ঘুম থেকে উঠার পর আমার অবস্থা হল সিজফ্রেনিয়া রুগীর মত।রাতে কি হয়েছিল কিছুই মনে করতে পারছি না কিন্তু বুকের ভেতরটা অজানা আতঙ্কে দুরুদুরু কাঁপছে।ঘুম যখন ভাঙল তখন সকাল গড়িয়ে দুপুর। জানালার ফাঁক গলে রোদ এসে ঘরময় নৃত্য করছে। রাতে মা আর শিশুর আহত শারীরিক অবয়ব দেখার ভৌতিক ঘটনাকে কেমন যেন গল্প ঠেকছে।দ্রুত বাথরুমে গিয়ে চোখে-মুখে জল দিলাম। কপালের কাছটা পানির স্পর্শ পেতেই টনটনে ব্যথা করে উঠল। বেহুশ হবার সময় বেকায়দায় পরে দরজার কোণা লেগে মাথায় আঘাত পেয়েছিলাম। কপালের ডানপাশ ফুলে ঢোল হয়ে আছে।
বহু কসরত করে এক কাপ রঙ চা বানিয়ে বিছানায় আরাম করে পা ছড়িয়ে বসলাম। বেলা ১১ টায় অফিসে ঢুকে বসের ঝাড়ি খাবার চেয়ে কামাই করা শ্রেয়।আজ ছুটি নেব ভাবতেই একটা শান্তিবোধ হল। মগবাজার বোনের বাসা। অনেকদিন ভাগ্নেভাগ্নিদের সাথে দেখাসাক্ষাৎ নাই।ওদের বাসায় ঘুরে গেলে কেমন হয় ভাবতে ভাবতে চায়ে চুমুক দিলাম।ঠোঁটের আগায় তিতকুটে চায়ের স্বাদ মুহূর্তে ভাবনার বেড়াজাল ছিঁড়ে মিলির কথা মনে পরল।মিলি নাই। মিলি ছাড়া সকালের চা বেরসিক, বাথরুমে গোসলর গরম পানি নাই, সবুজ মিয়ার দোকানের আধাকাঁচা পরোটা দিয়ে নাস্তা আরো এক হাজার রকম সমস্যা।
আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে, মিলিকে ছাড়া এই প্রথম কোনো সমস্যাকেই তেমন গুরুতর মনে হচ্ছে না। মন ঢুকে আছে আলমারির ভেতর। কোনোক্রমে চা শেষ করে আলমারির চারপাশে চক্রকারে কয়েকবার ঘুরলাম।চেয়ারের উপর দাঁড়িয়ে আলমারির উপরের ছাদটুকুও ভালোমতন লক্ষ্য করলাম।পুরানো আমলের ফুলকাটা নকশা,যথাসম্ভব এটা সংগ্রহ করা হয়েছে গ্রাম বা মফস্বল এড়িয়া থাকে। আজকাল এত উঁচু আর ভারী ডিজাইনের আলমিরা আধুনিক ফ্ল্যাটবাসায় ব্যবহৃত হয় না। সময়ের সাথে সাথে একসময়ের বনেদি ডিজাইনও পুরানো খাতায় নাম লেখায়। সে যাই হোক, তাই বলে দশ হাজার মানে নামমাত্র মূল্যে মিলি আলমিরা পেয়ে গেল ভাবতে কেমন খটকা লাগছে।
যাই হোক,আলমারির চাবি মিলির কাছে। আমি করলাম কি, মিস্ত্রি ডেকে আলমারির দুটো তালাই ভেঙে ফেললাম। দরজার পাল্লাদুটো খোলা রেখে সদর দরজায় তালা দিয়ে বাজার করতে এলাম।একটা ভালো টর্চলাইট,পাওয়ার ব্যাংক, মোমবাতি,ম্যাচবক্স এসব আর কি!ভূত-প্রেতে বিশ্বাস করি না তবে শৈশবে ভূতের গল্প শুনতে ভয় পেতাম। আলমারি দরজা খুলে ঘুমানো এক প্রকার অশরীরী কিছুকে আহ্বান করার মত চ্যালেঞ্জ মনেই আমার কাছে মনে হচ্ছে। মিলির ভাবী ফোন দিয়েছে। মিলির খু্ব জ্বর। জ্বরের ঘোরে একটা ছোট্ট ছেলের কথা বারবার বলছে। কালই যেন মিলিকে দেখতে যাই।
যাব! তার আগে সামান্য একটা জড়বস্তু দুজনের সাত বছরের সম্পর্কে চিড় ধরিয়ে ফেলেছে সেই অভিশপ্ত জিনিসটার সাথে বোঝাপড়া করতে চাই।
সারাদিন আর বাড়ি ফিরলাম না। দুপুরে পরিচিত হোটেলে ভাত-মাছ খেয়ে পার্কেই বেঞ্চে শুয়ে লম্বা ঘুম দিলাম। আলমারিটা যতক্ষণ না বিদায় করতে পারব বাড়িতে আমার ঘুম হবে না। কে জানে! ঘুমের মধ্যে কিছু বের হয়ে গলা টিপে ধরেই না কি না। লোকে শুনলে ভাববে, আটত্রিশ বছরের বুড়ো লোক বাচ্চাদের মত কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। কিন্তু না! কাল রাতের ভয়াবত অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দিচ্ছে কিছু একটা তো অবশ্যই আছে নয়ত ঘরের দুজন সুস্থ -সবল অস্বাভাবিক কিছু লক্ষ্য করবার কথা নয়।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলাম বিরিয়ানির প্যাকেট হাতে। মিলির জ্বর ১০৩। ইচ্ছা হচ্ছে ছুটে কুড়িগ্রাম চলে যাই। মেয়েটা অসুস্থ হলে বেড়ালের মত গুটিসুটি মেরে আমার বুকে ঘুমিয়ে থাকত৷ কি করছে কে জানে!আলমারির দরজার যেমন রেখে গিয়েছিলাম তেমনি আছে। খোলা। মিলির সাজানো শাড়ির সালোয়ার কামিজের বাহার দেখা যাচ্ছে। অন্যপাশে আমার পাঞ্জাবি, ইস্ত্রি করা শার্ট।মিলির একটা ভাজ করা শাড়ি নিয়ে নাকে শুঁকলাম।কেমন আপন আপন গন্ধ! প্রিয় মানুষের শরীরের গন্ধ হৃদয়ের গভীরের যত জড়তা ধুয়েমুছে সাফ করে দেয়।
ফেসবুকে স্ক্রলিং আর টিভিতে নিউজ দেখেও সময় কাটছিল না। ঘড়ির কাটায় মাত্র নয়টা ততক্ষণে আধপ্যাকেট সিগারেট শেষ। টেনশনে থাকলে সিগারেটের তৃষ্ণা বেশি জাগে এটা একেবারে ধ্রুব সত্য। ঘর বাহির করছি,বারান্দায় যাচ্ছি, মিলির খোঁজ নিচ্ছি। একফাঁকে রাতের খাবার খেয়ে নিলাম।
রাত বাড়তে থাকল।টিভি দেখতে দেখতে বার বার আলমারির দিকে তাকাচ্ছি। আলমারির ভেতর মিলির জামাকাপড় যেন বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আমাকে উপহাস করছে।মনে হচ্ছে অযথাই অপেক্ষা করছি, অল্পবয়সী বাচ্চাদের মত কল্পনায় ডুবে আছি কখন আলমারির ভেতর থেকে রাক্ষস খোক্কস বেরিয়ে আসবে।টিভিতে দক্ষিণ আফ্রিকা-ইংল্যান্ডের নিস্তেজ টেস্ট খেলা চলছে।মিলি থাকলে টিভির রিমোট থাকে মিলির দখলে। হঠাৎ রিমোটের দখল পেয়ে কি দেখব খুঁজে পাচ্ছি না। সম্ভবত সারাদিনের টেনশনে বেশ ক্লান্ত ছিলাম। অজান্তেই ঘুমিয়ে গেলাম।
ঘুম ভাঙল হঠাৎ! ঘড়ির কাটায় কয়টা বাজে জানি না। লাইট জ্বালিয়েই ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম।ঘুম থেকে উঠে দেখি ঘুটঘুটে অন্ধকার।ইলেক্ট্রিসিটি নাই৷ বিছানা হাতড়ে ফোন খুঁজলাম। আশ্চর্য ফোন বন্ধ! এত সর্তকতার সঙ্গে মোম,ম্যাচ সব বাড়িতে নিয়ে আসলাম আর ফোনে চার্জ দিতেই ভুলে গেছি।
কয়েক মিনিট চোখ মেলে শুয়ে থাকার পর অন্ধকার কিছুটা চোখে সয়ে এল। বিছানা থেকে উঠে এক পা দু’পা করে রান্নাঘরের দিকে এগোলাম।ম্যাচ,টর্চলাইট সব ওইখানে।
টর্চলাইট জ্বালিয়ে দুটো মোম জ্বালিয়ে ঘরে ফিরলাম।মুহূর্তে একটা মোম নিভে গেল। বুকের ভেতরটা কেমন দপ করে উঠল! কেউ বলে দেয় নি কিন্তু টের পাচ্ছি ঘরের ভেতর বাতাস শীতল। কুপির সলতে পোঁড়া ঘ্রাণ নাকে এসে ঠেকছে। যতটা ভয় পাবার কথা ততটা পেলাম না। বরঞ্চ শরীরে এক প্রকার শক্তি ভর করল। সকাল থেকে আমি এইরকম এক ভয়াবহ পরিস্থিতির অপেক্ষায় আছি। বুক ভরে একটা নিশ্বাস নিয়ে নিজের প্রবোধ দিলাম। মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে।
মোমবাতি টেবিল উপর রেখে ফোন পাওয়ার ব্যাংকে চার্জ দিলাম।টর্চ লাইট বন্ধ করে বিছানার উপর বসলাম। ঘড়ির কাটায় তখন রাত দুইটা চল্লিশ।।আমি মিলির একটা গল্পের বই হাতে নিয়ে পড়ার চেষ্টা করছি। কৌতুকের বই। সস্তা কিছু একঘেয়ে কৌতুকে লেখক একশ কুড়ি পৃষ্ঠার বই লিখে ফেলেছে। মানুষ তা কিনে পড়ছে ও। এক পাতা পড়ি আর ঘড়ির দিকে তাকাই। সময় আগাচ্ছে না।
কয়েক পৃষ্ঠা পড়বার পর বইয়ে বুঁদ হয়ে গেছিলাম। একটা দমকা বাতাস এসে মোমবাতি নিভিয়ে দিয়ে গেল। আমি ম্যাচবক্স নিয়ে প্রস্তুত ছিলাম কিন্তু ঘরের ভেতর দ্বিতীয় কোনো প্রাণীর উপস্থিতি আমার হাত-পা অবশ করে ফেলল।আলমারির ভেতর থেকে একজন মহিলা যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলছে।টুঙটাঙ কাঁচের চুড়ি আর নতুন কাপড়ের খচখচে আওয়াজ। আমার দুই হাত দূরে টেবিলে মোম, হাতের কাছে টর্চলাইট কিন্তু নড়তে পারছিলাম না। ঠিক এই সময় একটা তিন -চার বছরের বাচ্চা মা মা বলে ডেকে উঠল। আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছি না ঘরের ভেতর একটা শিশু আর্তনাদ করছে। আলমারির মেঝের কাছে হুটোপুটির আওয়াজ হল।
আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না টর্চলাইট অন করে কে কে বলে চিৎকার করে উঠলাম। শাড়ির খসখস বাচ্চার কান্না থেমে গেল কিন্তু….
কিন্তু আমার পিছনে গরম হাতের অনুভূতি টের পাচ্ছে। ধীরে ধীরে সেই হাত পিঠ থেকে ঘাড়ের দিকে উঠে আসছে। আমার শরীরে সম্ভবত কিছু একটা এসে ভর করেছিল। আমি দ্রুত হাত পিছনে ঘুরে টর্চলাইট দিয়ে আঘাত করছি। ছোট বাচ্চার মত কিছু একটা কুঁইকুঁই করে পিছিয়ে গেল। টর্চলাইট নিভে গেছে। টর্চলাইট বন্ধ হয়ে যাবার আগে এক পলক শুধু দেখলাম আগুনে ঝলসে পড়া দুটো ছোট হাত আমার দিকে এগিয়ে আসছে ….
আমি জানি না সেই বিভীষিকাময় রাত কিভাবে শেষ হয়েছিল।যতদূর মনে পরে আমি টর্চলাইট প্রানপণ জ্বালানোর চেষ্টা করছিলাম। আর সেই বাচ্চাদের মত ছোট সাইজ প্রাণীটা আমার হাতের উপর কিলবিল করে উঠে বাঁধা দেবার চেষ্টা করছিল। শেষপর্যন্ত কারেন্ট এসে পরায় ওই যাত্রায় বেঁচে গিয়েছিলাম। বিদ্যুতের আলোতে লণ্ডভণ্ড ঘরের দিকে এক পলক তাকিয়ে শরীরটাকে টেনে হেঁচড়ে বাসার বাইরে নিয়ে আসলাম। পরদিন বাড়ির কেয়ারটেকার আমাকে আবিষ্কার করে সিড়িতে। ঘুমন্ত অবস্থায়।হাতের নানা জায়গায় আঁচড়-কামড়ের দাগ। ছেঁড়া শার্ট। বিধ্বস্ত চেহারায় আমি শুয়ে আছি।
সেদিন সন্ধ্যায় আমি ঝালকাঠি রওনা হই।মিলিকে দেখতে। যাবার আগে অভিশপ্ত আলমারিটা এক এতিমখানায় দান করে আসি। এতিমখানার বড় হুজুরকে পুরো ঘটনা বলতে তিনি আলমারি গ্রহন করতে রাজি হন এবং আমাকে আর মিলিকে কিছুদির বাাসার বাইরে থাকার নির্দেশ দিলেন এবং তিনি এরমধ্যে বাড়িটা বন্ধক দিবেন। বাড়িতে অশুভ কিছুর উপস্থিতি টের পাবার বন্ধক দেবার কথা শুনে আমি আর বাঁধা দিলাম না।
যাই হোক, তার কিছুদিনের মধ্যে মিলি কনসিভ করে এবং আমি বাসা পরিবর্তন করি। আমি জানি না, এতিমখানার লোকজন আমার মত কোনো ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে কী না।
তবে নিশাত জন্মের সাত বছর একদিন ট্রেন স্টেশনে বড় হুজুরের সাথে দেখা হয়ে গিয়েছিল।ভদ্রলোকের আগের মতই শক্ত-সমর্থ শরীর। দাড়িগুলো সব পেকে সাদা হয়ে গেছে এতে উনার চেহারায় একটা সুফী সুফী ভাব চলে এসেছে। তিনি মিলির খোঁজ নিলেন। নিশাতের জন্ম হয়ে শুনেছে শোকরিয়া আদায় করলেন। করব না করব না করেও আমি আলমারির কথা জিজ্ঞেস করলাম।তিনি হেসে বললেন,
-আলমারির গোপন ড্রয়ারে আমার একজন ছাত্র একটা আধপোঁড়া চিঠি পেয়েছে। সম্ভবত আলমারির ভেতর মা আর তার ছোট সন্তানকে পুঁড়িয়ে মারা হয়েছে। কালো আলমারির রঙ তাই আপনারা লক্ষ্য করেন নাই আলমারির ভেতর দেয়ালে পোঁড়া দাগ!
-এখনও রাতে ওইরকম শব্দ হয়?
এই প্রশ্নের উত্তরে হুজুরসাব মুচকি হাসলেন। সেই হাসিতে দুরকমের অর্থ হয়। কোনটা সত্যি আল্লাহপাকই ভালো জানেন!