অবহেলা

রাতে ঘুমানোর সময় আমার স্ত্রী যখন আমার বুকের উপর এসে শুয়ে পড়লো তখন আমি বেশ বিরক্তি নিয়ে ওকে বললাম…
–” সারাদিন কাজ করে রাতে তোমার জন্য একটু শান্তিতে ঘুমাতেও পারি না।
–” তুমি তো জানো আমি তোমার বুকে ছাড়া ঘুমাতে পারি না।
–” এমন নেকামো না করলেও তো পারো! তোমার জন্য কোনো কাজে শান্তি নেই আমার।
–” ভালো তবুও আমি তোমার বুকেই ঘুমাবো৷
–” তুমি মরে গিয়েও তো আমাকে মুক্তি দিতে পারো? রোজ রোজ এমন অশান্তি আমার আর সহ্য হয় না৷ এমন একটা বস্তা গায়ের উপর থাকলে কি কেউ ঘুমাতে পারে?
–” আমি তো শুধু রাতের বেলাতেই বুকে ঘুমাই আর তো কখনো জ্বালাতন করি না।
–” তোমার মতো নির্লজ্জ মেয়ে আমি আর একটাও দেখিনি।
–” আমার মাথা ব্যাথা করছে একটু হাত বুলিয়ে দেও।
কথাটা বলে আমার হাতটা নিয়ে ওর কপালের উপর রাখলো। হাজারবার বলার পরও এমনকি গায়ে হাত তুলেও ওর এই স্বভাব পরিবর্তন করতে পারিনি৷ আপনারা নিশ্চয়ই ভাবছেন স্ত্রী বুকের উপর ঘুমালে আমি এতো বিরক্ত কেন হই! আসলে ওকে আমার এখন আর ভালো লাগে না। আমার অন্য একটা মেয়ের সাথে রিলেশন আছে। কিন্তু কিছুতেই মিতাকে বলতে পারি না। মিতা আমার স্ত্রী এর নাম। এমন বেহায়া মেয়ে আমি খুব কম দেখেছি। ওর জন্য রাতে কনিকার সাথে তেমন কথা বলতে পারি না। ঘুমাতে এলেই আমাকে ধরে রাখে।


গায়ের সাথে মনে হয় খুব গরম কিছু লেগে আছে মনে হচ্ছে। মিতার কপালে হাত রেখে বুঝতে পারলাম ওর গা অস্বাভাবিক ভাবে গরম হয়তো জ্বর এসেছে। শীতের রাতে গরম কিছু কার না ভালো লাগে। আমি হাতটা ওর কপালের সাথে চেপে ধরে রাখলাম। ওর কিছুটা কষ্ট কমবে এই জন্য নয় বরং এতো সময় কম্বলের বাইরে রাখা হাতটা নিমেষেই গরম হবে সেই আশায়।
সকাল আটটায় ঘুম ভেঙে দেখলাম মিতা আমার বুকের ওপরই ঘুমিয়ে আছে। গায়ে হাত দিয়ে বুঝলাম গা রাতের থেকে অনেক বেশি গরম হয়ে আছে। কয়েকবার ডাক দিলাম কিন্তু কোনো সাড়া দিলো না। ওকে বুকের ওপর থেকে সরাতে গেলে খেয়াল করলাম আমায় বেশ শক্ত করেই ধরে আছে৷ তবুও ফ্রেশ হতে চলে গেলাম৷ কিন্তু মিতার অবস্থা ক্রমশ খারাপ হচ্ছে তাই ওকে নিয়ে হাসপাতালে গেলাম।
ডাক্তার বললো ঃ- ওর অবস্থা অনেক বেশি খারাপ এখনই আইসিইউতে ভর্তি করতে হবে। কিন্তু আমি ওর জন্য এতো টাকা নষ্ট করতে পারবো না তাই সাধারণ মহিলা ওয়াডে ভর্তি করে দিয়ে এলাম৷
অফিসে এসে কনিকার সাথে গল্প জুড়ে দিলাম। মেয়েটা আমাকে ছাড়া কিছু বুঝতে চায় না৷ কনিকা আমার অফিসের কলিগ। ওর হাসি মুখটা যে কোনো পুরুষকে নিজের কাছে টানতে বাধ্য। তাই আমিও ওর কাছে চলে এসেছি।
সারাদিন বেশ ভালো কেটে গেলো। সন্ধ্যা বেলা বাড়ি এসে ফ্রেশ হয়ে খাবার টেবিলে গেলাম। না আজ আর এই টেবিলে আমার পছন্দের কিছু রান্না করা নেই। মিতা রোজ সন্ধ্যা হলে আমার পছন্দের হালকা খাবার বানিয়ে দিতো। তারপর নিজের হাতে খাইয়েও দিতো। কনিকার সাথে রিলেশনে যাওয়ার পর একদিন বলেছিলাম তোমার আমাকে খাইয়ে দিতে হবেনা। নাকি বিষ মিশিয়ে এইভাবে খাওয়াতে আসো? তারপর থেকে আর কখনো খাইয়ে দিতে দেখিনি। রান্না করে টেবিলে গুছিয়ে রাখতো।
আজ মিতা নেই তাই কেউ কিছু বানিয়ে রাখেনি। খাটে গিয়ে শুয়ে কনিকার সাথে কথা বলতে লাগলাম। কিন্তু এখন ওর সাথে কথা বলতে ভালো লাগছে না। সারাদিন মিতার কোনো খোঁজ নেওয়া হয়নি। আচ্ছা ওর কি জ্ঞান ফিরেছে? নাকি ও আর নেই। না না আমি এইসব কি ভাবছি। আর ও মরে গেলেই তো আমার আর কনিকার জন্য ভালো হয়। কিন্তু মনকে কিছুতেই শান্ত করতে পারছি না। সাথে পেটও বুঝিয়ে দিচ্ছে তার খাবার চাই। কিন্তু এখন বাইরে যেতে ইচ্ছা করছে না। আনমনে বলে উঠলাম
–” মিতা আজ কি রাতে না খাইয়ে রাখবে নাকি? তুমি আসলেই কোনো কাজের না। দুপুরের টিফিনটাও দেও নি আজ।
হঠাৎ খেয়াল আসলো মিতা হাসপাতালে ভর্তি। মেয়েটার আর কোনো খোঁজ কেন নিলাম না। সকালে একবার যেতে হবে হাসপাতালে দেখি কেমন আছে! এখন ঘুমিয়ে পড়ি।
কিন্তু শুয়ে কোনো শান্তি পাচ্ছি না। কিছুতেই ঘুম আসছে না। আজ মিতা নেই বলে কি এমন হচ্ছে। হয়তো বুকের ওপর কেউ না থাকলে ঘুম আসবে না। অভ্যাসটা খারাপ হয়ে গেছে। রাত যতো বাড়ছে মিতার কথা ততো বেশি মনে পড়ছে সাথে ক্ষুধাটাও বেড়ে চলছে। কিছু সময় এপাশ ওপাশ করলাম কিন্তু ঘুমাতে পারলাম না। উঠে গিয়ে ফ্রিজ খুলে খাবার আছে কিনা দেখতে গেলাম। গিয়ে দেখলাম দুইটা চিংড়ি মাছ আর কাল রাতের তরকারি রাখা সাথে ভাতও আছে৷ খাবার গুলো নিয়ে টেবিলে খেতে বসলাম। হঠাৎ মনে হলো মিতা কাল রাতে খাইনি। আমি ওকে চারটা মাছ রান্না করতে দেখেছিলাম। ভালোই হয়েছে এখন আমি খেতে পারবো। কিন্তু গলা দিয়ে নামছে না। আগে চিংড়ি মাছ রান্না হলে মিতা আমার পাশে এসে বসে থাকতো আর ম্যাও ম্যাও করে ডাকতো। মানে তাকে খাইয়ে দিতে হবে। চিংড়ি মাছ ওর সব থেকে পছন্দের খাবার৷
খাবারগুলো রেখে ঘরে চলে এলাম৷ হঠাৎ মনে হলো কেউ আমার বুকের উপর এসে শুয়ে পড়ছে৷ কিন্তু না কেউ নেই। মিতাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। ফোনটা বের করলাম কিন্তু এতে মিতার কোনো ছবি নেই। কনিকা সব ডিলেট করে দিয়ে ছিলো।
কিছু ভালো লাগছে না তার বাইক নিয়ে হাসপাতালের দিকে রওনা দিলাম। ওকে দেখে আসবো বলে৷ কিন্তু হাসপাতালে গিয়ে জানতে পারলাম এতো রাতে মহিলা ওয়াডে কোনো ছেলেকে ঢুকতে দিবে না। কিছু করার নেই বলে ডাক্তারের কাছে ওর খোঁজ নিতে গেলাম।
–” সকালে যে মেয়েটাকে ভর্তি করানো হয়ে ছিলো তার কি অবস্থা?
–“ওনার অবস্থা খুব খারাপ। শরীর কোনো রেসপন্স করছে না। স্যালাইনও টানতে পারছে না শরীর। আইসিইউতে না রাখলে যে কোনো সময়ে খারাপ কিছু হতে পারে।
–” তাহলে আইসিইউতে রাখার ব্যবস্হা করুন।
–” সরি স্যার এখন আইসিইউতে কোনো সিট খালি নেই৷ আপনাকে অন্য কোথাও দেখতে হবে৷ একটা সিট খালি ছিলো যা বিকালে বুক হয়ে গেছে।
ডাক্তারকে কিছু না বলে চলে এলাম সেখান থেকে শহরের আর কোনো ভালো হাসপাতাল নেই৷ বাইরে নিতে গেলে এখন অনেক সময় লাগবে। আর অনেক টাকা খরচ হবে। বাড়ি ফিরে চলে এলাম।
কিন্তু বাড়ি ফিরলে মিতাকে বেশি মনে পড়তে থাকলো। কনিকার জন্মদিনের সময় আমার কাছে টাকা ছিলো না৷ অনেক চিন্তায় ছিলাম তখন মিতা ওর গলার চেন আর নগদ দশহাজার টাকা দিয়ে বলেছিলো ঃ- আমার কাছে এতো টাকা নেই। তোমার তো বিশ হাজার টাকা লাগবে। এতে হয়তো হয়ে যাবে। তুমি চিন্তা করো না।
ওর দিকে এক পলক তাকিয়ে ছিলাম। ও মুচকি হেসে বলেছিলো তুমি চিন্তায় থাকলে আমার কষ্ট হয় অনেক আমার এইগুলো লাগবে না তুমি নিয়ে নেও। চেনটা ওর মায়ের দেওয়া বলে ওটা আর বিক্রি করিনি। কনিকাকে দিয়ে দিয়েছিলাম। চোখের কোণে মনে হলো পানি জমে যাচ্ছে। আজ অনেকদিন পর মিতার সাথে কাটানো সকল মুহুর্ত মনে পড়ছে। আমাদের ভালোবাসার তো কোনো কমতি ছিলো না। তাহলে কেন এতো দূরত্ব তৈরি হলো আমাদের ভিতর? মিতা আমাকে নিজের সবটা দিয়ে আগলে রেখেছিলো তাহলে আমি কেন মিতাকে কষ্ট দিলাম।
অফিস থেকে ফিরতে মিতা আমাকে রোজ জড়িয়ে ধরতো। একদিন ওকে বললাম ছেলেদের শরীর লাগলে ব্যবসা করো কিন্তু আমাকে এতো বিরক্ত করবে না। সেদিনের পর থেকে মিতা আর আমাকে জড়িয়ে ধরতো না। শুধু রাতে আমার বুকে ঘুমানোটাই পরিবর্তন করতে পারিনি কোনো কিছু বলে। ওর নাকি আমার বুকে না ঘুমালে ঘুম আসে না। আমিও ওকে একসময় বলতাম তুমি আমার বুকে না ঘুমালে আমার ঘুম আসে না। আজ বুঝতে পারছি কথাটা আমি মিথ্যা বলতাম না। রাত তিনটা বেজে গেলো এখনো আমি ঘুমাতে পারিনি।
সকাল হতেই হাসপাতালে চলে গেলাম। আজ মিতাকে আইসিইউতে রাখবো এখানে না হলেও অন্য কোথাও। মিতাকে ছাড়া আমি এক রাতও থাকতে পারি না। আমার সব করা কাজের জন্য মাফ চাইবো। আর কষ্ট দিবো না ওকে।
হাসপাতালে গিয়ে জানতে পারলাম কাল রাতে একটা মেয়ে মারা গেছে। না এটা মিতা হতে পারে না। মিতা আমাকে কথা দিয়েছিলো আমাকে রেখে যাবে না। আমাকে ছাড়া ও থাকতে পারে না। মিতা নিশ্চয়ই ওর কথা রাখবে। কিন্তু আমাকে ভুল প্রমাণ করে দিলো মিতার প্রাণহীন দেহটা।
কেমন নিষ্পাপ ভাবে ঘুমিয়ে আছে৷ খুব শক্ত করে ওকে জড়িয়ে ধরলাম। শেষ কবে ওকে জড়িয়ে ধরেছি মনে নেই। ওর মুখের কাছে মুখ নিয়ে বলতে লাগলাম
— তুমি বলতে না তুমি আমাকে ছাড় থাকতে পারো না তাহলে আজ থেকে কি করে থাকবে? জানো কাল রাতে আমি তোমাকে ছাড়া ঘুমাতে পারিনি গায়ের উপর এই বস্তাটা না থাকলে আমার ঘুম আসে না। কে আমাকে রোজ পছন্দের খাবার রান্না করে দিবে বলো? কে আমাকে এতোটা আগলে রাখবে? আমি তোমাকে আর কষ্ট দিবো না। এই দেখো তোমাকে জড়িয়ে ধরে কথা দিচ্ছে আমি আর কথার খেলাপ করবোনা৷ তুমি জানো কাল রাতে আমি তোনাকে ছাড়া কেমন ছিলাম। ভাতও খেতে পারিনি! তুমি আমাকে নিজের হাতে খাইয়ে দিবে না? এইবার আর বলবো না তুমি বিষ মিশিয়ে মেরে ফেলতে চাও। বলো না প্লিজ। আমার খুব ক্ষধা লেগেছে কাল রাতে খাইনি জানো। তোমার কলিজা না খেয়ে আছে আর তুমি নিশ্চিত ভাবে কি করে ঘুমিয়ে আছো?
আগে প্রতিরাতে আমার বুক ওর চোখের পানিতে ভিজে যেতো আমি যেমন কিছু বলতাম না। ওর চোখ মুছিয়ে দিতাম না। আজ আমার চোখের পানিতে ওর বুক ভিজে যাচ্ছে কিন্তু ও চুপ করে ঘুমিয়ে আছে। সত্যিই কি আমি ওকে আর ফিরে পাবো না।

Be the first to write a review

Leave a Reply

We’re sorry you’ve had a bad experience. Before you post your review, feel free to contact us, so we can help resolve your issue.

Post Review

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক গল্প