সব_হারিয়ে_যদি_পাই_তোমায় পর্ব০২

রাত তখন তিনটা। সবাই ঘুমিয়ে, পুরো বাড়িতে নিস্তব্ধতা।
আমি রান্নাঘরে বসে আছি, একটা পুরনো ডায়েরি খুলে। মা মারা যাওয়ার আগে তার শেষ চিঠিগুলোর একটা এটা।
আরফা, মানুষ যেটুকু পায়, সেটা তার ভাগ্য নয় — সে যা কাড়ে, সেটাই তার প্রাপ্য। তুই কাড়িস, কেউ কিছু দিয়ে যাবে না।
মায়ের চিঠি পড়ে চোখ ভিজে উঠল, কিন্তু মন শক্ত করে ফেললাম।
আমি এবার কিছু করবো। নিজের জন্য, মায়ের জন্য…
আর সবচেয়ে বড় কথা, নিজেকে প্রমাণ করার জন্য।
পরদিন সকাল
রান্না-বান্না শেষ করে নিজের ছোট ঘরে ঢুকে পড়লাম। হাতে একটা ফর্ম
একটা এনজিওর স্কলারশিপ ফর্ম।
তারা অবহেলিত মেয়েদের পড়াশোনার দায়িত্ব নেয়, আমি রাত জেগে ফর্ম পূরণ করেছিলাম।
আরিয়ান যেন আমার সবকিছুতেই বাধা।
সেদিন দুপুরে সে আমার ফর্মটা দেখে ফেলল।
এইটা কী?
আমি চুপ।
তুমি কি মনে করো, আমি তোমাকে চাকরি করতে দিবো? তুমি আমার বাড়িতে থাকবে, খাবে, তারপর বাইরে গিয়ে লোক দেখাবে তুমি কি কেউ? না আরফা, তুমি কেউ না।
আমি চোখে চোখ রাখলাম, এই প্রথম…
আমি কাউকে দেখাতে চাই না। আমি নিজেকে প্রমাণ করতে চাই। আমাকে থামানোর শক্তি তোমার নেই।
আরিয়ান ধাক্কা দিয়ে ফর্ম ছিঁড়ে ফেললো।
কিন্তু আমি আবার সেদিন রাতেই নতুন ফর্ম নামিয়ে ফেললাম।
আমি থামবো না।
নতুন দিন, নতুন লড়াই
দিনে দিন, সারিকার গলা বড় হয়, আর আমার সহ্যশক্তি পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়।
কিন্তু একদিন একটা সুযোগ আসে।
একটা স্থানীয় স্কুলে আয়া পদের চাকরি খালি।
সকাল ৬টা থেকে ৯টা।
সেই সময়টায় আমি রান্না শেষ করেই যেতাম, কেউ টের পায় না।
চাকরিটা পেয়ে গেলাম!
ধরা পরে গেলাম
তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেল। আরিয়ান কিছু বুঝতে পারল না।
কিন্তু একদিন দুপুরে স্কুলের গেটের সামনে ওর গাড়ি দাঁড়ানো—
আমাকে দেখতে পেল।
তুমি কি করে সাহস পাও এমনটা করতে?
সাহস নয়, প্রয়োজন। পেট চালাতে, স্বপ্ন বাঁচাতে, আর চোখে আগুন রাখতে।
সে কিছু বলল না, চোখে শুধু ঘৃণা।
আর আমি প্রথমবার কোনো ভয় পেলাম না।
আরফার ভিতরে শক্তি জন্মাচ্ছে
রাতে ফিরে নিজের ছোট্ট আয়নায় তাকিয়ে বললাম—
আরফা, তুই শুরু করেছিস। তুই থামবি না।
ভোর ৫টা।
চোখ খুলতেই চারপাশে কেমন যেন একটা প্রশান্তি।
রাতের অন্ধকারে কাঁদা মুছে গিয়ে, যেন একটা নতুন সকাল আসছে আমার জীবনে।
চুপিচুপি রান্না ঘর থেকে কাজ সেরে বের হলাম।
আজ আমার স্কুলে তৃতীয় দিন।
প্রথম চাকরি—যদিও তা ছোট্ট একটা আয়ার পদ,
তবুও এটা আমার “স্বাধীনতার শুরু।
স্কুলে আরফা
স্কুলে বাচ্চাদের হাসিমুখ দেখতে দেখতে মনটা একেবারে ভরে গেল।
একটা ছোট্ট মেয়ে, নাম মায়া।
প্রতিদিন দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে।
আপু, আপনি না থাকলে আমি আর স্কুলে আসতাম না!
কেন রে?
আপনি আমার চুলে ফুল বেঁধে দেন না?
ওর হাসি দেখে আমি ভুলে যাই আমার নিজের কান্না।
নতুন একজন আশীর্বাদ
স্কুলে একজন শিক্ষিকা আছেন, নাম রুবিনা ম্যাম।
একদিন আমাকে ডেকে বললেন—
তোমার চেহারায় আত্মবিশ্বাস দেখছি। তুমি যদি চাও, আমি তোমাকে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়িয়ে দিতে পারি। ফ্রি তে।
আমার চোখ ছলছল করে উঠলো।
আপু, আমি চাই… আমি খুব চাই পড়তে…
সেদিনই স্কুল শেষে রুবিনা ম্যামের কাছ থেকে একটা খাতা আর কলম পেলাম।
আর সেই রাতে…
একটি খাতা, একটি প্রতিজ্ঞা
ঘরে ফিরে খোলামেলা বিছানায় বসে ডায়েরি খুললাম।
প্রথম পাতায় লিখলাম—
এই খাতায় আমি প্রতিদিন লিখবো, আমি কে হই।
আমি একদিন নিজেকে প্রমাণ করবো।
একদিন এই আরফা নামটা শহরের সব চেয়ে উঁচু সাইনবোর্ডে জ্বলবে।
অন্যদিকে…
আরিয়ান বসে আছে সারিকার সঙ্গে।
তুমি জানো ও মেয়ে সকালবেলায় কোথায় যায়?
আমি খোঁজ নিয়েছি। একটা স্কুলে চাকরি নেয়!
আমার বাড়িতে থাকবে, আর আমার ইচ্ছার বাইরে কিছু করবে? অসম্ভব!
সারিকা বলল, তুমি ওকে থামাও, না হলে একদিন ও তোমার মাথার ওপর উঠে যাবে।
আরিয়ান রেগে গিয়ে বলল—
আরফা কখনোই কিছু হতে পারবে না। আমি সেটা নিশ্চিত করবো।
শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন
রাতের বেলা বাড়ি ফিরে দেখি রান্নায় লবণ কম হয়েছে।
সারিকা থালায় খাবার ছুড়ে দিল।
আরিয়ান বলল,
তোমার চাকরি করার প্রয়োজন নেই। বরং বাড়িতে রান্না ঠিকভাবে শিখো।
আমি মাথা নিচু করে চুপ করে থাকলাম।
কিন্তু ভেতরে আগুন জ্বলছে।
এই অপমানগুলোই একদিন আমার শক্তি হবে।
স্কুলজীবনের নতুন এক সকাল
আরফা, আজ তুমি আসবে তো? – মায়ার মুখে সেই চিরচেনা জিজ্ঞাসা।
আমি হেসে মাথা নাড়ি,
আমি না আসলে তোমার চুলে বেণি কে বাঁধবে বলো তো?
বাচ্চাদের মাঝে আমার একটা জায়গা তৈরি হয়ে গেছে।
ওদের হাসি, কৌতূহল, সেই ছোট ছোট দৌড়ঝাঁপ, আমাকে বাঁচিয়ে রাখে।
রুবিনা ম্যামের পরামর্শ
রুবিনা ম্যাম একদিন বইয়ের ব্যাগ খুলে একটা ব্রোশার বের করলেন।
আরফা, শহরের একটা এনজিও আছে। দরিদ্র মেয়েদের জন্য একটা স্কলারশিপ দিয়েছে। চাইলে তুইও আবেদন করতে পারিস।
আমি থমকে গেলাম। বুকের মধ্যে কেমন যেন রক্তের গতি বেড়ে গেল।
আমি কি পারবো?
তুই যদি না পারিস, তাহলে কেউই পারবে না।
আমার চোখে জল চলে এলো। কারো বিশ্বাস যখন ভেতর থেকে আসে, তখন নিজের উপরও বিশ্বাস জন্মায়।
বাসায় ফিরে লড়াই
তুমি কোথায় ছিলে? আরিয়ান দরজা খুলেই মুখের ওপর প্রশ্ন ছুড়ে দিল।
স্কুলে…
স্কুল? আবার?
সারিকা হেসে বলল,
আমার তো মনে হয়, এই মেয়েটার ঘর আর কাজ ছেড়ে বাইরের জগতে পা ফেলার খুব শখ হয়েছে!
আরিয়ান থেমে থাকলো না।
আমার ব্যাগ টান দিয়ে খুলে ফেললো। ভিতর থেকে রেজাল্ট শিট আর ব্রোশার বেরিয়ে পড়ল।
এইসব কাগজ কোথায় পেয়েছো?
আমি…
তুমি এখন পড়াশোনা করবে? তুমিই হবে ‘আরফা ম্যাডাম? নাকি ‘আরফা মালিক?
তার চোখে বিদ্রুপ, ঠোঁটে বিষ।
কিন্তু আমি এবার মাথা নিচু করিনি।
হ্যাঁ, আমি একদিন হবো… কেউ না কেউ হবো।
মধ্যরাতে খোলা জানালা
সারিকা আর আরিয়ান ঘুমিয়ে পড়েছে।
আমি জানালার ধারে বসে আছি। চাঁদের আলো পড়ে আমার খাতায়।
সেই খাতার এক পৃষ্ঠায় লিখলাম—
আমি যতটা অপমানিত হই, ততবার ফিরে আসার প্রতিজ্ঞা করি।
আমি একদিন এমন জায়গায় থাকবো, যেখানে আমার অপমান হবে না, বরং সম্মান হবে আমার নাম শুনে।
স্কলারশিপের জন্য আবেদন
পরদিন সকালে আমি চুপচাপ স্কলারশিপ ফর্মটা পূরণ করি।
একটা চিঠি লিখি নিজের সম্পর্কে।
রুবিনা ম্যামের সাহায্যে তা ডাকপটে পাঠিয়ে দিই।
প্রথমবারের মতো মনে হলো…
আমি হেরে যাচ্ছি না, লড়ছি।
সকালটা বড্ড অস্থির
সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখি রান্নাঘরে চিৎকার চলছে।
সারিকা মুখে কড়তাল দিয়ে বলছে—
আরেফা, তুই বই নিয়ে পড়ে থাকিস। আমি বুঝি চাকরানী নাকি? খাবার দিবে কে?
আমি চুপচাপ রান্নায় হাত লাগাই। তবু রেহাই পাই না।
আরিয়ান দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বলে—
এই মেয়ে চাকরির ভাব নিচ্ছে! তুমি কি ভাবো সত্যি সত্যি তুমি কিছু একটা হতে পারবে?
চোখে চোখ রেখে বলি, — হ্যাঁ, পারবো।
এই কথাটা বলার পর নিজের বুকেও সাহসের ঢেউ টের পাই।
এক চিঠির আগমন
দুপুরে রান্না শেষ করে উঠতেই দেখলাম পোস্টম্যান এসে দাঁড়িয়ে আছে।
হাতে একটা খাম।
আরফা আক্তার?
আমি অবাক।
এই নামটা এ বাড়িতে কেউ কখনো ডাকেনি।
আমি ধীরে খামটা হাতে নিই।
চিঠির ওপরে লেখা —শিক্ষা সহায়তা তহবিল, শহর উন্নয়ন বোর্ড।
হাত কাঁপছে।
চিঠি খুলে পড়ি—
আপনার আবেদন বিবেচনায় গৃহীত হয়েছে। আপনার বৃত্তি অনুমোদিত হয়েছে। প্রতি মাসে আপনাকে নির্দিষ্ট ভাতার অর্থ পাঠানো হবে এবং একটি বেসরকারি কলেজে ভর্তি নিশ্চিত করা হয়েছে।
আমার মুখে হালকা কান্না-হাসি।
আমি সুযোগ পেয়েছি। আমি সুযোগ পেয়েছি!
কিন্তু খুশি টিকলো না
সারিকা চিঠিটা কেড়ে নিল।
এইসব বাজে কাগজ কোথা থেকে আনিস তুই? চাকরানী হয়ে স্কুলে যাবে? এই বাড়ির সুনাম নষ্ট করবি?
আরিয়ান সেই চিঠি ছিঁড়ে ফেলতে গিয়েছিল।
কিন্তু আমি তখন সামনে দাঁড়িয়ে বলি—
তুমি আমার কিছু নিতে পারো না আর। আমি ভেঙে গেছি, কিন্তু শেষ হইনি।
রুবিনা ম্যামের বিপদ
পরদিন স্কুলে গিয়ে শুনলাম, রুবিনা ম্যাম হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি।
মাথার ভেতর চিনচিন করে ব্যথা।
যিনি আমাকে গড়ে তুলছিলেন, তিনিই এখন হাসপাতালে।
আমি স্কুল ছুটির পর ছোটাছুটি করে হাসপাতালে যাই।
রুবিনা ম্যামের চোখে তখনো দৃষ্টি নেই, কিন্তু হাত আমার হাত চেপে ধরেন।
তুই পেছনে ফিরিস না, আরফা। আমি জানি, তুই পারবি।
রাতে বাড়িতে যুদ্ধ
সারিকা আজ আর মিথ্যে মুখোশ পরে থাকেনি।
আমার বইখাতা পুড়িয়ে দিতে চাইল।
আরিয়ান দাঁড়িয়ে রইল নিরব দর্শক হয়ে।
তখন প্রথমবার আমি চিৎকার করি—
এই বাড়িতে আমি কেউ না, তবু আমি এখানেই থাকবো।
তোমাদের অপমানের মাঝে দাঁড়িয়ে আমি প্রমাণ করবো, আরফা শুধু একটা চাকরানী না— একটা নাম হবে একদিন!
রাতের আকাশে আলোর রেখা
বিছানায় শুয়ে আছি।
চোখে জল নেই। শুধু প্রতিজ্ঞা।
আমি পড়ে থাকবো না, আমি উঠে দাঁড়াবো।
একটা চিঠি আমাকে ভেঙে দেয়নি।
আরেকটা চিঠি আমাকে বাঁচিয়ে তুলেছে।

Be the first to write a review

Leave a Reply

We’re sorry you’ve had a bad experience. Before you post your review, feel free to contact us, so we can help resolve your issue.

Post Review

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক গল্প