পোস্ট অফিসটা শহরের এক কোণায়, পুরনো আমলের লাল-ইটের দালান। দেয়ালের রং চটে গেছে, কাঠের জানালায় কুয়াশার দাগ। সকাল বেলা এখানে ভিড় হয় ঠিকই, কিন্তু দুপুর নামলেই ঝিম ধরে যায় গাছগুলোর নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ভবনটার।
শুধু একজনই আসে নিয়মিত, একেবারে ১২টা বাজলে।
তার নাম মেঘলা।
সে আসে ধীরে ধীরে — হাতে একটা হলুদ চুড়িদার, কাঁধে সাদা ব্যাগ, চোখে গভীর কিছু খোঁজার চিহ্ন। ভিতরে ঢুকে ডানদিকের টেবিলের দিকে এগিয়ে যায়, যেখানে চিঠি বাছাই হয়। সেখানেই বসে থাকেন পোস্ট অফিসের বুড়ো কাকু — মনোহর বাবু।
তিনি দেখেই বলেন,
— “আজও…?”
মেঘলা হালকা হেসে মাথা নাড়ে।
— “হ্যাঁ কাকু। হয়তো আজ এসেছে।”
মনোহর কাকু তার সামনে রাখা পুরনো লোহার ট্রে-টা ঝাঁকুনি দিয়ে তুলে ধরেন।
— “না মা, আজও নেই। যদি থাকতো, চোখে পড়তো।”
মেঘলা থেমে যায়। জানালার পাশে একটা বেঞ্চে গিয়ে বসে। বাইরে গাছের ছায়া তার মুখে পড়ে — সেই মুখ যেখানে অপেক্ষা এক শিল্প হয়ে গেছে।
কেউ কেউ ভাবে সে পাগল।
কেউ ভাবে সে রোমান্টিক, কেউ ভাবে অভিমানী।
কিন্তু কেউ জানে না তার গল্প।
পাঁচ বছর আগে, তার প্রেমিক রুদ্র সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। সীমান্তে গিয়ে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল — চিঠি।
মেঘলা তখন প্রতিদিন একটা করে চিঠি পেতো।
রুদ্র লিখতো যুদ্ধের শব্দে, কিন্তু ভালোবাসার ভাষায়।
একদিন চিঠি আসা বন্ধ হয়।
জানা যায়, সেই সীমান্তে গোলাবর্ষণে কয়েকজন নিখোঁজ।
নিখোঁজ… মানে মৃত, না ফেরার দেশে।
কিন্তু মেঘলা বিশ্বাস করে — সে একদিন ফিরবে। অথবা একটা চিঠি আসবেই।
এই অপেক্ষার ঠিকানাতেই সে প্রতিদিন ফিরে আসে।
আজকের দিনটাও শেষ হচ্ছে।
মনোহর কাকু দরজাটা একটু বন্ধ করতে গিয়ে বলে —
— “মেঘলা মা, তুমি তো জানো… এতদিনে কেউ ফেরে না।”
— “কিন্তু মন যদি থাকে, খাম তো আসতেই পারে, কাকু,” মেঘলা শান্ত স্বরে বলে।
সে বেঞ্চ থেকে উঠে পড়ে।
চোখে ধুলোমাখা আলো, তবু ভেতরে জ্বলে একটুখানি আশার প্রদীপ।
পোস্ট অফিসের বাইরে এসে দাঁড়ায় সে।
স্টেশন রোডের দিকে তাকিয়ে ভাবে — রুদ্র তো বলতো,
“তোমার চিঠির ঠিকানায় ফিরেই আসব একদিন।”
সে জানে না কবে, তবু বিশ্বাস করে…
চিঠি আসবে। একদিন নিশ্চয়ই আসবে।
এদিকেই তখন এগিয়ে আসছে এক নতুন মুখ —
সুটকেস হাতে, কাঁধে ঝোলা ব্যাগ, চোখে প্রশ্ন।
নাম তার অভীক চৌধুরী — পোস্ট অফিসের নতুন পোস্টমাস্টার।
সে জানে না আজ যার সঙ্গে দেখা হবে, সেই মেয়েটিই বদলে দেবে তার নিজের একঘেয়ে জীবনটাকেও।