পাশের বাসার ভাবি আমাকে দেখেই মুখ গোমড়া করে বললেন, ‘অ্যাই, সুমিকে আনছো না কেন? পুরো বিল্ডিংটা কেমন খালি খালি লাগে তোমার বউকে ছাড়া। এতোদিন বউকে বাপের বাড়ি রাখে কেউ?’
আমি হেসে বললাম, ‘নিয়ে আসবো ভাবি। সবে তো হলো একমাস। ওর বড় ভাই অস্ট্রেলিয়া থেকে এসেছেন তো, সবাইকে নিয়ে সিলেট চিটাগাং ঘুরে বেড়াচ্ছেন। উনি ঢাকায় ফিরলেই সুমি বাড়ি চলে আসবে।’
ভাবি হেসে বললেন, ‘তোমরা যে কি না? বউকে রেখে এতোদিন একা কেমনে থাকো বুঝি না। তোমার ভাই তো আমি একবেলা বাপের বাড়ি গেলেই ফোন দিতে দিতে অস্থির করে ফেলে।’
অফিস শেষে কলিগদের সাথে বসে আড্ডা দিচ্ছি। সুবোধদা হাসতে হাসতে বললেন, ‘আরে, তুমি তো খুব সোশ্যাল হয়ে গেছো। আগে তো অফিস শেষ হবার ঘন্টাখানেক আগেই বের হয়ে বাসার দিকে ছুটতা। আর এখন তো বাসায় যাওয়ার নামই নাও না আমাদের সাথে আড্ডা দিতে দিতে।’
অন্তু বললো, ‘আর কি করবে দাদা বলেন। ঘরে তো আসল জিনিসই নাই। ঘরে গিয়ে কি করবে হুদাহুদি।’
‘সে কি! ভাবি এখনো আসেনি বাসায়? তোমাকে ছেড়ে তো এতোদিন কোথাও থাকার মানুষ সে না।’
আমি হেসে বললাম, ‘আরে দাদা, আপন ভাই এসেছে এতোদিন পর। উনার সাথে একটু সময় কাটাবে না?’
‘তাও ঠিক। কিন্তু তোমার কষ্টও তো বোঝা উচিত ওর। এই যে বাসায় না যেয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা আমাদের সাথে বসে আড্ডা দাও, তোমার ভেতরের কষ্টটা তো আমরা বুঝি।’
তারেক বললো, ‘তবে যাই বলেন দাদা, সজিব আসলেই অনেক লাকি। ভাবি যেমন ভদ্র, তেমনি দেখতে ভালো। উনার মতো বউ থাকলে আমি একঘন্টা কেন, তিনঘন্টা আগে অফিস থেকে বের হয়ে বাসার দিকে দৌড়াতাম, অফিসের কাজকে পাত্তাই দিতাম না।’
বিকেলে ছাদে উঠেছি। বিল্ডিংয়ের ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চাগুলো খেলছে। আমাদের নিচের ফ্ল্যাটের ছোট্ট নিশাত লাফাতে লাফাতে এসে বললো, ‘আংকেল, আন্টি কবে আসবে?’
আমি হেসে বললাম, ‘আসবে মা, তাড়াতাড়ি চলে আসবে।’
‘আন্টি না থাকলে মজা লাগে না। আন্টি প্রতিদিন ছাদে এসে কতো মজার মজার খেলা খেলে আমাদের সাথে।’
ছোট্ট তাসমিয়া একটা ফুলগাছ দেখিয়ে বললো, ‘গাছটা মরে যাচ্ছে দেখেন। আন্টি প্রতিদিন বিকেলে গাছে পানি দিতো। এখন আর কেউ দেয় না।’
দুদিন পর। অফিস থেকে বাসায় ফিরছি। পাশের বাসার ভাবি আমাকে দেখেই হেসে ফেলে বললেন, ‘সুমিকে নিয়ে এসেছো, জানাওনি তো।’
আমি বললাম, ‘না, আনিনিতো ওকে।’
‘আরে, মিথ্যা বললে হবে? ওকে দেখলাম ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। আমার সাথে দেখা করলো না কেন ও? ওকে বলো যাতে দ্রুত আমার সাথে দেখা করে।’
বাসায় ঢুকলাম। বাসা একদম খালি। ঘরে কেউ নেই। ব্যালকনিতে কেউ নেই।
সুবোধদা বললেন, ‘কালকে রাতে জুম মিটিংয়ে তোমার পাশে তো ভাবিকে দেখলাম। আর তুমি বলছো ভাবি এখনো আসেনি? তাহলে কালকে কাকে দেখলাম আমরা?’
আমি বললাম, ‘না দাদা। সত্যি বলছি। সুমি আসেনি এখনো ঢাকায়।’
অন্তু বললো, ‘স্পষ্ট দেখেছি ভাবি দাঁড়িয়ে ছিলো পাশে। এতোজন মানুষ তো আর ভুল দেখবে না। তুই কেন বউয়ের বাড়ি ফেরার কথা সবার কাছে লুকোচ্ছিস এটাই একটা রহস্য।’
ছোট্ট তাসমিয়া হাসতে হাসতে বললো, ‘আন্টি কালকে সন্ধ্যার সময় ছাদে এসেছিলো। আমাদের সাথে খেলাধুলা করে আবার নিচে চলে গেছে। এখন না আন্টি আগের থেকে অনেক সুন্দর হয়েছেন।’
আমি চুপচাপ ঘরে শুয়ে আছি। ঘর অন্ধকার, পুরো বাড়ি অন্ধকার। বাড়িতে আমি ছাড়া আর কেউ নেই। অথচ আমি মানুষের শব্দ পাচ্ছি বাড়িতে। পাশের রুমে কে যেন হাঁটছে। রান্নাঘরে কে যেন টুকটাক কাজ করছে। বসার ঘরে চেয়ার টেবিল সরিয়ে সাজিয়ে রাখছে কেউ।
আজ থেকে একমাস আগে আমি আমার বউ সুমিকে খুন করি। খুন করার যথেষ্ট বড় কারণ ছিলো। ও আমার আর অর্পিতার সম্পর্কের কথা জেনে গিয়েছিলো। এই কথা কোনোভাবে ফাঁস হোক, আমরা চাচ্ছিলাম না। কারণ অর্পিতা বিবাহিত, দুই ছেলের মা। আমার বড় ভাইয়ের স্ত্রী।
সুমির লাশটা টুকরো টুকরো করে পলিথিনে ভরে ইট দিয়ে বেঁধে নদীতে ফেলে এসেছিলাম। কারো জানবার কথা নয় সুমি যে আর নেই। সুমিরও আর কখনো ফিরে আসবার কথা নয়।
অর্পিতা মারা গেছে দুই দিন আগে। ও বারবার আমাকে ফোন করে বলতো সে সুমিকে দেখতে পাচ্ছে। আমাকে বলতো, ‘সত্যিই বলোতো, তুমি সুমিকে আসলেই মেরেছিলে? আমি রাতে ঘুম ভেঙ্গে উঠলে ওকে আমার বিছানার পাশে দেখতে পাই কেন?’
অর্পিতা ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পড়ে মারা গিয়েছিলো। সন্ধ্যার সময় ও কেন ছাদে উঠেছিলো, তা কেউ বলতে পারে না।
আমার রুমের বাইরে অন্ধকার। সেখানে কেউ হেঁটে বেড়াচ্ছে। অন্ধকারে কে হাঁটছে আমি তা দেখতে পারছি না। তবে তার হাসির শব্দ শুনছি। কথার শব্দ শুনছি। ‘সজীব, সজীব’ বলে ডাকছে কেউ।
কণ্ঠটা সুমির। খুব যেদিন ভালোবাসতে ইচ্ছে হতো ওর, আদর করে ফিসফিস করে এই কণ্ঠে সে ডাকতো আমায়।