এই কথাটা মাথার ভিতর বারবার বাজছিল। যেন আমার কানেই আটকে গেছে।
আমি বসে আছি আমাদের পুরনো সেই বারান্দায়। চারপাশ নিস্তব্ধ।
একটা সময় ছিল এই বারান্দা ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা।
এখন এখানে বসলে মনে হয়, আমি শুধু একটা বোঝা।
আমার নাম আরফা।
মা ছিলেন এই বাড়ির গৃহকর্মী।
তবে আমার শাশুড়ি মানে আরিয়ানের মা—তিনিই ছিলেন আমার জীবনের প্রথম আশ্রয়।
আমার বাবা-মা কেউই নেই আর।
মা এই বাড়িতে কাজ করতেন আর আমাকে নিয়ে আসতেন।
ছোটবেলা থেকেই এই বাড়িতেই বড় হয়েছি।
তবে বড় হয়েছি একজন ‘কাজের মেয়ে’ হয়ে নয়, বরং শাশুড়ির ‘মেয়ে’ হয়ে।
তিনি আমাকে নিজের সন্তানের মতো দেখতেন।
আরিয়ান তখনও বুঝত না, এই মেয়েটা একদিন তার জীবনের ছায়া হয়ে উঠবে।
আরিয়ান ছিল তার একমাত্র সন্তান।
বাবা ছিল না, তাই মা তাকে মাথার মণির মতো করে গড়ে তুলেছিলেন।
অহংকারী, সুন্দর, স্মার্ট, কিন্তু একেবারে শীতল।
আমি যতবারই তাকে দেখেছি, সে আমার দিকে তাকিয়ে তাকেই বলেছে,
এই কাজের মেয়ে এখানে কি করছে?
আমার মা বারবার বোঝাতো, ওই বাড়ির ছেলে, দূরে থাক, বেশি কিছু আশা কইরো না।
কিন্তু মানুষ তো চায়…
চাওয়া তো থামে না…
আমার মা একদিন অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
ঘন ঘন জ্বর, দুর্বলতা।
চিকিৎসা করানোর মতো অর্থ কোথায়?
তখনই আমার জীবনের দ্বিতীয় আশ্রয় তৈরি হয়—আরিয়ানের মা।
তিনি মাকে নিজের দায়িত্বে হাসপাতালে ভর্তি করেন, পাশে দাঁড়ান…
আর ঠিক সেই সময়, আমার মায়ের চোখে জল।
তিনি আমার হাত ধরে বলেছিলেন, আমি তোকে ফেলে যাচ্ছি রে আরফা… আমার পরে তোর কেউ থাকবে না।
আমি কাঁদছিলাম, ফুঁপিয়ে বলেছিলাম, তুমি এমন বলো না মা। তুমি ছাড়া আমি কিছু না।
আর ঠিক সেই সময়, শাশুড়ি মা আমার কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন,
তোকে আমি আমার ছেলের বউ করে ঘরে তুলবো। তুই আমার মেয়ের চেয়েও আপন।
তখন আমি জানতাম না, এই প্রতিশ্রুতি একদিন হয়ে উঠবে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ।
আমার মায়ের মৃত্যুর পর আমি নিঃশব্দ হয়ে গিয়েছিলাম।
শুধু শাশুড়ি মা’র কাঁধেই মাথা রেখে হালকা করে বলেছিলাম,
আমি এখন কই যামো মা?
তিনি তখন শক্তভাবে আমার কাঁধ জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন,
তুই কোথাও যাবি না আরফা। এই বাড়িই তোর ঘর। তুই আমার ছেলের বউ হবি।
সেই রাতে আরিয়ান বাড়ি ফিরেছিল।
তার চোখে বিরক্তি, ঠোঁটে তীব্র অবহেলা।
মা, প্লিজ! আমার জীবনে ওরকম একটা মেয়েকে ঠেলে দিও না। ও একটা কাজের মেয়ে ছিল!
তুই শুধু বাইরের পরিচয় দেখিস আরিয়ান। আমি কিন্তু ওর ভিতরটা দেখেছি। এই মেয়ে তোর জীবন পাল্টে দেবে, একদিন বুঝবি।
আরিয়ান কিছুই বুঝতে চায়নি।
সে তখন প্রেমে ডুবে শহরের নামী বিজনেসম্যানের মেয়ে সারিকার সাথে।
সারিকা ছিল সুন্দরী, দামি, উচ্চাকাঙ্ক্ষী।
আর আমি ছিলাম অনাথ, সাধারণ, আর ‘কাজের মেয়ের মেয়ে’।
বিয়েটা হলো হুট করেই।
এক সকালে আরিয়ানকে জোর করে বসিয়ে, মন্ত্র পড়ানো হলো, আর আমি তার পাশে বসে রইলাম নিঃশব্দে।
সে আমাকে একবারও তাকিয়ে দেখেনি।
আমি দেখছিলাম—এই ছেলেটাকে, যাকে একসময় অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখতাম, আজ তার চোখে আমি শুধুই ঘৃণা।
বিয়ের পরের দিন…
আমি একটা কোণার ঘরে বসে কাঁদছিলাম।
আরিয়ান দরজায় এসে দাঁড়িয়ে বলল,
এই নাটক আর চালাতে হবে না। এই বিয়ে আমার জন্য কিছুই না। আমি তোকে কোনোদিন স্বীকৃতি দেব না।
আমি কিছু বলিনি।
শুধু মনে মনে বললাম,
তুমি না দিলেও একদিন নিজেই চাইবে এই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে। আমি তখন ফিরেও তাকাব না।
বিয়ের পর তিনদিন পেরিয়ে গেল।
ঘরটা ছিল আমার, কিন্তু ঘরের মানুষটা যেন বহিরাগত।
আরিয়ান বাড়িতে থাকত না প্রায়, আর এলেও আমার দিকে তাকিয়ে একটা কথাও বলত না।
এক সন্ধ্যায় রান্নাঘরের কোণে বসে শাশুড়ি মা’র জন্য স্যুপ বানাচ্ছিলাম।
মা তখন হঠাৎ হেঁটে এসে বললেন,
আরফা, ওর মনটা বুঝে নিতে হবে মা। ছেলে তো, রাগ তো থাকবেই। কিন্তু তুই যদি সয়ে যেতে পারিস, দেখবি একদিন ভালোবাসতে শিখে যাবে।
আমি মৃদু হেসে বললাম,
মা, ভালোবাসা কি চেয়ে পাওয়া যায়?
তিনি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে শুধু বললেন,
তুই থাক, আমি ওকে বুঝাবো…
সেই রাতে ঘরে আরিয়ান ফিরল গভীর রাতে।
তার চোখ লাল, চেহারায় ক্লান্তি। আমি চুপচাপ পানি এগিয়ে দিলাম।
সে আমার হাত থেকে গ্লাসটা ছুঁড়ে ফেলে দিল।
তুমি আমার কিছু নও! আমাকে সারিকার থেকে কেড়ে নিতে চেয়ো না।
আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম।
সে চলে গেল, দরজাটা ধাক্কা মেরে বন্ধ করে।
পরদিন সকালে…
শাশুড়ি মায়ের হঠাৎ জ্বর।
চোখে অদ্ভুত ঘোর। ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম। রিপোর্ট দেখে বোঝা গেল
ক্যানসার!
আমি থমকে গেলাম।
তাঁর মুখে যেন তখন শুধু আমার ভবিষ্যতের চিন্তা
আরফা, আমার তো বেশিদিন নেই। তুই তো আমার মেয়ের মতো, আমি কথা দিলাম—এই বাড়িতে তুই থাকবি, যাই হোক না কেন।
আমি কাঁদছিলাম, কিন্তু কিছু বলিনি।
ওই রাতেই বুঝলাম, এই সংসারে আমার একমাত্র আপন এই মানুষটাই।
কয়েকদিন পর…
আরিয়ান বাড়ি ফিরল।
তার পাশে তখন সারিকা।
হাসি মুখে বলল,
আন্টি, আমি আর আরিয়ান এখন খুব সিরিয়াস। আমরা এনগেজমেন্ট প্ল্যান করছি।
শাশুড়ি মা কিছু বললেন না, শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন।
আর আমি বুঝে গেলাম
তাঁর মৃত্যু আসন্ন, আর আমার জীবনের ঝড় এখনো বাকি।
সারিকা প্রতিনিয়ত বাড়িতে এসে আমার দিকে কুৎসিত কথা ছুঁড়ে দিত।
আর আরিয়ান? সে যেন আরও বেশি নিষ্ঠুর হয়ে উঠছিল।
তার চোখে আমি ছিলাম শুধুই একটা ভুল।
মা, প্লিজ… তুমি আমাকে ছেড়ে যেতে পারো না!
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা আমার শাশুড়ি মা আর চোখ খোলেন না।
সাদা শাড়ি, সাদা বিছানা, চারপাশে ওষুধের গন্ধ আর নিস্তব্ধতা…
চোখের কোণে শুকিয়ে যাওয়া অশ্রু নিয়ে মা শেষবার আমার হাত ধরে বলেছিলেন,
আরফা, তুই যদি থাকিস না, তাহলে এই ছেলেটা একেবারে শেষ হয়ে যাবে… ওকে ছেড়ে যাস না মা। ওর যত রাগই থাক, তুই সয়ে নিস, কিন্তু ওর ছায়া হবি।
আমি কিছু বলিনি, শুধু মাথা নাড়লাম।
মা আমার মুখে হাত রাখলেন, তারপর নিঃশব্দে সব থেমে গেল…
কয়েকদিন পর… জানাজার দিন
সবাই ব্যস্ত, আমি চুপচাপ পেছনে দাঁড়িয়ে।
আরিয়ান এগিয়ে গিয়ে শেষবারের মতো মায়ের মুখে হাত রাখল, কিন্তু চোখে জল নেই।
আমি ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলাম।
আমার কান তখনো ঘুরে ফিরে শুনছিল—
তুই ওর ছায়া হবি…
১০ দিন পেরোতেই…
এক দুপুরে আরিয়ান আমাকে ডেকে বলল,
চল, সাইন করো।
আমি অবাক,
কোন সাইন?
ডিভোর্স পেপার। তুমি আমার জীবনে একটা ভুল ছিলে আর ভুল কেউ বেশিদিন ধরে রাখে না।
আমি তার চোখের দিকে তাকালাম, সেখানে ছিল না একটুও দয়া।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
তুমি কি জানো, তোমার মা আমাকে কিসের দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছেন?
তোমার দায়িত্ব ছিল মায়ের সময় পর্যন্ত। এখন তুমি কারও না। আরফা, তুমি কখনো আমার স্ত্রীর যোগ্য ছিলে না।
আমি কলম হাতে নিলাম, কিন্তু সই করিনি।
—“আমি এখান থেকে যাব না। এই বাড়ি এখনো তোমার মায়ের বাড়ি। যতদিন মাথা গোঁজার জায়গা না পাই, ততদিন এখানেই থাকবো।
আরিয়ান হেসে উঠে বলল,
তাহলে তুমি আরেকটা কাজের মেয়ে হয়ে থাকবে আমার বাড়িতে!
আমি মাথা নিচু করে চলে এলাম।
নিজেকে শক্ত করলাম।
মনে মনে বললাম,
হ্যাঁ, আমি এই বাড়ির কাজের মেয়ে হয়ে থাকবো… যতদিন না আমি এমন কিছু হয়ে উঠি, যাকে দেখে তুমি নিজেই মাথা নিচু করবে!
একই ছাদের নিচে…
ডিভোর্স হয়ে গেছে।
তবুও একই ছাদের নিচে আমি আর আরিয়ান।
সারিকা এখন ঘরে ঘুরে বেড়ায় আর আমাকে দেখলেই কুৎসিত মন্তব্য ছুঁড়ে দেয়
তুমি তো আর এখন বউ না, শুধুই গৃহকর্মী। ওটাই ভালো তোমার জন্য!
আমি মুখ নিচু করে থাকি।
কিন্তু চোখে আগুন জ্বলে।
আমার মা মারা যাওয়ার সময় বলেছিল—
তুই কাউকে ছোট দেখিস না, আর কাউকে ভয়ও করিস না…