আমরা অন্ধকার মাইক্রোতে বসে আছি। বাইরে অনবরত কাঁচে বাড়ি দেবার শব্দ। ভেতরে সবাই আতঙ্কে অস্থির। শায়লা আপু অদ্ভুত আচরণ করছে।
আপু রাতুল ভাইয়ের গলা চেপে ধরে বললো, ‘তোর কি মনে নাই, তুই আমার কি করেছিলি? আজ তার শোধ নিতে এসেছি। সেই পাপের ফল তুই পাবি আজকে।’
রাতুল ভাই চিৎকার করছেন। আতঙ্কে তার মুখের রক্ত সরে গেছে। মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছে তার।
রফিক ভাই আর জনি ভাই দুদিক থেকে আপুকে ধরে সরানোর চেষ্টা করছেন। পারছেন না। চিরদিনের রোগা আপুর গায়ে হঠাৎ যেন অসুরের শক্তি চলে এসেছে। তাকে বাঁধা দেবার সাধ্য আমাদের কারো নেই।
আমি মোবাইল বের করলাম। মামা-মামীকে ফোন দিবো। লাভ হলো না। নেটওয়ার্ক নেই ফোনে।
ড্রাইভার বারবার গাড়ি স্টার্ট নেয়ার চেষ্টা করছেন। পারছেন না। মাইক্রোর কাঁচে বাড়ির শব্দ তখন মাত্রা ছাড়িয়েছে। এখনই বুঝি কাঁচ ভেঙ্গে পড়বে।
এরপর, হঠাৎ সব চুপচাপ। বাইরের শব্দ থেমে গেল। মাইক্রো স্টার্ট নিলো। আপু জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেলেন।
ড্রাইভার গাড়ি ফুল স্পিডে টান দিলেন। যেকোন ভাবেই হোক, তার শহরে পৌঁছাতে হবে।
রাতুল ভাই বসে রইলেন চুপচাপ।
রফিক ভাই বললেন, ‘এসব কি হচ্ছে। কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।’
আমি বললাম, ‘আমি বুঝতে পারছি।’
‘কি বুঝেছিস?’
‘রাতুল ভাই, মিতু কে?’
রাতুল ভাই ঝাঁজের সাথে বলেন, ‘কেউ না।’
‘সত্যি করে বলেন তো, কে মিতু?’
‘কেউ না, বললাম তো। এমন করে প্রশ্ন করছো কেন তুমি?’
ড্রাইভার হঠাৎ ব্রেক করলো। এরপর পেছনে তাকিয়ে বললো, ‘স্যার, সত্যিটা বলে দেন।’
আপু ততক্ষণে জেগে উঠেছে।
রাতুল ভাই ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘গাড়ি চালা ব্যাটা।’
‘না স্যার। যে পাপ আমরা করছি, সেটা আমাদের এতোদূর নিয়া আসছে। সত্যি স্বীকার না কইরা আর উপায় নাই।’
‘দুই টাকার ড্রাইভার, এতো কথা কেন তোর? বেশি কথা বললে তোর মাইক্রো চালানো বন্ধ করে দিবো।’
ড্রাইভার মাইক্রো একদম বন্ধ করে দিয়ে চুপচাপ বসে রইলেন।
আমি ড্রাইভারকে বললাম, ‘আপনি তো সবই জানেন। তবে সবটা বলে দেন।’
রাতুল ভাই আবার কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, তখনই জনি ভাই মুখ খুললেন, ‘খবরদার। আর একটা কথা বললে, মাইক্রো থেকে বের করে দেবো।’
রাতুল ভাই চুপ করে গেলেন। তবে গজরাতে লাগলেন আপন মনে।
ড্রাইভার বলতে লাগলেন, ‘রাতুল স্যারদের এ অঞ্চলে খুব প্রতিপত্তি। তাদের ভয়ে কেউ কিছু করতে পারে না। সে সুযোগটাই রাতুল স্যার নিতেন। অনেক মেয়ের জীবন নষ্ট করেছিলেন তিনি।
শেষে তার মিতু আপার দিকে চোখ পড়লো। মিতু আপা আমাদের গ্রামের সবচেয়ে শিক্ষিত মেয়ে। পড়ালেখা শেষ করে গ্রামের স্কুলেই মাস্টারি করতেন। স্কুলের গরীব ছাত্রদের ফান্ডের টাকা রাতুল স্যারের চাচা সরায় ফেলছিলেন, তা নিয়ে আপা একটু প্রতিবাদ করছিলেন। তখনই তার দিকে স্যারের চোখ যায়।
গত সপ্তাহ, আপা যখন স্কুল থেকে ফিরছিলেন, তখন আমার মাইক্রোতে করে স্যার আপারে উঠায় নেয়। আমার মাইক্রোতে করে এমন অনেক খারাপ কাজ করসে স্যার, আমি ভয়ে কাউকে বলতে পারি নাই। পরে যে জায়গায় আপনারা মিতু আপার লাশ দেখছিলেন, সে জায়গায় মিতু আপার সর্বনাশ কইরা স্যার তারে খুন করেন। লাশটা এরপর রইস কুঁচি কুঁচি করে কাটে। তারপর নদীতে ভাসায় দেয়।’
আমরা সবাই অবাক হয়ে এ কথা শুনি। সবাই অবিশ্বাসের চোখে রাতুল ভাইয়ের দিকে তাকাই। এই তবে রাতুল ভাইয়ের আসল রুপ? আমরা চিনতে পারিনি কেন তাকে এতোদিন? মানুষকে বিশ্বাস করা এতো কঠিন কেন?
ড্রাইভার বলে চলে, ‘তবে এই ঘটনায় গ্রামে খুব তোলপাড় হয়। লাশ পাওয়া না গেলেও মিতু আপা যে নিঁখোজ, আর এতে রাতুল স্যারের হাত আছে, সবাই বুঝতে পারে। এই নিয়ে গ্রামে গ্যাঞ্জাম চলছে। আপনাদের বৌভাতের অনুষ্ঠান এই জন্যই খুব ভালো মতো হয় নাই। সবাই চাচ্ছিলো, তাড়াতাড়ি অনুষ্ঠান শেষ করে আপনাদের পার করে দিতে।’
জনি ভাই বললেন, ‘ড্রাইভার, তুমি গাড়ি টান দাও। তাড়াতাড়ি ঢাকায় যাওয়া লাগবে। সেখানে গিয়ে প্রথম থানায় ঢুকবা। এই জানোয়ারটাকে আমি ফাঁসিতে ঝোলাবো। তুমি হবা রাজসাক্ষী।’
ড্রাইভার গাড়ি চালাতে থাকেন। রাতুল ভাই চুপচাপ বসে থাকেন। তার যেন কোন চিন্তা নেই।
গাড়ি যখন গ্রামের রাস্তা ছেড়ে হাইওয়েতে উঠতে যাবে, তখনই রাতুল ভাই হঠাৎ বলে ওঠেন, ‘মনসুর, রইসের বরফকলে গাড়ি ঢুকা।’
ড্রাইভার চমকে উঠলো।
রাতুল ভাই চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘কিরে? কথা কানে যায় না? এক্ষুনি ওর বরফকলে গাড়ি ঢোকা। মনে রাখিস, তোর মা-বোন কিন্তু এখনও গ্রামে আছে।’
মনসুর গাড়ির মুখ ঘুরিয়ে ফেললো। আমি চিৎকার করে উঠলাম, ‘কি করছেন? ঢাকা চলেন তাড়াতাড়ি। ও আপনার মা-বোনের কিচ্ছু করতে পারবে না।’
মনসুর আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘আপনি জানেন না, উনি কি করতে পারে।’
গাড়ি তখনই এক বরফকলে ঢুকলো। আমরা ওকে থামানোর, বা কাউকে ফোন করবার সময়ই পেলাম না। এক কালো মোটা মতো লোক দৌড়ে এসে রাতুল ভাইকে সালাম দিলো। রাতুল ভাই বললেন, ‘রইস, এগুলা সব আমার শালা-সম্বন্ধি। এদের একটু খাওন-দাওন দে তো।’
আমাদের মাইক্রো থেকে নামানো হলো। এরপর মোবাইল-টোবাইল সব কেড়ে নেয়া হলো। জনি ভাই একটু প্রতিবাদ করতে গিয়েছিলেন। তাকে রইস অনেক মারলো। আমরা অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। এতোটা অসহায় নিজেদের কখনো লাগেনি।
রাতুল ভাই রইসকে বললেন, ‘এখানে বাইক আছে কয়টা?’
‘তিনটা আছে।’
‘সবগুলা নিয়ে আয় আমাদের সাথে।’
আমাদের আবার মাইক্রোতে ওঠানো হলো। রাতুল ভাই মনসুরকে বললেন, ‘গাড়ি বাড়িতে নিয়ে চল।’
শায়লা আপু রাতুল ভাইকে বললো, ‘তুমি এমন করছো কেন? আমাদের যেতে দাও। আমরা তোমার কথা কাউকে বলবো না, বিশ্বাস করো।’
রাতুল ভাই একটা কুৎসিত গালি দিয়ে বললেন, ‘কি ভাবছিস? আমি এতো বোকা? এতোক্ষণ যে নাটক করলি, আমি কিছুই বুঝতে পারবো না? তোরা সব মিলে আমারে ফাঁসানোর চেষ্টা করছিস। আমারে ভূতের ভয় দেখাস, না? তোদের আজকে খবর আছে। তোদের সাথে মিলে যারা এই ভূতের অভিনয় করছে, তাদেরও খবর আছে। একটাও গ্রামের বাইরে বেরোতে পারবি না।’
মাইক্রো চলতে শুরু করলো। তার পাশে তিনটা করে মোটরসাইকেল।
প্রথম যেখানে আমরা মেয়েটার লাশটা দেখেছিলাম, সেখানে এসে মাইক্রো থামলো। রাতুল ভাই নামলেন। শায়লা আপুকে নামালেন। আপুর চুলের মুঠি ধরে তার গলায় একটা ছুরি ঠেকিয়ে বললেন, ‘এখানে তোর কোন ভাই-বেরাদার লুকিয়ে আছে? অরে ডাক।’
আপু বললো, ‘এখানে কেউ লুকিয়ে নেই।’
‘আছে, অবশ্যই আছে। আমারে মিথ্যা বলে লাভ নাই। এখন ভালোয় ভালোয় ওদের বের কর। নাইলে এখানেই সবকয়টাকে শেষ করে দিবো।’
আপু কিছু বলছে না। চুপ করে আছে। তার চোখে পানি।
রাতুল ভাই খেঁকিয়ে উঠলেন, ‘কথা কানে যায় না? তাড়াতাড়ি ডাক। আর এক মিনিট দেরি করলে…’
হঠাৎ আপু ভীষণ জোরে রাতুল ভাইয়ের হাত কামড়ে দিলো। এক কামড়ে এক খাবলা মাংস ছিঁড়ে আসলো হাত থেকে। রাতুল ভাই চিৎকার করে হাতের ছুরি ফেলে দিলেন।
রইস আর ওর লোকজন দৌড়ে আসছিলো, এসময়ই আপুকে দেখে থমকে দাঁড়ালো ওরা। আপুকে ভীষণ ভয়ংকর লাগছে। তার মুখ বেয়ে রক্ত ঝরছে। চোখ দুটো টকটকে লাল।
রাতুল ভাই ব্যথায় কাঁতরাতে কাঁতরাতে বললেন, ‘ইডিয়টের বাচ্চারা। গুলি কর ওরে। কি করিস দাঁড়ায়া?’
রইস কাঁপা কাঁপা হাতে কোমরের পিছ থেকে পিস্তল বের করলো। কিন্তু সেটা তাক করতে পারলো না। তার আগেই এক ভয় পাওয়া আর্তনাদ বেরিয়ে এলো তার মুখ থেকে।
আপু যে জায়গাটায় দাঁড়িয়ে ছিলো, সেখানে এখন একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটাকে আমি চিনি। এর লাশই আমরা রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখেছিলাম।
মিতু।
আপু জ্ঞান হারিয়ে পড়ে আছে নিচে।
রইস কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললো, ‘এ এখানে কিভাবে? এর লাশকেই তো আমি শতটুকরা করছি।’
রইসের পাশের দুটো মোটরসাইকেল তাকে ফেলেই টান দিয়েছে ততক্ষণে।
রইস যেন বুদ্ধি হারিয়ে ফেলেছে। কোন রকমে মোটরসাইকেল ঘুরিয়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করলো। পারলো না বেশি দূর যেতে।
একটা গাছের সাথে ভীষণ জোরে ধাক্কা খেলো তার বাইক। গাছের গায়ে সজোরে বাড়ি খেলো তার শরীর। তার ঘাড় ভেঙে মাথা ঝুলে পড়লো শরীরের একপাশে।
মিতু ধীরে ধীরে রাতুল ভাইয়ের দিক এগোলেন। রাতুল ভাই বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে আছেন মিতুর দিকে, নিজের চোখকেও যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না। মুখ খোলা, কিন্তু চিৎকার দেয়ার সাহসটুকুও যেন তার নেই।
মিতু ফিসফিস করে রাতুল ভাইকে বললেন, ‘তোকে এতো সহজে আমি মারবো না। কিন্তু এর বদলে তুই শাস্তি পাবি, কঠিন শাস্তি পাবি। এখন থেকে যতোদিন তুই বেঁচে থাকবি, সব জায়গায়, সবখানে তুই আমাকে দেখতে পারবি। আমার এই গলা-পঁচা লাশের শরীর তাড়া করবে তোকে। অনন্তকাল ধরে তোর এই শাস্তি চলতে থাকবে। আমার হাত থেকে তুই নিস্তার পাবি না।’
মিতু চলে গেলেন। কিন্তু রাতুল ভাইয়ের মুখে তখনও আগের মতো আতংকের ছাপ। কি যেন দেখে তিনি ভয় পাচ্ছেন, প্রচন্ড ভয় পাচ্ছেন। তার মুখ থেকে গোঙানির শব্দ আসছে। গ্যাজলা বেয়ে পড়ছে তার মুখ বেয়ে।
শেষ কথা- সেই ঘটনার পর রাতুল ভাইদের পরিবারের প্রতিপত্তি একদমই কমে যায় গ্রামের মধ্যে। গ্রামের মানুষজন এক হয়ে তাদের সকল অন্যায়ের প্রতিবাদ করে। শেষে রাতুল ভাইদের পরিবারের সবাইকে গ্রাম ছেড়ে অন্য জায়গায় পালাতে হয়। পালানোর আগে দুই-একজন গণপিটুনিও খায় গ্রামবাসীর কাছে।
শায়লা আপুর এই ঘটনার ট্রমা কাটতে অনেকদিন লেগেছিলো। আপু ঠিক করেছিলো, আর বিয়ে করবে না। এমন ঘটনার পর আর কোনো ছেলেকেই সে বিশ্বাস করতে পারবে না। কিন্তু সময় যেতে যেতে তার মনেরও পরিবর্তন হয়।
আপুর আবার বিয়ে হলো, এবার সত্যিকারের একজন চমৎকার মানুষের সাথে। ফুটফুটে একটা কন্যা সন্তান রয়েছে তাদের সংসারে। আপু মেয়েটার নাম রেখেছে, মিতু।
রাতুল ভাইয়ের কিছুটা খবর পেয়েছি আমি। তিনি নাকি আর প্রকৃতিস্থ হতে পারেননি। গ্রামের পথেই ছালা পরে ময়লা-জটাধারী চুল নিয়ে ঘুরে বেড়ান। মাঝেমাঝে কি দেখে নাকি ভয়ে অস্থির হয়ে যান, ছুটোছুটি করেন। তার মুখ বেয়ে ফেনা বের হতে থাকে, মুখে চাপা আর্তনাদ শোনা যায়।
তবে রাতে নাকি তিনি ঘুমাতে পারেন না।
ভীষণ আতংকে গ্রামময় ছুটে বেড়ান। গ্রামের লোকদের যদি কারো মাঝরাতে ঘুম ভাঙে তবে তিনি রাতুল ভাইয়ের ভয় মেশানো চিৎকার শুনতে পান। কিসের ভয়ে তিনি ছুটে বেড়ান সারারাত ধরে, গ্রামবাসী বুঝতে পারে না
2 Responses
Citibet88login is where I log in to potentially increase my daily budget for Starbucks. A man can make a little. I am all about the login and quick fun. citibet88login
Alright, Wild Bandito demo, let’s see what you got! Heard some buzz about this one. Gonna give it a spin and see if it’s worth my time. Hoping for some sweet wins! Check it out for yourself here: wild bandito demo