“আজ রাতের ট্রেনে উঠলে কাল পৌছে যেতে পারব। দিনের বেলায় খোঁজ করলে নিশ্চয়ই একটা হদীস পাওয়া যাবে বাড়িটার।”
ভর দুপুরে ক্যাম্পাস খানিকটা ফাঁকা থাকে, আকাশে আজ অনেকটা মেঘ তাই চিটচিটে গরমটা কম। রিকশা না নিয়ে হাঁটছি দুজনে। আমি আর কৌশিক পাশাপাশি। একটা সময় ছিলো প্রতিদিন যেমন ক্লাস শেষে কৌশিক আমাকে হল পর্যন্ত এগিয়ে দিত, ঠিক তেমনি করে।
গত রাতের ঘটনা মনের গভীরে ছাপ ফেলেছে, তবে তা গভীরেই রেখেছি। বাইরে আসতে দেইনি কিন্তু আমার কৌশিকের সাহায্য লাগবে। গতকাল অস্বাভাবিক কিছু আবিস্কারের পাশাপাশি কিছু নিশানার দেখা পেয়েছি, ভয় কাটেনি বিন্দুমাত্র কিন্তু মনের কোনো এক কোণে প্রতিজ্ঞা আর সাহসের সঞ্চার হচ্ছে, এটাও টের পাচ্ছি।
“অরু, একেবারে অন্ধ আন্দাজে যাওয়া হয়ে যাবে কি? একটু ভেবে দেখো।”
“কেন, এমনটা বলছো কেন? আবছা করে হলেও একটা জেলার ম্যাপের আকৃতি পেয়েছি। একটা আস্ত ছবি পেয়েছি। এরচেয়ে বেশী সুত্র আশা করাটা কঠিন, অন্তত আমার নিজের তাই ধারনা।”
“ম্যাপ যেটা বলছো, তা একেবারেই নিশ্চিত নয়। চারটা চোখের একত্র করা নকশায় যে ওই জেলাটাই হচ্ছে তা তুমি হলফ করে বলতে পারবে? আর এইরকম জমিদার বাড়ী, মানে আদৌ যদি ওটা জমিদারবাড়ি হয়ে থাকে, তো এইরকম বাড়ি সারাদেশে অনেক ছড়িয়ে আছে।”
“তোমার কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু আমিতো সারাদেশ খুঁজে বেড়াবোনা। যেহেতু ডায়েরীর সুত্র ধরে একটা এলাকার খোঁজ পেয়েছি, শুধু ওখানেই তাহলে এমন কোনো বাড়ির অস্তিত্ব আছে কিনা একটু খুঁজে দেখি।
দুদিন থাকবো, না পেলে তোমার সাথে ফিরে আসব।”
“গুগলে সার্চ করে দেখেছো? আমি বরং আজ একটু গুগলে খুঁজে দেখি।”
“সকাল থেকে ওই কাজই তো করেছি। নাহ্ কিছু নেই। থাকার কথাও না, মিস্টার কৌশিক এটা ২০০৬ সাল, আরও পনেরো বছর পরে হয়তো গুগল ম্যাপ নিখুঁত হবে। আর কথা বাড়াবো না। তুমি যাবে আমার সাথে? জবাবটা হ্যাঁ হলে রাত সাড়ে দশটার একটা ট্রেন আছে, ধরতে চাই। তুমি আমাকে হল থেকে তুলে নেবে।”
কৌশিকের হতাশ চেহারা দেখে আমার কেমন মায়া হলো, কিন্তু আমিও তো নিরুপায়। সোহানার কথা মনে পড়লো। শুভ্র ভাইয়ের কথা। উনি নাকি রহস্যের খুব কাছাকাছি গিয়েছিলেন। তারপরই একটা বিশ্রী দুর্ঘটনা সব কিছু এলোমেলো করে দিয়েছিলো উনার জীবনটাকে। আমি কি কোনো বিপদ ডেকে আনছি? নিজের? সেই সাথে কৌশিকেরও?
৮.
ভোর রাতে নামিয়ে দিলো ট্রেনটা আমাকে। আরও বেশ কয়েকজন যাত্রী নেমেছে তবুও নিজেকে খুব একা একা লাগছে। উত্তরাঞ্চলের জেলা বলে শীতটা এখনো নিজের অস্তিত্ব জানান দিয়ে যাচ্ছে, এই কাক ডাকা ভোরে। ব্যাকপ্যাকে থাকা ডায়েরিটার অস্তিত্ব এক মুহুর্তের জন্যেও ভুলছিনা। ট্রেনে দুটো সীট ছিলো আমার দখলে। পাশেরটা ফাঁকা, তাই চাইলেই আরাম করে ঘুমোতে পারতাম, কিন্তু ট্রেনের দুলুনি বা অনবরত ঝিকঝিক তাল লয়ের মতই অজস্র চোখের শ্যেন দৃষ্টি আমার উপরে ছিলো পুরোটা রাত জুড়েই। চোখের পাতা এক করলে যেন শত সহস্র গুন হয়ে ওরা ঝাঁপিয়ে পড়তে আসে আমার উপরে।
রাতের বেলা কৌশিককে অতটা মিস না করলেও এখন এই ফিকে হয়ে আসা ভোরের আলোয় ভাসতে থাকা স্টেশন চত্বরে একা দাঁড়িয়ে কেমন যেন নিজেকে খুব বেশী নিঃসঙ্গ মনে হচ্ছে। তবে আমি সিদ্ধান্তটা ভুল নেইনি, আমার এসাইনমেন্ট আমাকেই করতে হবে। বিপদ কিছু হলে সে শুধু আমারই হোক, কৌশিককে কেন অকারণ বিপদে ফেলব? তাই গত রাতে ঠিক করে রাখা সময়ের আধা ঘন্টা আগে আমি হল থেকে বেরিয়ে সোজা স্টেশনে চলে আসি। সোহানাকে বলে এসেছি, “বাড়ি চলে যাচ্ছি। সালাম স্যারের দেওয়া এসাইনমেন্টের ভুত মাথা থেকে তাড়িয়েছি।”
খুব করে জানি, সোহানার কাছ থেকে যথা সময়ে কৌশিকও জেনে যাবে। পথে নিশ্চয়ই ফোন করবে। সামান্য মিথ্যের আশ্রয় নিয়ে ওকে আশ্বস্ত করতে আমার বাঁধবেনা। যা করছি, ওর ভালোর জন্যেই। রহস্য সন্ধানের পথটা আমার একার, ওটা আমাকেই খুঁজে বের করতে হবে।
সামান্য ফ্রেশ হয়ে নিলাম, সাথে গরম এক কাপ চা। কড়া লিকার, শরীর আর মাথা, প্রথম চুমুকে দুটোকেই তরতাজা করে দিলো। ট্রেনে থাকতেই ভেবে নিয়েছি, এগুবো কিভাবে। জনে জনে ছবি দেখিয়ে বেড়াবো না। শুধু বাড়ির ছবি হলে ভিন্ন কথা ছিলো, একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে যেহেতু তাই কিছুটা প্রাইভেসি বা আড়াল প্রয়োজন হতে পারে। একদম অচেনা অজানা একটা শহরে হঠাৎ কোনো শত্রু তৈরী করতে চাইনা।
তবে নিঃসন্দেহে একটা ট্রেন স্টেশন খুব ভালো জায়গা, এইরকম জমিদারবাড়ি টাইপ কিছুর খোঁজ করতে।
“ভাই আপনার হোটেলের চা’টা একেবারে এক নম্বুরী ছিলো। পরপর দুই কাপ খেয়ে ফেলেছি।”
বিল দিতে গিয়ে এই কথাটা ম্যানেজারকে বলাই যায়।
“আপা খাঁটি গরুর দুধ দিয়ে বানায় আমাদের মোসলেম কারিগর। এক ফোটা পানি থাকেনা সেই দুধে।”
“এই জন্যেই এত স্বাদের চা। আপনার বাড়ি কি এই এলাকাতেই?”
“জ্বে আপা, থানা ফুলবাড়িয়া। এইখান থেকে আঠারো কিলো দুরে।”
“আচ্ছা এই এলাকায় বা আশেপাশে কোনো জমিদার বাড়ি আছে?”
“এই শহরে তো নাই আপা। আমাদের ওই দিকেও নাই। ক্যান আপা, কোনো দরকার? আপনে কি সাম্বাদিক?”
“নাহ্ ঠিক সাংবাদিক না। তবে আমার একটা থিসিসের জন্যে, মানে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী তো। আমার পড়াশোনার কাজে লাগতো। আমার এক বন্ধু বলছিলো এই দিকে কোথাও একটা পুরোনো জমিদারবাড়ি নাকি আছে।”
“আমি ঠিক জানিনা আপা, কোনোদিন শুনিও নাই। তবে আমাদের মোসলেম কারিগর বয়সী মানুষ। উনি মনে হয় আপনারে সাহায্য করতে পারবে।”
পাঞ্জাবি গায়ে দিতে দিতে যে মানুষটা সামনে এসে দাঁড়ালো, উনুনের আঁচে তার মুখটা লাল হয়ে আছে। পঞ্চাশ পেরিয়ে যাওয়া বয়স।
“মা জননী আমারে কিছু কইবেন? আমার হাতের রান্ধন কি ভালা লাগেনাই?”
“উল্টোটা, আপনার হাতের চা জগতসেরা।”
পাশ থেকে ম্যানেজার বলে উঠলো,
“মোসলেম কাকা, এই আপায় আপনারে দুইটা কথা জিজ্ঞাসা করবে। উনি একটা বাড়ি খুঁজতেছেন।”
“কোন বাড়ি? কার বাড়ি?”
উঁকি দেয়া দ্বিধা ঝেড়ে ফেললাম দ্রুত, কাউকে না কাউকে তো ছবিটা দেখাতে হবে। আমি ডায়েরীটা বের করে সেখান থেকে আলতো হাতে ছবিটা শুধু বের করলাম। মেলে ধরলাম মোসলেম কারিগরের সামনে।
চোখ কুঁচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন উনি।
“এইটাতো বকুলপুরের জমিদারবাড়ি। এইখান থেইকা প্রায় ত্রিশ কিলো দুরে। কিন্তু অনেকদিন হইছে ওইখানে কেউ থাকেনা। পুরাই জঙ্গলাবাড়ি হয়া গ্যাছে।”
আমি সঙ্গোপোনে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লাম। প্রথম ধাপ পেরিয়েছি খুব সহজে, ভাগ্যদেবী সাথে আছে আজ, মনে হচ্ছে।
“সামনে দাঁড়ানো মানুষটাকে চিনতে পারছেন কি? উনি কে? বকুলপুরের জমিদার?”
“সঠিক চিনবার পারতাছিনা। তয় জমিদারবাড়ির কেউ না, এইটা নিশ্চিত। আর মা জননী, এখন কিন্তুক ওইটা আর জমিদারবাড়ি নাই। চৌধুরীরা কিনা নিছিলো মেলা মেলা দিন আগেই। কিন্তুক বড় চৌধুরী সাব মইরা যাওয়ার পরে তার ছেলেমেয়েরা সবাই ছড়ায়ে ছিটায়ে গেলো। প্রথম দিকে বিক্রীর চেষ্টা করছিলো। পারেনাই, পরে আর এইদিকে কেউ পথই মাড়ায় নাই।”
“আচ্ছা আপনি এত কথা জানেন কিভাবে?”
এই প্রশ্নের জবাব দিলো ম্যনেজার কামাল।
“আরে আপা, মোসলেম কাকার বাড়িতো ওইদিকেই।”
“চৌধুরী সাহেবের কয় ছেলে মেয়ে? কই থাকে?”
“তিনডা ছাওয়াল আর একডা মাইয়া। এদের মইধ্যে তিনজনই তো বিদেশ থাকে শুনছি। শুধু মাইঝা জনে বড় শহরে মাস্টারী করতো বইলা জানি।”
আমি আরও খানিকটা আলোর দিশা পেলাম।
“মেজো ছেলে, যে কিনা মাস্টারী করতো, উনার নাম কি? জামশেদ চৌধুরী?”
আমি জামশেদ স্যারের পুরো নামের সাথে চৌধুরী আছে কিনা কখনো শুনিনি। তবুও আন্দাজে ঢিল ছুড়লাম। লেগে যাওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ। কিন্তু মোসলেম চাচার উত্তরে হতাশ হওয়া ছাড়া উপায় থাকলোনা।
“নামতো জানিনা। চৌধুরী বাড়ির বড় পোলা, মাইঝা পোলা, সারাজীবন তো এমন নামেই ডাকছি।”
“আচ্ছা এখন ওই বাড়িতে কি কেউ থাকেনা? গিয়ে দেখা যাবে ভিতরটা?”
“আগেইতো কইলাম, পুরাই জঙ্গলাবাড়ি। তয় একজন চৌকিদার মনে হয় আছে। ওই সব দেইখা শুইনা রাখে আর কি।”
“তাহলে আমি কিভাবে ওখানে যাবো, যদি একটু বলে দিতেন?”
“মা’রে একটা কথা কই, শুনেন। পড়াশোনার লাইগা আইছেন বইলা এত কথা কইলাম। কিন্তুক ওইখানে যাওয়ার কথা মনের মাঝে আইনেন না। বাড়িটায় নাকি অভিশাপ লাগা আছে। রাইতের বেলা অনেক রকম শব্দ পাওয়া যায়। চোর ডাকাতেরাও ওইদিক মাড়ায়না। আর আপনে একজন মাইয়া মানুষ হইয়া ওইখানে একা একা যাইতে চাইতেছেন!”
আমার আগ্রহ আরও বাড়লো।
“অভিশপ্ত কেন ওই বাড়ি? কোনো কাহিনী আছে কি? আপনি জানেন এমন কিছুর কথা? কবে থেকে এমন অভিশপ্ত?”
আমি মোসলেম কারিগরকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে গেলাম।
“চৌধুরী সাব মরার কয়দিন পর থেকেই এই অবস্থা। তাও তো আট দশ বছর হইয়া গেলো। রাইতের বেলা বীণ বাজে। আমি নিজের কানে একদিন শুনছি। খুব বেদিশা লাগা সেই বীণের সুর।”
“যেই চৌকিদার আছে ওখানে সেওতো বাজাতে পারে!”
“কি যে কন আপনে, ওইরকম সুর যেইদিন বাইজা উঠে হেইদিন ও আরও জোরে জোরে হাক দিয়া ওঠে। ভুত তাড়ায় মনে হয়।”
আমার ভিতরে তিনটে অনুভুতি একই অনুরণনে বেজে চলেছে। ভয়, উত্তেজনা আর রোমাঞ্চ। ভয়টা হার মেনে গেলো বাকি দুটোর কাছে। মোসলেম চাচাকে অনেক অনুনয় করে ওই বাড়িটাতে পৌছানোর পথটা জেনে নিলাম।
৯.
আমার পরিকল্পনাটা সহজ, আপাতত শহরে উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরবো কিছুক্ষণ। দুপুর গড়িয়ে গেলে রওনা দিবো। গ্রামের মাঝে আমার শহুরে বেশভুষা সহজেই সবার চোখে পড়বে, তাই বিকেল বা সন্ধ্যার আগে দিয়ে ওই বাড়িতে পৌঁছুতে চাই। রহস্যের কিনারা যে ওখানেই তাতে তো কোনো সন্দেহ নেই। বাড়িটার কেয়ার টেকার কেমন মানুষ, কোনো ধারনা নেই বলেই আমি দুইদিক ভেবে এগুতে চাচ্ছি। বিকেলে পৌছে গেলে দিনের আলোয় বাড়িটাতে ঢোকার চেষ্টা করব, চৌকিদারের সাথে কথা বলব সহজ ভাবে। মোসলেম বাবুর্চির মত তার কাছ থেকেও যদি কোনো তথ্য পেয়ে যাই তাহলেতো আর কোনো কথাই নেই। কেয়ারটেকার যদি আমার মত ভৌতিক কোনো অভিজ্ঞতায় আগে থেকেই কাবু হয়ে থাকে তবে রহস্যের জট ছাড়ানো সহজ হবে। এইসব ভাবতে ভাবতে শহরের প্রধান সড়ক ধরে হেটে চলেছি। আবিস্কার করলাম, ভীতিকর চোখের দৃষ্টি আজ আমাকে তাড়িয়ে নিচ্ছেনা। প্রবল উত্তেজনা বাকী সব অনুভুতিতে প্রলেপ দিয়েছে। দুপুর পার করে আমি বকুলপুরের দিকে রওনা দিলাম।
আমাদের দেশটা খুব ছোটো, প্রায় সবগুলো গ্রামই দেখতে আসলে একইরকম। শুধু এই বকুলপুরে একটা পার্থক্য আছে। আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িটা। এককালে খুব কারুকার্য মাখা ছিলো। এখন কালের স্বাক্ষী শুধু। জঙ্গলাকীর্ণ, আগাছার ভারে নুয়ে পড়েছে যেন বাড়িটার অতীত ঐতিহ্য। পকেটে থাকা নোকিয়া ১১০০ সেলফোনটা আজ সারাদিনই চুপ ছিলো। খুব ভোরে একবার শুধু কথা হয়েছে কৌশিকের সাথে। বেশী কথা বলা মানেই ওর কাছে একগাদা মিথ্যে বলা, তাই আমি কথা বাড়তে দেইনি। এখন পুরো সাইলেন্ট করে দিলাম।
ব্যাকপ্যাকে থাকা ডায়েরীটা থেকে ছবিটা বের করে একবার মিলিয়ে নিলাম। এই বাড়িটাই। বিকেলের আলো মরে আসছে। আমি পা দুটোকে আর একটু শক্ত করে মাটিতে রাখলাম। এটাকেই সম্ভবত দৃঢ় পায়ে এগিয়ে যাওয়া বলে।
বাইরের গেটটা তুলনামূলক শক্তপোক্ত এবং ভিতর থেকে তালা দেয়া। চারদিকের দেয়াল ধরে একটা চক্কর দেয়ার চিন্তা করে পা বাড়ালাম। আমি একজন মেয়ে, এই ভর সন্ধ্যায় বিদেশ বিঁভুইয়ে একটা ছেলের তুলনায় আমার কিছু নিরাপত্তা জনিত সমস্যা আছে, এই সম্ভাবনাগুলো মাথা থেকে দুরে সরিয়ে রেখেছি। বিপদ আসলে পরে দেখা যাবে। পিছন দিকে আর একটা গেট এবং ওখানে আমার জন্যে একটা প্রবল চমক অপেক্ষায় ছিলো। সামনের মত পিছন দিকেও বাড়িতে ওঠার জন্যে কয়েক ধাপের সিড়ি আছে। এবং এই পিছন দিকের সিড়ির লাগোয়া দরজায় ঠিক উপরে একটা সুর্য মুখ আঁকা আছে, সিমেন্টের মাঝে নকশা করে। রং দেখে মনে হলো, এটা বাড়িটার মত এত পুরোনো না, অর্থাৎ পরে তৈরী করা হয়েছে। যেটা চমকে দিলো, সুর্যমুখে থাকা দুটো চোখ। একদম অবিকল আমার স্বপ্ন দৃশ্যে যে চোখটা ভয় দেখিয়েছিলো সেই চোখ। আলো দ্রুত কমে আসছে, আমি হাতে থাকা ছবিটায় চোখ বোলালাম। সামনে দাঁড়ানো মানুষটার সাথে কোনো একজনের মিল আছে। আমি এমন কাউকে চিনি যে কিনা এই মানুষটার আদলে। খুঁটিয়ে দেখতে গিয়ে মনে হলো, ছবির মানুষটার চোখের সাথে খুব অল্প হলেও মিল আছে সামনের দেয়ালে থাকা চোখ দুটোর। তবে এগুলো কুঁচকে আছে রাগী চোখে। আর ছবিতে মানুষটা সামান্য হাসিমুখে তাকিয়ে আছে।
হঠাৎ করেই আমার আবার গত চারদিনের অনুভুতি ফিরে এলো, এবার যেন কয়েকশো গুণ বেশী হয়ে। হাজার হাজার চোখ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। পলকহীন শীতল সেই দৃষ্টি, আমার সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠছে।
বাড়িটাতে ঢুকতে হবে যে করেই হোক। চৌকিদার কোথায়? হাঁটতে হাঁটতে সামনের গেটে চলে এলাম। যা হয় হবে, ভেবে নিয়ে জোরে জোরে ধাক্কা দিলাম গেটের গায়ে কয়েকবার। কোনো সাড়া নেই। আবার ধাক্কা দিলাম। মিনিট পাঁচেককে যখন ঘন্টাখানেক মনে হচ্ছে, তখন ভিতর বাড়ির সদর দরজা খোলার শব্দ পেলাম।
বয়োবৃদ্ধ একজন মানুষ, হাতে একটা লাঠি। ওটা কি তার অস্ত্র, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নাকি তার ভার বহন করার সঙ্গী, ঠিক বুঝতে পারলাম না। গায়ে মোটা একটা চাদর অনেকটা আলখেল্লার মত পড়ে আছে। আজকালকার দিনে কেউ খড়ম পড়ে, আমার ধারনা ছিলোনা। খট খট শব্দ তুলে মানুষটা এগিয়ে এলো।
“কি চাই এই ভর সইন্ধ্যাকালে? সাপখোপের আড্ডা আছে চাইরদিকে। তোমার কি বাপু মাথা খারাপনি?”
কথা গুলো বলতে বলতে মোটা ফ্রেমের একটা চশমা চোখে লাগালো। আমাকে দেখে তার সামান্য হলেও চমকে ওঠার কথা ছিলো, আমি যে এই গ্রামের না, চেহারা ভিন্ন, ভিন্ন আমার পোষাক আশাক। কিন্তু মোটা কাঁচের লেন্সে মানুষটা তার অভিব্যক্তি আড়াল করতে পারলো সহজেই।
“আমার নাম অরুনিমা। আমি আসলে অনেক দুর থেকে জরুরী কাজে এসেছি। এটাতো জামশেদ স্যারের বাড়ি, তাইনা? স্যার আমাকে এই ঠিকানাটা দিয়েছেন।”
আমি গভীর দিঘীর পানিতে ছোট্ট একটা নুড়ির চাল চাললাম।
কিন্তু লাভ হলোনা, নুড়িটা ডুবে গেলো কোনো ঢেউ তৈরী না করেই।
“জামশেদ? হ্যায় আবার কেডা? এই নামে এইহানে কেউ থাহেনা।”
“জামশেদ চৌধুরী, এই বাড়ির মেজো ছেলে। ইউনিভার্সিটিতে পড়ায় যেই জন। আপনি মনে হয় উনাকে ডাকনামে চেনেন।”
“এই মাইয়া তুমি যাওতো। এইহানে এই নামে কেউ কম্মিনকালেও থাহেনাই।”
“কিন্তু স্যার তো আমাকে এই ঠিকানাটাই দিলো। এইটা বকুলপুরের পুরাতন জমিদারবাড়ি না? এখন চৌধুরী বাড়ি! আমি জামশেদ স্যারের খুব প্রিয় ছাত্রী। স্যার নিজে আমাকে এই বাড়িতে আসতে বলেছেন।”
আমি আমার নিজের কল্পনা আর মিথ্যের মিশেল দেয়ার ক্ষমতা দেখে নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম।
কিন্তু চৌকিদার ব্যাটা আমার চেয়েও ঘোড়েল। কাবু করতে পারলাম না।
“শোনো মেয়ে, সন্ধ্যা নাইমা গ্যাছে। কথা বাড়ায়ে লাভ হইবোনা। এই নামে চৌধুরী বংশে কেউ ছিলোনা। তুমি ভুল ঠিকানায় আইছো।
মনের মাঝে দমে যাচ্ছি, কিন্তু হার মানার মেয়ে আমি, এটা কি আপনাদের মনে হয়? আর যেহেতু বাড়ির পিছনে ওই চোখের দেখা পেয়েছি তখন আমাকে ঢুকতেই হবে এই বাড়িতে। হাজারটা চোখ তাকিয়ে আছে আমার দিকে, প্রবলভাবে ফিরে আসা এমন অনুভূতিটাকে কিভাবে সরিয়ে রাখি!
“চাচা, রাত হয়ে যাচ্ছে। এখন শহরে ফেরার জন্যে কোনো কিছু পাবোনা। আজকের রাতটুকু কি থাকা যাবে এখানে?”
সবরকম পরিকল্পনা করেই তো আমি এই সময়টা বেছে নিয়েছি। যেন এমন একটা প্রস্তাব দেয়া যায়। যদিও যেই অটোতে করে আমি এখানে এসেছি, সে এখান থেকে প্রায় মাইল দুয়েক দুরে তার বাড়িতে আছে। এবং আমি তার ফোন নাম্বার রেখে দিয়েছি। বলে রেখেছি, খুব বিপদ হলে তার অটোতেই আজ রাতে আবার শহরে ফিরে যাব।
রাতে থাকতে চাওয়ার প্রস্তাবে কোথায় বুড়ো চৌকিদার সামান্য খুশী হবে তা তো নাই, যেন ভুতের ডাক শুনলো।
চোখ জোড়া কপালে তুলে একটি কথা না বলে আমার মুখের উপরে গেটটা বন্ধ করে দিয়ে পিছন ফিরে হাঁটা ধরলো। আমার পরের পরিকল্পনাটাও তৈরীই ছিলো।
আমিও পেছন ফিরে ভগ্ন মনোরথে হাটা শুরু করলাম।
সামনে থাকা কয়েকটা মেহেগনী গাছের আড়ালে আসা মাত্রই আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। আপাতত এখানেই গা ঢাকা দিয়ে অপেক্ষা। রাতটা আর একটু কালো রঙ গায়ে মাখুক, তারপর আমি চুপিসারে ঢুকে পড়বো রহস্যের আধার হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িটাতে।
১০.
ঘন্টা দুয়েক পরে সামান্য খুটখাট শব্দের বিনিময়ে বাড়িটাতে ঢুকে পড়লাম। সারা বাড়িটাতে কেমন যেন বোটকা পড়া গন্ধ। ব্যাটা চৌকিদার মনে হয়না কোনোদিন দরজা জানালা খোলে। অন্ধকার চোখে সয়ে আসার পরে ধীরে ধীরে এগুনো শুরু করলাম। একটু পরে একটা হলরুমের মত বড় ঘরে দাঁড়ালাম আমি, অল্প ওয়াটের টিমটিমে আলো জ্বলছে।
আমি কি খুঁজছি, ঠিক জানিনা। তবে প্রশ্ন বা রহস্য তো দুটো মাত্র। আমার ডীন, প্রফেসর আব্দুস সালাম স্যার আমাকে যে এসাইনমেন্ট দিয়েছিলেন, সেই সিলেবাসে শুধু দুটো প্রশ্ন ছিলো।
জামশেদ স্যারের ডায়েরী জুড়ে সব চোখের ছবি কেন? কোথায় তাদের উৎস এবং যার হাতে এই ডায়েরী পড়ে তাদের কেন শত সহস্র চোখের দৃষ্টি অনুভুত হয়?
আর দ্বিতীয়ত, জামশেদ স্যারই বা তার ডায়েরীটা রেখে কোথায় হারিয়ে গেলেন?
এই ফিকে হয়ে আসা আলো আঁধারিতেও আমার সারাক্ষণ মনে হচ্ছে অসংখ্য চোখ তাকিয়ে আছে আমার দিকে। সময় যত গড়াচ্ছে অনুভূতিটা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।
সামনেই দোতালায় উঠে যাবার সিড়ি। পুরাতন জমিদার বাড়ির মতই দেয়ালে বেশ কিছু প্রানীর স্টাফ করে রাখা মাথা। আমি সামান্য এগিয়ে গিয়ে একটা চিত্রা হরিনের মাথা পরীক্ষা করলাম। কি যেন আছে এটাতে, মিলছেনা কিছু একটা। হিসেবটা মিলিয়ে ফেললাম এক মুহূর্ত পরেই, আমার পুরো গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। হরিনের চোখ দুটো আমি আগে দেখেছি। জামশেদ স্যারের ডায়েরীতে। এবং এটা কোনোভাবেই হরিনের চোখ হতে পারেনা। এই দুটো কোনো মানুষের চোখ, বসিয়ে দেয়া হয়েছে হরিনটার অক্ষিকোটরে।
এর মানে কি? কেন এটা করা হয়েছে? কে করেছে? জামশেদ স্যার? এটা যে জামশেদ স্যারের বাড়ি, সেটাইতো প্রমান করতে পারলাম না এখনো। আমার কেমন যেন বমি পাচ্ছে। মাথায় একটা সন্দেহ উঁকি দিলো, নিঃশব্দ পায়ে কাছের শোকেসের দিকে এগিয়ে গেলাম, দুটো বাঘের মুর্তি। কাছে গিয়ে আবছা আলোয় খুটিয়ে দেখলাম সময় নিয়ে। সন্দেহটা বিশ্রীরকমের সত্যি প্রমান হওয়া মাত্র ছিটকে পিছিয়ে এলাম। এখানেও মানুষের চোখ বসিয়ে দেয়া আছে। কোন বিশেষ প্রক্রিয়ায় চোখগুলোকে মমি বানিয়ে অক্ষত রেখে প্রানীগুলোর চোখের জায়গায় বসিয়ে দেয়া হয়েছে। এবং প্রতিটা চোখের ছবি জামশেদ স্যারের ডায়েরীতে আঁকা আছে। রহস্য ফিকে না হয়ে আমার কাছে আরও কেমন যেন জমাট হয়ে যাচ্ছে। এই চোখের মানুষগুলো এখন তবে কোথায়? জামশেদ স্যারই বা চোখগুলোর দেখা কোথায় পেয়েছেন?
ডায়েরীর পাতায় আঁকা চোখের হিসেবে আরও অনেক চোখের অস্তিত্ব থাকার কথা এই বাড়িতে। কিন্তু আর কোনো স্টাফ করা প্রানীর শরীরের দেখা পাচ্ছিনা আমি এই মুহূর্তে। ঠিক এমন সময়ে কেমন একটা করুন সুর বেজে উঠলো বাড়ির কোথাও। খুব চাপা সুর, আমি সামান্য বিভ্রান্ত হলাম। প্রতিধ্বনি হচ্ছে, তাই ঠিক কোন জায়গা থেকে এই শব্দ উঠে আসছে আমি বুঝতে পারছিনা। শরীরে ভিতরে এড্রেনালিনের ঝড় বইছে, বুঝতে পারছি। ভয়টা আসি আসি করেও তাই আসতে পারছেনা। কয়েকটা সেকেন্ড শুনলাম করুন সুরটা। মনে হলো ভায়োলিনের সুর। আর যাই হোক ভুতেরা ভায়োলিন বাজানো শিখেছে বলে শুনিনি।
গ্রামের একজন চৌকিদার এত সুন্দর ভায়োলিন বাজাবে, এটা মানতে মন চাইছেনা। তারমানে এই বাড়িতে আরও কেউ আছে। রহস্যের চাবিকাঠি কি তবে তার কাছে! আমি এবার প্রত্যেকটা ঘরের দরজায় হানা দিলাম। কিছু বন্ধ আর কিছু খোলা পেলাম। একটা দরজা আমাকে আটকে ফেললো, তালাটা নতুন, নিয়মিত হাত পড়ে, খোলা হয়। আমি এদিক সেদিক তাকালাম, এই ঘরটা খুলতে হবে। মিনিট পাঁচেকের চেষ্টায় খুলেও ফেললাম। খানিকটা শব্দ হলো, উপায় নেই কোনো। চৌকিদার কোথায় জানিনা। ঘুমিয়ে গেলে বাঁচি। ঘরের ভিতরে ঢুকে তাকালাম চারদিকে।
না খুলতে পারলেই কি ভালো ছিলো? সারি সারি সব বড় বয়াম। প্রত্যেকটা বয়াম যেন আমার দিকে তাকিয়ে আছে! এবার আর আমি পারলাম না, হড়হড় করে বমি করে সব ভাসিয়ে ফেললাম। প্রতিটা বয়ামে এক জোড়া করে চোখ, তরলে পদার্থে ভেসে আছে।
এই চোখগুলোই এতদিন আমায় তাড়া করে বেরিয়েছে, পরীক্ষা না করেই বলতে পারি এদের ছবিই জামশেদ স্যার এঁকেছেন। তবে কি মানুষগুলোকে মেরে ফেলার আগে অথবা চোখ তুলে নেয়ার আগে এগুলো জামশেদ স্যার এঁকেছিলেন? প্রশ্নেরা আকুলি বিকুলি করছে।
ভায়োলিনের সুরটা আমাকে ডেকে তুললো। দ্বিতীয় মানুষটাকে খুঁজে বের করতেই হবে। কোথা থেকে আসছে এই করুন সুর, কে বাজাচ্ছে। ঘোরের মাঝে বেরিয়ে যাচ্ছি ওই অভিশপ্ত ঘর থেকে। না জানি কত অসংখ্য অজানা দুর্ভাগা মৃত মানুষের চোখগুলো আজও বেঁচে আছে, অনিশ্চিত কোনো দুর দিগন্তে তাকিয়ে আছে নির্নিমেষ। তীব্র ভয়ের পাশাপাশি কেমন যেন মায়া লাগলো। আহ্ হা রে।
ঘর থেকে বের হবার মুহুর্তে এক জোড়া চোখের দৃষ্টিতে আমার চোখ আটকে গেলো, এইতো সেই চোখ! দুই রাত আগের ঘোর দুঃস্বপ্নে আমাকে স্বান্তনা দিয়েছিলো, পুরো ডায়েরীর পাতা থেকে যে চার জোড়া চোখের ছবি কেটে নিয়েছিলাম, এটা সেই চোখ। এখনো সেই একই রকম দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে। একটু আলাদা ভাবে রাখা আছে জারটা। বোঝা যায়, সংরক্ষনের সময় বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে চোখ জোড়াকে। কার চোখ এটা? রহস্যের জাল বিছিয়ে আছে যেন এই বাড়িতে।
সিড়ি বেয়ে দোতালায় উঠে গেলাম। সুরটা কাছে এগিয়ে আসছে, তারমানে আমি ঠিক পথেই আছি। উপরেও অনেকগুলো ঘর। এবার আর আন্দাজের উপরে ভর করে সবগুলো দরজা খুলছিনা। পুরোনো সব দরজা, খুলতে গেলেই ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ করে। চৌকিদার এখনো এসে আমাকে তাড়া করেনাই, আমার ভাগ্য। ডান দিক থেকে শব্দটা আসছে। নীচ তলার মত এখানেও একটা ঘরের দরজার তালা কিছুটা নতুন। এবং ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে আমি নিশ্চিত, এই ঘরেই সুরের উৎপত্তি হচ্ছে। হিসেবটায় আবার গড়মিল লাগলো! ধরে নিতে পারি বাড়ির মালিকই ভায়োলিন বাজাচ্ছে। এবং যে যাই বলুক, জামশেদ স্যারই এই বাড়ির মালিক, আমার যুক্তি তাই বলে। কিন্তু তাহলে ঘর বাইরে থেকে তালাবদ্ধ কেন? তারমানে এখানে কাউকে বন্দী করে রাখা হয়েছে! কাকে? তালাটা ভাঙ্গতে হবে। আজ রাতে আমাকে যে আর কয়টা তালা ভাঙ্গতে হবে, উপরওয়ালা জানেন। দেশের বিখ্যাত সাইকোলজিস্ট হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে গেলে এত কিছু করতে হয়, আমি ভাবিনি।
দরজায় লাগানো তালাটায় একটা রড দিয়ে আঘাত করলাম। সাথে সাথে ভায়োলিনের সুর বন্ধ হয়ে গেলো।
এবার আর একটু জোরে আঘাত করলাম। ঠিক সেই সময়ে আমার মাথার পিছনে কেউ আঘাত করলো, লুটিয়ে পড়লাম আমি, তার আগেই অন্ধকার ঘরটা আমার চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলো।