কোথাও বেড়াতে যাওয়ার পর যদি জানা যায় সন্ধ্যার পরপরই ঘরে ফিরে আসতে হবে, কোনোভাবেই বাইরে থাকা যাবে না, তখন কেমন লাগে? আমাদের সাথে এরকম একবার হয়েছিলো।
সেবার শীতে ফ্যামিলি ট্যুরে গেছি এক জায়গায়। জায়গার নাম বলছি না। আমাদের দেশের পূর্বে পাহাড়ের ধারের এক জায়গা। আমরা একটা কটেজে উঠেছি। কটেজের কেয়ারটেকার বললো, ‘ঘুরাঘুরি সন্ধ্যার মধ্যেই শেষ করতে হবে। কিছুতেই সন্ধ্যার পর বাইরে থাকা যাবে না।’
আমরা অনেক চাপাচাপি করলাম কেন এসব কথা বললো তা জানার জন্য। সে কিছুতেই বলবে না। শেষে শুধু ফিসফিস করে বললো, ‘এইখানে পরিবেশ একটু খারাপ। বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ঝামেলা করতেসে। সন্ধ্যার পর বাইরে থাকলে অনেককে ধরে নিয়ে যায়, পরে মুক্তিপণ দাবি করে। তাই বলছি বাইরে না থাকতে। ঘরে থাকলে সমস্যা নাই।’
আমরা তার কথা মেনে সন্ধ্যার সময়েই ঘরে ফিরে এলাম। কিন্তু ঘরে বসে থাকতে ভালো লাগছিলো না। বাড়ির যারা মুরব্বি, তাদের তো আর ঘরে থাকতে কোনো সমস্যা নাই, গল্প করে কাটিয়ে দিবে। সমস্যা আমাদের। বারবিকিউ পার্টি করতে চেয়েছিলাম, সেটা তো শেষ। রাতে একটু ঘুরতেও পারবো না? আমাদের ট্যুরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জিনিস ছিলো আমার কাছে কাজিনদের নিয়ে সন্ধ্যার পর বাইরে ঘুরা। সেই মজাটাও শেষ।
রাগের চোটে ঠিক করলাম এই নিয়ম মানবো না। আমি বাইরে যাবো। আমার সাথে আমার চাচাতো ভাইও যোগ দিলো।
রাতে খাবারের পর সবাই যখন রুমে, আমরা আস্তে আস্তে বের হলাম। বেশিদূর যাবো না, কাছাকাছি ঘুরেই চলে আসবো। এই প্ল্যান নিয়ে শুধু মোবাইলটা নিয়ে বের হলাম। আমাদের সাথে যে খারাপ কিছু হতে পারে, এটা একদম মাথাতেও এলো না।
সেইসময়টায় বেশ ঠান্ডা পড়েছে। আমরা দুই ভাই হাঁটতে হাঁটতে একটু দূরে চলে এসেছি। হঠাৎ মনে হলো আমার কাজিন বিপ্লব কেমন একটু উশখুশ করছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম-‘ কি হয়েছে?’
ও বললো, ‘ ভাই, মনে হচ্ছে কে যেন আমাদের পিছন পিছন আসছে।’
আমি পিছনে তাকালাম। কেউ নেই। ওকে অভয় দিয়ে বললাম, ‘ধুর ব্যাটা হুদাই ভয় পাচ্ছিস। চল আরেকটু সামনে যাই।’
আমরা আরেকটু সামনে গেলাম। বিপ্লব আবার বললো, ‘ভাই সত্যিই আমার মনে হচ্ছে কে যেন ফলো করতেসে আমাদের।’
আমি আগের মতোই ওকে ধমক দিলাম। তারপর বললাম, ‘তুই যখন ভয় পাচ্ছিস, চল বাড়ি ফিরে যাই। এমনেও অনেক দূরে চলে আসছি।’
দুজনে কটেজের পথ ধরলাম। কিন্তু একটা কথা ওকে বুঝতে দেই নাই। আমিও তখন টের পাচ্ছিলাম, আড়ালে দাঁড়িয়ে কে যেন আমাদের দেখছে। এইটা ওকে বললে ও আরো ভয় পাবে। তাই কথাটা চেপে গিয়েছিলাম।
আমরা ফিরে আসছি, হঠাৎ পিছনে তাকিয়ে বিপ্লব চিৎকার করে উঠলো, ‘ঐটা কি?’
আমিও পিছনে তাকালাম। তাকিয়ে দেখলাম, আমাদের পথটা থেকে বেশ দূরে মানুষের মতো কি জানি একটা দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু একটু বেশি লম্বা। ঐটাকে দেখে মনে হচ্ছিলো, আমাদের দিকেই তাকিয়ে আছে ঐটা।
বিপ্লব বললো, ‘ভাই, কি করবো?’
আমি বললাম, ‘মনে হচ্ছে কোনো লোক। ভয় পাবার কিছু নাই। আমরা আমাদের মতো হাঁটি। দেখি ও কি করে।’
আমরা হাঁটতে শুরু করলাম। ঐ লোকটাও হাঁটতে শুরু করলো। আমরা দাঁড়ালাম, সেও দাঁড়ালো। আমরা হাঁটতে শুরু করলাম, আবার সে শুরু করলো হাঁটা।
সেসময়টায় বুঝলাম, ঐ লোকটার উদ্দেশ্য ভালো না। বিপ্লব ভয় পাওয়া গলায় বললো, ‘ভাইয়া, এখন কি করবো?’
আমিও তখন ভয় পেয়ে গেছি। ভয়টা লুকানোর চেষ্টা করলাম। পারলাম না। কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম, ‘এখন একটু আস্তে ধীরে হাঁটি। ভয় যে পেয়েছি ওকে বুঝতে দেয়া যাবে না। কটেজের কাছে গেলেই ঝেড়ে দৌড় দিবো।’
বিপ্লব রাজি হলো। আমরা আস্তে আস্তে হাঁটতে লাগলাম। কিছুদূর গিয়ে আমরা পেছনে ফিরলাম। দেখি, লোকটা আগের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে। একটুও আগায় নাই। আমাদের প্রাণে যেন পানি আসলো। বুঝলাম, লোকটা তাহলে এমনি এমনি হাঁটছিলো। আমাদের ফলো করছিলো
না। আমি আর বিপ্লব একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে হাসলাম। কি বোকা আমরা।
আমরা ফিরে চললাম। কিছুদূর হাঁটার পর বিপ্লব আবার পিছন ফিরলো। পিছন ফিরে সেই যে তাকালো, তাকিয়েই থাকলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কি হয়েছে রে?
বিপ্লব বললো, ‘ভাইয়া, লোকটা তো এখনো দাঁড়িয়ে আছে।’
আমি আবার পেছনে তাকালাম। আসলেই তো, লোকটা দাঁড়িয়ে আছে। আর, আমার যদি দেখার ভুল না থাকে, লোকটা একটু যেন লম্বা হয়েছে আরো।
আর তখনই, আমরা খুবই ভয় আর আতংক নিয়ে দেখলাম, লোকটা দৌড়ে আসছে আমাদের দিকে, মাথা দুপাশে দোলাতে দোলাতে, পাগলের মতো।লোকটার মুখে হাসি। হাসিমুখে সে দৌড়াচ্ছে। হাসিটা কি ভয়ংকর।
আমরাও দৌড়াতে শুরু করলাম। কিন্তু লোকটার সাথে পারছিলাম না। কোনো মানুষ এতো জোরে দৌড়াতে পারে আমার জানা ছিলো না। চোখের পলকে সে আমাদের একদম পিছে চলে এলো। ধরে ফেলবে। এমন সময় কটেজের আলো দেখলাম। আমরা যেন ঝাঁপিয়ে পড়লাম কটেজের বারান্দায়। পিছনে ফিরলাম। কেউ নেই লোকটা যেন মিলিয়ে গেছে বাতাসে।
আমরা প্রচন্ড ভয় পেয়েছিলাম সেই রাতে। কিন্তু কাউকে এই কথা বললাম না। সবাই বকবে, তাই।
পরদিন কটেজের কেয়ারটেকারকে ডেকে একা আমি কথাটা বললাম। সে রেগে গিয়ে বললো, ‘এতো বলার পরও বাইরে গেলেন কেন?’
আমি বললাম, ‘গিয়েই তো ফেলেছি, কিছু করার নাই আর। এখন বলেন, ঐ জিনিসটা কি?’
সে বললো, ‘বললে তো বিশ্বাস করবেন না, আপনারা শহরের মানুষ। পাহাড় খুব খারাপ এক জায়গা। এইখানে এমন অনেক জিনিস ঘটে, যা আপনারা স্বপ্নেও ভাবতে পারবেন না। কালকে রাতে আপনারা যাকে দেখসিলেন, ঐটা মানুষ না। স্থানীয় আদিবাসীরা ওকে গাডরাবাংগো বলে। হাজার হাজার বছর ধরে ও এই পাহাড়ে ঘুরে বেড়ায়। বছরের এই সময়টা সে পাহাড় ছেড়ে লোকালয়ে আসে মানুষ ধরার জন্য।’
জিজ্ঞেস করলাম, ‘মানুষ ধরে সে কি করে?’
তিনি বললেন, ‘জানে না, কেউ জানে না। সবাই শুধু জানে, যে মানুষটাকে সে ধরে নিয়ে যায়, সে আর ফিরে আসে না।’
ভয়ে আমার গায়ে কাঁটা দিলো। যে বিপদ থেকে কালকে রাতে ফিরে এসেছি, সেটা সম্পর্কে আমার ধারণাও ছিলো না। উনাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এইখানে আপনারা থাকেন কিভাবে?’
কেয়ারটেকার লোকটা চোখের পানি লুকিয়ে বললো, ‘খুব বিপদে আছি স্যার। এইখান ছাড়া কোথাও যাওয়ার উপায় নাই। পৈত্রিক বাসা স্যার। এই সময়টায় খুব ভয়ে থাকি। ঐ জিনিসটা শিকার না পেলে বন্ধ ঘরেও ঢুকে যায়। আদিবাসীরা ওর থেকে বাঁচার জন্য কতো তুকতাক করে। লাভ হয় না। তবুও ওদের সাথে লড়াই করেই তারা টিকে থাকে। আমরাও টিকে থাকবো স্যার। লড়াই করেই টিকে থাকতে হবে আমাদের।’
সেদিন আমরা সেই জায়গা থেকে চলে আসি। কয়দিন পর পেপারে দেখতে পাই, ঐ জায়গায় এক লোক নিখোঁজ হয়েছেন। রাতে বাসায় একা ছিলেন, তাকে একা রেখে ফ্যামিলির অন্যরা শহরে কোন একটা কাজে গিয়েছিলো। ফিরে এসে লোকটিকে আর পাওয়া যায় নাই। কোনো চিহ্নই নাই লোকটার। এখনো খোঁজ চলছে লোকটার। পুলিশ বলছে, পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
লোকটিকে আমি চিনি। আমাদের সেই কেয়ারটেকার। যে বাঁচতে চেয়েছিলো সেই ভয়ংকর জঙ্গলে।
2 Responses
Yo, pakjeto has some cool stuff going on. I use it sometimes, when I’m bored and there’s nothing on Tv. Could be better but it’s got potential, ya feel me? pakjeto
Hey there, been hitting up 7m ma cao lately. Keeps me in the loop on the scores. Good shout if you’re following the action!