শফিক আত্মহত্যা করতে হাতিরঝিল এসেছে। সন্ধ্যা নাগাদ কাজ শেষ হয়ে যাবে ভেবেছিল কিন্তু সুবিধা করা যাচ্ছে না তেমন।
হাতিরঝিলের এই দিকটা একটু অন্ধকার। লেকের প্রায় শেষ দিকে ফাঁকা জায়াগাটায় ছোট পার্কের মতো করা। লোকজন বিকেল থেকে আড্ডা দেয় । শফিক এক কোনার দিকে বসে ছিল। মাথার উপরের আম গাছের ছায়া পড়ে অন্ধকার আরও গাঢ হয়েছে। একটু দূরে লাইটের নিচে জটলা করে দাবা খেলেছে কয়েকজন। এখানে কিছু জায়াগায় সিমেন্ট দিয়ে দাবার কোট কেটে দেয়া আছে। শফিক ঘড়ি দেখল সাড়ে দশটা বাজে। তার মন ভীষণ খারাপ। তার আত্মহত্যার প্ল্যান খুব পরিষ্কার ছিল। ঝিলের একটা ব্রিজের উপর থেকে ঝাপ দেবে, ব্যাস কাজ শেষ। সে সাঁতার জানেনা, তার উপর বর্ষাকালে ঝিলের পানিতে নানা জায়গায় ঘুর্নি তৈরি হয়েছে, খেল খতম হতে বেশীক্ষন লাগার কথা না। বিকেল থেকে ইতোমধ্যে দুইবার এটেম্পট নিয়ে ফেলেছে। প্রথমবার ব্রীজের উপর দাঁড়িয়ে নীচের দিকে তাকাতেই তার মাথা ঘুরতে লাগল, সে ভয়ে পিছিয়ে এসেছে। দ্বিতীয়বার সে চোখ বন্ধ করে ঝাপ দিতে চেয়েছিল, চোখ বন্ধ থাকায় খেয়াল করেনি ব্রীজের স্টিলের রেলিঙয়ে সাথে বাড়ি লেগে সে ব্রীজের উপর পড়ে গেল। লোকজন এসে ধরাধরি করে তুলেছে। দুই একজন ধমকেও গেছে, চোখের মাথা খাইছেন নাকি মিয়া? আরাকটু হলেই তো পানিতে পড়তেন। এরপর শফিকের মুড অফ হয়ে গেছে, তখন থেকে সে এই কোণায় এসে বসে আছে। ভাবছে একটু রাত হলে ডিস্টার্ব করার লোকজন কমে যাবে তখন থার্ড এন্ড ফাইনাল চান্স নিতে হবে, দান দান তিন দানে সাকসেসফুল আত্মহত্যা।
হঠাৎ সামনে দাবা খেলার জটলার মধ্যে থেকে একটা হৈ চৈ উঠল। দুইপক্ষ উচ্চ স্বরে ঝগড়া করছে। শফিক এগিয়ে গিয়ে একটু উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করল কি হয়েছে। একদল লোক বলছে স্টিল মাত হয়েছে, খেলা ড্র, রাজার চাল দেয়ার জায়গা নেই। অন্যদল বলছে উঁহু আমার বড়ে উপরে উঠে মন্ত্রী হয়েছে, অটোমেটিক চেক, মাত। দুইদল বিরাট তর্ক শুরু করল। দাবা এক আশ্চর্য খেলা। আমাদের দেশে প্রথমে দুইজন দাবা খেলতে বসলেও পরে দুইজনের পক্ষে অনেক পরামর্শদাতা জুটে যায়। এরপর দেখা যায় পরামর্শ দাতাদের কথায় খেলা চলছে, প্রথমে কোন দুইজন দাবা খেলতে বসেছিল সেটা সবাই ভুলে গেছে। সে একটু এগিয়ে গিয়ে উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করল। ড্র হয়েছে এই মতবাদের লোকজনের লিডার এক শুকনা মতো লোক। সে তীব্র গলায় অন্যপক্ষের একজনকে বলছে , ‘আরে রাখেন মিয়া আপনে খেলা বুঝেন? আমি সেই কাসপরভ কারপভবদের খেলা দেখে বড় হয়েছি আমাকে শিখাতে আসবেন না। ‘ যাকে বলছে সেই লোক উত্তেজিত হয়ে তোতলাচ্ছে তার কথা বোঝা যাচ্ছে না। শফিকের ইচ্ছে করছে একদলের পক্ষ নিয়ে অন্যদলের সাথে খানিকটা তর্ক ঝগড়া শুরু করতে। অন্যদের উত্তেজিত হতে দেখলেই কেন যেন শফিকের মধ্যেও উত্তেজনা ছডিয়ে পড়ে, সেও কারণ না জেনেই উত্তেজিত হয়ে পড়ে। একবার ফার্মগেটে দুই লোকের ঝগড়ার মধ্যে গিয়ে সে উত্তেজিত হয়ে এক লোকের পক্ষ নিয়ে হালকা মারপিটেও জড়িয়ে গিয়েছিল।
শফিক সরে এসে নিজের জায়গায় বসল। এইসব গ্যাঞ্জামে জড়ানোর মানে হয় না, সে একটা বিরাট কাজে এসেছে তার কাছে এইসব ছোটখাট ঘটনা এখন তুচ্ছ। ভীড়ের মধ্যে থেকে এক লোক হঠাৎ বেরিয়ে এসে শফিকের সামনে এসে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা ভাই দাবা খেলায় ঘোড়ার চাল কয় কোট?
শফিকে লোকটার দিকে ভালো করে তাকালো। আলাভোলা ধরনের লোক, মধ্য বয়স্ক, সাধারণ জামা প্যান্ট পরনে। অবশ্য এই লোকের হুট করে দাবা খেলা নিয়ে আগ্রহ আর শফিককেই এইসব প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার কারণ বোঝা যাচ্ছে না। শফিক একটু গম্ভীরভাবে বলল, ঘোড়া আড়াই কোট চলে।
লোকটা বিড়বিড় করে বলল, কি আশ্চর্য! ঘোড়া আড়াই কোট কেন চলবে?
লোকটা চলে যাচ্ছিল হঠাৎ করে ঘুরে বলল, আচ্ছা আপনি মরতে চাচ্ছেন কেন? আত্মহত্যা তো মহাপাপ।
শফিক একটু চমকে গেল। তারমানে ব্যাটা তাকে ফলো করছে অনেকক্ষণ থেকে। তার ভীষণ বিরক্ত লাগল। দেশের জনসংখ্যা এতো বেশী হয়ে গেছে যে কিছু লোকের তেমন কোন কাজ নেই। এদের কাজই হচ্ছে সারাক্ষণ অন্যকে নজরদারিতে রাখা। কে কি করছে না করছে এইসব দেখে বেড়ায় সারাদিন। বোঝাই যাছে সামনের লোকটাও এই রকম একজন। এদের জন্য শান্তিতে একটু আত্মহত্যাও আজকাল করা যাচ্ছে না।
শফিক বলল, কই না তো, আপনি কেমনে জানলেন?
লোকটা একটু হাসল, বলল, আপনার বান্ধবী শায়লার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে দেখে আপনি আত্মহত্যা করতে এসেছেন, ভাবছেন শায়লা বিশ্বাসঘতকতা করল।
শায়লার কথায় শফিক খানিকটা উদাস হয়ে গেল। প্রায় তিনবছর শায়লার সাথে সে প্রেম করছে। এরপর হুট করে শায়লা লন্ডনি জামাই দেখে তাকে ভুলে গেল, ভাবাই যায় না। অথচ এই তিন বছরে তার একবারও মনে হয় নি শায়লা তাকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারে। শায়লার মতো মেয়েই যদি এই কাজ করতে পারে তাহলে আর পৃথিবীতে কাকে বিশ্বাস করা যায়? এই বিশ্বাসহীন পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়াই ভালো।
শফিকের হঠাৎ মনে হলো আচ্ছা এই লোকটা এতোকিছু জানল কেমনে? শায়লার নাম পর্যন্ত জানে। সে কি শায়লার কোন আত্মীয়?
শফিক বলল, আপনি কে? এতোকিছু জানলেন কিভাবে?
লোকটা আবার হাসল। এইবার তাকে আর আলোভোলা ধরনের লোক মনে হচ্ছে না। বলল, এমনিতেই আপনাকে দেখে মনে হলো সব।
—ফাজলামি করেন? দেখেন আমি জীবনের একটা চূড়ান্ত অবস্থায় আছি এই সময় কিছু লুকাবেন না আমার কাছে।
লোকটা বলল, আপনি যা ভাবছেন তা না। আমি কিছু জানি না, তবে আপনি আজ আত্মহত্যা করলে আপনার ছোট ভাইয়ের পরীক্ষার টাকা কে দেবে? বেচারা আপনার দিকে তাকায় আছে।
শফিক বিস্মিত হয়ে গেল। ব্যাটা কত কিছু জানে! তার মনে হল এই লোক কনফার্ম দরবেশ টাইপ কেউ, সে সারা জীবন এই ধরনের এক দরবেশ খুঁজেছে মনে মনে যে তার ভাগ্য ফিরিয়ে দিতে পারবে। শফিক চট করে লোকটার হাত ধরে কেঁদে ফেলল, স্যার আমারে বাঁচান।
লোকটা একটু বিব্রত হয়ে বলল, আমি আপনার স্যার হলাম কেমনে! আর আমি কিভাবে আপনাকে বাঁচাবো, নিজেই বাঁচেন, বাসায় যান।
–না স্যার শায়লাকে না পেলে আমি মারা যাবো। শায়লাকে ফিরিয়ে দেন প্লীজ।
— আরে আমি কি আপনার শায়লাকে কিডন্যাপ করছি? নাকি আমি পীর ফকির না জাদুকর? ভালো ঝামেলায় পড়লাম তো। যান ভাই আপনি আত্মহত্যা করেন সেটাই ভালো। যে চলে গেছে তাকে কি ফেরানো যায় নাকি?
শফিক হঠাৎ করে লোকটার পা জড়িয়ে ধরল। এখন লজ্জা করার সময় না। শায়লাকে পাওয়ার একটা শেষ চান্স মনে হচ্ছে এই লোকটা।
লোকটা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আশেপাশে তখন লোকজন কমে এসেছে, যে কয়েকজন আছে তারা ঘুরে ঘুরে কৌতূহল নিয়ে দেখছে, রাস্তা ঘাটে একজন আরাকজনের পা ধরে বসে আছে এটা সচারচার দেখা যায় না, ঘটনা বোঝার জন্য দুই একজন উঁকিঝুঁকি দেয়া শুরু করল, অস্বস্তিকর ব্যাপার।
লোকটা বলল, শায়লাকে ফিরাতে হলে আপনাকে চড়া মূল্য দিতে হবে, তাকে যেতে দেন, যে চলে গেছে সে চলে যাক।
শফিক এই কথায় আরোও শক্ত করে পা জড়িয়ে ধরল, না স্যার, শায়লা ছাড়া আমার আর কিছু চাই না। তাকে ছাড়া বাঁচব না আমি।
লোকটা আর কোন কথা না বলে পকেট থেকে একটা ছোট ঘোড়ার মুর্তি বের করল। অনেকটা দাবার ঘুটির মতো তবে ঘোড়াটা সম্পূর্ন , দুইপায়ের উপর দাঁড়িয়ে আছে। আগেকার দিনে জমিদারদের দাবার ঘুটি অনেকটা এমন হতো।
লোকটা বলল, এইটা আমার ঘোড়া, এটা আড়াই কোট চলে না কিন্তু এটা শায়লাকে এনে দেবে কিন্তু শর্ত আছে।
–কি শর্ত। শায়লাকে পেলে আমি সব শর্তে রাজি।
—শায়লাকে ফিরিয়ে আনার বিনিময়ে আমার ঘোড়া একজনকে নিয়ে যাবে। কাকে আমি জানি না।
শফিক একটু কেঁপে উঠল। তারপর ভেবে দেখল শায়লা ছাড়া তার জীবন তো এখানেই শেষ, কাজেই শায়লাকে পেলে পরে কি হলো সেটা পরে দেখা যাবে। আর এই লোক যতই বলুক এই শো পিস ঘোড়া তার শায়লাকে এনে দেবে এটাও ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না। লোকটা সম্ভবত গুল তাপ্পি মেরে তার কাছে ভাব ধরে রাখার চেষ্টা করছে। শফিকের ভক্তি এখন অনেকটাই চলে গেছে তবু সে একটু সুস্থির হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমি রাজি।
লোকটা ঘোড়াটাকে শফিকের হাতে গুঁজে দিয়ে বলল, এটাকে রাতে আপনার বাসার ছাদে রাখবেন, আগামীকাল শায়লা চলে আসবে। আর ঘোড়াও তার পাওনা বুঝে নিয়ে আমার কাছে ফেরত আসবে।
শফিক মাথা নাড়িয়ে ঘোড়াটা হাতে নিয়ে দেখল , তারপর সামনে তাকিয়ে লোকটাকে খুঁজল, নেই। সে কখন চট করে সামনের অন্ধকারের মধ্যে ঢুকে হারিয়ে গেছে।