অনন্ত যৌবন

১২/১৩ বছরের দু’টো মেয়েই একসাথে সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলছিলো। দু’জনের গলাই অপরাধীদের ফাঁসি দেওয়ার মত করে পেঁচিয়ে আছে একটা মাত্র মোটা দড়ি। দৃশ্যটা ততক্ষণ ভয়ংকর ছিলো, যতক্ষণ মেয়েদু’টো ছিলো নিশ্চল, কিন্তু আতংকজনক হয়ে উঠলো যখন ওরা নড়তে আরম্ভ করেছিলো। প্রথমে কালো জুতো পরা দুই জোড়া পা হঠাৎ হঠাৎ অনিয়ন্ত্রিতভাবে নেচে উঠছিলো, তারপর খু-ব ধীরে ধীরে মেয়েদু’টোর লাশ ঘুরতে আরম্ভ করলো চক্রাকারে, ঘড়ির কাঁটার দিকে। সজীব মাত্রাতিরিক্ত আতংকে জমে গেছিলো, খেয়াল করলো মেয়েদের ঘূর্ণন গতি বাড়তে বাড়তে চক্রটাও বড় হয়ে উঠেছে। মনে হচ্ছিলো যেনো ফ্যানে বাঁধা দোলনা। চক্রটা আর অল্প বড় হলেই ওদের হিম, নিস্পন্দ শরীর ধাক্কা খাবে সজীবের দেহের সাথে…
প্রচন্ড আতংক নিয়ে সজীবের ঘুম ভাঙ্গলো স্বপ্নের এ পর্যায়ে। স্বপ্ন, স্বপ্নই তো, নাকি?! সত্য বলতে বাস্তবের চেয়েও বেশি বাস্তব ছিলো স্বপ্নটা। ওদের ড্রয়িংরুমের ফ্যান, টিভি, জানালা সব ছিলো বাস্তবের মতই। মেয়েগুলোর কালো জামায় চিকচিকে পুতি বসানো ছিলো অনেকগুলো- স্বপ্নে এতো ডিটেইলিং থাকে? সব থেকে বড় কথা হলো- একই স্বপ্ন সে পাঁচ/ছয় দিন আগেও একবার দেখেছে। তবে সেবার মেয়েগুলো ফ্যানের বদলে গ্র্যাভিটিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সিলিং এ লেপ্টে ছিলো, টিকটিকির মতন। যেনো সিলিংটাই একটা বিছানা। সেবারও ওদের গায়ে ছিলো অনেকগুলো পুতি বসানো একই কালো জামা, পায়ের জুতোজোড়াও ঠিক এবারের মতই। অনেকক্ষণ দু’জনই ছাদ এর সাথে লেপ্টে চোখ বন্ধ করে থাকার পর চোখ খুললো। ওরা সরাসরি তাকিয়ে ছিলো সজীবেরই দিকে। একসময় ছাদ আঁচড়ে, খামচে খুব ধীরে ধীরে তাঁর দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করলো। মেয়েদু’টোর চেহার হুবহু একই রকম ছিলো, যমজ সন্তান হলে যেমন হয়। ঠিক সজীবের মাথার উপর পৌছে তাঁরা স্থির হলো। সজীব ঘুমের মধ্যেই টের পেয়েছিলো- বিষপানে আত্মহত্যার চিহ্ন বয়ে বেড়ানো মেয়েদু’টোর ঠোঁট বেয়ে গড়িয়ে পরা সাদা ফেনা ওপর থেকে সজীবের গায়ে পড়ছে। বলা বাহুল্য- সেবারও তীব্র আতংকে সজীবের ঘুম ভেঙ্গে যায়।
প্রথমবার ঘুম ভাঙ্গার পর যেমন দুর্বল লেগেছিলো সজীবের, এবার আরো বেশি দুর্বল লাগছে। ব্যাপারটা নিয়ে কি তার অন্য কারো সাথে আলাপ করা উচিত? নাকি এসবের সাথে গত সপ্তাহেই বিরামপুর জমিদারবাড়ি ঘুরে আসার কোনো সম্পর্ক আছে?
***
বিরামপুর জমিদারবাড়ি যাওয়ার আসলে কোনো প্ল্যান ছিলো না সজীবের। সে ছোটখাট কন্টেন্ট ক্রিয়েটর। একজন ভ্লগার। বাইক নিয়ে ঢাকার কাছাকাছিই এক পুরনো জমিদারবাড়ির সন্ধানে বেরিয়েছিলো। শুনেছিলো মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে এমনই এক প্রাচীন বাড়ির অস্তিত্ব আছে নাকি আজও, কিন্তু পৌছে রীতিমত চমকালো। বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রত্নতাত্ত্বিক জমিদারবাড়ির মত কোনো ধ্বংসস্তুপ তো নয়ই, বরং রীতিমত বাসযোগ্য। সব থেকে বড় কথা- জমিদারদের এক বংশধর আজো সেই বাড়িতে বসবাস করছেন সস্ত্রীক।
ভদ্রলোকের নাম কৃষ্ণপদ, নামের শেষে চৌধুরি এবং শুরুতে এখনো ‘রাজা’ পদবী বসান। সজীবের বাড়ি খুঁজে বের করতেই প্রায় দুপুর হয়ে গেছিলো, ঢাকা থেকে বাইক নিয়ে তাঁদের রাজবাড়ি দেখতে এসেছে শুনে কৃষ্ণপদ বাবু খুব খুশি হলেন। সজীবকে প্রস্তাব করেছিলেন তাঁর ওখানেই দুপুরের খাবারটা খেয়ে নেয়ার জন্য- “আমাদের বাড়িটা একটু রিমোট জায়গাতে। আশেপাশে খাবার দোকান বলতে সেরকম কিছু পাবেন না। খুব কাছাকাছি বলতেও বাজার যেটা আছে, ওখানে পৌছাতে আপনার মিনিমাম আধাঘন্টা সময় লাগবে। তারচেয়ে আমার এখানেই চারটা ডালভাত খেয়ে নেন। খাওয়া শেষে আমি নিজেই আপনাকে ঘুরিয়ে দেখাবো বাড়িটা…”
কৃষ্ণ বাবু ডালভাতের কথা বললেও সজীব খাবারের আয়োজন দেখে চমকালো। দস্তরখান বিছিয়ে খাবার আয়োজন। সবজি, মাছ, মাংস মিলে ১৭টা আইটেম গোনার পর সজীব আর গুনতে সাহস করে নি। তাছাড়া বৈঠকখানাতেও রুচির ছাপ স্পষ্ট। সত্যিকার জমিদারবাড়ি কেমন হয়- সে ব্যাপারে সজীবের কোনো আইডিয়া নেই, কিন্তু তারপরো সে অনুমান করলো- ওসব বাড়িতে নিশ্চয়ই এমন আভিজাত্যেরই ছাপ থেকে থাকবে। তবে এতোকিছু ছাপিয়েও একটা ভ্যাপসা, প্রাচীন প্রাচীন গন্ধ ঠিকই ছিলো, যেটা বারবার সত্যটা মনে করিয়ে দিচ্ছিলো যেনো সবাইকে- এ বাড়ির গায়ে এখন শ্যাওলা জমেছে। এর আগের জৌলুস আর কিছুই অবশিষ্ট নেই!
কৃষ্ণ বাবুর স্ত্রী এতোক্ষণ একটা কথাও বলেননি, লম্বা একটা ঘোমটা টেনে তফাতে বসেছিলেন। খাওয়া শেষে সজীবকে পান এগিয়ে দিতে দিতে শুধু নীচু গলায় বললেন- “খাবার ভালো হয়েছে? আমি নিজে রেঁধেছি সব..”
সজীবের অবাক হওয়ার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেছিলো ততক্ষণে, তা না হলে মহিলার একথা শুনেও সে চমকাতো। কৃষ্ণ বাবু কৈফিয়ত দেয়ার ভঙ্গিতে বললেন- “অজপাড়া গাঁ অঞ্চল, এখানে হেল্পিং হ্যান্ড কোথায় পাবে বলেন। এ কারণে কষ্ট হলেও…”
ঘুমে সজীবের চোখ বন্ধ হয়ে আসছিলো। ভদ্রলোকের কথায় মন বসাতে পারছিলো না সে। আশ্চর্য, কোথাও ঘুরতে গিয়ে আজকে ঘুমিয়ে পড়ার রেকর্ডও করে ফেলবে নাকি!
এসব এলোমেলো ভাবতে ভাবতে সত্যি সত্যি নিজের অজান্তেই সজীব ঘুমিয়ে গেলো একসময়।
***
অবশ্য ঘুম থেকে ওঠার পর বেশ ঝরঝরে লাগছিলো শরীরটা। কৃষ্ণবাবুকে ঘরে ঢুকতে দেখেই যেই কিছু একটা বলতে যাবে, এমন সময় উনি নিজেই বললেন- “আপনার বিব্রত হওয়ার কিছু নেই ভাই। তাছাড়া বেশিক্ষণ ঘুমানও নি আপনি। সব মিলে চল্লিশ মিনিটের কিছু বেশি হবে।”
“আসলে…”
কৃষ্ণবাবু আবার প্রসঙ্গ ঘোরালেন- “যদি কিছু মনে না করেন, দ্রুত ফ্রেশ হয়ে এক কাপ চা খেয়ে নিন। তারপর যে কাজে এসেছিলেন, সেই আসল কাজটা শেষ করে ফেলেন, নাকি! অঘ্রাণ মাসে দিন খুব একটা বড় হয় না, অন্ধকার হয়ে যাবে একটু পরেই। তখন আর ঘুরে দেখতে পারবেন না ভাই।”
সজীব দশ মিনিটের মাঝেই চা শেষ করে কৃষ্ণবাবুর সাথে রাজবাড়ি কমপ্লেক্স ভ্রমণে বেরিয়ে পরলো। তাঁর কাছে মনে হচ্ছিলো- কৃষ্ণবাবু একটু বাড়িয়েই বলেছেন। সত্যি বলতে জমিদারবাড়িটা খুব বিশাল কোনো স্থাপনা নয়। মূল বাসস্থান এর বাইরে বলতে শুধু একটা বাইজি ঘর আর মন্দির। ছোট একটা কুয়াও আছে কমপ্লেক্স সীমানার ভেতরে। এটুকু জায়গা ঘুরে দেখতে দেখতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে কেনো- সেটাই সজীব বুঝে উঠতে পারছিলো না।
তবে এটা ঠিক, মূল বাড়িটা দেখার মত ছিলো। এখানেরই একটা ঘরে সজীব খেয়েছিলো দুপুরে। বাইরের প্যাঁচানো সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে দোতলায় চলে যাওয়া যায়। সজীব বিস্মিত হলো দেখে, দোতলার হলরুমের মত একটা ঘরে এখনও বিশাল বিশাল সব ঝাড়বাতি, দেওয়ালজুড়ে দামি সব পর্দা আর একটা দু’টো কাঠ কি মার্বেলের অভিজাত আসবাব অবশিষ্ট আছে। সজীব তাঁর ভ্লগের বড় একটা অংশই এখানে শ্যুট করলো।
মূল বাসস্থান শেষ করার পর বাইজি ঘর। সেখানে তেমন কিছু নেই, তাই ঘুরে দেখতে বেশি সময়ও লাগলো না। তবে সজীবের অনুমান ভুল প্রমাণ করে ঝুপ করে হঠাৎই সন্ধ্যা নেমে এসেছিলো তখন। ওড়া যখন কুয়া দেখতে যাচ্ছিলো, ততক্ষণে সূর্য ডুবে গেছিলো পশ্চিমে।
কুয়ার কাছটায় এসে কেনো জানি সজীবের বুক ধ্বক করে উঠেছিলো। মনের হচ্ছিলো এর ভেতর বুঝি ভয়ংকর একটা কিছু আছে। অথচ কুয়াটা ছিলো নিতান্তই শ্রীহীন। ভেতরে অনিঃশেষ অন্ধকার। কৃষ্ণবাবু জানালেন- মন্দিরের যাবতীয় কাজে এ কুয়ার পানিই ব্যবহৃত হতো একসময়, বর্তমানে যা পরিত্যাক্ত।
সবশেষে তাড়াহুড়ো করে কৃষ্ণবাবু সজীবকে মন্দির দেখাতে নিয়ে গেলেন। ওটাও এরই মধ্যে ভগ্নস্তুপে পরিণত হয়েছে। ভেতরটা কুয়ার মতই অন্ধকার। সজীব জানতে চেয়েছিলো “এটা কার মন্দির?” কিন্তু কৃষ্ণবাবু কোনো জবাব দিলেন না। সজীব অন্ধকারে চোখ সয়ে আসার পর আবছা আবছা দেখলো- অল্প দূরে দু’টো মূর্তির অবয়ব বোঝা যাচ্ছে। রাধাকৃষ্ণ নাকি? কৃষ্ণবাবুও মূর্তি হয়ে গেছেন যেনো, সজীবের দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে রাধাকৃষ্ণর দিকে চেয়ে।
কুয়ার সেই অনুভূতিটা আবারো ফিরে এলো হঠাৎ। এবার সজীব এক ঝটকায় মন্দির থেকে বাইরে বেরিয়ে এলো দ্রুত। কেমন একটা ঘোর ঘোর যেনো লাগছিলো তাঁর, মনের ভেতর কে যেনো একটা সতর্ক করছিলো- “পেছনে তাকাস না। বাঁচতে চাইলে পালা এখান থেকে!”
কিন্তু সজীব পেছনে তাকিয়েছিলো। দেখলো কৃষ্ণবাবু খুব স্বাভাবিকভাবেই বেরিয়ে এসে মন্দিরের দরজায় তালা লাগাচ্ছেন। সজীবকে দেখে একটু হেসে বললেন- “ঢুকেছিলাম যেহেতু, প্রণামটা করেই এলাম।”
কোথায় যেনো একটা সুর কেটে গেছিলো। কৃষ্ণ বাবু আরেক কাপ চা খেয়ে যাওয়ার জন্য খুব জোরাজুরি করলেন, কিন্তু সজীব একরকম অভদ্রের মতই ও বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিলো। তারপর বড় কোনো ঘটনা বা দুর্ঘটনা ছাড়াই ঢাকায়।
***
ঢাকায় ফিরে সে ব্যস্ত হয়ে পড়ে খুব। বেশ কিছু পরীক্ষা ছিলো পরপর। ওগুলো গুছিয়ে উঠতে না উঠতেই এইসব অতিবাস্তব স্বপ্নের যন্ত্রণা। তাছাড়া, স্বপ্নগুলো দেখার পর থেকেই বোধহয় সজীবের শরীরটা দুর্বল লাগে আজকাল অত্যাধিক, সব মিলে বিরামপুর জমিদারবাড়ির ভ্লগটা নিয়ে বসার আর সময় পায় নি। অবশ্য সজীবের ক্ষেত্রে প্রায়ই এমন হয়। ভিডিও করে আনা আর এডিট করে ইউটিউবে আপ দেওয়ার মধ্যে অনেক সময় তিন-চার মাসেরও ব্যবধান থাকে। তবে বিরামপুরের ক্লিপগুলো এডিট করতে গিয়ে মাথায় বাজ পড়ার মত অবস্থা হয়েছিলো তাঁর। ডিভাইস ঘেটে দেখলো- সেখানে ঐ জমিদারবাড়ির ভিডিও তো দূরের কথা, একটা স্টিল ছবিও নেই।
অথচ সেদিন মুন্সিগঞ্জ যাওয়ার পথের ক্লিপ, মাঝে তিন-চারবার চায়ের দোকানে থামা, এমনকি সিরাজদিখান বাজারের বেশ কিছু ছবিও আছে। শুধু নেই বিরামপুর জমিদারবাড়ি! আশ্চর্য, এটা তো কোনোভাবেই হওয়ার কথা নয়! তাহলে কি সজীব নিজেই মনের ভুলে ক্লিপগুলো মুছে দিয়েছে? নাহ, হিসাব মিলছে না। হিসাব জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে দিন-কে-দিন।
সজীবের একটা ভালো গুণ আছে, যেটা আধুনিক যুগের অনেক ছেলেমেয়েরই থাকে না, আর তা হলো কোনো একটা জিনিসের পিছনে লেগে থাকা। এ কারণেই তৎক্ষণাত সে ডিসিশন নিলো আবার বিরামপুর যাবে। ঝড়ের মত বাইক ছুটিয়ে ২ ঘন্টার ভেতরই সিরাজদিখান বাজারে পৌঁছে গেছিলো। আজও দুপুর প্রায় পার হয়ে গিয়েছে। তবে গতদিনের মত এবার আর অন্ধের মত বাইক ছোটালো না বিরামপুরের দিকে। সিরাজদিখানেই চায়ের দোকান, পুরির দোকান আর অটোওয়ালাদের কাছ থেকে জমিদারবাড়ি আর কৃষ্ণপদ বাবুর ব্যাপারে একটু খোঁজখবর নেওয়া শুরু করলো। অবশ্য যে উত্তর পেলো, তাতে বিভ্রান্তি বাড়লোই। সকলে একবাক্যে জানালো সজীবকে- কোথাও একটা কিছু ভুল হয়েছে, বিরামপুরে জমিদারবাড়ি ছিলো ঠিকই, কিন্তু আজ আর সেখানে কয়েকটা ইটের স্তুপ ছাড়া বিশেষ কিছু অবশিষ্ট নেই। মাথা গোঁজার মত ভগ্নপ্রায় একটা ছোট্ট ঘর (বাইজিঘরটা অথবা মন্দির) আছে, তবে সেটাও যে কোনো মুহূর্তে ভেঙ্গে পড়ে যাবে। আর কৃষ্ণবাবু নামে নাকি ওখানে কেউ থাকে না, থাকে আধাপাগল নিয়ামত হোসেন আর তাঁর বউ। সম্ভবত নিয়ামতকেই সজীব কৃষ্ণবাবু নামে কাল্পনিক কারো সাথে মিলিয়ে ফেলছে।
সজীব স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তাঁর কাছে কোনো প্রমাণও নেই যে স্থানীয়দের সাথে তর্ক করবে, তবে ঢাকা ফিরে যাওয়ার আগে সেই নিয়ামতের সাথেই একবার দেখা করে আসতে চাইলো। এমনিতে ওদিককার লোকজন খুব আন্তরিক, বাজারেই বাইকটাকে রেখে সজীব একটা অটো নিয়ে ছুটলো বিরামপুরের দিকে।
বিকেল তখন ফুরিয়ে আসছে প্রায়। দিনের আকাশেই উঠে এসেছে দীপ্তিহীন এক চাঁদ।
***
এবার আর সজীব কোনো ভুল করলো না। যেখানেই গেলো, অটোওয়ালাকে সাথে রাখলো তাঁর। নিয়ামতের দু’একটা ছবি আর ক্লিপ নিলো। ওখানে দাঁড়িয়েই ডাটা চালিয়ে ভিডিও আর ছবিগুলো আপ দিয়ে দিলো ক্লাউডে, যেনো লোকাল মেমোরিতে কোনো কারণে মুছে গেলেও ক্লাউডে ঠিকই রয়ে যায়। কিন্তু নিয়ামত লোকটা খুবই বদমেজাজি আর তিরিক্ষে ধাঁচের ছিলো। স্থানীয় লোকজন ঠিকই বলেছিলো তাহলে, এ সম্ভবত এক অভাবী পাগলই বটে।
ফেরত আসার আগে শুধু একবারের মত মন্দিরটা (বাইজি বাড়িটা ধ্বসে গেছিলো) ঘুরে দেখতে চাইলো। নিয়ামত গাইগুই করছিলো, কিন্তু সজীব না দেখার ভান করে অটোওয়ালাকে নিয়েই সামনে এগিয়ে গেলো। দূরে বড় করে ঘোমটা দেয়া দাঁড়িয়ে ছিলো একজন, সম্ভবত নিয়ামতের অভাবী বউটাই হবে। সজীব একঝলক মহিলাকে দেখেই মন্দিরের ভেতর ঢুকে গেছিলো টর্চ নিয়ে। শুধুমাত্র এই একটা জায়গাই সজীবের দেখে যাওয়া আগের মত ছিলো, টর্চের আলোয় চোখ অভ্যস্ত হয়ে আসার পর সেই যুগল মূর্তিটাকেও দেখলো। তবে রাধাকৃষ্ণের মূর্তি ছিলো না ওটা, বরং অপরিচিত এক ধরণের মাছ কিংবা জন্তু কিংবা মানুষ, অথবা এ তিনটারই কুৎসিত মিশ্রণ একটা কিছু আরেকটাকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে ছিলো পাশাপাশি। দু’টো মূর্তিই হুবহু একই রকম দেখতে। সজীব একটা ছবি তুলে নিলো জিনিসটার, ওদিকে পাশ থেকে অটোওয়ালা তাড়া দিচ্ছিলো খনিক পরপর। সজীব নিজেও অবশ্য বেশিক্ষণ আর মন্দিরে থাকতে চাইছিলো না। তাছাড়া সূর্যও ডুবে গেছে ততক্ষণে, আর এ জায়গার সাথে জড়িয়ে থাকা এক অদ্ভুতুড়ে স্মৃতি তো তাঁর আছেই। সব মিলে সে-ও চাইছিলো এখান থেকে যত দ্রুত সম্ভব বেরিয়ে যেতে। সজীব ঐ মূর্তিদু’টোর ইমেজ সার্চ দিতে দিতে বাইরে বেরিয়ে এলো।
সেদিন সিরাজদিখান বাজার ফিরতে ফিরতে সজীব একটা কথাই শুধু ভাবছিলো। ডিভাইস থেকে ভিডিও ক্লিপ কিংবা ছবি মুছে গেলেও মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে এতো ব্যাপক এক জমিদারবাড়ি কমপ্লেক্স কোথায় মিলিয়ে যাবে! আজ তো সে নিজ চোখে দেখে এসেছে- সত্যিই সেখানে কয়েকটা ইটের স্তুপ, ভাঙ্গাচোরা দেয়াল, আর একটা নড়বড়ে মাথা গোঁজার ঠাই বাদে তেমন কিছুই অবশিষ্ট নেই। সবথেকে বড় কথা হলো- স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী সজীব যেরকম হুলস্থুল জমিদারবাড়ি আর দালানের কথা বলেছিলো, সেটা নিকট অতীতে ওখানে ছিলোই না। আজ থেকে ৫০/১০০ বছর আগে হলে থাকলেও থাকতে পারে। তাছাড়া কৃষ্ণবাবু আর স্ত্রীর ব্যাপারটা, এগুলোরই বা ব্যাখ্যা কী?
ওদিকে মূর্তির বিষয়টাও সন্দেহজনক। গুগল ঘেটে খুব নির্ভরযোগ্য কিছু পাওয়া যায় নি। মোটামুটি কাছাকাছি অবয়বের এক জোড়া মূর্তির তথ্য পেলো, যেটা কি না ‘বিলজিবাব’ নামে পরিচিত। এমাজনের গহীন অরণ্যে এক আদিম নরখাদক গোত্র এর পূজা করতো। ইংরেজিতে এই ‘বিলজিবাব’ টুইন ডেভিল নামে পরিচিত, কারণ এর উপাসনা পদ্ধতি অনেকটাই মিলে যেতো পশ্চিমের শয়তান উপাসকদের সাথে। মানুষ বলি দেওয়া থেকে শুরু করে যাবতীয় অনাচার ব্যবহৃত হতো এই টুইন ডেভিলের পূজায়… তবে সেই গোষ্ঠী নাকি গত শতকেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে কোনো এক রহস্যময় কারণে- এর বেশি আর কিছু নেট ঘেঁটে পাওয়া গেলো না।
ঢাকা ফেরার পথেও সজীব অন্যমনস্ক ছিলো পুরোটা সময়। তাঁর কেবলই মনে হচ্ছিলো- কৃষ্ণবাবুর সাথে আজ দেখে আসা নিয়ামতের চেহারায় কি কোথাও খানিকটা মিল আছে?
***
সেদিন রাতেই মারা গেছিলো সজীব। হঠাৎ হঠাৎ কত মানুষই তো মারা যায়, সজীবেরও ভাগ্যেও তেমনটা ঘটেছিলো বোধহয়। তবে মৃত্যুর আগে সে ঐ ভয়াবহ স্বপ্নটা আবার দেখলো, শেষবারের মতই। এবার মেয়েদু’টো সাদা জামা পরে এসেছিলো। জামায় ঘন হয়ে ছিলো কালচে হয়ে আসা জমাট বাঁধা রক্তের দাগ। সজীব দেখলো ওদের বাথরুমের দরজা খুলে মেয়েদু’টো টলতে টলতে বেরিয়ে আসছে। গলায় সাদা ব্যান্ডেজের মত কিছু একটা জড়ানো। সজীবের একদম কাছাকাছি এসে রক্তভেজা ব্যান্ডেজটা দু’জনেই খুলতে শুরু করলো। পুরোপুরি খুলে ফেলার পর সজীব আতংকের সাথে লক্ষ্য করে- দু’টো মেয়েরই গলায় গভীর একধরণের ক্ষত দেখা যাচ্ছে। যেনো কেউ বড় একটা ছুরি দিয়ে দু’জনের গলা আলাদা করে দিয়েছিলো একসময়।
ওরা সজীবের দিকে তাকিয়ে হাসলো, কিন্তু সে হাসিতে প্রাণ ছিলো না ওদের। সজীব মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তে দেখতে পেলো, গলার ক্ষতের ফাঁক দিয়ে ভেতরে কিছু একটা যেনো নড়ছে !
***
(শেষ কথা)
গুগলে সার্চ দিয়ে সজীব যেটা পায় নি, সেটা হচ্ছে-
কৃষ্ণবাবু আর তাঁর স্ত্রী অমরত্ব লাভ করেছিলো জোড়ামূর্তির কাছে নিজেদের বিক্রি করে দিয়ে। বিরামপুর জমিদারবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা নরনারায়ণ চৌধুরি আর তাঁর স্ত্রী রায়লক্ষ্মী এখানে ‘বিলজিবাব’ এর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। নিজেদের স্বার্থেই তাঁরা সমাজের সাথে দূরত্ব বজায় রেখে চলতেন। প্রতি দুই যুগে একবার করে গর্ভবতী হতেন রায়লক্ষ্মী, যমজ সন্তান হতো তাঁর। সেই সন্তান বয়োঃপ্রাপ্ত হওয়া মাত্র বিলজিবাব এর উদ্দেশ্যে বলি দেওয়া হতো তাঁদের। গলা কেটে সেই কুয়ায় ফেলে দেয়া হতো মৃতদেহগুলোকে, যার বিনিময়ে রাজা নরনারায়ণ আর রাজলক্ষ্মী লাভ করেছিলেন অনন্ত যৌবন।
নরনারায়ণ বাবুই কয়েক প্রজন্ম পর নিজের নাম পালটে রাখেন কৃষ্ণপদ, কৃষ্ণপদ আবার দুই পুরুষ পরে ভোল পালটে হয়ে ওঠেন নিয়ামত। একইভাবে রায়লক্ষ্মীও কখনো নরনারায়ণ, কখনো কৃষ্ণপদ আবার কখনো বা নিয়ামতের স্ত্রী। তবে ওদের এই অমরত্বের জন্য অন্য কারো না কারো আত্মা প্রয়োজন হতো। স্থানীয় লোকজন বাদে বহিরাগত কেউ যখন বিরামপুর জমিদারবাড়ির অশুভ প্রভাববলয়ের ভেতর প্রবেশ করতো, তখন কৃষ্ণপদ-রায়লক্ষ্মী দম্পতি ওদেরই পরিণত করতো শিকারে। ঠিক সজীবকে যেমন করেছিলো! ওর স্বপ্নে দেখা পিশাচেরা আসলে ধীরে ধীরে সজীবের আত্মিক শক্তিটুকু নিঃশেষ করে দিচ্ছিলো। শরীর থেকে আত্মা পুরোপুরি বেরিয়ে গেলে কি আর মানুষ বেঁচে থাকে!
এমাজনের সেই গোত্রটিও কি অনন্ত যৌবন লাভ করতে পেরেছিলো, নাকি সত্যি সত্যিই ধ্বংস হয়ে গেছিলো কোনো এক আশ্চর্য কারণে- সেটা অবশ্য এখনও নিশ্চিত হওয়া যায় নি।

Be the first to write a review

Leave a Reply

We’re sorry you’ve had a bad experience. Before you post your review, feel free to contact us, so we can help resolve your issue.

Post Review

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক গল্প