কাঁচের_চুড়ি পর্ব ০৩ এবং শেষ পর্ব

দেখতে দেখতে টগরেরও স্কুল যাওয়ার বয়স হয়ে গেলো।তীর-তরীর এখন তেরো বছর বয়স। জামান এই কটা বছর খুবই ব্যস্ততার মধ্যে কাটিয়েছে ব্যবসা নিয়ে।কারন, তার বড় ভাই মারা গেছে।তীর-তরীর দিকে নজর দেওয়ার সময় তার হয়েই ওঠেনা।ঘরের প্রায় সমস্ত কাজই তরী করে।এর জন্য আয়না তাকে প্রতিদিন স্কুলেও যেতে দেয় না।টগর কে স্কুলে ভর্তি করানোর সময় আয়না অনেক নামী-দামি একটা স্কুলের ফর্ম আনলো। জামানও বাঁধা দিলো না।এতে তীর খুবই ক্ষিপ্ত হলো।বলল, বাবার কাছে নাকি সব সন্তান সমান?তাহলে আমাদের কেন ভালো স্কুল থেকে ছাড়িয়ে এনেছিলে?টগর কে এখন ভালো স্কুলে ভর্তি করাতে দিবো না আমি।
তীর টগরের ভর্তির ফরম ছিঁড়ে ফেলে।জামান সাহেব তীরকে থাপ্পর মারে।তীর আরো জোরে চিৎকার করে ওঠে।এইসব হলো ওদের পরিবারের রোজকার ঘটনা। আয়না জামানকে অভিযোগ করে,তীরকে তার ভয় লাগে।তীর কোনদিন টগরকে আর তাকে মেরে ফেলবে। জামান এসব শুনতে শুনতে ক্লান্ত।এদিকে তার ব্যবসায়ও বিরাট লস হয়েছে।ভাতিজারা তাকেই দায়ী করছে।এবং বলেছে লসের টাকা ফেরত দিয়ে নতুন কাজ খুঁজতে। জামানের পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সরে গেলো।একে এতো চিন্তা তার উপর বাড়ির ঝামেলা।জামান কার বিপক্ষে যাবে?তীর-তরী তার সন্তান আবার আয়না আর টগরও তো তার স্ত্রী সন্তান।
তীর এমন হয়ে গেল কেন জামান বুঝতে পারে না।সে আয়না কে তো কবেই মা ডাকা বন্ধ করেছে , একবছর হলো তাকেও বাবা ডাকেনা।আর,তরী সে তো তীর ছাড়া দুনিয়ার সবাইকে ভয় পায়।এমনকি জামানকেও,বাচ্চা টগরকেও।কি থেকে কি হয়ে গেলো।
ভাবতে ভাবতে জামান বাড়ি ফিরে দেখে আয়না আর টগর নেই। তীরের সাথে ঝগড়া করে বাবার বাড়ি চলে গেছে।জামান তীরের সাথে প্রচন্ড রাগারাগী করে।তীর ও সমান তালে রাগ দেখায়। চিৎকার করে বলে,আপনি শুধু এটাই দেখলেন আপনার বউ চলে গেছে?আমার বোনকে যে কাজের মেয়ের মতো খাঁটায় তখন কি আপনার চোখ বন্ধ থাকে।
তীর তরীর হাত দুটো মেলে ধরে জামানের সামনে। সেখানে পোড়া,কাটার কত্তগুলো দাগ।
জামানের মায়া লাগে।মেয়েকে জড়িয়ে ধরতে চায়। তীর চেঁচিয়ে বলে, আমার বোনের জন্য আপনার দরদ দেখাতে হবে না।আপনি আপনার বউ-বাচ্চার প্রতি দেখান গিয়ে।
আবার,বাবা-ছেলের মধ্যে ঝগড়া বেঁধে যায়। জামান বাড়ি থেকে চলে যায়।তরী তীরকে বোঝায়।যদিও তীর তার কথা পাত্তা দেয়না। জামান আয়নাকে ফিরিয়ে আনতে যায়। আয়নার বড় ভাই জামানের ব্যবসা মন্দার কথা শুনে তাকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেয়। এদিকে,তীর আর তরী একাই বাসায় থাকে। ওদের কাছে অবাক লাগছিলো।কারন,কেউ ওদের উপর চেঁচামেচি করছে না।বকছে না।মা চরিত্রহীন বলে খোঁটা দিচ্ছে না।২ জন বসে বসে ছোট বেলার গল্প করছিল। ছোট বেলায় তারা নিজেদের নাম ভুল করতো খালি।তীর নিজের নাম লিখতে গিয়ে তরী লিখে ফেলতো।আর তরী লিখতো তীর।কারন,২ জনের নামই এক। শুধু ১টা ী কার এদিক-ওদিক।এসব নিয়ে হাসাহাসি করার সময় ওরা হঠাৎ লক্ষ্য করলো দরজার ফাঁক দিয়ে কেউ ওদের দেখছে। এরপর ওরা দরজা খোলায় সেই মহিলা টি হকচকিয়ে ওঠে। কুচকুচে কালো ১টা বয়স্ক মহিলা।চুল-টুল জট পাকানো। মুখ ঢেকে রাখে।এই মহিলা কে ওরা আগেও দেখেছে স্কুল যাওয়ার সময়।ইনি ওদের প্রায়ই ফলো করে।তীর জিজ্ঞেস করল, আপনি কি চান? মহিলা আমতা আমতা করে বলে ভিক্ষা করতে এসেছি।
তীর রাগত স্বরে জিজ্ঞাসা করে,তাহলে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে আমাদের কথা শুনছিলেন কেন?
মহিলাটি সে প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বলে,তোমরা ২ জন অনেক সুন্দর। তোমাদের একটু ছুঁয়ে দেখি?
তীর হেসে ফেলে।বলে,আমরা সুন্দর? আমাদের বাবার বউ রোজ বলে আমাদের শয়তানের মতো দেখা যায়।
তরী ভিক্ষা দেয়ার জন্য চাল এনে দেখে মহিলার কাছে ব্যাগ নেই। ওদের সন্দেহ হয়। মহিলাটি বলে উনি নাকি চাল নেন না।টাকা নেন।
তীর আর তরী ঘরে কোথাও টাকা পায়না। শেষে ওর বাবার ১টা ছোট ট্রাংক আছে সেটা খোলে টাকার আশায়। কিন্তু, সেখানে টাকা নেই। অনেক গুলো চিঠী আছে শাহানা কে লেখা।আর,দুই ডজন কাঁচের চুড়ি।
এই চুড়ি গুলো আরো আগে আয়না পরতে চেয়েছিল কিন্তু জামান দেয়নি। তীর তাই হিংসা করে বলে ,এই চুড়িগুলো উনাকে দিয়ে দে, বাবার স্বাধের চুড়ি।নিবে কিনা কে জানে? ভিখারি মহিলা টি হাসিমুখেই চুড়িগুলো নেয়।আর, হঠাৎ ওদের ২ জনকে জড়িয়ে ধরে ফেলে।এমন ময়লা কাপড় পরা রাস্তার মহিলা ওদের জড়িয়ে ধরলো কিন্তু, ওদের একটুও খারাপ লাগলো না।বরং,মনে হলো এই ছোঁয়াই তো ওরা পেতে চেয়েছে এতো দিন। মহিলাটি দৌড়ে কাঁদতে কাঁদতে চলে যায়…২ ভাই-বোন নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকে। হঠাৎ,কি মনে করে বাবার ট্রাংক আবার খোলে। ঘাঁটাঘাঁটি করে ১টা ছোট পুরানো ছবি পায়।ছবির মেয়েটা অনেক সুন্দর। কিন্তু,তবুও ওরা বুঝে গেলো একটু আগে যে এসেছিল সে আসলে কে।
তরী ‘মা’- বলে চিৎকার করে ওঠে।সে ঘর থেকে বের হয়ে যেতে চায়। তীর তরীর সাথে রাগারাগি করে।বলে, আমাদের কোন মা-টা নেই।যে ২ বছরের বাচ্চাদের কথা না ভেবে চলে যেতে পারে তার মা ডাক শোনার অধিকার নেই। তরী জানে, এগুলো শুধু তার মুখের কথা।তরী কাঁদতে থাকে। কেন, তাদের সাথেই আল্লাহ এমন করলো।তীর চোখের পানি আটকাতে অনেক চেষ্টা করে কিন্তু পারে না। পরদিন, জামান আয়নাদের নিয়ে ফিরে আসে। আয়নার ভাই জামানকে নতুন করে ব্যবসা শুরুর জন্য টাকা দিয়েছে তাই আয়নার শক্তি যেন দ্বিগুন বেড়ে গেছে।আসার পর থেকে আয়না ওদের সাথে খারাপ ব্যবহার করছে।আর, জামানও এখন কিছুই বলছে না আয়না কে। আবার তীর আর আয়নার সেই পুরোনো ঝগড়া। ভাঙচুর। মারামারি।
আয়নার অভিযোগ, কান্নাকাটি। দিনশেষে রাগ করে জামান তীরকে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলে। তীর খুবই অবাক হয়।এতো দিন আয়না বললে সে গায়ে মাখতো না।আজ, তার বাবাই বলছে…. তীর ঘরে গিয়ে তার বইখাতা আর কয়েকটা ড্রেস নিয়ে বেরিয়ে আসে।তরী কাঁদে। বলে,তুই না থাকলে আমিও থাকবো না। ওরা ২ জন ই চলে যায়। কিন্তু, ওদের বাবা পিছু ডাকে না।ওরা ভেবেছিল,বাবা ওদের ডাকবে,যেতে বারন করবে। দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরবে। কিন্তু,সেসব কিছুই হলোনা।ওরা ষ্টেশনে এসে বসে থাকে।আর যাই করুক আয়নার সংসারে আর ফিরবে না। তীর বলে,বুঝলি তরী আমরা হলাম ও বাড়ির আগাছা।আর ওরা হলো পাকাপোক্ত ১টা গাছ। ওদের খুব অসুবিধা হচ্ছে আমাদের জন্য।হবেই তো বল। বাবার বউ-বাচ্চা আছে।হ্যাপি ফ্যামিলি। তার,মধ্যে আমরা হলাম উটকো ঝামেলা। মায়ের ই বা দোষ কি? নিজের স্বামী-পুত্র নিয়ে সংসার করছে তার ই বা আমাদের ভাল্লাগবে কেন?
তরী অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়।তীর কতদিন পর আয়না-জামানকে মা-বাবা ডাকলো।তরী বলে,তবে দোষ কার? তীর বলে , আমাদের কপালের। বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। জামানের ভাবী এসে জামানকে বলে,”১টা জিনিস মনে রাখবা কাউরে ভালোবাসলে সেইটা বারবার তাকে বলতে হয়, চোখে আঙুল দিয়ে দেখাইতে হয়। তুমি যদি ভাবো, আমি মনে মনে ভালোবাসমু আর অপরপক্ষ এমনি বুঝবো।এটা ভুল।তীর-তরীকে তুমি অনেক ভালো বাসো কিন্তু লাভ কি?ওরাই তো বুঝলো না তোমার ভালোবাসা…তাইলে, ভালোবেসে লাভ কি?ওরা তো এতটুকুই জানবে ওদের বাবা ২য় বউয়ের জন্য ওদের সাথে খারাপ ব্যবহার করে। ওদের বাবা যে ওদের কথা ভেবে বিয়ে করতে চায় নি, বাচ্চা নিতে চায়নাই এইসব তো ওরা কোনো দিন জানব না।তাই, কারো জন্য ত্যাগ করলে তা শোনানো লাগে।”
জামান চোখের পানি মুছে ওদের খুঁজতে বের হয়। আয়নার বাঁধা সে শোনে না।ষ্টেশনে গিয়ে দেখে, কয়েকটা ফালতু ছেলে তরীকে হেসে হেসে কিসব যেন বলছে। জামান সেই ছেলেগুলো কে ধমকাতে যাবে অমন সময় তীর পানির বোতল নিয়ে চলে আসে ।সে মেবি পানি আনতে গিয়েছিলো।সে এসে চিৎকার করে ছেলেগুলোর উপর। ছেলে গুলো হকচকিয়ে ওঠে,এতো ছোট ছেলের গলায় এতো জোর। তীর ধমকে ছেলে গুলো কে বিদায় করে।শক্ত করে বোনের হাত ধরে। জামানের চোখে পানি চলে আসে।এতোটা শক্ত করে তরীর হাত ধরার ক্ষমতা তারও নেই।কারন,সে যে শ্বশুর বাড়ির টাকায় চলছে। আয়না ম্যাসেজ পাঠিয়েছে ,তীর-তরীকে ফেরত আনলে সে টগরকে নিয়ে চলে যাবে। জামান দূর থেকেই অসহায় এর মতো তীর তরীকে দেখে।তীর তরীকে বলে , “তুই ভয় পাবি কেন?তোর ভাই আছেনা?বাবা-মা নেই তো কি হইছে? তোর ভাই-তো আছে।” তরী হাসে। নিজের ওড়না দিয়ে বৃষ্টিতে ভেজা তীরের চুল মুছে দেয়।বলে,তুই তো জ্বর বাঁধাবি।তরী যেন শুধু তার কিশোরী বোন নয়,তার মমতাময়ী মা-ও।
জামান চেয়েই থাকে। কে বলবে তীর চৌদ্দ বছরের কিশোর?নাহ,সে কোনো সাধারণ কিশোর নয়,সে ভাই!সে বোনের ঢাল!
জামান ২ জনের জন্য মন ভরে দুয়া করে।ভাবে,ইশ!যদি শাহানা চলে না যেতো…ষ্টেশনের কোনায় বসে থাকা ১ ময়লা চাদরে আবৃত মহিলাও ভাবে,ইশ আমি যদি না চলে যেতাম!আমি যদি জামানের সংসার ছেড়ে যাওয়ার ভুল না করতাম!
সে তাকিয়ে থাকে।দুয়া করে তীর-তরীর জন্য মন ভরে।তার হাতে কাঁচের চুড়ি।আরো, অনেক বছর আগে এগুলো জামান তার জন্য ই কিনেছিলো!

Be the first to write a review

2 Responses

Leave a Reply

We’re sorry you’ve had a bad experience. Before you post your review, feel free to contact us, so we can help resolve your issue.

Post Review

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক গল্প