কালোরাত

বাবা মার একমাত্র সন্তান ,তাই মিরপুর দশ এর ছয়তলা বাড়িটা আমিই পেলাম । তিন তলার ফ্লাটে থাকি , ফ্লাটটি সুন্দর তবে রান্না ঘরের ফ্লোরটা অনেকটা উঁচু । এই ফ্লোরটা এমন কেন বুঝতে পারলাম না । মা বেঁচে থাকতে তিনতলায় কখনো আসিনি । তবে মাকে বলতে শুনতাম , তিন তলার ভাড়াটিয়ারা থাকে না ।মা থাকতেন নিচতলায় ।সেটা বন্ধ রেখে ,বাকি গুলো ভাড়া দিলাম ।একটা বেসরকারি ব্যাংকে সিনিয়র অফিসার হিসেবে আছি । অফিস থেকে সাড়েছয়টায় বাসায় ফিরে উপরে উঠবার সময় লিফটে একজন বৃদ্ধার সাথে দেখা হলো । বৃদ্ধা শব্দ করে শ্বাস নিচ্ছিল । আপনি কী অসুস্হ ? বৃদ্ধা হ্যাঁ সূচক মাথা নড়ালো । কোন ফ্লোরে কাজ করেন । বৃদ্ধা ফ্যাঁসফ্যাঁসে কন্ঠে বললো ছয় তলায় ।
এতো অসুস্হ শরীরে কাজে এসছেন কেন ?
কী করমু আম্মা কাম না করলে খামু কী ? কঠিন বাস্তব ।আপনার আত্মীয় স্বজন কেউ নেই? বৃদ্ধা দুপাশে মাথা নাড়ালো । ডাক্তার দেখান নাই ? ঔষধ খান না ?
বৃদ্ধা আগের মতোই শ্বাস টেনে টেনে ফ্যাসঁফ্যাঁসে কণ্ঠে বললো ,অসুদ কিনার টেকা নাই ।
আমি তিন তলায় থাকি ,কাজ শেষ হলে আমার সাথে দেখা করে যাবেন কেমন ।
রাত নয়টায় মহিলাটি আমার ফ্লাটে এলো । আমি ওকে একগ্লাস দুধ খেতে দিলাম । দুধটুকু সে তৃপ্তি সহকারে খেলো ।যাবার সময় তাকে ঔষধ কেনার জন্যে তিনহাজার টাকা দিলাম ।এই ফ্লাটে কিছুদিন আগে উঠেছি । একমাসও হয়নি , সব জায়গায় বাবা মার স্মৃতি জড়িয়ে আছে । বাবা মার অমতে রমিজের সাথে পালিয়ে বিয়ে করেছিলাম । তাও প্রায় সাত বছর হলো । এই সাত বছরে বাবা কখনও একটা ফোন দিয়েও কুশল জানতে চান নি । বাবা গত হলে মাঝে মাঝে মাকে দেখতে আসতাম ।ছয় মাসের মধ্যে মাও চলে গেলেন ।বিয়ের সাতবছরেও আমাদের কোন সন্তান হয়নি। অফিস , বাসা , বাসা , অফিস আর আমার একাকীত্ব এই নিয়েই আমি ।এক জায়গায় বেশিদিন থাকতে পারি না তাই বছর বছর বাড়ি পাল্টাতাম ।তবে এই ফ্লাটটা আমার নিজস্ব আর , খুব সুন্দর ।এখানেই বাকি জীবন কাটিয়ে দিবো ।
অফিস থেকে বাসায় ফিরে দেখি সারা মহল্লা অন্ধকারে ডুবে আছে। লোড সেডিং ।আমাদের ফ্লাটে জেনারেটারের কারনে ডাইনিং স্পেসের বাতিটা জ্বলছে । বেডরুমের দরোজাটা খোলার সাথে সাথেই কে যেন আমার পাশ দিয়ে ঘর থেকে দৌঁড়ে বারান্দায় চলে গেল ! ভয় আর গভীর ভাবনায় বুকের ভিতর হাতুরী পিটানোর শব্দ পাচ্ছি ।কী হচ্ছে এসব ! এই ফ্লাটে উঠবার পরের দিন থেকেই আমিএকটা ঘোরের মাঝে ছিলাম । মনে হতো বাবা মাও আমার সাথে এখানেই থাকেন । বাড়িতে উঠে আসার প্রথম রাতেই এতো ভয়ঙ্কর একটা স্বপ্ন দেখলাম ,যেটা ভাবলেই এখনো আমার গায়ে কাঁটা দেয় । গতকিছুদিন ধরেই আমি নিশ্চিত যে এই ফ্লাটে একটা ছোট্ট বাচ্চার আত্মা ঘুরে বেড়ায় । তবে আজ যে পাশ কাটিয়ে দৌঁড়ে গেলো সে তো সেই ছোট্ট পায়ের ছাঁপ ফেলা পিচ্চিটা নয় । তবে এ কে ? এই ফ্লাট কী ভূতের আবাস? পিচ্চিকে নিয়ে আমি ভয় পাচ্ছি না ।সকালেই বুঝে গেছি ওকে ভয় পাবার কিছু নেই , তবে ও যে আমার কাজ বাড়িয়ে যন্ত্রনা বাড়াবে তা নিশ্চিত ।অন্যজন কে ?
এ সমস্ত কী আমার সঙ্গে সত্যি ঘটছে ? নাকি আমার মানসিক অসুখটাই এর জন্যে দায়ী ?বেশি ভেবে সময় নষ্ট করতে চাইলাম না । রমিজ একটু পরেই চলে আসবে তখন ওর সঙ্গে শেয়ার করবো । হঠাৎ করেই সব ঘরের আলো জ্বলে উঠলো ।হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম ।
প্রচন্ড গরম । শাওয়ার নেবো । আলমারির পাল্লা খুলে প্রচণ্ড জোরে চিৎকার দিলাম । নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছি না । ছোট্ট একটা মেয়ে ,বয়স ছয় , বা সাত হবে। আলমিরার নিচের তাকে ঘরে পরার কাপড়ের উপরে দুই পা মেলে বসে আছে , ঘাড় পর্যন্ত কোকড়া চুল , কিছু চুল ওর কপালে পরে আছে । কালো মেয়েটির বড়ো বড়ো চোখ দুটি বিষন্নতায় ছাঁওয়া ,ভয় পাওয়া চোখে সে আমার দিকে তাকালো । আমি নিজেও ভয়ে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম । ও ভয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললো আমাকে মেরো না ।
হঠাৎ কেউ আমাকে জোরে ধাক্কা মারলো , আমি মেঝেতে পরে গেলাম ।মাথার ভেতর অসংখ্য চড়ুই পাখির হুটুপুটির শব্দ পাচ্ছি দুই হাতে মাথা চেপে ধরলাম ।আলমারির দিকে চোখ গেলো , ছোট মেয়েটি এখন আর সেখানে নেই , সেখানে একটা বারবি ডল পরে আছে ।
দরোজায় বেল বাজছে । অনেক কষ্ট করে উঠে বসলাম , হেঁটে যাওয়ার মতো শক্তি অবশিষ্ট নেই । বিরক্ত রমিজ অনবরত বেল টিপেই যাচ্ছে , এবং অধৈর্য হয়ে বেলটি চেপে ধরেই আছে । আর কলিংবেলটি একনাগারে বলেই চলছে ওপেন দ্যা ডোর । ওপেন দ্যা ডোর । ওপেন দ্যা ডোর । মাথার ভেতরের চড়ুই গুলোও একসাথে উচ্চস্বরে ডাকতে শুরু করলো ।আমি জ্ঞান হারালাম ।
কতোক্ষণ অজ্ঞান ছিলাম জানি না ।চোখ খুলে দেখলাম আমি হাসপাতালের সাদা চাদরে শুয়ে আছি , আর রমিজ আমার মুখের উপর ঝুকে আছে । আমাকে চোখ খুলতে দেখে জানতে চাইলো ,এখন কেমন আছো ?
অনেক রাতে ঘরে ফিরলাম । ক্লান্ত আমি ঘুমিয়ে পরলাম । সকালে রমিজই চা বানিয়ে দিল । নিরাসক্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো কাল কী হয়েছিল ?
গতকালের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো কেন যেন রমিজকে বলতে ইচ্ছে করলো না ।
রমিজ অফিসে চলে গেলে , শীতল জলের শাওয়ার নিলাম ।খুব ক্ষুধা পেয়েছে । ভেজা চিড়া ,দই আর কলা মেখে খেয়ে নিলাম । মনে হলো কারা যেন ফিসফিস করে কতো শতো গোপন কথা বলছে । চিৎকার করলাম কে ? কে কথা বলে ? ফিসফিস থেমে গেলো ।
হঠাৎ একটা ছোট্ট কোমল হাত আমার মুখ ছুঁয়ে গেলো । বুঝলাম গতকালের পিচ্চিটা আমাকে আদরে ছুঁয়ে গেলো । ওর চোখ আর ঠোঁট ফোলানোর ভঙ্গিমাটা আমার মনে ভেসে উঠলো , মনের অজান্তেই আমি আকুল হয়ে কাঁদতে লাগলাম । দরোজায় বেল বাজছে ।
গতকালের লিফটে দেখা সেই অসুস্হ বৃদ্ধা । জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে ।
ঔষধ কেনেন নি ?
কিনছি আম্মা ।
একটু ও তো সুস্হ্য দেখাচ্ছে না ?
ভালা হইলেই বা কী করুম আম্মা , খালাম্মায় তো আমারে আর কামে রাখবো না । কাম না থাকলে খামু কী গরবাড়া দিমু কেমনে ?
গাজিপুরে একটা বিদ্ধাশ্রমের সাথে আমার জানাশোনা আছে । বৃদ্ধাকে বললাম বৃদ্ধাশ্রমে থাকবেন?
কার বাসায় ?
কারো বাসায় না , ওটা একটা আশ্রয় কেন্দ্র ওখানে খাবার ,চিকিৎসা সব পাবেন ।যাবেন সেখানে । যদি যেতে চান আমি আজ ই সব ব্যবস্হা করবো ।
করেন আম্মা । তাইলে তো আমার ভালাই অইবো ।
ঠিক আছে । কিছু খাবেন?
না আম্মা বিহানে খাইছি ।
আমি তাকে দুইহাজার টাকা দিলাম । তার নাম , জন্মস্হানের নাম ,বর্তমান ঠিকানা লিখে রেখে বললাম ,কাপড় চোপড় নিয়ে দুদিন পরে আসবেন । সব ব্যবস্হা করে আমি আপনাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসবো ।
এই দুদিনে আমি বৃদ্ধাশ্রমের সমস্ত ফরমালিটি সারলাম , পিচ্চিটার উপস্হিতি টের পেলাম না । দুদিন কেটে গেলো , পরদিন সকালে আমি বৃদ্ধার অপেক্ষায় থাকলাম কিন্তু সে এলো না ।
ছুটা বুয়াকে ওর খোঁজে পাঠালাম , ফিরে এসে সে জানালো মহিলাটি খুবই অসুস্হ , তাই আসতে পারে নি । একটু সুস্হ্য হলেই চলে আসবে ।
রমিজ একসপ্তাহের ছুটি নিয়েছে ।অশরীর উপস্হিতি টের পাচ্ছি না ।ভয়ে ভয়ে আলমারি খুলি , না , কেউ নেই ।ভাবছি তবে কী সমস্তই আমার কল্পনা ছিল ?কিংবা হেলুশিনেসন ? হয়তো তাই নতুবা ওরা এখন কোথায় ?”
তিন দিন পর বৃদ্ধা সকাল এগারোটায় এলো । মুখটা শুকিয়ে এতোটুকু হয়ে গেছে , তবে স্বাভাবিক ভাবেই শ্বাস নিচ্ছে । বললাম শরীরটা মনে হয় এখন একটু ভালো তাই না ?
হ আম্মা ভালাই আছি ।
আজ তো হঠাৎ করে যেতে পারবো না , আগামী কাল সকাল নয়টার মধ্যে চলে আসবেন কেমন ।বৃদ্ধা চুপ করে থাকলো ।
কিছু খাবেন ?
বৃদ্ধা কণ্ঠ খাঁদে নামিয়ে ফিসফিস করে বললো ,না আম্মা কিছু খাইতে পারি না । খালি জার লাগে ।
জার লাগে ? অবাক হলাম !এই আগুন গরমে শীত লাগে ?
হ , আম্মা ,জারে শরীরডা কাঁইপ্যা কাঁইপ্যা উডে ।আমি অহন যাই গো আম্মা ।
কাল কিন্তু সকাল সকাল চলে এসো , দেরী করো না ।
সে চলে গেলো যাবার আগে কিছুক্ষণ খুব অদ্ভুত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো । সেই দৃষ্টিতে কী ছিল যে আমি কেঁপে উঠলাম ?
দুপুর বারোটায় বুয়া এসে খবর দিল সেই শ্বাসরোগের বুড়ি কাইল রাইতে মইরা গেছে ।
অসম্ভব কি সব বলছিস ? না জেনে গুজব ছড়াবি না ।
গুজব কমু কেন আফা ? আমি তো হেরে দেইখা ই আইলাম । উঠানে শোয়াইয়া রাখছে , টেকার লাইগ্যা দাফন কাফন হইতাছে না ।
আমি ভীষণ ভাবে অসুস্হ হয়ে পরলাম । মুখ ভরে বমি হলো , হঠাৎ করে প্রচুর শীত শীত লেগে গা কাঁপিয়ে জ্বর এলো । রমিজকে কোন রকমে বললাম িএকজন দরিদ্র মহিলার দাফন কাফনের জন্যে , শেফালীর কাছে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে দাও । এর পর আমি এক গভীর অদ্ভুত ঘুমে আচ্ছন্ন হলাম । পরের দিন খুব ভোরে ঘুম ভাঙ্গলো । ক্লান্তি আর অবসাদে শরীর মন দুইই বিধস্ত । রমিজ তখনো গভীর ঘুমে । পানির তেস্টা পেলো । রমিজের ঘুম ভাঙ্গলাম না । অবসন্ন শরীরটাকে কষ্ট করে টেনে টেনে রান্না ঘরে গেলাম । ফ্রীজ খুলে একটা বোতল বের করে গ্লাস আনতে গেলাম , ডাইনিং টেবিলে কে যেন মুখ নিচু করে বসে আছে , তার লম্বা চুলগুলো টেবিলের উপরে কিলবিল করে নড়ছে ।আমি স্হির হয়ে কতোক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম জানিনা !
হঠাৎ আঁচলে টান পরতেই নিচে তাকালাম , গতকালের সেই ছোট্ট মেয়েটা তার বড় বড় দুটি চোখ দিয়ে আমার মুখ চেয়ে আছে । হাত থেকে বোতলটা পরে গেল , কাঁচ ভাঙ্গার শব্দে রমিজ উঠে এলো ।
প্রায় দু ঘন্টা পরে আমার জ্ঞান ফিরলে রমিজের মুখ থেকে মেঘ সরে গেল । একগ্লাস দুধ আমার মুখের সামনে ধরলো ।
খেতে ইচ্ছে করছেনা ।
খেতে হবে ডাক্তার বলে গেছেন । সন্ধ্যায় তোমার অনেকগুলো টেস্ট আছে , দুধটুকু খেয়ে এই ঔষধটা খেয়ে নাও ।
আমার কিছু হয়নি রমিজ , ভয় পেয়েছি , ভীষণ ভয় ।
রমিজ খানিকটা অবাক হয়ে আমাকে দেখে , কিসের ভয় মিলি ? এই নিয়ে তুমি দুইবার জ্ঞান হারালে , ডাক্তার বলছে —
না রমিজ রোগ আমার শরীরে না , মনে । আমার খুব বেশি হেল্যুশিনেসন হচ্ছে , যদি পারো আমাকে মানসিক ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাও প্লীজ ।
মানসিক ডাক্তার দেখিয়ে বেশ ভালোবোধ করছি । রাতে খুব ভালো ঘুম হলো । অফিস থেকে ছুটি নিয়েছি , রমিজও ছুটিতে । শেফালীর কোন খবর নেই , রমিজ আমাকে কোন কাজ করতে দিচ্ছে না , আনাড়ি হাতে রান্না করছে , শেফালীকে ফোন দিলাম , ওপাশে কেমন যেন ঘরঘর শব্দ হচ্ছে , হ্যালো শেফালী ? শেফালী ? ওপাশে জোরে জোরে শ্বাস টানার শব্দের সাথে ফ্যাঁস ফ্যাঁসে কণ্ঠে বললো , আম্মা বড় জার লাগে , কাফনের কাপড় দেয় নাই গো আম্মা , জার লাগে । আমি চিৎকার করে মোবাইল ছুড়ে ফেললাম । রমিজ এসে জড়িয়ে ধরলো , কী হয়েছে ? এমন করছো কেন ? সেই বৃদ্ধা সে ফোন ধরেছিল । আমি ,আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি রমিজ , আমাকে বাঁচাও ।প্লীজ আমাকে ধরে রাখো , প্লীজ । রমিজ আমাকে আরেকটা ঘুমের ঔষধ খাইয়ে দিলো ।
নিয়মিত ঘুমের ঔষধ খাই , আরো বেশি বেশি দুঃস্বপ্ন দেখি । মনে মনে ভাবি আমিতো বেশ সাহসী ছিলাম , তবে এখন কেন এতো ভয় পাচ্ছি ? এসব কী হচ্ছে ? কেন হচ্ছে ? ভূত প্রেত বলে কী পৃথিবীতে আদ্যো কিছু আছে ? ভিতু মন বলে আছে আছে , পুরাতন সাহসী মন বলে নেই । অলৌকিক বলে কিছু নেই ।
রমিজ অফিসে জয়েন করেছে , আমি ছুটিতে । সোনালী বিকেলে বারান্দায় বসে চা খাচ্ছি । উপলদ্ধি করলাম পেছনে কেউ একজন এসে দাঁড়ালো ।হাতে চা নিয়ে আমি স্হির হয়ে রইলাম । সে আমার ঘাড়ের নিচে তার বরফ শীতল হাত রাখলো , পুরুষের হাত ! আমি কেঁপে উঠলাম , ওর গায় শ্যাওলা পঁচা গন্ধ । নিজকে বললাম মিলি সাহস রাখো , তুমি সাহসী মানুষ । পেছন না ফিরেই আমি কাঁপা কাঁপা কন্ঠে প্রশ্ন করলাম কে তুমি ?
সে ফিসফিসিয়ে বললো আমি মনসুর , আমার বউ শায়লা আমার একমাত্র মেয়ে ময়না । আমরা এই তিনতলাতেই বাস করতাম , এক রাতে আমার একবন্ধু ড্রিংকে ঘুমের ঔষধ মিশিয়ে আমাদের তিনজনকে এক এক করে মেরে এই বাড়ির রান্নাঘরের মেঝেতে গেঁথে ফেললো । আমার অপরাধ ছিল ওর সুন্দরী বউ আমাকে ভালোবেসে ফেলেছিল , আমিও ওর ভালোবাসায় সাড়া দিয়ে ছিলাম । কেউ কিছু জানলো না ।কোন বিচার পাই নাই , সেই থেকে আমরা এইখানেই থাকি । এই বাড়িতে কোন মানুষ আমরা থাকতে দেই না । তোমরাও শীঘ্রই মারা পরবা ।
ঘাড় থেকে তার হাত সরে গেলো , আমি পিছনে ঘুরতে চাইলে সে আমাকে চেয়ার সহ উল্টে ফেলে দিলো ।চেয়ার থেকে পরে আমার ডান হাতের কনুইয়ে সম্ভবত ফ্যাকচার হলো , হাতটা তুলতে পারছিনা , হাতটা মরা মাছের মতো ঝুলে রইলো ।
সন্ধ্যায় রমিজ ডাক্তার নিয়ে এলো । হাতে ব্যান্ডেজ হলো । রমিজ খুব মন খারাপ করে বসে রইলো । আমি ঘরে গিয়ে শুয়ে রইলাম ।স্হির করলাম আর না , আগামীকালই আমরা এ বাড়ি ছেড়ে যাবো । এখানে আর নয় । হঠাৎ রমিজের চিৎকার শুনে তাড়াতাড়ি বসার ঘরে গেলাম , রমিজ ওখানে নেই , দুটো চায়ের কাপ থেকে এখনও ধোঁয়া উঠছে , ডাক্তারকেও কোথাও দেখা গেলো না । আমি চিৎকার করে ডাকলাম রমিজ , রমিজ , ডাক্তার বাবু ? নেই ! কারো কোন সন্ধান নেই ।মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো , সেই সাথে ঘন ঘন বিকট শব্দে বিদ্যৎু চমক । সাথে সাথে লোডশেডিং হলো। আতংকে দিশাহারা আমি ঘরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটো ছুটি করছি আর চিৎকার করে রমিজকে ডাকছি ।
ঘরের এক কোনে হঠাৎ করে একটা মোম জ্বলে উঠলো । মোমের আলোতে সেই বৃদ্ধা মহিলাকে দেখলাম , বিষন্ন চোখে আমাকে দেখছে , ফ্যাঁস ফ্যাঁসে কণ্ঠে বলে উঠলো পালা , এক্ষুনি পালা । হঠাৎ করে মনসুর , আর অচেনা একজন মহিলাকে দেখলাম , সবার চোখে জিঘাংসা । মিলি পালা , পালা মিলি , বাবা মার গলা শুনতে পেলাম ।শিলিং থেকে কে যেন ঘরঘরে কণ্ঠে বললো ,ভয় নেই আমি আছি , শিলিংয়ে তাকিয়ে আমি জমে গেলাম , রমিজ ও ডাক্তার ফাঁসিতে ঝুলছে , আমি একমুহূর্ত কম সময়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার চেষ্টা করলাম , মনসুর , অচেনা রমনী , ডাক্তার , রমিজ আমার পথ রোধ করে দাঁড়ালো , বৃদ্ধা আর মা বাবা ওদের সরিয়ে দিয়ে আমাকে জোর করে ঘর থেকে বের করে দিল ।রমিজের গলায় দড়ির ফাঁস ।মুখ থেকেরক্ত ঝরছে। দুহাত বাড়িয়ে বলছে , এসো মিলি আমার কাছে এসো । ভয় নেই ।আমাকে ভয় পেওনা ।
আমি ঝড় বৃষ্টি বিদ্যৎুচমক সব উপেক্ষা করে পাগলের মতো দৌড়চ্ছি , এই মুহূর্তে ঘর নয় এই বৈরী প্রকৃতি আমার নিরাপদ আশ্রয়। হঠাৎ আঁচলে টান পরলো ,বিদ্যুৎতের একঝলকে দেখলাম পিচ্চিটা আমার সাথে সাথে আসছে । আসুক তবে , যদি বেঁচে থাকি ,ওর সাথে সময় কাটাতে আমার মন্দ লাগবে না ।

Be the first to write a review

Leave a Reply

We’re sorry you’ve had a bad experience. Before you post your review, feel free to contact us, so we can help resolve your issue.

Post Review

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক গল্প