অজস্র অসাড় বরফ কঠিন চোখ তাদের হিমশীতল দৃষ্টি দিয়ে আমাকে তাড়া করে নিয়ে বেড়াচ্ছে!
আজ নিয়ে টানা তিনদিন, চরম অস্বস্তিকর অনুভুতিটা আমাকে ঘিরে ধরে আছে। আমার বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক আব্দুস সালাম স্যারের দেয়া এসাইনমেন্ট যখন বুঝে নিলাম, তখন থেকেই এটা অবশ্যম্ভাবী ছিলো, তবে মনের কোনে আশাও ছিলো, আমার ক্ষেত্রে হয়তো এটা হবেনা। কিন্তু নিরাশার কোলে আশ্রয় নিতে আমার মাত্র দিন চারেক সময় লেগেছে। তারপর থেকে গত তিনদিনের প্রত্যেক মুহূর্ত মনে হচ্ছে কেউ আমার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সবুজ ঘাসের চাদর বিছানো মাঠে, নিরেট চার দেয়ালের বদ্ধ কামরায়, অজানা জনস্রোতের চোরা মিছিলে নিজেকে গড়িয়ে দিয়েছি। গাঢ় আঁধার রাতের অস্তিত্বে নিজেকে নিশ্চিহ্ন করে মিশিয়ে দিয়েছি কিন্তু ওই তীব্র অনুভুতিটা আমাকে ছেড়ে যায়নি। কখনো এক জোড়া আবার কখনো অসংখ্য জোড়া চোখের দৃষ্টি আমাকে বিদ্ধ করেছে। অথচ আমি যেদিকেই তাকাই না কেন, সেইসব চোখের দেখা আমি পাইনা। সচেতনভাবে একটি মানুষও আমার দিকে তাকিয়ে নেই। ছোট্ট এক কামরার ঘরে ডেস্কে রাখা ক্যালেন্ডারে আমি দাগ দিয়ে যাচ্ছি, বদ্ধ উন্মাদ হতে আমার আর কয়দিন বাকী!
২.
ঠিক দিন সাতেক আগে,
একটা সোনালী, স্বপ্ন সমাপ্তি দিনের কিছু মুহূর্তের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম, আমি অরুনিমা শবনম, মাস্টার্সের ফাইনাল পরীক্ষার্থী।
ক্রিমিন্যাল সাইকোলজি বিভাগের সব শিক্ষক আমাকে একনামে চেনে। চিনবেনা কেন? গত চারটে বছর প্রতিটি পরীক্ষায় আমার ফলাফল ছিলো দুর্দান্ত।
আজ চুড়ান্ত পরীক্ষার ভাইবা দিতে বসেছি। সামনে শ্রদ্ধেয় ডীন সালাম স্যার আর ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা একজন এক্সটার্নাল বসে আছেন।
একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছেন দুজনে মিলে।
“এই যে এত এত এক্সট্রিমিস্ট তৈরী হচ্ছে পৃথিবী জুড়ে, এর পিছনের কারণটাকে তুমি কিভাবে ব্যাখ্যা করবে?”
“আজকাল দেশে ক্রোনোফিলিয়াতে ভোগা শিক্ষকের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। প্রতিরোধের উপায় বলো।”
“পাইরোম্যানিয়াকের সাইকো- ক্রিমিনোলোজিক্যাল প্রোফাইল ব্যাখ্যা করো?”
“DSM-5 ম্যালএডাপটিভ ট্রেইট মডেলের মানুষগুলোর ছল চাতুরীগুলো তুমি কিভাবে ধরবে বা ব্যাখ্যা করবে?”
প্রতিটা প্রশ্নেই আমি সপ্রতিভ উত্তর দিয়ে যাচ্ছি। স্বপ্নের জাল বোনা শুরু করেছিলাম অনেকদিন আগে থেকেই, আজ তার পূর্ণতা প্রাপ্তির দিন হবে, এমনটাই আশা নিয়ে এসেছি আমি। একেকটা উত্তর যেন আমার স্বপ্ন পুরণ পথের একেকটা ইট দিয়ে গাঁথা শক্ত গাঁথুনি। আর হয়তো সর্বোচ্চ দুটো বা তিনটে প্রশ্ন। ঠিকঠিক উত্তর দিয়ে বেরিয়ে যাবো আমি, কিন্তু ফিরবো আবার এখানেই, স্যারদের সহকর্মী হিসেবে। ছায়াঘেরা এই ক্যাম্পাসটাকে আপন করে নিয়েছি সেই কবেই। একাডেমিক ভবনগুলো থেকে সেই সীমানা প্রাচীরের কাছে আমাদের ঠিকানা যে হলগুলো, তার মাঝে ছড়িয়ে থাকা কালো পীচ ঢালা রাস্তাগুলোতে হাটতে হাটতে কত কিছুইনা ভেবে নিয়েছি। কিন্তু আমার স্বপ্ন আরও অনেক দুর ছড়িয়ে গিয়েছে, রাস্তাগুলো পাল্লা দিয়ে পারবেনা। এই সবুজে মোড়ানো ক্যাম্পাস তো বটেই, আমি পুরো দেশের মাঝে কিংবদন্তিতুল্য ক্রিমিন্যাল সাইকোলোজিস্ট হব। আগামী দিনগুলোতে যত ছাত্র ছাত্রী এখানে পা ফেলবে, আমি হব সবার শিক্ষাগুরু। শৌভিক তো আমাকে দুষ্টুমি করে মহিলা মিসির আলী বলে ডাকে সেই কবে থেকেই!
“অরুনিমা, তোমার জানার পরিধি নিয়ে আমার কখনোই কোনো সংশয় ছিলোনা। প্রশ্ন করে আমরা তোমায় আটকাতে পারবোনা, সেটা চাচ্ছিও না।”
সালাম স্যার স্মিত হাসি মুখে নিয়ে বললেন। কথাটা আমার দিনরাত এক করা পরিশ্রমের প্রতিদান।
“স্যার আপনাদের ঠিকঠাক দিক নির্দেশনাতেই আমি নিজেকে গড়ে নিয়েছি। আজকের অরুনিমা আপনারই তৈরী স্যার।”
“তোমার পরীক্ষা আনুষ্ঠানিক ভাবে শেষ। এবং তোমাকে আমি সর্বকালের সর্বোচ্চ নাম্বার দিতে চাই।”
“স্যার এটা আপনার মহানুভবতা। আমার পরম পাওয়া স্যার। কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা আমার জানা নেই”
“তবে ওই নাম্বারটা পেতে গেলে তোমার দিকে থেকে ছোট্ট একটা এসাইনমেন্ট আছে আমার তরফ থেকে।”
আমি নিজের অজান্তেই সামান্য কেঁপে উঠলাম। আঁচ করতে পারছি, আমার সামনে কি আসছে।
আঁচে থাকলেও আশঙ্কা বা আশায় ছিলোনা এই প্রস্তাব।
“দেখো, ক্রিমিন্যাল সাইকোলজি শুধু পুঁথিগত বিদ্যা না। একটা সত্যিকারের রহস্য ভেদ করতে পারলে তবেই না তুমি সত্যিকারের জিনিয়াস, সবার মাঝে নিজেকে আলাদা বলে ভাবতে পারবে।”
“জ্বী স্যার তা তো অবশ্যই। স্যার আমার এসাইনমেন্টটা কি হবে?”
উত্তরটা জানি, তবুও স্যারকে প্রশ্নটা করলাম। আমার কুসুম কালারের কামিজের গলা আর সাথে হালকা ম্যাচ করা পিয়াজী রঙের ওড়না ঘামে ভিজে জবজব করছে, আমি টের পাচ্ছি। এটা উত্তেজনা নাকি সামান্য ভয়ের কারণে তা এই মুহূর্তে ঠাহর করতে পারছিনা।
আব্দুস সালাম স্যার তার টেবিলে থাকা তালাবদ্ধ ড্রয়ার খুলতে লাগলেন। আমি দক্ষিণ দিকের জানালা বরাবর থাকা লাল ফুলে ভরে ওঠা কৃষ্ণচুড়া গাছটার দিকে তাকালাম, ভরদুপুরের আলো কেমন ঘোলাটে হয়ে আসছে আমার কাছে। বাইরে থমথমে নিরবতা। একটা পাখির ডাকও আসছেনা আমার কানে।
“এই যে নাও, তোমার এসাইনমেন্ট।”
স্যারের কথায় সম্বিত ফিরে পেলাম। আমার সামনে টেবিলের উপরে একটা বহুল ব্যবহৃত বাদামী চামড়ায় মোড়ানো ডায়েরী পড়ে আছে। কখনো দেখিনি তবে এর কথা বহুবার শুনেছি। আমাদের ডিপার্টমেন্টের বহুদিনের পুরোনো এক আনসলভড মিস্ট্রী কেস। প্রতি এক বা দুই বছর পরপর একবার এটা তালাবদ্ধ ড্রয়ার থেকে বের করেন অধ্যাপক সালাম স্যার। ব্যাচের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্র বা ছাত্রীকে এই ডায়েরীটা ধরিয়ে দিয়ে এসাইনমেন্টটা পুরণ করতে বলেন।
আমি আমার জোড়া হাত দুটোকে নিরব ধমক দিয়েও কাঁপুনিটা থামাতে পারছিনা। ওই কম্পিত হাতেই ডায়েরীটা নিলাম।
“তুমি সময় নাও। পুরোটা আগাগোড়া পড়ো, দ্যাখো। প্রফেসর জামশেদের মনোজগতের কতটা আবিস্কার সম্ভব হয় আর তার তিরোধান রহস্যের কতটা সমাধান করতে পারো, দেখা যাক।”
আব্দুস সালাম স্যারের মিষ্টি হাসি দেখে বুঝলাম, আমার ভাইবা শেষ। কিন্তু সত্যি কি শেষ? নাকি আসল পরীক্ষা শুরু হলো? আমার এতদিনের স্বপ্ন এভাবে অধরা থেকে যাবে! এটাতো শুধু আনসলভড মিস্ট্রীই না বরং জীবনের গতিপথ বদলে দেয়া ভয়ঙ্কর এক ডায়েরী
৩.
“তুই কি পাগল হয়েছিস? এই ডায়েরি স্যারের টেবিলে কালকেই রেখে আয়।” রুমমেট এবং ঘনিষ্ঠ বান্ধবী সোহানার চিলচিৎকার।
দুপুরে স্যারের রুমে ঘটা ভাইবাকে কেন্দ্র করে ঘটনা রটে গিয়েছে পুরো হল জুড়ে। আপাত কৌতুহল মিটিয়ে আর নিজের ভিতরের কৌতুহল কম ভীতি বেশীটাকে চাপা দিয়ে আমি আর সোহানা বসেছি রুমের দরজা বন্ধ করে দিয়ে।
“সোহানা, তুই জানিস আমার স্বপ্নের কথা। আমি এই ক্যাম্পাসেই শিক্ষকতা করবো। বড় বড় সব রহস্যের সমাধান করব, এমনটাইতো সবসময় ভেবে এসেছি।”
“তুই নম্রতা, নিরবদা কিংবা শুভ্র ভাইয়ের কথা ভুলে গিয়েছিস? তারা প্রত্যেকে এই ডায়েরীটা পেয়েছিলো। কোথায় তারা আজ?”
উত্তর দিতে পারলাম না আমি। গলায় আটকে গেলো।
নম্রতাদি, আমরা যখন প্রথম বর্ষে তখন উনি ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছিলো। ভার্সিটিতে সবসময় শাড়ি পড়ে আসতো, উচ্ছল চঞ্চল। যেকোনো অনুষ্ঠান আয়োজনে সবার আগে। সিদ্ধার্থদার সাথে বিয়ের কথা সব পাকা। মাস্টার্সের পরেই ঘটা করে বিয়ের অনুষ্ঠান। ডায়েরীটা উনার কাছে পনেরো দিনের মত ছিলো। তারপর থেকে বদ্ধ উন্মাদ। এখন কোথায় আছেন জানিনা।
নিরবদা, আরেক তুখোড় ছাত্র আমাদের ডিপার্টমেন্টের,
ডায়েরী হাতে পেয়েও বেঁচে গিয়েছেন। তিনদিনের বেশী নিজের কাছে রাখেননি। অপারগতা প্রকাশ করে ডায়েরীটা ফেরত দিয়েছেন। পরীক্ষার রেজাল্টের জন্যে অপেক্ষা না করে সোজা বড় ভাইয়ের কাছে আমেরিকা চলে গিয়েছেন। তারপরও ট্রমা কাটাতে নাকি বেশ কিছুদিন সময় লেগেছে।
শুভ্র ভাইকে আমরা দেখিনি তবে উনার কথা শুনেছি। উনিই নাকি রহস্যের কিছুটা কাছে যেতে পেরেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ এক রোড এক্সিডেন্টে মানুষটা সারাজীবনের জন্যে অচল হয়ে ঘরে পড়ে গেলো। শরীরের সাথে সাথে মাথাও ঠিকমত কাজ করেনা।
এদের সবার মাঝে একটা ব্যপার খুব কমন ছিলো, এরা প্রত্যেকেই ডায়েরীটা হাতে পাওয়ার পরে, ওটা নিয়ে ঘাটাঘাটির কিছুদিন পরেই ওরা বলা শুরু করেছিলো,
কে বা কারা যেন ওদের দিকে সারাক্ষন তাকিয়ে থাকে।
“সব জানি আমি, কিন্তু স্যারের কথায় তো যুক্তি আছে।আমি নিজেকে অন্যদের চেয়ে আলাদা প্রমান করতে গেলে একটা শক্ত কেসতো সমাধান করতে পারা উচিৎ”
“তাই বলে নিজের জীবনের উপরে রিস্ক নিবি? অরু এটা বোকামী আমার চোখে।”
“কিন্তু সোহানা হতেও তো পারে এই সবগুলো ঘটনাই কাকতালীয়। সালাম স্যার তো ইচ্ছে করে তার প্রিয় ছাত্রদের বিপদে ফেলবেনা। হয়তো নম্রতাদি কিংবা নিরব’দার মানসিক শক্তি দুর্বল ছিলো।”
“তোর কথা ফেলে দিবোনা। সালাম স্যারের পরিকল্পনা নিয়েও আমার মনে কোনো প্রশ্ন নেই। উনি প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত শিক্ষকের খোঁজ করেন প্রতি বছরই। সেইসাথে সম্ভবত তার বন্ধুপ্রতীম জামশেদ স্যারের হারিয়ে যাওয়ার রহস্য বের করতে চান। কিন্তু তিন তিনটা ঘটনাকে কাকতালীয় বলতে আমি নারাজ। আর সেইসাথে নিজের জীবনের উপরে সামান্যতম ঝুকি নিতেও আমি রাজি হতাম না।”
“দোস্তো আমি তোর উদ্বিগ্নতা বুঝতে পারছি। কিন্তু সেইসাথে একটা চ্যালেঞ্জও অনুভব করছি। জামশেদ স্যারকে কখনো দেখিনি। শুধু তার কথা শুনেছি। যদি আমার হাত দিয়েই তার ডায়েরী রহস্য উন্মোচন হয় তবে একটা চেষ্টা তো নেওয়াই যায়, তাই না?”
“ঠিক এরকমভাবে নম্রতাদি, শুভ্র ভাই বা নিরব’দারাও ভেবেছিলো বলেই আমার ধারনা। আমি জানি তুই মানসিকভাবে বেশ শক্ত, কিন্তু রিস্কটা বেশী হয়ে যাবে, এটা আমি হলপ করে বলতে পারি।”
ঠিক সেইসময়ে রুমের জানালা লাগোয়া পাকুড় গাছে থাকা একটা তক্ষকের ভারী গলার ডাকটা আমাদের দুজনের হৃদস্পন্দন সামান্য বাড়িয়ে দিয়ে গেলো।
৪.
পরের কয়কেটা দিন আমি রুমের মাঝে নিজেকে আটকে ফেললাম। সারাদিন ডায়েরীটা নিয়ে পড়ে থাকি, জামশেদ স্যারের একটা ঝাপসা হয়ে আসা ছবি লাগানো আছে দ্বিতীয় পৃষ্ঠায়। চশমা চোখে, মাথা ভর্তি একরাশ উসকোখুশকো চুল, সামনের দিকটায় পাক ধরেছে প্রবল ভাবে। শার্টের উপরে একটা বাহারী রঙের সোয়েটার পরনে। মানুষটার চোখ দুটোতে বুদ্ধির ঝিলিক। এরপর স্যারের নাম ঠিকানা লেখা আছে।
আর তারপর থেকেই গুটিগুটি অক্ষরে অসংখ্য লেখা। পড়তে গিয়ে প্রায় সবই সাংকেতিক ভাষায় মনে হয় প্রথম দিকে। ধীরে ধীরে বুঝতে পারি, নাহ্ এগুলো আসলে স্যারের নিজস্ব ভাষায় বেশ কিছু মুহূর্তের বর্ননা,
শুরুতে কিছু এলোমেলো শব্দের জলসিড়ি থাকলেও ধীরলয়ে একসময় সমস্ত শব্দ মিলে একটাই স্রোত তৈরী করেছে। কিন্তু ডায়েরীর যতটা গভীরে গিয়ে সেই স্রোতের খোঁজ পাওয়া যায় তার বহু আগে থেকেই পাতায় পাতায় আঁকা অসংখ্য ছবি পাঠকের চিন্তা চেতনাকে আচ্ছন্ন করে নেবে। এবং ছবিগুলো সব একই বিষয়ের উপরে। চোখের ছবি, শুধুই চোখের ছবি। একই চোখের বিভিন্ন মুহূর্তের ছবি যেমন আছে ঠিক তেমনি অসংখ্য চোখের ঠিক একই মুহূর্তের ছবিও আছে।
“কি বলতে চাও তোমরা, তোমাদের দৃষ্টি দিয়ে?”
আমি আচ্ছন্নের মত, প্রবল ঘোরে ডুবে যেতে যেতে ঘন্টার পর ঘন্টা তাকিয়ে থাকি ছবিতে আঁকা চোখের দিকে? প্রশ্ন সুধাই। নিজেকেই জিজ্ঞেস করি, প্রফেসর জামশেদ কেন এই ছবিগুলো এঁকেছিলেন! কি বোঝাতে চেয়েছেন?
তার গোটা হাতের লেখায় উত্তর খুজিঁ। নাহ্, ওখানে কিছুই নেই। শুধু তার আতংকে অভিভুত হওয়ার কথা, প্রবল ভীতিতে গ্রাস হয়ে যাবার আশঙ্কার কথা লেখা আছে ছবিগুলোর ফাঁকে ফাঁকে। উনি কিছু একটা জানতে পেরেছেন কিন্তু জানাতে পারছেন না। সম্ভবত নিজেই নিশ্চিত নন। সন্দেহের প্রবল দোলাচলে দুলে চলেছে তার মন। লেখাগুলো পড়ে এমন মনে হয়, আবার পরমুহূর্তে মনে হয় উনার সমস্ত কথাই অসাড়, অযৌক্তিক। প্রলাপে ভরা সব লেখাজোখা।
এরইমাঝে অদ্ভুত শব্দযোগে দুই চারটে লাইনে কবিতার মত কিছু লেখার চেষ্টা। কোনো সুত্র লুকিয়ে আছে কি এখানে। পাইনা। হাজার চেষ্টাতেও আমি অরুনিমা শবনম, ব্যাচের সবচেয়ে উজ্জ্বল ছাত্রী, কিছুই খুঁজে পাইনা। হতাশার চাদর ঘিরে ধরে। আত্মবিশ্বাস কিছুটা মাটিতে লুটোপুটি খায়। তবুও তুলে নেই সযতনে। হার মেনে নেয়ার মেয়ে আমি না, অন্তত অত সহজে না।
ছবিতে দৃষ্টি নিবদ্ধ করি। এখানেই কিছু আছে। এত শত চোখের ছবি কেন? এত অজস্র ভঙ্গিমায় কেন? আমার চোখ ব্যাথা করে, জ্বালা করে, পানির কণা গড়িয়ে পড়ে তবুও তাকিয়েই থাকি। এবং ঠিক চতুর্থ দিন থেকে আমার সমস্যার শুরু হয়। ডায়েরির পাতায় পাতায় আঁকা চোখেরা জীবন্ত হয়ে ওঠে। সেই থেকে শুরু। ভয় পেয়ে ছুঁড়ে ফেলি। দমবন্ধ হয়ে আসা ঘর থেকে ছিটকে বের হয়ে যাই। কিন্তু কুঁচকে ওঠা জোড়া ভ্রু নিয়ে দুটো চোখের তীব্র দৃষ্টি আমায় সারা শহর তাড়া করে বেড়ায়।
৫.
স্বনামধন্য প্রফেসর জামশেদ স্যারের ডায়েরীটা আমার হাতে এসেছিলো সাতদিন আগে। গত তিনদিনে আমার ওজন কমেছে, চোখের নীচে গাঢ় কালি জমেছে। যেই দ্যাখে, আঁতকে ওঠে।
“অরু তোর একি অবস্থা? তুই কি এখনো ডায়েরীটা নিয়ে পড়ে আছিস?”
বাড়ি থেকে ফিরে আসা সোহানা প্রশ্ন করে আমাকে।
“নাহ্। ওটাতে আর নজর বোলাই না।”
আমি সত্যি মিথ্যে মিলিয়ে উত্তর দেই।
“কোথায় ওই অভিশপ্ত ডায়েরী? ফেরত দিয়েছিস সালাম স্যারকে?”
আমি মৃদু স্বরে হ্যাঁ বলি, আমার ডেস্কের ড্রয়ারের দিকে তাকাই। ওখানেই তালাবদ্ধ হয়ে আছে ডায়েরিটা।
“তোর কি রাতে ঘুম হচ্ছেনা? শেষ কবে স্নান করেছিস বলতো? চুলের এমন অবস্থা কেন?”
সোহানা প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে যাচ্ছে, কিন্তু আমার মনোযোগ ওর দিকে নেই। আমি টের পাচ্ছি, তৃতীয় তলায় থাকা আমাদের রুমের পুর্ব দিকের যে জানালাটা আঁধার কালোয় মাখা, সেখান থেকে এক জোড়া চোখ জ্বলজ্বলে দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। এমনকি সোহানা যে কথা বলে চলেছে, ওর পেছনের দেয়ালেও আবছা ভাবে ফুটে উঠছে জোড়া চোখের তীব্র দৃষ্টি। গত তিনটা দিন এক মুহূর্তের জন্যে চোখের পাতা এক করতে পারিনি। সোহানার উপস্থিতির জন্যেই হোক কিংবা ক্লান্তির শেষ সীমানায় পৌছে যাওয়া, আমার চোখে আজ ঘুম নেমে আসছে। সারা শরীরে অসংখ্য চোখের দৃষ্টি মেখে নিয়ে আমি ঘুমের রাজ্যে হারালাম।
তবে খুব বেশী সময়ের জন্যে না, সম্ভবত সামান্য পরেই ধরমড় করে জেগে উঠলাম। ঘরটা পুরো অন্ধকার। সামান্য দুরের দেয়াল ঘেষে সোহানা ওর বিছানায় ঘুমোচ্ছে অঘোরে। কালিগোলা অন্ধকারেও আমি বেশ স্পষ্ট সব দেখতে পাচ্ছি। হঠাৎ কেন ঘুম ভেঙ্গে গেলো, বোঝার চেষ্টা করছি। ঠিক তখুনি দেয়াল ফুঁড়ে লাফ দিয়ে একটা কালো মুর্তি আমার গায়ের উপর এসে চেপে ধরলো। ভয়ে দুই চোখ বন্ধ করে ফেললাম কিন্তু নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হতেই বাধ্য হয়ে চোখ খুললাম। ঠিক ইঞ্চি খানেক উপরে ক্রুর দৃষ্টি মাখা এক জোড়া বাঁকানো চোখ। অঙ্গারের মত জ্বলছে। তপ্ত আভা আমার কপালের চামড়া পুড়িয়ে দিতে চাচ্ছে। এই চোখ আমার পরিচিত, জামশেদ স্যারের ডায়েরীতে এই চোখ জোড়া আমি দেখেছি।
আমি আমার শরীরের উপর থেকে ফেলে দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি নিরন্তর, মনে হচ্ছে কয়েক যুগ ধরে চেপে আছে অশরীরী শরীরটা। কিন্তু জানি, হয়তো মাত্র কয়েক সেকেন্ড পেরিয়েছে। আমার চোখ জোড়া পুড়ে যাচ্ছে ওই ভীষন দৃষ্টিতে, ঠিক এমন সময়ে ওই চোখের একটু পিছনে শুন্যে আর এক জোড়া চোখের উপস্থিতি টের পেলাম আমি। শান্ত, কোমল দীপ্তি ছড়ানো একজোড়া চোখ। আমাকে অভয় দেয়ার চেষ্টা করছে।
সেই দৃষ্টিতে কি এক প্রবল আকুতি! কি যেন বোঝাতে চাচ্ছে, বলতে চাচ্ছে।
অস্ফুট চিৎকারে উঠে বসলাম।। বাইরের স্ট্রীট লাইটের আবছা আলোতে ভেসে যাওয়া ঘরে আমি জেগে উঠলাম। এতোক্ষন তবে সব স্বপ্ন ছিলো! কিন্তু সেই স্বপ্ন ডালাতে দুটো জিনিস সত্যি ছিলো। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত আমার ডেস্কের ড্রয়ারের তালা খুললাম আলগোছে, সোহানার ঘুম যেন ভেঙ্গে না যায়। ডায়েরীর পাতা মেলে ধরলাম চোখের সামনে। হ্যাঁ, যে দুই জোড়া চোখ আমি দেখেছি, ঠিক হুবহু দুটোই আঁকা আছে এখানে।
৬.
সমস্ত মনোযোগ ঢেলে দিলাম দ্বিতীয় চোখের দিকে। মোট তিন জায়গায় এই একই চোখ জোড়া আঁকা আছে। কোমল দৃষ্টি তিনটেতেই শুধু আকৃতিতে অনেক পরিবর্তন। এই কদিন কেন এরা আমার চোখে পড়লোনা, রহস্যটা অবাক করলো আমায়! একটা বুদ্ধি খেলে গেলো মাথায়। ডায়েরীর পাতা থেকে তিনটে চোখ কেচি দিয়ে কেটে নিলাম। পাশাপাশি সাজালাম। নাহ্ কিছু অর্থ দাঁড়ায় না। এবার উপর নীচে, কিছু কি ফুটে উঠছে? একটার উপরে একটা সামান্য ওভারল্যাপ করলাম। আমার স্মৃতিশক্তি প্রখর। আমি নিশ্চিত একটা এলাকার ম্যাপ ফুটে উঠছে। প্রান্তীয় একটা জেলা, কিন্তু অসম্পূর্ণ। এমন তো হওয়ার কথা না। কিছু কি মিস করে যাচ্ছি আমি? হিসেবে ভুল হচ্ছে কোথাও?
প্রথম থেকে শুরু করে প্রত্যেক পাতায় আবার নজর বোলানো শুরু করলাম। একদম শেষের পাতা, যেখানে বাদামী চামড়াটা শক্ত বাধাই করা, সেই পৃষ্ঠায় গিয়ে যা খুঁজছিলাম আমি, পেয়ে গেলাম। এখানেও একটা সেই একই চোখের ছবি আছে তবে খুব হালকা পেন্সিলের স্কেচে আঁকা। তাই প্রথম নজরে চোখে পড়েনা।
এটা কেচি দিয়ে কাটা যাবেনা। ব্লেড দিয়ে চোখের ছবি আকা কাগজটা ছেচে তুলে ফেললাম।
দুটো জিনিস একসাথে বেরিয়ে এলো। কাগজটার নীচে একটা ফটোগ্রাফের সামান্য অংশ দেখা যাচ্ছে। বাঁধানো চামড়ার মাঝে লুকিয়ে রাখা ছিলো।
আর কাটা কাগজটা বাকী তিনটে চোখের সাথে মেলালে একটা সত্যিকারের ম্যাপ তৈরী হয়ে যাচ্ছে।
ওটা রেখে ছবিতে কনসেনট্রেট করলাম। খুব সাবধানে বের করে আনলাম ছবিটা। একটা বেশ বড় পুরোনো আমলের জমিদার বাড়ীর সামনে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। মানুষটাকে খুব চেনা চেনা মনে হচ্ছে, কার সাথে যেন আকারে চেহারায় খুব মিলে যায়, কিন্তু আমি ধরতে পারছিনা।
তবে যা ধরতে পেরে গিয়েছি ইতিমধ্যে আপাতত তাতেই সই আমি। রহস্য সমাধানে আমাকে এই বাড়ীটাতে যেতে হবে এবং জমিদার বাড়ীটা যে একটু আগে আবিস্কার করা ম্যাপে দেখানো সীমান্তবর্তী জেলাতে, তা বুঝতে গেলে খুব বেশী বুদ্ধিমতী হতে হয়না।
ছবির মানুষটার দিকে তাকিয়ে রইলাম এই আঁধারেও,
আস্তে করে বললাম,
“আসছি আমি, অপেক্ষায় থেকো।”