সব_হারিয়ে_যদি_পাই_তোমায় (৫)

আরফা ঘুম থেকে উঠে দেখে বাড়ির সামনে একটা লম্বা কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে।গাড়ি থেকে নেমে একজন পরিচিত মুখ, নাহিদা রহমান।কিন্তু আজ তার চোখে ভয়ের ছাপ।
আরফা… আমাদের সাথে বড় একটা গেম হয়েছে। আমাদের ইনভেস্টমেন্টের ফাইলস কেউ চুরি করেছে। আর তোর অফিস থেকেই!আরফার মুখ থমথমে হয়ে যায়।
মানে?
মানে… আমি নিশ্চিত না, কিন্তু সিসিটিভিতে একজনকে দেখা গেছে — দেখতে অনেকটা আরিয়ানের মতো।
আরফা তাৎক্ষণিক অফিসে যায়।সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট দেখা যায়, একজন ছায়ামূর্তির মতো মানুষ রাতের আঁধারে কম্পিউটার ঘাঁটছে।হাইট, মুভমেন্ট — সব মিলিয়ে সন্দেহ পড়ে আরিয়ানের উপর।
আরফা তাকে ডেকে পাঠায়।তুমি কি অফিসের ডেটা চুরি করেছো?আরিয়ান আঁতকে উঠে —না! প্লিজ আরফা, আমি এমন কিছু করি নাই। আমি তো সবেমাত্র নিজেকে গুছিয়ে নিতে শুরু করেছি।আরফা তাকে সন্দেহ করলেও, ভেতরে একটা দ্বিধা কাজ করে।
সন্ধ্যায় আরফা বাড়ি ফিরতে ফিরতে পায় —
একটা এনোনিমাস ইমেইল।Subject: “It’s not Ariaan. Trust your gut.”
Attachment: এক টুকরো ভিডিও ক্লিপ, যেখানে দেখা যায়
একজন অফিস অ্যাসিস্ট্যান্ট (নাম মেহেদী) মূলত USB নিয়ে ফাইল কপি করছে।
আরিয়ান নির্দোষ।আরফার চোখ ভিজে ওঠে,
আমি কী করে ভাবলাম, সে আবার এমন করবে?
পরদিন সকালে আরফা কফির কাপ হাতে আরিয়ানের ডেস্কে আসে।আমি… আমি ভুল করেছি। তোমাকে সন্দেহ করার কোনো অধিকার আমার নেই। আমি… দুঃখিত।
আরিয়ান চুপচাপ তাকিয়ে থাকে।তুমি এখন যেই জায়গায় আছো, আমার সেখানে যাওয়ার সাহস নেই, আরফা। তুমি এখন আলাদা লিগে। আমি শুধু এখানে কাজ করবো, এটাই চাই।আরফার চোখে এক ঝলক কষ্ট।
সাদিক ধীরে ধীরে আরফার খুব কাছের একজন হয়ে উঠছে।সে বারবার চেষ্টা করছে আরফাকে একটু ব্যক্তিগত সময় দিতে।আরফা, যদি কখনো তোমার পাশে কেউ না থাকে, আমি আছি।আরফা একটু হেসে বলে,তুমি বন্ধুই থেকো, এই মুহূর্তে আমি কিছু আর মেনে নিতে পারবো না।
রাতের দিকে অফিস থেকে বের হতেই একদল অজানা লোক আরফার গাড়ি ঘিরে ফেলে।তারা শুধু বলে, আপনার খুব শত্রু তৈরি হয়ে গেছে, ম্যাম। সাবধানে থাকবেন।
আরফা অবাক।এই শত্রু কে?
প্রতারক নাহিদা?
নাহিদার পিছনে কেউ?
নাকি সেই বিজনেসম্যান আর সারিকা, যাদের সাথে প্রতিশোধ এখনও অসম্পূর্ণ?
রাত্রির অন্ধকারে,আরফার গাড়ি ঘিরে থাকা অচেনা মুখগুলো হঠাৎই কাছাকাছি আসতে শুরু করে।
তারা কিছু না বলে শুধু একটা খাম তার গাড়ির জানালার উপর রেখে সরে যায়আরফা কাঁপা হাতে খামটা তোলে।
ভেতরে একটা চিঠি,
তুমি যতোই শক্ত হও, কিছু মানুষ ভুলে যায় না। সময় শেষ হওয়ার আগে সাবধান হয়ে যাও, ম্যাডাম আরফা।আরফা মাথা নিচু করে ফুঁপিয়ে ওঠে,
এই কে?
আরিয়ান?না… সে তো এখন নিজেকে প্রমাণ করার লড়াইয়ে।রাইশা?সম্ভব, কিন্তু এত পরিকল্পিত?
হঠাৎই এক মোটরবাইক এসে থামে।হেলমেট খুলতেই দেখা যায় আরিয়ান।আরফা! তুমি ঠিক আছো?তুমি এখানে কীভাবে?
আমি আজকাল তোমার গাড়ির ট্র‍্যাকার অন রাখি। কিছু একটা গোলমাল হবে বুঝছিলাম।আরিয়ান নিজের গাড়ি দিয়ে তাকে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দেয়।আরফার বুকের ভেতরটা গরম হয়ে ওঠে সে আজো তাকে রক্ষা করে, এত অপমান, এত দূরত্বের পরেও।
পরদিন অফিসে খবরে ছড়িয়ে পড়ে, কোম্পানির স্টক কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে নিচে নামাচ্ছে।সবাই চুপচাপ, কিন্তু চোখে চোখে রাখছে একে অপরকে।
এদিকে সাদিক খুব গা ঘেঁষে চলতে শুরু করেছে।
আরফা, তুমি জানো না তোমার আশেপাশে কে তোমার বন্ধু আর কে শত্রু। আমি চাই না তুমি কষ্ট পাও।আরফা মুখ ফিরিয়ে নেয়।আমার জীবন এখন যুদ্ধক্ষেত্র, বন্ধুত্বের সময় নাই।
অন্যদিকে,সারিকা এখন পুরোপুরি আরিয়ানকে এড়িয়ে চলছে।বিজনেসম্যান যার সাথে সে প্রেম করছে, সেই মোহিন উদ্দিন তাকে বিদেশ পাঠাতে চাইছে।
সারিকা রাজি, আমি আর এই নিঃস্ব লোকটার সাথে কিছু রাখতে চাই না।আরিয়ান জানতে পারে, সারিকা তার সমস্ত টাকা আত্মসাৎ করেছে।তার নামে থাকা ফ্ল্যাট, গাড়ি, ইনভেস্টমেন্ট — সব হস্তান্তর করেছে।আরিয়ান নিঃস্ব।ভেঙে পড়লেও সে আর চোখের জল ফেলেনি।
রাতে আরফা স্বপ্ন দেখে —মা চিৎকার করছে,আরিয়ানের মা হাত বাড়িয়ে বলছেন,আমার ছেলেকে রক্ষা করো, আরফা.আরফা ঘামতে ঘামতে উঠে পড়ে।
সে জানে,সবকিছুর পেছনে একটা বড় হাত আছে, যেটা শুধু প্রতিহিংসা নয়, বরং পুরো ধ্বংসের পরিকল্পনা।
পরদিন বিকালে, আরিয়ান আরফার অফিসে ঢোকে।
আমার সাথে একটা কথা বলতেই হবে। আমি জানি রাইশা আমাকে ঠকিয়েছে। কিন্তু আমি শুধু জানতে চাই, তুমি এখনও বিশ্বাস করো — আমি খারাপ ছিলাম?
আরফা চুপচাপ তাকিয়ে থাকে।তুমি ছিলে অহংকারী, কিন্তু খারাপ না। কিন্তু তুমি হার মানলে… সেই আরফার পাশে না দাঁড়িয়ে যেটা প্রতিশ্রুতি ছিলো তোমার মায়ের।আরিয়ান মুচকি হেসে বলে,তাহলে এবার দাঁড়াবো, যদি তোমার অনুমতি পাও।
আরফা এবার যেন একধরনের নীরব যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সে নিজেকে আয়নায় দেখে বলে,আমি কাউকে আর কাঁদতে দিব না। আমাকে কাঁদানোর জন্য কেউ আর থাকবে না।
অফিসে ঢুকেই আরফা লক্ষ্য করে, একাধিক কর্মী আজ হুট করে ছুটি নিয়েছে।তাদের আচরণেও পরিবর্তন।অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্টের একজন ছেলেকে ডেকে জিজ্ঞেস করলে সে মুখ ফিরিয়ে বলে,আমাকে কিছু বলার অনুমতি নেই ম্যাডাম…
আরফা কিছুটা ধাক্কা খায়।কারা যেন ভিতর থেকে একে একে তার রাজ্যটাকে ভাঙার চেষ্টা করছে।
আরফা তখনই সিকিউরিটি হেডকে ডেকে বলে—
“সিসিটিভি ফুটেজ, কম্পিউটার লগস— সব খতিয়ে দেখাও। কেউ আমার অফিস থেকে বাইরের কাউকে ডেটা দিচ্ছে।তিন ঘণ্টার মধ্যেই রিপোর্ট আসে।
নাম: রাশেদা খাতুন
পদ: পিএ (পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট)
যোগাযোগ: মোহিন উদ্দিন গ্রুপের এক সিনিয়র অফিসারের সাথে।
আরফা নির্বাক।নিজের সবচেয়ে কাছের একজনই বিশ্বাসঘাতক!সে কিছু না বলে রাশেদাকে ডেকে নেয়।
রাশেদা কাঁপতে থাকে।
আমাকে মাফ করে দিন ম্যাডাম, আমাকে বাধ্য করা হয়েছিল। আমার ছোট ভাইকে অপহরণ করে…আরফা ধীরে বলে,তোমার জন্য একটা সুযোগ আছে — আমাকে সব বলো, কে কে জড়িত।
ঠিক তখনই অফিসে একজন প্রবেশ করে।
সবাই অবাক।আরফা তাকিয়ে রীতিমতো স্থির।
নাম: আশফাক রহমান
পরিচয়: আরফার স্কুলজীবনের বন্ধু, যার সাথে শেষ দেখা ছিল ১০ বছর আগে।
আশফাক:তুমি হয়তো বিশ্বাস করবে না, আমি এই শহরে ফিরেছি শুধুমাত্র তোমার জন্য। তোমার নাম এখন শুধু শহরে না, দেশের বাইরেও আলোচিত। আমি চাই, আমরা একসাথে একটা কোম্পানি শুরু করি — এবার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে।
আরফার চোখে জল চলে আসে।এতদিনের পর একজন আপনজন ফিরে এসেছে—যে তাকে শুধু আরফা নামে জানে, আরিয়ান-এর স্ত্রী নামে না।
অন্যদিকে আরিয়ান, আরিয়ান বসে আছে নিজের ফাঁকা ঘরে।সারিকা আজ তীব্র ভাষায় বলেছে , তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল, আরিয়ান। এবার তুমি নিজের মতো করে মরে যাও।
সারিকা এখন মোহিন উদ্দিনের সাথে ফ্ল্যাটে থাকে।আরিয়ানকে ঠেলে বের করে দিয়েছে।তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে সব টাকা তুলে নিয়েছে।
আরিয়ান ভাঙা কণ্ঠে বলে—তবুও আমি আরফার মতো হতে পারিনি… ওর মতো সবকিছু সহ্য করে এগিয়ে যেতে পারিনি।
রাতে আরফার ফোনে আসে একটা অচেনা নাম্বার থেকে মেসেজ:আশফাক বিশ্বাসের যোগ্য না। সে একসময় মোহিনের সাথেও কাজ করতো। সাবধান।
আরফা কাঁপা হাতে ফোনটা ধরে।এই কে? আবারও প্রশ্ন জেগে ওঠে…এটা কি আরিয়ান?নাকি এই শহরে আরও কেউ আছে, যে তাকে নীরবভাবে সাহায্য করছে?
আরফা নিজের অফিস ডেস্কে বসে আশফাকের প্রস্তাব নিয়ে ভাবছে।আশফাক তার পুরনো বন্ধু, স্কুলে যার সাথে বই ভাগ করে পড়তো, যার সাথে চকলেটও ভাগ করে খেতো।কিন্তু এই বন্ধুত্বের মাঝেই যদি প্রতারণা লুকিয়ে থাকে?
আরেকবার সেই মেসেজটা পড়ে সে:আশফাক বিশ্বাসের যোগ্য না। সাবধান।সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
আরফা গোপনে আইটি টিমকে বলে আশফাকের গত পাঁচ বছরের ট্র্যাকিং রিপোর্ট দিতে।তার সব কোম্পানির রেকর্ড, যোগাযোগ— সব কিছু।
আশফাক দুবাইতে মোহিন উদ্দিন গ্রুপের একটিসাবসিডিয়ারিতে ২ বছর কাজ করেছে।তারপর হঠাৎ করে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে যায়।দেশে ফেরার আগের মাসেও মোহিনের এক সাবেক ম্যানেজারের সাথে ইমেইল যোগাযোগ ছিল।আরফার মুখ কঠিন হয়ে ওঠে।বন্ধু ছিলে, থাকো— কিন্তু আমার পথে যদি তুমি বাধা হও, তাহলে আমি কাউকে ছাড়বো না।
ওদিকে সারিকা ও মোহিন এখন পরিণত এক বিষাক্ত জুটিতে পরিণত হয়েছে।তারা আরফার সব কোম্পানির সাপ্লায়ার লিস্ট জোগাড় করেছে।সারিকা একে একে তাদের ব্রাইব দিচ্ছে যেন তারা আরফার কোম্পানিকে ধ্বংস করে।
সারিকা হেসে বলে:এই মেয়ে অনেক বড় হয়ে গেছে। সময় এসেছে ওর শেকড়টাই উপড়ে ফেলার।একসময় যাকে সবাই চিনতো নামি বিজনেসম্যান হিসেবে, আজ সেই আরিয়ান একটি ছোট কন্সালটেন্সি ফার্মে চাকরির জন্য ঘুরে বেড়ায়।
হঠাৎ সে দেখে, এক কোম্পানিতে নতুন ব্রাঞ্চ খোলা হয়েছে।
নাম: ARFA ENTERPRISE INTERNATIONAL
সে ভেতরে ঢুকে ম্যানেজারের সাথে কথা বলে, কিন্তু ম্যানেজার বলে,আপনার সিভি খুব পুরনো। আপনি কাজ পাবেন না। মালিক নিজে সিলেকশন করে।
আরিয়ান বলে,তাহলে মালিকের সাথে দেখা করতে চাই।
ম্যানেজার ফোন করে কাউকে ডাকে।আরিয়ান যখন ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে,দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন আরফা।
আরফার পরনে সাদা শার্ট, কালো ব্লেজার, চোখে ঠান্ডা দৃঢ়তা।কিন্তু গভীরে এক ধরণের শূন্যতা।দুজনের চোখ এক হয়।
আরফা ধীরে জিজ্ঞেস করে,কী কাজে এসেছেন, Mr. Aryan?আরিয়ান জবাব দেয় না।তবে চোখে একরাশ অনুতাপ।
কিছুক্ষণ পর আরফা তাকে অফিসে ডাকে।
আরফা: আপনার স্ত্রী সারিকা এখন কেমন আছে?
আরিয়ান: সে আমার স্ত্রী না… এখন আর না।
আরফা: ডিভোর্স?
আরিয়ান (চুপ থেকে): না… সে নিজেই চলে গেছে, আমার সবকিছু নিয়ে।
আরফা হেসে ফেলে।এটা তো কাকতালীয়… আমার সবকিছু কেড়ে নিয়ে আপনি এখন এসেছেন আমার সামনে?আরিয়ান:আমি কাজ চাইনি, আমি ক্ষমা চাইতে এসেছি। যেটা অনেক দেরিতে আসলো।
পরদিন সকালে আরফার অফিসে বড় ধাক্কা।৫টি বড় অর্ডার একসাথে ক্যানসেল হয়।আরেকজন ট্রাস্টেড পার্সন কোম্পানির ফান্ড থেকে ২০ লাখ টাকা সরিয়ে নিয়েছে।
আরফা ফেটে পড়ে:একা লড়তে হবে আমাকে! এবার কাউকে আর বিশ্বাস করবো না।আরফা ক্লান্ত হয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে দেখে আরিয়ান দাঁড়িয়ে।তুমি আমাকে ঘৃণা করতে পারো, কিন্তু আমি তোমাকে ফেলে আসতে পারছি না। আমি জানি, আমি খারাপ ছিলাম। খুব খারাপ। কিন্তু এই ভয়ংকর শহরে, শুধু তুমিই ছিলে আমার আপন। আমি সেটা হারিয়ে বুঝেছি…
আরফা তার দিকে তাকিয়ে বলে,তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি। এখন শুধু চেয়ে দেখো— কীভাবে আমি তোমার ছায়া ছাড়াই বাঁচতে শিখে গেছি।বৃষ্টির ফোঁটায় গলে যায় পুরোনো ব্যথা, গলে যায় নীরবতা।

Be the first to write a review

Leave a Reply

We’re sorry you’ve had a bad experience. Before you post your review, feel free to contact us, so we can help resolve your issue.

Post Review

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক গল্প