ছায়াবাজী

শুরু থেকে শুরু করি। যখন আমি চতুর্থ শ্রেণিতে পড়তাম, তখন টাঙ্গাইল আর্মি ক্যান্টনমেন্টে ছিলাম। ওখানে ভিতরে একটা বিশাল বটগাছ ছিল, যা যুদ্ধের অনেক আগে থেকেই ছিল। তা ছাড়া ঘরগুলোও অনেক পুরনো ছিল, পাকিস্তান আমলেরও আগের। সেখানে থাকলেও কখনো বেশি দূরে যাওয়া হয়নি। এক বিকেলে খেলতে গিয়ে সেখানে চলে যাই। বিকাল হলেও চারপাশ নিস্তব্ধতায় ভরা ছিল।
খেলতে খেলতে হঠাৎ দেখি বাতাস শুরু হয়, মুহূর্তের মধ্যে কিছুটা অন্ধকার নেমে আসে। এমনিতেই সন্ধ্যা হয়ে আসছিল। সেদিন আর তেমন কিছু ঘটেনি। কিন্তু মাঝরাতে আমার ঘুম ভাঙা শুরু হলো। দুদিন পরে আমার পরিবার ঢাকা উদ্দেশ্যে রওনা দিল। ঢাকা রাস্তায় ওঠার পর থেকেই আমার শরীরের অদ্ভুত এক বিরক্তি শুরু হয়। মনে হচ্ছিল, যেন সব কিছু বের হয়ে যেতে চাইছে।
আমাদের নিজস্ব গাড়ি ছিল। ড্রাইভারকে বলেছিলাম জানালা খুলে দিতে। পরে সে খুলে দেয়, কিন্তু ভালো লাগার বদলে আরও বেশি খারাপ লাগতে শুরু করল। এভাবে চলতে চলতে ঢাকা পৌঁছালাম। এরপর থেকেই নাকি আমার আচরণে পরিবর্তন আসে। বাবা-মা তো তাই বলতেন।
এরপর দুই বছর কেটে যায়। তখনও সব মোটামুটি ঠিক ছিল, কিন্তু পুরোপুরি নয়। সপ্তম শ্রেণিতে উঠার পরে বাবা-মা আমাকে টাঙ্গাইল পাঠিয়ে দিলেন। ততদিনে আমাদের নিজস্ব বাড়ি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। বলতে পারেন, বাড়ির দেখাশোনা করতে। যদিও আমি তাদের কাছে জেদ ধরেছিলাম সেখানে যাওয়ার জন্য।
বলে রাখি, হয়তো মনে হতে পারে সপ্তম শ্রেণির একটি ছেলে কীভাবে একা একা বাড়িতে থাকা শুরু করল? আসলে তখন আমার শরীরের গঠন এমন ছিল যে দেখে মনে হতো আমি নবম শ্রেণিতে পড়ি। বাড়িতে আসার পর শান্তি পেলেও কিছু ঘটনা ঘটেছিল, যা পরে বাবা-মা জানতে পেরে আমাকে ফিরিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমি দাদিকে দিয়ে শরীর বন্ধ করে নিয়েছিলাম।
আসার পরেও অনেক ঘটনা ঘটেছে। তবে সময়ের অভাবে আমি শুধু গত এক বছরের ঘটনাগুলো বলব।
বাড়িতে প্রায় সময় একা থাকতে হয়, আর এমন কিছু ঘটনা ফেস করতে হয় যা অন্য কেউ থাকলে হয়তো এর চাপ নিতে পারত না। মাঝরাতে বিরিয়ানির গন্ধ আসত, যদিও এটা অনেক মানুষের নাকে যায়। তারপর গু গু আওয়াজ শুনতাম যখন শুয়ে পড়তাম। সাদে হাটার আওয়াজও আসত!
গত রোজার শেষে রাত ১০/১২টার দিকে শুয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ পায়ের দিক থেকে কেউ যেন পা টেনে দিল। আগে কখনো এত ভয় পাইনি, কারণ এসবের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিলাম। কিন্তু সেদিন খুব ভয় পেয়েছিলাম। পরে সূরা পড়ে গায়ে ফুঁ দিয়েছিলাম, ওযুও করেছিলাম।
আরেকদিন গরমের মধ্যে রুমে শুয়ে আছি। লাইট অন, ফ্যান অফ। গরম লাগছিল। আমি উপরের ফ্যানের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবছিলাম, “ওহ ফ্যান বন্ধ, তাই গরম লাগছে।” বিশ্বাস করবেন না হয়তো, কিন্তু ফ্যান নিজে থেকেই ঘুরে অন হয়ে গেল। ভয় পাইনি, তবে রুম থেকে বের হয়ে গিয়েছিলাম।
বলে রাখা ভালো, আমার বাড়িটা একটা কবরস্থানের পাশে ছিল। সাদে উঠলে কবরস্থানটা দেখা যেত। এমনকি আমি নিজেও মাঝে মাঝে সেখানে গিয়ে বসতাম।
এবার মূল ঘটনার দিকে আসি। রাতে খেতে যাই, টয়লেটে যাই, কিংবা টিভি দেখতে যাই, সবসময় একটা জিনিস আমার পিছু পিছু থাকত। একটা কালো ছায়া, যা ২৪ ঘণ্টা আমার সাথে থাকত। হুট করে দেখতাম ঘরের মধ্যে কেউ দৌড়ে চলে যাচ্ছে। আবার কখনো দেখতাম, কেউ অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে।
গত ঈদের পরে আম্মা-আব্বা ঢাকায় চলে যান। আমি নিজ জেলায় ছিলাম। সেদিন তারা বাসায় এসেছিলেন, জামা কাপড় রেখে গিয়েছিলেন সাদে। পরে চলে যান। সেদিন সারাদিন বাড়ি থেকে বের হইনি। সন্ধ্যা হয়ে গেছে, হয়তো ৬/৭টা বাজে। মনে হলো, সাদে রাখা জামা কাপড় তোলা হয়নি। তুলতে গেলাম। গিয়ে দেখি, সাদের এক কর্নারে কালো ছায়ার মতো একটা মূর্তি। ভালো করে দেখেও কিছু পেলাম না, যেনো কিছুই নেই। পরে জামা কাপড় তুলে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে দেখি, আমার পাশ দিয়ে কালো একটা বিড়াল দৌড়ে চলে গেল। সেদিনও খুব ভয় পেয়েছিলাম। বিড়ালটা দৌড়ে আমার ঘরের দিকে গেল। আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ঘরে গিয়ে দেখি, কিছু নেই।
ঘরের অনেক জিনিস নাই হয়ে যেত। আজ মাছ রান্না করলে, দেখতাম এক পিস মাছ নেই। ঘরে কোনো জিনিস রাখলে তা পরে আর পাওয়া যেত না। আবার কয়েক দিন পরে সেই জায়গাতেই দেখা যেত। কখনো ক্ষতি করেনি, কিন্তু ভয় দেখায়। বলতে পারেন, যেন খেলা করে!
এগুলোর সঙ্গে আমি আস্তে আস্তে মানিয়ে নিয়েছি। আমার দাদি খুব আমলধারী মানুষ। জ্বী তাড়ানো বা ছাড়ানোর বিষয়ে তিনি অনেক জানেন। তো, তাকে অনেক বছর আগেই ঘটনাগুলো জানানো হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, সময়মতো যদি এসব বোঝা যেত, তাহলে এতটা পেয়ে বসত না। এখন ছাড়ানো কষ্টকর হবে, আর আমার ক্ষতি করতে পারে। এই ভয়ে দাদি আমার শরীর বন্ধ করে দেন, যাতে চাইলেও ক্ষতি করতে না পারে। তবে, এসব আমার সঙ্গেই থাকবে।
শেষে একটা ঘটনা বলি, যেটা আমার খুব ভালো লাগত। জ্বর হলে আমার বেশ ভালো লাগত—অবাক করার মতো হলেও এটাই সত্যি। এই বছর চারবার জ্বর হয়েছিল। এর মধ্যে দুইবার খুব বেশি তীব্র ছিল এবং বেশিদিন ধরে ছিল।
জ্বরের সময়, বিশেষ করে যখন সারারাত ছটফট করার পর মাঝরাতে ঘুম আসত, তখন মনে হতো আমার চারপাশে অনেক মানুষ বসে আছে। আমি ধীরে ধীরে চোখ খুলে এটা অনুভব করতাম। মনে আছে, পরিষ্কারভাবে দেখতাম, আমার পায়ের নিচে দুজন মানুষ বসে থাকত। ডান আর বাম পাশে তাঁরা দুজন বসে থাকত। আর তাদের মাঝে মনোমুগ্ধকর সাদা আলো পড়ত। ওরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে গল্প করত। সেই সময়টা আমার বেশ ভালো লাগত। মনে হতো শরীর থেকে জ্বর চলে গেছে।
এমনও মনে আছে, আমি তাদের দেখে হালকা মুচকি মুচকি হাসতাম। ঠিক ফজরের আজানের সময় তারা উঠে চলে যেত—গায়েব হয়ে যেত। তখন পুরোপুরি আমি নিজের মধ্যে ফিরে আসতাম। আর তখন থেকেই আবার আমার শরীরে জ্বরের অস্তিত্ব অনুভব করতাম।
এভাবেই ঘটনাগুলো চলতে থাকে।

Be the first to write a review

Leave a Reply

We’re sorry you’ve had a bad experience. Before you post your review, feel free to contact us, so we can help resolve your issue.

Post Review

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক গল্প