সব_হারিয়ে_যদি_পাই_তোমায় (শেষ পর্ব)

চিরকুটে লেখা আরিয়ানের প্রশ্ন—তুমি কি আবার আমার স্ত্রী হতে পারো?আরফা উত্তরে কিছুই বলেনি,
শুধু চুপ করে হাসছিল।কিন্তু সেই চুপচাপ হাসির মধ্যে ছিল একটা জবাব,একটা আশা,একটা ভাঙা হৃদয়ের ছোট্ট জোড়া লাগানো চেষ্টা।
পরদিন সকালের অফিসে আরিয়ান আর আরফাএক টেবিলে কাজ করছিল।এক সময় আরিয়ান ধীরে বললো,
চুপচাপ হাসলে হবে না, উত্তর দিতে হবে।
আরফা একটু থেমে বললো,তোমার মতো মানুষ কি সত্যি কোনোদিন বদলায়?আরিয়ান ধীরে বললো,
না, বদলায় না। কিন্তু ভালোবাসলে বদলাতে হয়।
আরফা তাকিয়ে বললো,তবে প্রমাণ দাও। আমি আবার কাউকে ভরসা করতে ভয় পাই।
এইদিকে সারিকা এবার আর বসে নেই।সে আর রাহাত মিলে একসাথে প্ল্যান করে আরফার কোম্পানির বড়ো এক প্রজেক্ট নষ্ট করার।তারা আরিয়ানকে ভুল তথ্য দিয়ে পাঠায়
এক ভুয়া মিটিং-এ।আরিয়ান সেই মিটিং-এ গিয়ে বুঝতে পারে সে ফাঁদে পড়েছে, আরফা বুঝে যায়, তার টিমে ভেতরে কেউ আছে,যে তথ্য পাচার করছে।
সে সবাইকে কড়া ভাষায় বলে—এটা শুধু বিজনেস নয়, এটা আমার আত্মসম্মান!কাউকে ছাড় দেবো না।
সেই দিন রাতেই আরফা অফিসে বসে,নতুন প্রজেক্ট প্ল্যান করে,যা পুরনো প্ল্যান থেকে ১০ গুণ বেশি প্রভাব ফেলবে মার্কেটে।
এক পুরনো বাক্স খুলতে গিয়ে আরফা পায় একটা চিঠি।
চিঠিতে লেখা:তোমার মা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ঋণ।তার জন্যই আমি তোমাকে নিজের মেয়ের মতো মানুষ করেছি। আরিয়ানের মা
আরফা চোখে জল নিয়ে বুঝে যায়,এই সম্পর্কের ভিত অনেক গভীর।রাতের শেষে আরিয়ান দরজায় দাঁড়িয়ে বললো,তুমি যদি আবার আমার স্ত্রী হও,আমি সারাজীবন তোমার অফিসে পিয়ন হিসেবেও থাকতে রাজি।
আরফা হেসে বলে—তাহলে আগামীকাল অফিসে তোমার ইউনিফর্ম আনছি।দুজনের চোখে জল, কিন্তু মুখে হাসি।
সারিকা আর রাহাত মিলে একটি ভয়ানক ষড়যন্ত্র করে রেখেছে।তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবার শুধু আরফার ব্যবসা নয়,আরিয়ানকেও ধ্বংস করতে হবে—মানসিকভাবে।
তাদের প্রথম ধাপ—আরিয়ানকে এমন এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করানো,যেটা আসলে আরফার কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবহার হবে।আরিয়ান বুঝতে পারে না,সে নিজের সই দিয়ে শত্রুর হাতেই তুলে দেয় আরফার স্বপ্ন।
দুদিন পর কোম্পানিতে হঠাৎ এক নোটিশ আসে—
আরফার কোম্পানির এক গোপন প্রজেক্টের লিকড ডিটেইলস চলে গেছে রাহাতদের কোম্পানিতে।
আরফা নির্বাক।তদন্তে দেখা যায়—আরিয়ানের সই করা চুক্তি থেকেই এই লিক।আরফা স্তব্ধ হয়ে যায়।সে আরিয়ানকে ডাকে না, কিছু বলে না,শুধু নিজের অফিসে দরজা বন্ধ করে দেয়।
আরিয়ান যখন জানতে পারে সে ফাঁদে পড়েছে,
তার পা থেকে যেন মাটি সরে যায়।সে ছুটে যায় আরফার কাছে।বিশ্বাস করো, আমি জানতাম না! তারা আমাকে বোকা বানিয়েছে!
আরফা ধীরে বললো,তুমি সেই মানুষ, যে একদিন আমায় ডিভোর্স দিয়েছিলে,আজ আবার ভুল করে আমার ব্যবসা ভাঙলে।তুমি কতবার সুযোগ পাবে?
রাতে আরফা পুরনো স্মৃতিতে হারিয়ে যায়।সে মায়ের লেখা একটা চিঠি পড়ে:তুমি কষ্ট পাবে, বিশ্বাস করেছো বলেই কষ্ট পাবে।কিন্তু মনে রেখো, কখনো নিজের স্বপ্ন ছাড়বে না।
আরফা চোখ মুছে আবার উঠে দাঁড়ায়।সে সিদ্ধান্ত নেয়— এই যুদ্ধ আমি একাই জিতবো।
আরফা বুঝে যায়, এবার সময় হয়েছে কৌশলে জবাব দেওয়ার।সে আরিয়ানকে সরাসরি কিছু না বলে
একটি নতুন পরিকল্পনা নেয়:
সারিকা কোম্পানির ইনসাইড ইনফো বের করা আরিয়ানকে এইবার সত্যিকারের মূল্য দিতে বাধ্য করানিজের ব্যবসাকে এক ধাপে সামনে নিয়ে যাওয়া
পরের দিন আরিয়ান বাড়ি ফিরে দেখে—তার ঘরে রাখা একটা খাবারের থালা।চিরকুটে লেখা— আজও খেয়ো, শরীর খারাপ হলে লাভ নেই।আরিয়ান চুপ করে বসে,চোখ ভিজে যায়।
আরফা কিছুটা বিরক্ত,তবু সে ভালোবাসা ভুলতে পারে না।
রাতে ঘুমাতে পারে না আরিয়ান।চোখের সামনে বারবার ভেসে আসে আরফার মুখ।একটা অদৃশ্য দেয়াল দাঁড়িয়ে গেছে ওদের মাঝে—বিশ্বাসের দেয়াল।
আমি কি সত্যিই আরফার জীবনে শুধু ভুল আর কষ্ট এনেছি?তবে কি আমার ভালোবাসা ছিল একতরফা?
সে নিজের ভুলে কষ্ট পেতে শুরু করে।তবে সে জানে,এই ভাঙা সম্পর্ক যদি আরফার হাতেই বাঁচে,তবে তাকেই নিজের দাম প্রমাণ করতে হবে।
অফিসে বসে আরফা ফাইল ও কাগজে চোখ রাখলেও
মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে একটাই ভাবনা—
আমি কাউকে আর আমার স্বপ্ন ভাঙতে দেবো না।সে চুপিচুপি এক নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগ শুরু করে—
নতুন প্রোডাক্ট লঞ্চ করবে,যেটা বাজারে সারিকাদের কোম্পানির মুখ বন্ধ করে দেবে।
সারিকা বুঝতে পারে কিছু একটা হতে যাচ্ছে।
সে রাহাতকে বলে,আরফাকে হালকা ভাবে নিয়েছিলাম, ভুল করেছি।ও আবার দাঁড়াতে জানে। এখন ওকে থামাতে হবে।
রাহাত হেসে বলে,ছোটলোক মেয়েটা কিছু করতে পারবে না।আর তুই চিন্তা করিস না, আমি ওর বিজনেসেই আগুন ধরিয়ে দেবো।
তবে ওরা জানে না,আরফা এখন আর একা নয়, সে এখন নিজের মতো করে যুদ্ধ করতে শিখে গেছে।
আরফা রেনু আপার সাথে কথা বলে।রেনু আপা সেই মহিলা, যার সাথে একসময় আরফা পার্টনার হয়েছিল।
এইবার আরফা একা শুরু করছে,একটি ছোট্ট অফিস ভাড়া নেয়,তিনজন কর্মচারী নিয়ে শুরু করে “ARFA ENTERPRISE”
প্রথম প্রজেক্ট—একটি হেলথ বেইজড কসমেটিক প্রোডাক্ট।
চোখের নিচে কালো দাগ দূর করার এক নতুন সমাধান।
আরিয়ান অফিসে বসে থাকা অবস্থায় হঠাৎ আরফার নতুন প্রজেক্ট সম্পর্কে শুনে যায়।সে নিজের নাম না বলে,একটা সূত্রের মাধ্যমে ইনভেস্টমেন্ট করতে চায়।
কিন্তু আরফা জানে—এই সাহায্য তার লড়াইকে দুর্বল করবে।তাই সে ফিরিয়ে দেয়—আমার যুদ্ধ আমার নিজের। এই যুদ্ধ শুধু টিকে থাকার নয়, নিজেকে প্রমাণ করার।
সারিকা আর রাহাত বসে আছে অফিসে।একজন সিক্রেট সোর্স ফোনে জানায়—আরফার কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন হয়ে গেছে। নাম ARFA ENTERPRISE… এবং ওদের প্রথম প্রোডাক্ট বাজারে নামছে দশদিনের মধ্যে।
রাহাত রেগে গিয়ে বলে,ওকে এবার থামাতেই হবে। আমরা শেষ করবো ওকে!
ক্যামেরা জুম করে আরফার দৃঢ় মুখে—সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলে,এবার আমিই খেলবো, আর তোমরা দেখবে।
সকালটা অন্যরকম রোদ্দুরে ভরে গেছে।আজ আরফার জীবনের সবচেয়ে বড় দিন।তিন মাসের কষ্ট, রাত জাগা ঘুমহীন সময় আর মনের জেদ নিয়ে আজ সে দাঁড়িয়েছে নতুন এক জায়গায়।
“ARFA ENTERPRISE”-এর প্রথম প্রোডাক্ট লঞ্চ হচ্ছে।
“DARKCLEAN” নামে এক নতুন কসমেটিক—চোখের নিচে কালো দাগ দূর করার কার্যকর হেলথ-বেইজড প্রোডাক্ট।
প্রথম প্রোডাক্ট লঞ্চ উপলক্ষে একটা ছোট্ট মিডিয়া,কনফারেন্স হয়েছে।আরফা নিজের সাধারণ অথচ আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলে,
আমি কারো দয়া বা করুণা চাই না।আমি শুধু চাই আমার পরিশ্রমকে মানুষ চিনুক।আমার নামের পাশে কখনো কেউ আর ‘কাজের মেয়ের মেয়ে’ বলে পরিচয় দেবে না।
প্রতিটি সাংবাদিক মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে।আরিয়ান এই দৃশ্য টিভিতে দেখে তার চোখ জলে ভরে ওঠে।আমি হারিয়েছি, এক দানবের মতো আচরণ করে।
আজ সে আগুন থেকে নিজেই ফিনিক্স হয়ে উঠেছে।
এই লঞ্চটা রাহাত সহ্য করতে পারে না।সে তার কিছু মিডিয়া চ্যানেলকে টাকা দিয়ে ভুয়া নিউজ ছড়াতে শুরু করে:নতুন কোম্পানির মালিক একসময় কাজের মেয়ে ছিলেন,ব্ল্যাকমেইল করে বিজনেস দখল করা এক মেয়ের গল্প
সারিকা হেসে বলে,এভাবেই ওর স্বপ্নকে ভেঙে দেবো, আরিয়ানকেও ভুলে যাবে।
কিন্তু আরফা জানে—ওকে নিয়ে অনেক কথা হবে।তবুও সে থামবে না।
একটি স্পেশাল ভিডিও তৈরি করে আরফা পোস্ট করে সোশ্যাল মিডিয়াতে।নিজের গল্প তুলে ধরে সে বলে,আমি কাজের মেয়ে ছিলাম, ঠিক।কিন্তু আমি চুরি করিনি, কারো টাকা মেরে খাইনি।আমি শুধু ঘাম দিয়েছি, রক্ত দিয়েছি, আর বিশ্বাস দিয়েছি।আমি গর্বিত আমি কে।
ভিডিওটা ভাইরাল হয়ে যায়।সবার সাপোর্ট পেতে শুরু করে আরফা।একটা শব্দ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে—”Respect for Arfa!
একদিন রাহাত আরফার অফিসে আসে।
সে হুমকি দেয়:তুই এত বড় হতে পারিস না! আমি তোকে শেষ করবো!
আরফা শান্ত স্বরে উত্তর দেয়,তুমি যা পারো করো, কিন্তু একটা কথা মনে রেখো—আমি ভেঙে যেতে পারি, কিন্তু মরে যাবো না।আর বারবার মাটি থেকে উঠে দাঁড়াতে আমি জানি।রাহাত মুখ থমথমে করে চলে যায়।
আরিয়ান এখনো বাইরে থেকে সব কিছু দেখে যাচ্ছে।
সে একদিন অফিসের বাইরে দাঁড়িয়ে আরফাকে দেখে,
মনে মনে বলে,তুমি যেটা পারো, আমি কোনোদিন পারিনি।
আমি শুধু তোমাকে ভাঙতে জানতাম, তুমি নিজেকে গড়তে জানো…
চোখে জল, কিন্তু মুখে কঠিন দৃঢ়তা।সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে,আমি এখন আর কারো হয়ে বাঁচি না।
আমি এখন নিজেকে নিয়েই বাঁচি।আর আমার যুদ্ধ শুধু শুরু হয়েছে।
আরিয়ান এখন আর সেই আগের মানুষটা নেই।ব্যবসা গেছে, প্রেম গেছে, অহংকার গেছে…শুধু বেঁচে আছে এক টুকরো পাপের বোধ আর বুকের ভেতর কাঁটা হয়ে থাকা আরফার মুখ।
প্রতিদিন রাতে সে ARFA ENTERPRISE এর প্রোফাইল ঘেঁটে দেখে—নতুন ক্লায়েন্ট, নতুন প্রোডাক্ট, সফলতা…
এই মেয়েটাকে আমি ফেলে দিয়ে আজ কিছুই না আমি, কেন পারিনি ওর পাশে থাকতে?মনে মনে ভাবে।
আরফা এই কঠিন সময়েও একা না।তার পাশে পেয়েছে এক আশ্চর্য মানুষ—নাফিসা আপু, একাধিক প্রতিষ্ঠানের মালিক, সিঙ্গেল মা, সাহসী উদ্যোক্তা।
নাফিসা বলে,তুমি শুধু টাকা কামাতে এসো না আরফা, তুমি হোক একটা প্রতীক—যেনো কেউ আর কখনো ‘কাজের মেয়ের মেয়ে’ বলার সাহস না পায়!আরফা মুগ্ধ হয়ে ভাবে—আমি যদি মায়ের মুখটা এখন দেখতে পারতাম…
রাহাত আর সারিকা মিলে এক বড় কোম্পানির সাথে চুক্তি করেছিলো।কিন্তু শর্ত ভেঙে তারা রাহাতদের বিরুদ্ধে লিগ্যাল অ্যাকশন নেয়।সব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ, ব্যবসার লাইসেন্স বাতিল।রাহাত বুঝে যায়, তার সব শেষ, আমি এখন পুরো শূন্য হয়ে গেছি।
সারিকা তখন রাহাতকে বলে:তুমি তো একটা ফেলিওর, আমি বিজনেসম্যান চাই… প্রেমিক না। এটা বলে সারিকা, রাহাতের বাসা ছেড়ে চলে যায়, সারিকার বুঝতে পারে, সে আর আরফার সামনে দাঁড়ানোর কোনো যোগ্যতা নেই, সেই রাতে সাকিরা, এই শহর ছেড়ে পালায়,,রাহাত রুমে একা বসে ভাঙা মগ ছুড়ে মারে দেয়ালে।
এভাবে কিছুদিন যেতেই, রাহাত এখন চাকরি খুঁজছে…
আরফা এখন কোম্পানির সিইও।আরিয়ান প্রতিদিন রাস্তায় বেরিয়ে ভাবে আরফার মুখ, তার গলা, তার চোখ।
আমি যদি তখন একটু বুঝে নিতাম,যদি একবারও বলতাম, থেকে যাও’তাহলে আজ ও আমার স্ত্রী হতো, কেউ else’s inspiration না।
সে হঠাৎ একদিন সাহস করে আরফার অফিসের সামনে দাঁড়ায়।ভেতরে ঢুকতে চায়, কিন্তু দারোয়ান তাকে বলে,
স্যার, আপনাকে appointment ছাড়া যেতে দেয়া হবে না।
আরিয়ান শুধু হেসে বলে,আমি appointment ছাড়াই ওর জীবন থেকে চলে গিয়েছিলাম,এখন বুঝি… ফিরে আসার অধিকার আমার আর নেই।
আরফা: ছবির সামনে বসে একটা পুরোনো গলার হার ধরে বলছে—মা, আজ আমি ভালো আছি।তুমি না থাকলেও তুমি আমার ভেতর আছো,তোমার শেখানো লড়াইটাই এখন আমার পরিচয়…
রাহাত বসে আছে আরফার অফিসের রিসিপশনে।
কাজ খুঁজছে—কিন্তু আজকের পরিস্থিতি যেনো জীবনের সবচেয়ে অপমানজনক মুহূর্ত।একসময় যাকে সে “কাজের মেয়ের মেয়ে” বলে অপমান করত…আজ তার অফিসে ইন্টারভিউ দিতে এসেছে।রিসিপশনিস্ট বলে,স্যার, ম্যাডাম আপনাকে নিচের কনফারেন্স রুমে যেতে বলেছে।রাহাত ওঠে—চোখ নামিয়ে হাঁটে।
আরফা আজ গাঢ় নীল শাড়ি পরে বসে আছে কনফারেন্স রুমে।তার চোখে ক্লান্তি নেই, কণ্ঠে নেই কোনো কম্পন।
রাহাত আসতেই বলে—বসুন। আপনি চাকরি খুঁজছেন শুনলাম?রাহাত মুখ নিচু করে মাথা নাড়ে।হ্যাঁ… যদি কোনো সুযোগ…
আরফা ঠান্ডা গলায় বলে,আপনার সিভিতে তো দেখি, একাধিক কোম্পানি আপনি নিজের হাতে ডুবিয়েছেন?
রাহাত ঘেমে ওঠে।আরফা উঠে এসে বলে,আপনার একটাই যোগ্যতা ছিল—আমাকে দমন করা।এখন আপনি আমার অধীনে কাজ করবেন… সেটাই আপনার সবচেয়ে বড় শাস্তি হবে।
রাহাত চুপচাপ চুক্তিপত্রে সাইন করে।আরফা বলে,শোনেন রাহাত, আমি আপনাকে ঘৃণা করি না…আমি আপনাকে ছায়ার মতো সামনে রাখতে চাই,যেনো আপনি প্রতিদিন মনে করেন… আমাকে অবহেলা করার মূল্য আপনি ঠিকঠাক দিয়েছেন।
আরিয়ান নিজ বাসার ছাদে বসে একটা পুরোনো ডায়েরি পড়ছে।আরফার হাতের লেখা,আরিয়ান ভাইয়া, আমি যদি একদিন বড় হই, আমি আপনাকে প্রমাণ করে দেবো—আমি কাজের মেয়ের মেয়ে না, আমি নিজের পরিচয় নিয়ে বাঁচতে জানি।
আরিয়ান চোখ বন্ধ করে ফেলে।আজ আমি সব হেরে গেছি, কিন্তু ও জিতেছে…ওকে হারিয়ে আমি কিছুই পাইনি, শুধু একাকীত্ব…
একদিন সন্ধ্যায় আরফা তার নতুন অ্যাপার্টমেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে।আরিয়ান রাস্তার ওপার থেকে চুপচাপ তাকিয়ে থাকে।
আরফা একটু বুঝতে পেরে বলে—ওখানে দাঁড়ানো মানুষেরা যদি সাহস করত, তাহলে হয়তো অতীতটা এতো নিষ্ঠুর হতো না। এই কথা শুনতেই আরিয়ান আরফার কাছে এসে বলে, আরফা তুমি কি কখনো আমাকে আর গহন করবে না? আমি তোমার কাছে হাত জোর করছি আরফা আমাকে আর একটা সুযোগ দাও, আমি আজ তোমায় ছাড়া অনেকটা একা হয়ে গেছি,,এই কথা বলতেই আরফার চোখের কোনে জল টলমল করছে,
আরফা: আচ্ছা আসো একটা মিটিং আছে, আমার সাথে চলো। আরিয়ান সাথে সাথে গাড়িতে উঠে পড়ে।
স্থান: আরফার নতুন প্রতিষ্ঠানের উদ্বোধনী দিননাম: Arfa’s Rise….
সবার সামনে আরফা দাঁড়িয়ে আছে, গায়ে হালকা সাদা শাড়ি, চুল খোলা, মুখে আত্মবিশ্বাসের দীপ্তি।আরিয়ান প্রথম সারিতে বসে। তার চোখে আজ অহংকার নেই, আছে বিস্ময়। যেন সে আজও বিশ্বাস করতে পারছে না— এই মেয়েটা একদিন তার হাত ধরেছিল, আর সে হাত ছেড়ে দিয়েছিল।
আরফা মাইকে বলছে,জীবনে অনেক কিছুই হারিয়েছি।
মা… ছোটবেলায়।ঘর… কৈশোরে।সম্মান… এক সময়ে।
ভালোবাসা… নিজের অজ্ঞতায়।কিন্তু একটাই জিনিস হারাইনি— নিজেকে।আজ আমি দাঁড়িয়ে আছি এই জায়গায়, কারণ আমি হার মানিনি।একসময় আমি ছিলাম কারো দয়ায় বাঁচা একটি মেয়ে,আর আজ আমি নিজের পরিচয়ে গর্বিত— আমি আরফা আহমেদ।
হলজুড়ে করতালি, চোখে জল।আরিয়ান মাথা নিচু করে ফেলে। সে বুঝে যায়— সে যা হারিয়েছে, তা হয়তো আর ফিরবে না।
স্থান: ছাদের চূড়ায়, ঢাকার এক শান্ত রাত,আরফা ছাদে একা দাঁড়িয়ে, আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। পেছনে পা ধীরে ধীরে এগোয়।আরিয়ান এসে দাঁড়ায় পেছনে।
একটা সময় তুমি অনেক কিছু হারিয়েছিলে। আজ আমি হারিয়েছি তোমাকে।আরফা চুপ করে থাকে।
আরিয়ান বলে,আমি যদি অতীতে ফিরে যেতে পারতাম… সব ঠিক করতাম, আরফা।
আরফা ধীরে বলে—সময়ের ঘড়ি কারো জন্য থেমে থাকে না, আরিয়ান।
আরিয়ান হঠাৎ পকেট থেকে একটি ছোট চিঠি বের করে দেয়।তোমার মা বেঁচে থাকার আগে এটা আমার মা’র কাছে দিয়ে গিয়েছিল। মা সবসময় এটা লুকিয়ে রেখেছিল— কারণ ও জানত, একদিন তুমি নিজের পথ তৈরি করবে।
আমার আরফা,যখন আমি থাকবো না, তখন তোদের পৃথিবী থেমে যাবে না।হয়তো তুই একা হয়ে যাবি, কিন্তু আমি জানি— তুই অন্যরকম মেয়ে। তুই আলো, তুই আগুন।
কখনো কারো দয়ার পাত্রী হবি না,নিজেকে এমন জগতে প্রতিষ্ঠা করবি— যেন তোকে দেখে মানুষ বিশ্বাস ফিরে পায় নিজের ওপর।ভালোবাসা যদি তোর জীবনে ফিরে আসে…
ক্ষমা করতে শিখবি, কিন্তু নিজের দাম কখনো ভুলে যাস না।তোর মা,সালমা খাতুন।
চিঠি পড়ে আরফার চোখ ছলছল করে।
আরিয়ান এক পা এগোয়—তোমাকে আমি ভালোবেসেছিলাম, কিন্তু বোঝাতে পারিনি। আজ তুমি সব হয়ে গেছো— আমি কিছু না। তবু, যদি চাও… আমি পাশে দাঁড়াতে চাই আবার, ঠিক আগের মতো নয়, অনেক গভীরভাবে।
আরফা তার দিকে তাকায়।একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে ধীরে বলে—ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, সে ফিরে আসে। আর তুমি ফিরেছো… খালি হাতে, খোলা মন নিয়ে।
আরফা তার হাত বাড়িয়ে দেয়।আরিয়ান সেই হাত ধরতেই বলে—এবার আর ছাড়বো না। জীবন শেষ হোক, কিন্তু তুই যেন আমার ছায়া থেকে কখনো দূরে না যাস।
ছাদে বাতাস বয়ে যাচ্ছে। দুজন মানুষের হাতে হাত, হৃদয়ে হৃদয়।
পেছনে কণ্ঠে ভেসে আসে—ভালোবাসার শেষ নামটা তুমি…
শেষ দৃশ্য: আরফার গলায় একটা লাইন,
আমি যখন ভাঙি, তখন আবার গড়ি নিজেকে…
কিন্তু তুমি, আরিয়ান… তুমি তো কেবল ভাঙতেই শিখেছো…

Be the first to write a review

Leave a Reply

We’re sorry you’ve had a bad experience. Before you post your review, feel free to contact us, so we can help resolve your issue.

Post Review

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক গল্প