শ্যামল নিজের আঙুল নিজেই খাচ্ছে। ঠোঁট থেকে রক্ত ঝরছে। হাড় চাবানোর কচকচ বিশ্রী রকমের শব্দ আসছে তার মুখ থেকে। সেই সাথে ভেসে আসছে একটা অসহনীয় পঁচা দূর্গন্ধ। রানু বিশ্বাস করতে পারছে না এমন কিছু সত্যই তার সামনে ঘটছে।ও এটা ভেবে অবাক হলো যে সে এখনো অজ্ঞান হয়ে যায় নি কেন! এই দৃশ্য সহ্য করার ক্ষমতা তার নেই।তখনো ঝড় বৃষ্টি হচ্ছে । আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। রানু একবার ভাবল দৌড় দিবে। দৌড়ে রুমে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা লাগিয়ে দেবে। কিন্তু পরমুহুর্তেই মনে হল দৌড় দিলেই শ্যামল দা ওকে ধরে ফেলবে।রানু এক পা এক পা করে পেছনে আসতে থাকে। বারান্দার শেষ মাথা থেকে রুমের দরজা পর্যন্ত যেতে কয়েক সেকেন্ড লাগার কথা। রানুর মনে হচ্ছে অনন্ত কাল ধরে ও পেছনে হাটছে কিন্তু পথটুকু শেষ হচ্ছে না। ও খানিকটা সড়ে আসার পর শ্যামল আবারও ঘাড় ঘুরিয়ে ওর দিকে তাকালো।তার রক্ত মাখা মুখটা দেখেই আবারও রানুর সারা শরীরে কাটা দিয়ে উঠলো। শ্যামল বলল-“ দিদি মনি কই যান? ডরাইছেন?” বলেই শ্যামল বিকট শব্দে হাসতে থাকে। রানু কোন রকমে ভেতরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয়। ওর সারা শরীর ঘেমে গেছে। ভেতরে ঢুকেও ওর ভয় কমলো না। কারণ পুরো রুম অন্ধকার। যেভাবে ঝড় বৃষ্টি হচ্ছে আজ রাতে কারেন্ট আসবে বলে মনে হয় না। রানু হাতড়ে দিয়াশলাই খুঁজে নিয়ে মোম জ্বালালো। মোমের অল্প আলোতে ওর চেনা ঘরটাও কেমন যেন ভৌতিক মনে হচ্ছে। আরও একটা মোম জ্বেলে সেটি রাখল টেবিলের ওপর।তারপর আলমারিতে হেলান দিয়ে মেঝেতে বসে কান্না শুরু করে ও। আর মনে মনে বলতে থাকে-“ খোদা আমাকে অজ্ঞান করে দাও। আমাকে অজ্ঞান করে দাও।” রানু জ্ঞান হারাল না। ভয়ে কাপতে কাপতে এক সময় ওর চোখ যায় খাটের তলায়।কিছু একটা দেখা যাচ্ছে। ওটা কী মানুষের হাত? হ্যা হাতের মতোই তো। রানু জোরে চিৎকার দেয়। ও কী করবে এখন? ও কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে বসে থাকে। তারপর সাহস করে ধীরে ধীরে চোখ খুলে ও।নাহ, খাটের নিচে কোন মানুষের হাত নেই।ভয়ে ভুল দেখেছে ও। রানু জানে না কী করবে এখন। প্রতিদিন সাজ্জাদ বাসায় থাকে। একটা দিন রাতে ফিরছে না আর এই দিনই এত খারাপ কিছু হয়ে যাচ্ছে ওর সাথে। রানু ভাবলো সারারাত এভাবে এক জায়গায় বসেই কাটিয়ে দেবে। ও ঘড়ি দেখল। ও ভেবেছিল হয়তো অনেক রাত হয়ে গেছে। ঘড়ি দেখে অবাক হল রানু। মাত্র ৯.৫০। সারারাত এখানে বসে থাকা সম্ভব না। রানু ঠিক করল দ্রুত বিছানায় চলে যাবে। মশারী টানানোই আছে। একবার মশারীর ভেতর ঢুকে গেলেই হল। কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে যাবে। কিন্তু বসা থেকে উঠতে গিয়ে দেখল ওর হাত পা কাপছে। উঠে দাঁড়ানোর শক্তিটুকুও নেই। অনেক কষ্টে রানু উঠে দাঁড়ালো। খাটের দিকে এগিয়ে যাবে এমন সময় আবার মনে হল খাটের নিচে কেউ একজন শুয়ে আছে। ও খাটে উঠতে গেলেই ওর পা টেনে ধরবে নিচ থেকে। রানু এক জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলো। থেকে থেকে আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো। নাকে এসে লাগল সেই সুতীব্র পঁচা গন্ধটা। রানু বুঝতে পারল দরজার ওপাশে শ্যামল এসে দাঁড়িয়েছে।শ্যামল কয়েকবার দরজায় ধাক্কা দেয়ার পর বলল-“ দিদি মনি, দরজা খুলেন।ডরের কিচ্ছু নাই। আমি আপনের আঙুল খামু না। খুলেন একবার দরজাটা”। রানু জমে গেল ভয়ে। ওর মাথা কাজ করছে না। ও কী করবে এখন! কতক্ষণ পর পর শ্যামল দরজায় ধাক্কা দিতে লাগল। প্রথমে আস্তে আস্তে, তারপর হঠাৎ জোরে। রানু নড়তে পারল না। আতঙ্কে ও পা নড়াতে পারছে না। পা দুটো যেন পাথরে পরিণত হয়েছে। হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ থেমে গেল।বাইরে কোন সাড়া শব্দ নেই। রানুর মনে হলো শ্যামল চলে যায়নি। দরজার ওপাশেই নিরবে দাঁড়িয়ে আছে। যেন সুযোগের অপেক্ষায় আছে সে। রানু তাকালো খাটের নিচে। আবছা একটা ছায়ার মতো দেখা যাচ্ছে।তবুও রানু সিদ্ধান্ত নিল ও বিছানাতেই যাবে। ছোট একটা দৌড় দিয়ে এক ঝাটকায় ঢুকে যাবে মশারির ভেতর। খাটের নিচে কেউ যদি থেকেও থাকে সে ওর পা ধরতে পারবে না। রানু মনে সাহস সঞ্চয় করে নিল। তারপর হঠাৎ দ্রুত এগিয়ে গেল খাটের দিকে। এইতো ও মাথা ঢুকিয়ে ফেলেছে মশারীর ভেতর। এখন দ্রুত পা দুটো খাটে তুলতে পারলেই হলো। রানু তারাহুরো করে উঠতে গিয়ে জোরে বাড়ি খেল খাটের সাথে। ওর পা ছিলে গেল। কিন্তু এতে রানুর ভ্রুক্ষেপ করলো না। ও খাটে উঠতে পেরেছে এবং কেউ ওর পা টেনে ধরেনি এতেই ওর আনন্দ হলো।রানু কম্বলের ভাজ খুলল। যেন কম্বলের ভেতর একবার ঢুকে যেতে পারলেই আর ভয় নেই। কম্বলের ভাজ খুলেই আঁতকে উঠল ও। সে কি এটা সত্যিই দেখছে! অল্প আলোতে দেখলেও রানু বুঝতে পারলো কম্বলের উপর একটা মানুষের আঙুল। কিছুক্ষণ আগেই আঙুলটা কাটা হয়েছে। গোড়ায় লেগে আছে তাজা রক্ত।রানু দুই হাতে চোখ ঢেকে ফেলল। ও আর সহ্য করতে পারছে না। রানু ভাবতে লাগল, ও কি মরে যাবে আজকে! এসব কেন হচ্ছে ওর সাথে! নাকি সবই মনের ভুল। নিজের মনকে বোঝায় ও। আজ যা কিছু দেখছে সবই ওর মনের ভুল।ঝড় বৃষ্টির রাত এজন্য ওর মন হয়তো দূর্বল হয়ে ছিল।তাই অবচেতন মনের কল্পনা থেকেই ও এসব দেখছে। ও যদি এখন চোখ খুলে দেখবে কিছুই নেই। রানু খাটের এক মাথায় গুটিসুটি মেরে বসে রইলো চোখ বন্ধ করে। তারপর ভয়ে ভয়ে চোখ খুলতে লাগল। রানু জোর করেই মনকে এটা বিশ্বাস করাতে চাইলো চোখ খুলে দেখবে কিছুই নেই। রানু চোখ খুলে দেখল মশারীর ভেতর আরও একজন মানুষ। খাটের অন্য মাথায় একজন গুটিশুটি মেরে বসে আছে। লোকটি নিজের আঙুল খাচ্ছে। তাকিয়ে আছে সোজা রানুর চোখের দিকে। মানুষটাকে চিনতে দেরি হল না রানুর। খাটের ওপাশে বসে আছে সাজ্জাদ, ওর স্বামী।
এবারে রানুর প্রার্থনা মঞ্জুর হলো। এই দৃশ্য দেখার সাথে সাথেই ও জ্ঞান হারাল।
#পরিশিষ্ট- যারা ভুতের গল্প ভালবাসেন, তাদের গল্পের এই অংশ না পড়লেও চলবে। রানুর যখন জ্ঞান ফিরলো ও দেখলো ওর পাশে বাসে বসে সাজ্জাদ কান্না করছে। বার বার বলতে লাগলো -“ সরি, তুমি অনেক সাহসী। আমি বুঝি নি তুমি এত ভয় পাবে। মশারীর ভেতর ঢুকেই আমি ভেবেছিলাম তোমাকে পুরো প্ল্যানের কথা বলে দেব। কিন্তু ঠিক শেষ মুহুর্তে তুমি জ্ঞান হারিয়ে ফেললে।আর এমন করবো না। সরি”
সাজ্জাত রানুর হাত ধরে বসে রইলো। রানুর বেপারটা বুঝতে সময় লাগলো না। সাজ্জাদের দোষ দিল না ও। রানু সব সময় চাইতো ভয় পেতে। এজন্যই এমন এমন প্ল্যান করেছে সাজ্জাদ। প্ল্যানের অংশ হিসেবে ছিল শ্যামল দা। শ্যামল পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। সে লজ্জায় মাথা নিচু করে রাখলো। রানু বলল- “কিন্তু শ্যামল দা যে আঙুল খাচ্ছিল, রক্ত বের হচ্ছিল। এটা কীভাবে?”
সাজ্জাদ কান্না মাখা গলায় বলল-“ বিশেষ ধরনের হ্যান্ড গ্লাভস আছে এমন। ম্যাজিশিয়ানরা এগুলো ব্যাবহার করে জাদু দেখায়। আর বিছানায় যে আঙুল দেখেছো ওটা প্লাস্টিকের আঙুল ছিল।”
সাজ্জাদও মাথা নিচু করে রাখে। রানুর মুখে হাসি এনে বলল-“ এতো কান্না করতে হবে না।ছেলেদের এমন কান্নায় মানায় না। তুমি স্বাভাবিক হও প্লিজ। শখ ছিল ভয় পাওয়ার, শখ পুরণ করার জন্য তোমাদের দুজনকে থ্যাংকস ।”
এই কথাতেও সাজ্জাদের কান্না থামে না। ওর চোখ দিয়ে টপটপ করে জল ঝরতে থাকে। রানু হাত বাড়িয়ে সেই সেই জল ধরে ফেলে। ভালবাসার মানুষের চোখের জল নিচে পরতে দিতে হয় না।