কাঁচের_চুড়ি পর্ব ০২

তীর আর তরীর বয়স মাত্র ২ বছর। ওদেরকে নিয়ে জামান যেনো অথই সাগরে পরেছে। শাহানার জন্য মন খারাপ করার সময়ও সে পাচ্ছেনা।ওদেরকে খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো এসব যেন একেকটা যুদ্ধ। আবার,একজনকে ঘুম পাড়ালে,আরেকজন উঠে যায়।কি এক যন্ত্রনা!এভাবে ২ দিন কেটে গেলো।এমন দুধের শিশু কি আর মা ছাড়া বড় করা যায়?জামানের বড় ভাই তাকে বলে আবার বিয়ে করতে। কিন্তু,জামানের মনে হয় শাহানা খুব শীঘ্রই ফিরে আসবে।তখন,নাহয় বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকিয়ে ওকে ক্ষমা করা হবে। আবার,জামানের এটাও চিন্তা হয় যে সে বাবা হয়েই তীর-তরীকে সামলাতে গিয়ে বিরক্ত হচ্ছে সেখানে অন্য আরেকটা মেয়ে আসলে না জানি কি অত্যাচারই না করবে বাচ্চা ২টার উপর। ভাবতেই তার বুক কেঁপে উঠে।আর,তীর আর তরীও ভীষণ জ্বালায়। জামান বিয়ে না করার সিদ্ধান্তই নিলো ভেবে চিন্তে।স্কুলের চাকরি টা ছেড়ে দিলো সে বাচ্চাদের দেখভাল করার জন্য।বাড়িতেই এখন সে ছাত্র পড়ায়। রোজগার যেমন কমেছে তেমন খরচও তো নেই এখন তেমন। গ্রামের সবাই জামানকে বোকা উপাধিতে ভূষিত করলো।সেসব যদিও সে কানে নেয়না। বাচ্চাদের কাছ থেকে দেখতে তার খুবই ভালো লাগে। বিশেষ করে যখন বলের মধ্যে পানি ছিটিয়ে ছিটিয়ে ২ জন গোসল করে।প্রথমে এই ভালোলাগার দৃশ্য বেশি সময় দেখতে গিয়ে বাচ্চাদের জ্বরও বাঁধিয়ে ফেলেছিল সে।দেখতে দেখতে ১ বছর কেটে গেলো। শাহানার কোনো খোঁজখবর মেলেনি।
……..
শাহানা আহসানের সাথে ঢাকায় থাকে ১টা ১ কামড়ার বাসায়। সেখানে আসবাব বলতে শুধু ১টা পুরানো খাট আর ১টা মিটসেফ।আহসান সপ্তাহে ২-৩ দিন এই বাসায় এসে থাকে।বাকি সময় নাকি কাজের জন্য অফিসে থাকতে হয়। শাহানা আস্তে আস্তে বুঝে ফেলেছে আহসান বিবাহিত।তার ১ম পক্ষের স্ত্রী আছে।শাহানা কে সে মিথ্যা কথা বলেছিলো এতো দিন।এখন এসব বুঝেই বা কি লাভ?যা ক্ষতি হওয়ার তো হয়েই গেছে।এখন তো সে চাইলেও আর বাড়ি ফিরতে পারবেনা।এদিকে আহসানের ব্যবহার ও দিন দিন খারাপ হচ্ছে।তার এখন তীর-তরীর কথা খুউব মনে পরে,মনে পরে ওদের বাবার কথাও!
তীর আর তরী খুব যন্ত্রনা করে।ওদের নামে প্রতিদিনই ওদের চাচীরা বিচার দেয় জামানের কাছে।জামানের রাগ হয়,প্রতিবার সে ভাবে ওদের বকবে কিন্তু ২ জনকে ধমকের স্বরে কিছু জিজ্ঞেস করলেই মুখগুলো এমন কাঁচুমাচু করে ফেলে যে বকার বদলে জামান ওদের আদর করে ফেলে।তীর খুব জেদী হয়েছে। সেদিন অ-আ ভুল লেখায় জামান বকেছে বিধায় সে শ্লেট ভেঙে ফেলেছে।ভাবা যায়…. আর তরী হয়েছে ভীষণ অভিমানী।জামান ১বার রাগ করে বলেছে,তুই এতো জ্বালাস…তোকে বিড়ালের কাছে দিয়ে আসবো যেন খেয়ে ফেলে।ওমা পরদিন সে নিজেই ১টা বিড়ালের সামনে দাঁড়িয়ে বলছে,আমাকে খেয়ে ফেলো।আমাকে কেউ ভালোবাসেনা।
জামান এসব দেখে আর শাহানার জন্য আফসোস করে ,ইস!কত সুন্দরতম দৃশ্যগুলোই না সে মিস করলো!
দেখতে দেখতে ৫ বছর কেটে গেল। এবার জামানের বড় ভাই খুব রেগে গেলেন, বললেন আর অপেক্ষা না। এবার তোকে বিয়ে করতেই হবে।তীর আর তরীও খুব খুশি।তারাও বাবাকে বলছে,যেনো বাসায় ১টা মা নিয়ে আসে। অবশেষে,ভাইয়ের পছন্দ মতো ১টা মেয়ের সাথেই জামানের বিয়ে ঠিক হলো।জামান এখন ভাইয়ের ব্যবসায় সহযোগিতা করে।যে মেয়েটার সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে তার নাম আয়না।আয়নাকে দেখে জামানের মনে হয়েছে মেয়েটা মাতৃসুলভ ই হবে।বিয়ের দিনও ঠিক হয়ে গেলো।
এদিকে আহসানের ১ম স্ত্রী শাহানার ব্যাপারে জানতে পেরে খুব অশান্তি করেছে। শাহানার বাসায় নিজের ভাইদের নিয়ে এসে খুব অপমান করেছে শাহানা কে। শাহানা কি করবে কিছুই বুঝতে পারছিলো না। আহসান ও আর এই বাসায় আসে না,টাকাও দেয় না।আর সহ্য করতে না পেরে শাহানা ফিরে আসে গ্রামে।জামানের পায়ে ধরে ক্ষমা চাইলে কি জামান তাকে মাফ করবে না ,অন্তত তীর-তরীর জন্য।সন্ধ্যা বেলায় শাহানা গ্রামে পৌঁছায়।বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে দেখতে পায় বাড়িতে নতুন বউ এসেছে। জামান আবার বিয়ে করে ফেলেছে। নতুন বউকে ঘিরে মা-মা করে লাফাচ্ছে দুটি শিশু।আহা!কি সুন্দর বাচ্চা দুটি।এরাই তীর-তরী। শাহানার চোখ ভর্তি হয়ে যায় জলে।চলে যাওয়ার আগে আরো একবার তাকায় মায়াবী শিশু দুটির দিকে।মনে মনে মাশাআল্লাহ বলে তার নজর না লেগে যায় তীর-তরীর উপর………
নতুন মা পেয়ে তীর আর তরীর খুশি যেন ধরে না।আয়নাও তাদের অনেক আদর করে।নিজ হাতে খাইয়ে দেয়‌,ঘুম পাড়ায়।দেখতে দেখতে এক বছর কেটে যায়। জামানের বড় ভাই বলে ,এবার তুই বাচ্চাদের চিন্তা বাদ দিয়ে আমার সাথে ব্যবসার কাজে শহরে চল।জামান প্রথমে যেতে চায় না, কিন্তু আয়না তাকে আশ্বস্ত করে।জামান তের দিনের জন্য ভাইজানের সাথে শহরে যায়। কিন্তু,তার মন খারাপ করে বাচ্চাদের জন্য।যদিও আয়না তাদের ভালোই খেয়াল রাখে।
জামান অনেক জিনিসপত্র কিনে বাড়ি ফিরে অনেক রাতে।এসে দেখে আয়না খুব সাজগোজ করে বসে আছে। জামানকে দেখে সে খুব লাজুক কন্ঠে বললো,জানেন ভাবী আমারে জিগায় কবে আমার বাচ্চা হবে?এক বছর তো হইয়াই গেলো।
জামান অবাক হয়।বলে,বাচ্চা তো আমাদের আছেই।
আয়না বলে, কিন্তু তীর-তরী তো আমার নিজের সন্তান না।আমি নিজের সন্তান চাই।
এই কথা শুনে আকস্মিক ভাবে জামান খুব রেগে গেলো।হাতের কাছে থাকা পানির গ্লাসটা ফেলে দিলো নিচে।ধমকের স্বরে বললো,তোমাকে আমি বউ করে এনেছি আমার তীর-তরীর মা বানানোর জন্য।এই কথা ভুলবা না।তুমি কিভাবে বললা ওরা তোমার সন্তান না।
জামানের এমন রাগী রুপ আয়না আগে দেখেনি।ধমকের চোটে বাচ্চাদের ঘুম ও ভেঙে গেছে।তারাও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।আয়না কাঁদতে কাঁদতে বাইরের ঘরে চলে গেলো। জামান বাচ্চাদের ঘুম পারালো।সারা রাতে আয়না আর এঘরে আসলো না।জামানের মন খারাপ হতে লাগল।আয়নার সাথে খারাপ ব্যবহার করা উচিৎ হয়নি।ওর তো কোনো দোষ নেই।দুইটা যমজ বাচ্চা পালা কি এতোই সোজা?তবুও তো আয়না কত সুন্দর বাচ্চাদের সামলায়।তার নিজের প্রতি রাগ হতে লাগলো।
পরদিন সকালে জামানের ঘুম ভাঙলো আয়নার কান্নার শব্দে।চোখ মেলে দেখে আয়না মেঝেতে বসে কাঁদছে। জামানের মনটা মায়ায় ভরে গেলো।কালকে রাতের জন্য ক্ষমা চাইলে শুনলো কান্নার কারন টা অন্য।তীর নাকি তাকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলেছে।জামান প্রথমে ব্যাপারটা হেসে উড়িয়ে দিতে চাইলেও আয়নার কান্নার কারনে তীরকে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,এমন কথা সে কেন বলেছে….তীর তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলল,মা আমাকে বলেছে তাই আমিও বলেছি। আমাদের বাড়ি থেকে আমাকে বের হয়ে যেতে বলে কেন?
জামান তীরকে ধমক দেয়।আয়না এসে বলে,ও তো ঠিকই বলেছে আমি এ বাড়ির কে? আমার তো কেউই নাই।আপনে না থাকলে এইখানে আমার থাকার অধিকার কি?
জামান দীর্ঘশ্বাস ফেলে।আয়নার কথার ইঙ্গিত জামান বুঝতে পারে। পরদিন বড় ভাবী জামানকে বাচ্চার কথা বলে।বুঝায়,প্রত্যেকটা মেয়েরই স্বপ্ন থাকে সন্তান জন্মদানের। অবশেষে, জামানও আয়নার দিক থেকে ভাবে।
আয়না গর্ভবতী হয়।সঙ্গত কারণেই জামান এখন আয়নার একটু বেশি খেয়াল রাখে।তীর-তরী এতকিছু বোঝেনা।তাদের মনে হয় তাদের বাবা তাদের আর আগের মত ভালোবাসে না।ছোট বেলা থেকেই তারা বাবার একচেটিয়া ভালোবাসা পেয়ে এসেছে।এখন সেটার ভাগ আর কাউকে দিতে মন চায়না ওদের।জামান সারাদিন কাজে ব্যস্ত থাকে।বাড়িতে ফিরলে আয়নাকে সময় দেয়।তীর এখন ছোটো ছোটো কারনেও চেঁচামেচি করে।আয়না তাকে বকে,জামানও বকে। কিন্তু,তাও ছেলেটা কেমন যেন হয়ে গেছে।আয়না জামানকে বলে, আপনার অতি আদরে ওরা বাঁদর হয়েছে।
জামানের মনে হয় বাচ্চাদের আরো বেশি সময় দেয়া দরকার। কিন্তু,সে পেরে ওঠেনা।
দেখতে দেখতে আয়নার কোল আলো করে জন্ম নেয় একটা পুত্র শিশু।নাম রাখা হয় টগর। তীর-তরীর খুব ভালো লাগে নতুন আরেকটা প্রান দেখে। কিন্তু,বাবা কেন একে কোলে নিয়ে এতো আদর করছে? ওদের ভীষণ কষ্ট হয়।তরী বলে,বুঝলি তীর এর জন্যই বাবা আর আমাদের ভালোবাসে না।তীরের চোখ টলমল করে ওঠে।তীর আর তরী এখন বাবা-মায়ের সঙ্গে শুতেও পারেনা। তাদের পাশের ঘরের মেঝেতে শুতে হয়।কারন,৫ জন এক খাটে জায়গা হয়না। একদিন টগরকে রেখে আয়না যখন বাইরে গেছে তীর তখন টগরের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।মুখে বলে ,তুই একটা শয়তান বাচ্চা।মরে যা তুই।
আয়না দরজায় দাঁড়িয়ে একথা শুনে ফেলে।তড়িৎ গতিতে এসে তীরকে চড় মারে।রাতে জামানের কাছে বিচার দেয়,তীর টগরের গলা চেপে ধরেছিল।আরেকটু হলে টগর মরে যেতো।
জামান রাগে কাঁপতে থাকে।পাশের রুমে গিয়ে বিছানা ঝাড়ু দিয়ে তীরকে ইচ্ছা মতো মারে।তীরের ফর্সা শরীর লাল হয়ে যায়।তীর চেঁচিয়ে বলে,তোমরা কেউই আমাদের ভালোবাসো না।আর ইনি আমাদের মা নন। তাই, এভাবে মিথ্যা কথা বলতে পারে।
আয়না দ্বিগুণ চেঁচিয়ে বলে,তোদের মা অনেক ভালো।এর জন্য আরেক লোকের লগে ভাগছে।
রাত বাড়লে জামানের মায়া লাগে। আসলেই তো তীর আর তরীকে সময়ই দেয়া হয়না।সে পাশের ঘরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু, দরজার কাছে গিয়ে শোনে,তীর তরীকে বলছে,এই টগরকে আমি মেরেই ফেলবো তরী।মেরেই ফেলবো।
জামান রাগে ও ঘরে প্রবেশ করে না।সে ভাবে তীর এতো খারাপ কিভাবে হলো?এইটুকু ছেলে। আয়না সবসময় বলে তীর নাকি শাহানার মতো খারাপ হয়েছে।
টগর বড় হচ্ছে।আয়না জামানকে বলে তীর-তরীকে ইংলিশ ভার্সন থেকে বাড়ির কাছের গ্রামের স্কুলে নিয়ে আসে।তার মতে,এতো টাকা খামোখা বেতন দেয়ার মানে হয়না। তীর আর আয়না কে মা ডাকেনা।
একদিন আয়না জোর করে তরীর চুল কেটে দিতে চায়।কারন,এতো ছোট মেয়ে খামোখা বড় বড় চুল রেখে তেল-শ্যাম্পুর খরচ বাড়ায়।তরী কান্না করে।তীর আর সহ্য করতে পারে না। আয়নার হাত থেকে টানাটানি করে ক্যাঁচি নিতে চায়। হঠাৎ, আয়নার হাতে পোস লেগে রক্ত বের হয়। আয়না সেটা বা্ঁধেনা। জামান ফিরলে কাঁদতে কাঁদতে জামানকে দেখায়।আজ, জামান ভেবে এসেছিল তীর-তরীকে নিয়ে মেলায় যাবে। কিন্তু,এ ঘটনায় সে সিদ্ধান্ত বদলায়।২ জনকে ডেকে বকা দেয়।
রাতে মেঝেতে শুয়ে ২ ভাই-বোন একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে।
পাশের রুম থেকে কত কথার আওয়াজ আসছে।আয়না টগর সারাদিন কি কি করেছে তা বলছে।আর,সেসব শুনে জামান হো হো করে হাসছে।
তরীর চোখে পানি আসে।তীর বলে, আমি আছি তো তরী……..

Be the first to write a review

2 Responses

  1. K9winapp, huh? Downloaded the app. It’s pretty smooth, runs well on my phone. Had a few spins on some of the newer games. Seemed legit. Good for mobile gaming on the go. Give it a look: k9winapp!

Leave a Reply

We’re sorry you’ve had a bad experience. Before you post your review, feel free to contact us, so we can help resolve your issue.

Post Review

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক গল্প