চিঠির ভেতরে কাঁদে যে মানুষটা

প্রতিদিন সকালে গ্রামের পুরনো পাকা রাস্তা দিয়ে একটা সাইকেল ধীরে ধীরে চলে যায়। তার গায়ে কালচে পাঞ্জাবি, চোখে ঘোলা চশমা, পিঠে ধূসর এক খালি ব্যাগ। তিনি রফিক সাহেব, এক সময়ের ডাক পিয়ন। এখন আর সরকারি চাকরি করেন না, অবসর নিয়েছেন বহু বছর আগে। তবু তিনি প্রতিদিন সকাল ন’টার দিকে নিজের পুরনো অফিসের পাশ দিয়ে সাইকেল চালিয়ে গ্রামের পথে নামেন। কারও হাতে কিছু দেন না, কিছু নেনও না। কেবল যান, ফিরে আসেন।
তাকে দেখে শিশুরা চিৎকার করে
“রফিক চাচা, চিঠি আনলেন?”
তিনি মৃদু হাসেন, ব্যাগে হাত ঢোকান, ফাঁকা হাতে বের করেন। মৃদু হেসে জবাব দেন,
“আজকের চিঠিটা হারিয়ে গেছে বোধহয়।”
লোকজন ভাবে, পাগল হয়ে গেছেন। কেউ করুণা করে, কেউ মুখ ঘুরিয়ে যায়। কেবল ১৪ বছরের জাহিদ, একজন কিশোর। বিশ্বাস করে এই চাচার ভেতরে কিছু একটা আছে, যা বোঝা যায় না, কেবল অনুভব করা যায়। তার চোখের দিকে তাকালে মনে হয়, সেই চোখে যেন এক সমুদ্র জমে আছে। শব্দহীন, শান্ত, অথচ গভীর।
********
রফিক সাহেব রাতে লিখে যান চিঠি। নিজের জন্য। নিজের হাতেই নিজের নাম লিখে খামে ভরেন।
প্রেরক: রফিকুল ইসলাম
প্রাপক: রফিকুল ইসলাম
চিঠির ভাষা কাঁপা হাতে লেখা,
“আজকে তুমি বাজারে গিয়েছিলে, কিন্তু মাছ না পেয়ে ফিরে এসেছ। তোমার মনের মধ্যে একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছে যা আমি বুঝি, কিন্তু তোমার স্ত্রী বোধহয় বোঝত না।”
এই চিঠিগুলো তিনি নিজেই ডাকবাক্সে ফেলেন, তারপর পরদিন নিজেই গ্রহণ করেন। নিজের পুরনো ঘরের জানালার পাশে বসে চিঠি খুলে পড়েন, চোখে জল আসে। জানালার পাশেই বসে থাকে একটা পুরনো পাথরের ফুলদানি, যেখানে শুকনো ফুলগুলো ধুলো জমে পড়ে থাকে, ঠিক যেমন জমে থাকে স্মৃতির স্তর।
জাহিদ একদিন প্রশ্ন করেছিল,
“চাচা, নিজের কাছে নিজে চিঠি লিখেন কেন?”
তিনি বলেছিলেন,
“কাউকে কিছু বললে সেটা হারিয়ে যায়, কিন্তু লিখলে থেকে যায়। আমি যদি হারিয়ে যাই, চিঠিগুলো যেন থেকে যায়।”
********
স্ত্রী মারা গেছেন প্রায় একযুগ আগে। একমাত্র সন্তান, তানভীর। মালয়েশিয়ায় গিয়ে বিয়ে করে ফেলেছে, বছর দশেক হল কোনো চিঠি বা ফোন নেই। মা মারা যাওয়ার খবরও জানে না। রফিক সাহেব প্রথম দিকে অপেক্ষা করতেন। তারপর বিরক্ত হতেন। পরে অভিমান করতেন। এখন আর কিছুই করেন না। কেবল চিঠি লেখেন।
এক সময়ের চঞ্চল ডাক পিয়ন আজ নিজেই চিঠির অপেক্ষায়, অথচ জানেন—কোনো চিঠি আর আসবে না। যে ছেলে একদিন স্কুল থেকে ফিরে বলত, “আব্বা, আমার জন্য চিঠি আছে?” সেই ছেলেই আজ বাবার খোঁজ রাখে না।
“তুমি যদি কখনো ফিরে আসো, এই চিঠিগুলো পড়বে। বুঝবে আমি শুধু তোমার চিঠি আসার অপেক্ষায় ছিলাম না, তোমার ফিরে আসার অপেক্ষায়ও ছিলাম।”
*********
শীতকালের এক সন্ধ্যা। জানালার ওপাশে কুয়াশা জমে। রফিক সাহেব একা বসে আছেন। আলনা থেকে পুরোনো শাড়িখানা নামিয়ে কোলে রাখেন। স্ত্রীর গন্ধ মিশে আছে কি না, বোঝার চেষ্টা করেন।
একেকটা চিঠি যেন একটা দিন, একটা মুহূর্ত যা তিনি ফিরে পেতে চান, কিন্তু পারেন না। তার চিঠিগুলোয় স্ত্রীর জন্য লেখা, ছেলের জন্য, এমনকি নিজের সেই পুরোনো ছায়ার জন্য, যে ছায়া এখন আর আয়নায় ধরা পড়ে না।
তিনি লিখেন:
“আজ দুপুরে হঠাৎ খুব কাঁদতে ইচ্ছে করল। কিন্তু কান্না যদি শুনে ফেলে কেউ, তাহলে ভাববে আমি পাগল। তাই চোখের জল টুপটাপ গাল বেয়ে নেমে গেল, শব্দহীন।”
একবার তিনি লিখেছিলেন, “মালতী, তুমি চলে যাওয়ার পর আমি যতটা নিঃসঙ্গ হয়েছি, তা কেবল রাতের তারাগুলো জানে। ঘুম আসেনা। শুধু শুনি ঘড়ির কাঁটার শব্দ, বুকের মধ্যে একরাশ হাহাকার।”
*******
একদিন সকালবেলা সাইকেলটা আর বের হয় না। জাহিদ অপেক্ষা করে, দুপুর গড়িয়ে যায়। বিকেলে সে সাহস করে পুরনো সেই কুঁড়েঘরে যায়। দরজা খোলা, বাতাসে ধুলোর গন্ধ। চেয়ারে বসে আছেন রফিক চাচা। চোখ বন্ধ, ঠোঁটে অল্প হাসি। বুক ওঠানামা করছে না।
হাতের মুঠোয় ধরা একটা খাম। জাহিদ ধীরে ধীরে তা খুলে পড়ে:
“আজ আমি আর কোথাও যাইনি। চিঠির ব্যাগটা খালি রেখে দিয়েছি। তোমার মা হয়তো বলত, ‘আজ এত চুপচাপ কেন?’
আসলে আমি ক্লান্ত, বোধহয় চিঠি লিখে লিখে নিজেরই ভেতরটা ফাঁকা করে ফেলেছি। তুমি যদি আসো, আমাকে খুঁজে পাবে না। কিন্তু আমার চিঠিগুলো পাবে। সেগুলোতে আমি বেঁচে থাকব। চিঠির ভিতরে কাঁদে যে মানুষটা, সে এখন চুপ করে তোমার অপেক্ষায় বসে আছে। শেষবারের মতো।”
*******
জাহিদ চিঠিগুলো একত্র করে রেখে দেয়। কিছুদিন পর শহর থেকে একজন সাংবাদিক আসে, গল্প শুনে যায়। লোকেরা কাঁদে, অবাক হয়, ভাবেন একজন মানুষ কেমন করে এত নিঃসঙ্গ হতে পারে, অথচ এত নরম, এত কোমল থাকে?
কয়েক মাস পর, “চিঠির ভিতরে কাঁদে যে মানুষটা” শিরোনামে একটি বই প্রকাশিত হয়। লেখক রফিকুল ইসলাম। পাঠক জানেন না, লেখক নিজের কাছেই লিখেছিলেন। আর চিঠিগুলোর ভেতরে আজও কাঁদে এক নিঃসঙ্গ পিতা, যার অপেক্ষা শেষ হয়নি। শুধু রূপ বদলেছে। বাতাসে ভেসে বেড়ায় তার শেষ নিঃশ্বাসের শব্দ, জানালার ধারে এখনো পড়ে থাকে শীতের বিকেলে লেখা শেষ চিঠিটা।

Be the first to write a review

Leave a Reply

We’re sorry you’ve had a bad experience. Before you post your review, feel free to contact us, so we can help resolve your issue.

Post Review

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক গল্প