কনে_বদল পর্ব০৬ এবং শেষপর্ব

‘আল্লাহ মহান। তিনি ন্যায়পরায়ণ।দুঃখীদের জন্য তার অসীম মায়া।আর অনিষ্টকারীদের জন্য আছে তার সীমাহীন ক্রোধ। তিনি নির্মম অত্যাচারী নমরুদকেও শেষ করেছিলেন।আর জলে ডুবিয়ে মে*রেছিলেন ফি*রাউন কে। সাইমুম নামের অসভ্য বদমা*শটাও তার যথার্থ পেলো!

পরদিন সকাল বেলা আমার কাছে কিছু না বলেই সাইমুম বাসা থেকে বের হয়ে গেল। আমার ফোনও দিয়ে গেল না আমার কাছে।।আমি বুঝতে পারছি আপু এখন দেখা করতে আসবে।তার সাথে মেসেজে কথা বলে নিবে সাইমুম।আপু বুঝতে পারবে না কিছুই। ভাববে আমিই কথা বলছি। কিন্তু ঠিক করে রাখা জায়গায় এসে দেখবে সাইমুম। তারপর আর আপুর কিছুই করার থাকবে না।সাইমুমের শিকার হবে সে।

আমি কেবল ডানাভাঙ পাখির মতো ছটফট করছিলাম।কিচেনে হাঁড়ি বসাতে যাইনি আজ। শাশুড়ি আজ কেন জানি একটু বেলা করে রুম থেকে বের হলেন। তারপর আমার দিকে ক’বার আড় চোখে তাকালেন। আমার খুব ইচ্ছে করছিলো শাশুড়ি মার কাছে সবকিছু খুলে বলতে। তবুও কেন জানি বলতে পারছিলাম না। শুধু ছটফট করছিলাম। একবার ভাবলাম শাশুড়ি মার ফোন নিয়ে আপুকে ফোন দিবো। কিন্তু শাশুড়ি মা যে প্রশ্ন করবে! জিজ্ঞেস করবে তোমার ফোন কোথায়?
আমি মিথ্যে বলবো।বলবো আমার ফোনে ব্যালেন্স নাই।
শাশুড়ি মা তখন তার ঘরের সামনে চেয়ারের উপর বসে আছে।রোদ পোহাচ্ছে। আমাকে দেখেও কিছু বলছে না।বিষয়টা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না।আমি এখনও রান্না ঘরে কেন যাইনি তা এতোক্ষণে তার জিজ্ঞেস করা উচিৎ ছিল। কিন্তু তিনি জিজ্ঞেস করছেন না কিছুই।আমি ভয়ে ভয়ে মার কাছে গেলাম। গিয়ে বললাম,’মা আপনার মোবাইলটা একটু দিবেন!’
শাশুড়ি মা জিজ্ঞেস করলেন,’কেন?’
তার কন্ঠ কেমন যেন লাগলো।বোঝা গেল আমার উপর তিনি ক্রোদ্ধ। আমার খুব ভয় লাগছে।এর আগে কখনো তিনি এমন করেননি!
আমি ভয়মাখা গলায় বললাম,’মা, বাড়িতে একটু ফোন করতাম। আমার ফোনে ব্যালেন্স নাই তো তাই আপনার কাছে আসলাম।’
শাশুড়ি মা আমার দিকে মুখ বেজার করে তাকালো।কী হলো কিছুই বুঝতে পারছি না।তার সামনে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে আমার খারাপ লাগছে। তাছাড়া আপুর কথা খুব মনে পড়ছে।না জানি সে এতোক্ষণে ভয়ংকর বিপদে পড়েই গেল কি না! এবার মন চাচ্ছে শাশুড়ি মার কাছে বলেই দেই তার পাপী ছেলের সব কীর্তিকলাপ। কিন্তু কী এক অজানা ভয়ে যেন বলতেও পারছিলাম না।
শাশুড়ি আমায় কেমন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। একেবারে মাথা থেকে পায়ের তালু পর্যন্ত।
আমি আরেকবার অনুনয়ের গলায় বললাম,’মা,একটু দিবেন আপনার মোবাইলটা!’
শাশুড়ি মা এবার উঠে দাঁড়ালো। দাঁড়িয়ে ধমকের গলায় বললো,’কবে থেকে এমন ভয়ঙ্কর মিথ্যে বলা শিখেছো হ্যা?’
আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।কী সব বলছে শাশুড়ি মা!
আমায় চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শাশুড়ি মা আবার বললো,’ফোন দিয়ে তুমি কাকে ফোন করবে?সত্যি করে বলো।’
আমার সবকিছু জড়িয়ে আসছে।চোখে সবকিছু অন্ধকার অন্ধকার দেখাচ্ছে। আমার বারবার মনে হচ্ছে শাশুড়ি মা কী আমায় অন্যকিছু সন্দেহ করছে?ভাবছে,আমি অন্য কোন ছেলের সাথে কথা বলবো?
কিন্তু এমন সন্দেহ তো তার করার কথা না। কোন ছেলের সাথে যদি কথাই বলবো তবে শাশুড়ির ফোন নিয়ে কেন করতে যাবো। নিজের ফোন দিয়েই করবো।এটা শাশুড়ির ভালো বোঝার কথা!
আমায় চুপ করে থাকতে দেখে শাশুড়ি মা এবার চোখ লাল করলো। তারপর বললো,’অনেক নাটক হয়েছে। অনেক!এই বাড়িটা একটা নাটক বাড়ি হয়ে গেছে। এই নাটক আমি বন্ধ করবো আজ। একেবারে চিরতরে বন্ধ করে দিবো!’
আমি এসবের কিছুই বুঝতে পারছি না। এ যেন এর আগে দেখা শাশুড়ি মা না।এ যেন অন্য এক রুদ্রমূর্তি ধারণ করা নতুন শাশুড়ি মা।যার রাগে মনে হচ্ছে আমি আজ পোড়ে যাবো!
এরপর শাশুড়ি আমায় বললেন,’ এখানে দাঁড়াও।আমি অবশ্য এক পায়ে ন*গ্ন হয়ে দাঁড়াতে বলবো না। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে উঁচু করে রাখা পা মাটিতে নামিয়ে ফেললেও বিছুটি পাতার গুঁড়ো গায়ে লাগাবো না।’
শাশুড়ি মার মুখ থেকে এই কথাগুলো শুনে আমার টনক নড়ে উঠলো।আমি জীবনে প্রথম বারের মতো সবচেয়ে বেশি কেঁপে উঠলাম।আর মনে মনে বললাম,এটা কী করে সম্ভব? শাশুড়ি মা এসব জানলো কী করে?
শাশুড়ি মা এবার বললো,’মেয়ে মানুষ হয়ে জন্ম নেয়া মানে নিজেকে গা*ধার পিঠ করে তোলা না!এইটা মনে রাখতে হবে মা।এটা মনে রাখতে পারলে তোমারে কোন শয়*তান পুরুষ কাবু করতে পারবে না।মনে রাখতে না পারলে তোমার সাথে যা ইচ্ছা তাই করবে।দাসী বাদীর চেয়েও খারাপ আচরণ করবে। ‘
আমি চুপ হয়ে থাকি।কথা বলার সাহস পাই না। কিন্তু এটা কিছুতেই বুঝে আসে না যে শাশুড়ি মা এসব জানলো কী করে!
এরপর শাশুড়ি মা নিজে থেকেই বললো,’আমি কিন্তু তোমার বিয়ের পরদিনই বিষয়টা খেয়াল করেছি। তোমার মুখ দেখেই আন্দাজ করে ফেলেছি গতরাতে তোমার উপর একটা ঝড় বয়ে গেছে। এরপর তোমায় নিয়ে যখন ছাদে গেলাম তখন খেয়াল করলাম তোমার শরীরের দিকে।বাতাস এসে তোমার শাড়ি উড়িয়ে নিচ্ছিলো।আর তুমি একটু পর পর জোর করেই শাড়ি দিয়ে পিঠের কাছে,পেটের একপাশে কী একটা ঢাকছিলে। তারপর আমি খুব গভীর ভাবে খেয়াল করলাম। খেয়াল করে দেখলাম তোমার পেটে পিঠে লাল লাল কিছু। আবার জায়গায় জায়গায় ফুলাও। তখনই আমার মনে সন্দেহ জাগলো।আর এই সন্দেহ থেকেই পরদিন রাতের বেলা সাইমুম যখন ফিরলো আর তোমরা ঘরে গিয়ে দরজা আটকে দিলে। তখন আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম তোমাদের দরজার কাছে।সব শুনছিলাম ওখানে দাঁড়িয়ে। সবকিছু শোনার পর নিজেকে ধিক্কার দিলাম।থুথু ছিটিয়ে দিলাম নিজের শরীরের উপর নিজেই। নিজেকেই নিজে বলছিলাম,কী এক অসভ্য জা*নোয়ার জ*ন্ম দিলি তুই! ছিঃ ছিঃ ছিঃ!
তারপর তুমি যখন চিৎকার দিয়ে উঠলে।আর অর্ধ চিৎকার দিয়েই থেমে গেলে। তখন ইচ্ছে করছিলো দরজাটা ভেঙে ভেতরে ঢুকে ওই কু*ত্তার বাচ্চাকে নিজের হাতেই খু*ন করি। কিন্তু আমি আরো কিছুর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। তারপর ওর মুখ থেকেই সব শুনতে পেলাম।তোমায় বোকা বানিয়ে ও তোমার বোনের ক্ষতি করতে চাইছে। এবং সকাল বেলা ওই উদ্দেশ্যে যাত্রাও করলো। কিন্তু এই যাত্রায় সে সফল হবে না।আমি সফল হতে দিবো না তাকে!’
আমি তখনও চুপ করে আছি। আমার সারা শরীর ঘামে ভিজে চুপসে গেছে একেবারে।আর ঠিক তখনই শাশুড়ি মার ফোন বাজলো।কেউ কল করেছে। শাশুড়ি মা ফোন রিসিভ করে বললেন,’কে বলছেন?’
ও পাশ থেকে একটা পুরুষ কন্ঠ তখন বললো,’আমি ওসি সোহাইল রহমান। আপনার দেয়া ইনফরমেশন অনুযায়ী আমি স্টাফ নিয়ে পরিত্যক্ত ভবনটাতে গিয়েছিলাম। এবং হাতে নাতে আসামীকে ধরেছি। আরেকটু দেরি করে গেলে ভয়ংকর কিছু হয়ে যেতো।আমি গিয়ে দেখি ছেলেটা ওই মেয়েটাকে ধরে টানা হেঁচড়া করছে। অর্থাৎ জোর জবরদস্তি করছে!’
শাশুড়ি মা বললেন,’আরেকটা ব্যাপার আছে। এই ছেলে আমার নিজের জন্মজাত সন্তান।তার সম্পর্কে আমার আরো অভিযোগ আছে। সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো সে আমার পুত্রবধূ অর্থাৎ তার স্ত্রীর উপর অমা*নুষিক অত্যাচা*র করেছে।নির্যা*তন করেছে।আমি নিজে থানায় আসবো।আমি নিজেই এসবের সাক্ষী।’
ওসির সাথে ফোন করার পর শাশুড়ি মা আমার একটা হাত ধরে টেনে তার কাছে নিলো। তারপর মিনতি করে বললো,’মারে, আমার পোড়া কপাল। আমার ঘর থেকে এমন ইব*লিশ জন্ম নিয়েছে আমি কল্পনাও করিনি। তুমি আমায় মাফ করে দেও মা।আমি এর আগে আমার ছেলের চরিত্র সম্পর্কে কিছুই জানতাম না!’
শাশুড়ি মা কাঁদছে।আমি মাকে জড়িয়ে ধরলাম। আমিও কাঁদছি। হাউমাউ করে কাঁদছি। কাঁদতে কাঁদতে আমি মাকে বললাম,’মা, আপনি সত্যি সত্যিই একজন মহান মানুষ।মহৎ মা!’
শাশুড়ি মা কান্নাভেজা গলায় তখন আমায় বললেন,’আমি তোমাকে নিজে ছেলে দেখে বিয়ে দিবো। কিন্তু তোমার প্রতি আমার একটা আদেশ থাকবে। স্বামীর অন্যায়কে কখনোই বরদাস্ত করবে না!মান সম্মান চলে যাবে এই ভয়ে নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিবে না!’
শাশুড়ি মার হাত ধরে আমি কাঁদলাম।জলে চোখ ভাসিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললাম,’মা,আমি কোনদিন স্বামীর অন্যায়কে প্রশ্রয় দিবো না। কখনোই না!’
শাশুড়ি মা আমায় তার বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো এবার। তারপর আমার কপালে চুমু খেয়ে বললো,’লক্ষ্মী মা আমার!’

Be the first to write a review

Leave a Reply

We’re sorry you’ve had a bad experience. Before you post your review, feel free to contact us, so we can help resolve your issue.

Post Review

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক গল্প