ঘোড়ারচাল (দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)

শফিকের কেমন অদ্ভুত অনুভুতি হচ্ছিল। এই পাথরের শো পিস তার কাছে শায়লাকে ফিরিয়ে আনবে ভাবতেই তার অবিশ্বাস্য লাগছে। লোকটা তাকে বোকা পেয়ে ভুংভাং বুঝিয়ে চলে গেল না তো? কিন্তু লোকটার স্বার্থ কি? টাকা পয়সা তো নিলনা কিছু। নাকি এই ঘোড়ার মধ্যেই কোন ট্রিক্স আছে? আজকাল কত ধরনের ট্রিক্স বের হয়েছে চুরি ছিনতাইয়ের। দেখা যাবে এই ঘোড়া নিয়েই বিরাট ঝামেলা হয়ে গেল, ঘোড়া শায়লাকে ফিরিয়ে আনবে এই ধারনাকে এখন হাস্যকর লাগছে।
সে একবার ভাবল ঘোড়াটা জোরে ছুঁড়ে হাতির ঝিলের পানিতে ফেলে দেবে , ফালতু আপদ বিদায় হোক। পরে কি মনে করে সে ঘোড়াটা পকেটে রাখল। দেখা যাক আজ রাতটা, পরে না হয় ফেলে দেয়া যাবে।
রাতে সে তার ভাড়া করা রুমে ফিরল। একটা ছয়তলা বিল্ডিঙয়ের চিলেকোঠার দুইটা রুম ভাড়া নিয়ে আছে তারা। এক রুমে সে আর তার ছোট ভাই সিফাত থাকে। অন্যরুমে তার দুই বন্ধু থাকে। সিফাত বই পড়ছিল, সামনে তার এইচ এসসি পরীক্ষা। সিফাতের দিকে তাকিয়ে শফিক একটু লজ্জা পায়। আজ বিকেলে সে হুট করে আত্মহত্যা করতে যাচ্ছিল অথচ সিফাত তার দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের বাবা মারা গেছেন, মা থাকেন গ্রামে। বাবার পেনশনের টাকায় মা চলেন। শফিক ছোট একটা চাকরি করে সেটা দিয়ে চলে দুইভাই। সে না থাকলে সিফাত হুট করে বিপদে পড়ে যাবে।
সিফাত তাকে দেখে বলল, তোমাকে এত ক্লান্ত লাগছে কেন ভাইয়া? এতক্ষণ কোথায় ছিলে ? আজ এতো দেরী করলে কেন?
শফিকের আবার লজ্জা লাগল, সে বলল, ছিলাম একটু কাজে। তুই খাইছিস?
সিফাত মাথা নাড়ল। শফিক জানে সে বাসায় না ফেরা পর্যন্ত সিফাত খায় না কখনও, অপেক্ষা করে। সে বলল, চল খেয়ে নেই।
ঘুমাতে যাবার আগে শফিকের ঘোড়ার শো পিসের কথা মনে পড়ল। সে কৌতূহল নিয়ে ছোট পাথরের ঘোড়াটা ছাদে রেখে এসে ঘুমিয়ে গেল।
পরদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে ছাদে চলে গেল শফিক। শো পিসের ঘোড়াটা নেই। ছাদে ভালো করে খুঁজেও পেল না সেটা। হতে পারে ভোরে তার আগেই কেউ ছাদে এসেছিল, চোখে পড়ায় নিয়ে গেছে ঘোড়াটা অথবা ছাদ থেকে পরে গেছে কোন ভাবে। সকালের এই তীব্র সূর্যের আলোতে ঘোড়াটার কথা ভেবে হাসি পাচ্ছে তার। লোকটা কেন তাকে ঘোড়া ধরিয়ে দিল বোঝা যাচ্ছে না, তার জোড়াজুড়ি থেকে বাঁচার জন্য হয়ত। এই ঘোড়া শায়লাকে আনবে কিভাবে, নিজেই গায়েব হয়ে গেছে।
ঠিক এক ঘন্টা পর অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে সে ছাদে এসে দাঁড়িয়েছিল। চিন্তিত ভঙ্গিতে গতকালের লোকটা কথা ভাবছে। ব্যাটা তাকে ভালই বুঝিয়ে ফেরৎ পাঠিয়েছে নাহলে এতোক্ষনে হয়ত তার লাশ খুঁজে ফিরত সিফাত। এই সময় তার বন্ধু হিমুল এসে বলল, বাসায় একটা মেয়ে এসেছে, তোকে খুঁজছে। শফিকের বুক ধ্বক করে উঠল, কে এসেছে তার কাছে? শায়লা? সেটা তো অসম্ভব ব্যপার । তার ইতিমধ্যে বিয়ে হয়ে যাওয়ার কথা। তাহলে কে আসবে? ওই পাথরের ছোট ঘোড়া কি সত্যিই কাজ করে?
শফিক বাসায় ঢুকে বিস্মিত হয়ে গেল। শায়লা বসে আছে।
শায়লার হাতে ছোট ব্যাগ। সে বলল, শফিক তোমাকে ছাড়া আমি থাকতে পারব না, তাই চলে এলাম। গতকাল রাতে এক ফোঁটা ঘুমাতে পারিনি, সামান্য ঘুমালেই তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছি আমি , একটা সাদা ঘোড়ায় চড়ে তুমি আমাকে নিয়ে যাচ্ছ, আমি আসলেই ভীষণ ভুল করেছিলাম, চল আজই আমরা বিয়ে করব, বাসায় ফিরব না আর। তোমার সাথে থাকব আমি এখন থেকে।
শফিক ভীষণ বিস্মিত হলো। খুশীও হলো দারুন। সে দ্রুত শায়লাকে বাসার ভিতরে নিয়ে গেল। সিফাত আগে থেকেই শায়লাকে চিনত, কিন্তু অন্য রুমের বন্ধুরা শায়লাকে দেখেনি কখনও, তারা দ্রুতই শায়লাকে আপন করে নিল, সেদিন সমস্ত কাজ বাদ দিয়ে শফিক আর শায়লার বিয়ে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল সবাই। সারাদিন সবাই ছোটাছুটি করে কাজী অফিসে নিয়ে গিয়ে তাদের বিয়ে দিল।
হৈচৈ আর ব্যস্ততা শেষে সন্ধ্যায় সবাই তাদের দুই রুমের বাসায় ফিরল। বন্ধুরা শফিকের রুমটাকে চমৎকার করে সাজিয়ে দিয়েছে। শফিক আর শায়লা তাদের রুমে বসল। শফিকের খুবই ক্লান্ত লাগছিল। একটা অদ্ভুত উত্তেজনাও জড়িয়ে আছে শরীরে। সারাদিন কি অবিশ্বাস্য গেল ভেবেই অবাক লাগছে।
শায়লা হঠাৎ বলল, শফিক আমার খুব খারাপ লাগছে , বাসার কাউকে না বলে বিয়ে করাটা ঠিক হয় নি। আব্বা আম্মা ভীষণ কষ্ট পাবে।
শফিক কিছু বলল না। শায়লা আবার বলল, জানো আমার গিলটি ফিলিংস হচ্ছে। দাঁড়াও বাসায় একটা ফোন করি।
শায়লা বাসায় ফোন করার আধা ঘন্টা পর শায়লার বাবা এসে উপস্থিত। সবার হতভম্ব মুখের উপর দিয়ে শায়লা তার বাবার সঙ্গে চলে গেল। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল না যাবার সময় তার কোন দ্বিধা কাজ করছিল। স্বাভাবিক ভাবে সে আজ কেনা নতুন শাড়িটা পরা অবস্থাতেই হেঁটে চলে গেল।
শফিকের বন্ধু রিপন এসে বলল, আরে ব্যপার না বিয়ে হয়ে গেছে ব্যস! এখন একটু টানা পোড়ন চলবে কিছুদিন তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে। চল ঘুমাই , সারাদিন মেলা ধকল গেছে।
রাতে শফিকের ঘুম আসছিল না। সারাদিন অনেক ধকল গেছে শরীর জুড়ে ক্লান্তি কিন্তু মন অস্থির হয়ে আছে। শায়লা তাকে হুট করে বিয়ে করতে চলে আসল কেন আর কেনই বা সে কোন প্রতিবাদ না করেই রাতে বাবার সাথে চলে গেল? মাথায় আসছে না কিছু। রিপন বলেছে এটা নাকি খুবই সিম্পল এন্ড কমন সাইকোলজি। শায়লা শফিকের টানে চলে এসেছে বিয়ে ভেঙ্গে দিয়ে সেটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। আবার সারাদিন ধকল শেষে তার বাবা মাকে মনে পড়ছিল সেটাও খুব অস্বাভাবিক না। উত্তেজনায় বিয়ে করে ফেলেছে এখন সে চাচ্ছে বাবা মাও এই বিয়ের স্বীকৃতি দিক। মেয়েরা চট করে বাবা মাকে ছাড়া কোন কাজ করার কথা ভাবতে পারে না। রিপনের ধারণা দুই একদিনের মধ্যে শায়লা বাবা মাকে রাজি করিয়ে ধুমধামের সাথে বিয়ের অনুষ্ঠান করবে। শায়লার বাবা বেশ টাকা পয়সা ওয়ালা মানুষ। রাজাবাজারে তাদের নিজেদের বাড়ি আছে।
নানা চিন্তা করতে করতে ঝিম এসে গিয়েছিল শফিকের । গভীর রাতে সিফাতের চিৎকারে ঘুম ভাঙ্গল। সে জেগে উঠে তাড়াতাড়ি লাইট জ্বালালো। সিফার তার পাশেই শুয়ে ঘুমাচ্ছিল। এখন উঠে বসেছে। আতংকে চোখ ঠিকরে বের হয়ে আসছে।
—ভাইজান ভাইজান।
–কি হয়েছে স্বপ্ন দেখছিস?
সিফাতকে বিভ্রান্ত দেখাল। বলল, স্বপ্ন কিন্ত ভীষণ ভয়ের। মনে হলো সত্যি।
—আরে ধুর ঘুমা। আজ সবার উপর দিয়ে অনেক ধকল গেছে। সেজন্য এমন লাগছে। কি দেখছিস?
–একটা সাদা ঘোড়া ভাইজান। আমাকে ধাওয়া করছে। নিয়ে যাবে ধরতে পারলে। কি জীবন্ত। দেখলাম এই বাসার ছাদে এসে আমাকে খুঁজছে। উফফ…।
শফিকের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। জোর করে বলল, ধুর কি দেখতে কি দেখেছিস, লাইট বন্ধ করে ঘুমা।
–না ভাইজান লাইট জ্বালায় রাখ। আমার ভীষণ ভয় করছে, স্বপ্নটা ভীষণ জীবন্ত।
সিফাত সারারাত লাইট জ্বালিয়ে রাখল। শফিক কিছু বলল না। তার শরীর ক্লান্ত ছিল। একটু পর ঘুমিয়ে গেল। সকালে যখন ঘুম ভাঙ্গল তখন অনেক বেলা হয়ে গেছে। শফিক উঠে দেখে সিফাত তখনও বিছানায় বসে আছে চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে। সারা রাত ঘুমায়নি ছেলেটা। সকালের ঝকঝকে আলোয় শফিকের আত্মবিশ্বাস ফিরে এসেছে। বোঝাই যাচ্ছে সিফাত কাল দুঃস্বপ্ন দেখেছে, ঐ ব্যাটার ঘোড়ার সাথে এর কোন সম্পর্ক থাকার প্রশ্নই নেই।
সে উঠল। দ্রুত রেডি হতে হবে। অফিসে গতকাল যাওয়া হয়নি , আজ গিয়ে সেটার একটা ফিরিস্তি দিতে হবে বসকে। বিয়ে করছি বলাটাও ঠিক হবে কি না সে বুঝতে পারছে না। এই সকালে গতকালের ঘটনা কেমন যেন খাপছাড়া আর অবিশ্বাস্য লাগছে। শায়লা ওইভাবে ছুটে চলে এলো তাদের বিয়েও হয়ে গেল আবার রাতে সে চলেও গেল। কত দ্রুত কত কিছু ঘটে গেল। শায়লার সঙ্গে যোগাযোগও করা যাচ্ছে না, তার মোবাইল বন্ধ। অফিস শেষ করে সাহস করে একবার শায়লার বাসায় যাওয়া যায়। শায়লার বাসা থেকে কি ব্যবহার পাবে সেটা অবশ্য বলা যাচ্ছে না।
শফিক রেডি হয়ে অফিস যাওয়ার জন্য দরজা খুলে বের হতে গিয়েই চমকে গেল। শায়লা দাঁড়িয়ে আছে দরজার ওপাশে। পরনে এখনও কাল রাতের পরা শাড়ি।
শায়লা খুব স্বাভাবিক ভাবে বাসায় ঢুকল। বলল, আজ অফিস না গেলে হয় না? নতুন বউকে বাসায় ফেলে কেউ অফিসে যায়?
শফিক ফিরে এলো। শায়লা তাহলে তার বাসা ম্যানেজ করে ফেলেছে। দারুন কাজের মেয়ে। সে ঠিক করল আজ অফিসে যাবে না। সারাদিন শায়লার সঙ্গে কাটাবে। বিকেলে দুইজন মিলে ঘুরতে টুরতে বের হবে। শায়লাদের বাসায়ও যাওয়া যেতে পারে। নতুন বউ তার, যা বলবে সেটা শোনাই তার প্রথম কাজ।
বন্ধুরা অফিসে চলে গেল। রিপন যাওয়ার আগে চোখ টিপে দিয়ে বলল, শালা তোর ভাগ্য, কোন রাজকন্যা এতো দ্রুত তার রাজা বাবাকে ম্যানেজ করতে পারে না। বড়লোক শ্বশুর পেয়ে গেলি, আনন্দ ফুর্তি কর।
দিনটা দারুন কাটল তাদের। দুপুরে শায়লা খিচুড়ি রান্না করল । তারা দুইভাই মজা করে সেই খিচুড়ি খেল। সিফাত অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে গেছে। সকাল থেকে সে অন্যরুমে পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত। নতুন ভাবীর সাথে কথাটথা অবশ্য কম বলছে লজ্জা পাচ্ছে , ছোট মানুষ, সময় লাগবে।
বিকালের দিকে শফিক বলল, শায়লা ঘুরতে যাবা? তোমার বাসায় গেলে কেমন হয়?
শায়লা একটু আনমনা হয়ে বলল, ওহ আমি তো বাসায় বলে আসিনি। দাঁড়াও বাসায় ফোন দেই।
শায়লা তার মোবাইল অন করে ফোন দেয়ার কিছুক্ষণ পর তার বাবা এসে উপস্থিত। শায়লা ঠিক গতকালের মতো চুপ করে বাবার পিছু পিছু চলে গেল।
শফিক হতভম্ব হয়ে গেল। শায়লা এমন করছে কেন বোঝা যাচ্ছে না। শায়লার বাবাও অদ্ভুত লোক। বাসায় ঢুকে শফিকের দিকে তাকায় না পর্যন্ত। শায়লাকে নিয়ে চুপচাপ বের হয়ে যায়।
রাতে বাসায় ঢুকে রিপন সব শুনে যথারীতি বলল, আরে এটাতো ভারী নরমাল, বুঝতেছিস না ওদের বাসা থেকে এখনও এই বিয়ে মানতে পারে নাই। তবে লক্ষণ খুব খারাপ না। শায়লাকে তো আর আটকে রাখছে না বা তোকেও হুমকি ধামকি দিচ্ছে না। সব ঠিক হয়ে যাবে, একটু সময় দিতে হবে। চিন্তা করিস না।
শফিকের অস্বস্তি লাগছিল। রিপন যতই বলুক নরমাল তার ভালো লাগছিল না। গভীর রাতে আবারও সিফাতের গোঙানিতে ঘুম ভাঙ্গল তার। উঠে লাইট জ্বালিয়ে দেখল সিফাত তার পাশে গুটিসুটি হয়ে ভয়ে কাঁপছে। সদ্য কৈশর পেরুনে কচি মুখ ঘামে ভিজে গেছে। সে বলল, সিফাত কি হয়েছে আবার স্বপ্ন দেখছিস?
—স্বপ্ন না ভাইজান , একটা সাদা ঘোড়া এসেছিল ঘরের ভিতর। আমাকে নিয়ে যাবে ভাইজান।
–আরে ধুর, তুই কি পাগল হলি, তোকে কেনো নিয়ে যাবে?
সিফাত তার দিকে অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে বলল, তোমার সাথে কি তার কোন সম্পর্ক আছে ভাইজান? সেরকম কি জানি মনে হল, তুমি কি আমারে দিয়ে দিছ?
— আরে কি বলিস এইসব ভাই? পড়াশুনার চাপে তোর মাথা নষ্ট হয়ে গেছে। ঘোড়া কি কাউকে নিতে পারে এই ছয়তলার উপর এসে? তুই না বিজ্ঞানের ছাত্র, এইসব আজগুবি স্বপ্ন দেখে কেনো মাথা নষ্ট করছিস? ঘুমা কাল তোকে একটা ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব।
সিফাত ঘুমাল না। আগের রাতের মতোই লাইট জ্বালিয়ে বসে বসে কাঁপতে থাকল।
পরদিন ভোরেই চলে আসল শায়লা। শফিক সেদিনও অফিসে গেল না। বাসায় থাকল। সিফাত অন্য রুমে পড়াশুনা করল। শফিক মাঝে মাঝে উঁকি দিয়ে তার ভাইকে দেখে এলো, গতরাতের ঘটনা নিয়ে আর কোন কথা হলো না দুজনের মধ্যে।
সেরাতে শায়লা থেকে গেল। তার বাসা থেকে কেউ এলো না নিতে। সম্ভবত বাসা ম্যানেজ করে ফেলেছে সে। বাসায় ফিরে রিপন চোখ টিপে দিল, নীচু স্বরে বলল, কি বলছিলাম না?
রাতে শায়লা আর শফিক এক রুমে ঘুমাতে গেল। সিফাত শুয়েছে রিপনদের সাথে।
লাইট নিভাতে গেলে শায়লা বাঁধা দিল। –লাইট নিভিও না। গত কয়েকরাত দুঃস্বপ্ন দেখছি, ভয় লাগে।
—কি বল, কিসের দুঃস্বপ্ন ? আরে আমি আছি না।
–হু তোমারে নিয়েই তো। দেখি যে আমি একটা মাঠের মধ্যে দাঁড়ানো, কোত্থেকে এক ভংকর সাদা ঘোড়া এসে ধাওয়া করতে থাকে। দৌড়াতে দৌড়াতে আমি তোমাকে খুঁজতে থাকি, তোমার কাছে পৌঁছানোর পর ঘোড়া চলে যায়।
শফিকের অস্বস্তি লাগল। সিফাতও একটা সাদা ঘোড়ার কথা বলছে, সে বলল, আরে ধুর স্বপ্ন তো স্বপ্নই। বাদ দাও, আজ ঘুমাবো না, এসো গল্প করে কাটাই। ছাদে যাবে?
শায়লা মাথা নাড়ল, ভয় করে। তুমি এখানেই গল্প কর।
তাদের গল্প জমলো না। একটু পরেই শায়লা ঘুমাতে লাগল। দেখে মনে হলো বহুদিনের ক্লান্ত কেউ ঘুমিয়েছে। শফিকের ঘুম আসল না। একটা অস্বস্তি ঘিরে রেখেছে তাকে। সে অনেক রাত পর্যন্ত কান খাড়া করে রইল পাশের রুম থেকে কোন শব্দ আসে কিনা সেটা শোনার জন্য। সিফাতকে সে কলে পিঠে করে মানুষ করেছে তার ভীষণ ন্যাওটা সিফাত। বড় ভাই বলতে অজ্ঞান। এখনো কিশোর বেলা কাটেনি তার। কোন কারনে ভয় পাচ্ছে সে, তার কোন ক্ষতি না হয়ে যায়। কিন্তু সেরাতে কোন শব্দ এলো না সিফাতের রুম থেকে। শেষ রাতের দিকে ঘুমিয়ে গেল শফিক।
পরদিন সকালে ঘুম ভেঙ্গে দেখল, শায়লা তখনো ঘুমাচ্ছে। সে উঠে পড়ল, পাশের রুমে শব্দ পাওয়া যাচ্ছে ওরাও উঠে পড়েছে মনে হয়।
পাশের রুমে রিপন আর হিমেল ছিল। শফিক বলল, সিফাত কোথায়?
রিপন কাঁধ ঝাঁকাল, কি জানি সকালে উঠে দেখিনি, বাথরুমে বা ছাদে গেছে মনে হয়।
শফিক বাথরুমে গেল, সেটা খালি। ছাদেও কেউ নেই। কিছুক্ষণ পর বোঝা গেল সিফাত নেই কোথাও।
শায়লা ততক্ষণে উঠে গেছে ঘুম থেকে। শফিককে অস্থির হতে দেখে বলল, কি হয়েছে এতো অস্থির হচ্ছ কেন? শোন আমি এখন আব্বুর সাথে বাসায় যাব। আব্বুকে ফোন দিয়েছিলাম, আমাকে নিতে আসছে।
শফিক বলল, সিফাতকে পাওয়া যাচ্ছে না, আচ্ছা তুমি কি কাল রাতেও ঘোড়ার স্বপ্ন দেখেছ?
শায়লা হাই তুলে বলল, নাহ দেখিনি। রোজ রোজ এক স্বপ্ন দেখব কেন? সিফাতকে পাওয়া যাচ্ছে না মানে কি? এতো বড় ছেলে কি হারিয়ে যাবে নাকি? নিশ্চয়ই নিচে গেছে, হয়ত দোকানে টোকানে গেছে কোন কাজে।
একটু পর শায়লার বাবা এসে শায়লাকে নিয়ে গেলেন। সেই যন্ত্রের মতো এলেন, কারোও সাথে কথা বললেন না, শায়লা চুপ করে বাবার পিছু পিছু চলে গেল। একবারও বিদায় নিল না শফিকের কাছ থেকে।
সিফাতের পড়ার টেবিলের দিকে শফিকের বুকটা হু হু করে উঠল। কোথায় গেছে তার ভাই? এর পিছনে ওই ঘোড়ার হাত নিশ্চয়ই আছে।
………
এই ঘটনার বছর পাঁচেক পর এক সন্ধ্যায় রায়হান কমলাপুর রেল স্টেশনের বাইরে রেল লাইনের উপর দাঁড়িয়েছিল। উদ্দেশ্য পরিষ্কার, রেলগাড়ির নীচে ঝাপ দিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়া। এই সময় উশকো খুশকো চুলের এক লোক এসে বলল, কি ব্যপার, কেস কি? তানিয়ার বিয়ে হয়ে গেছে?
লোকটা ভীষণ আশ্চর্য হয়ে বলল, আরে সেটা আপনি জানলেন কেমনে? আপনাকে কি আমি চিনি?
লোকটা হাসল। তানিয়াকে ফিরিয়ে আনতে পারে এই ঘোড়া। বলে সে একটা ঘোড়ার ছোট মুর্তি রায়হানের হাতে দিল।
রায়হানের চোখে ভীষণ একটা আশার আলো ফুটে উঠল। তার তানিয়া কি সত্যিই ফিরে আসবে? হতেও পারে। পৃথিবীতে কত আশ্চর্য ঘটনাই না ঘটে।
সে বলল, কিন্তু আপনি কে? আপনার নাম কি?
পাগলা ধরনের লোকটা তার কথা পাত্তা না দিয়ে বলল, তানিয়ারা থাকে না তারা চলে যায়। ফিরিয়ে আনতে হলে দিতে হয় চড়া মূল্য। তানিয়া ফিরে এলে কিন্তু চলে যাবে অন্য প্রিয়জন।
রায়হান ধরা গলায় বলল, তানিয়া ছাড়া পৃথিবীতে বেঁচে থাকার কোন অর্থ নেই আমার। সে ছাড়া আর কোন প্রিয়জন নেই এই দুনিয়ায় ।
লোকটা হেসে বলল, আচ্ছা। ঘোড়া নিয়ে আজ রাতে ঘুমালেই কাল তানিয়া ফিরবে ঘোড়ায়।
রায়হান বিস্মিত হয়ে বলল, কিন্তু আপনি কে? কি নাম আপনার?
লোকটা বলল, আমি সামান্য একজন কালেক্টর , ঘোড়া দেখাশোনা করি।
রায়হানের বিস্মিত দৃষ্টির সামনে দিয়ে লোকটা চলে গেল। সে হাতের মুঠোয় ঘোড়াটা ধরে ভাবতে লাগল সত্যিই কি এই ঘোড়া তানিয়াকে ফেরাবে?
এই সময় তার ফোন বেজে উঠল। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে তার বোন নেহা বলল, ভাইয়া তুমি বাসায় আসতে দেরি করছ কেনো? আমার কেমন ভয় ভয় করছে।

Be the first to write a review

Leave a Reply

We’re sorry you’ve had a bad experience. Before you post your review, feel free to contact us, so we can help resolve your issue.

Post Review

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক গল্প