দেওয়াল

১. বাড়ি বদলের প্রথম দিন:
২০২১ সালের জুন মাসে, রাহুল ও তার স্ত্রী অন্বেষা কলকাতার গড়িয়াহাটে একটি পুরনো বাড়িতে ভাড়া এল।
তিনতলার উপর, ছোট্ট ছাদের ঘর, সিঁড়িঘর পেরিয়ে সোজা একটা রেলিং ঘেরা টালির ছাদ, আর তার এক কোণে একটা অদ্ভুত মোটা দেওয়াল — বাকি ঘরগুলোর তুলনায় আলাদা।
বাড়ির মালিক বলে, “ওটা পুরনো বন্ধ ঘর, ভিতরে কিছু নেই। দেয়াল করে ফাঁকা করে রেখেছি, ফ্যামিলি ট্র্যাজেডির পর থেকেই তালা ঝুলছে।”
রাহুল অবাক—“মানে ঘর ভেঙে দেয়াল তোলা হয়েছে?”
মালিক হেসে বলেন—“না রে বাবু, ঘরটা এখনও আছে। শুধু বাইরের দিকটা বন্ধ। জানলা, দরজা সব ইট দিয়ে ঢেকে ফেলা হয়েছে।”

২. অদ্ভুত ধ্বনি
প্রথম রাতেই রাহুল ঘুম ভেঙে শুনতে পেল—
“টিক…টিক…টিক…”
ঘড়ির মতো নয়, ঘরঘর করে খোলার মতো নয়—
এটা ঠিক দেওয়ালের ভিতর থেকে আসা একটা টিক… টিক শব্দ।
পরদিন সকালে অন্বেষা জানায়, রাতে ঘুমের ঘোরে তার মনে হচ্ছিল কেউ ঘরের এক কোনা থেকে তাকিয়ে দেখছে।
“আমার স্পষ্ট মনে আছে, ঘরের তাপমাত্রা হঠাৎ হিম হয়ে গিয়েছিল,” সে বলে।
রাহুল মজা করে বলে, “বেশি হরর সিরিজ দেখছো তুমি।”
কিন্তু সেই রাতেও… শব্দটা এল। এবার একটু জোরে।

৩. দেওয়ালের পেছনে কিছু আছে?
তৃতীয় দিনে রাহুল কাজ থেকে ফিরে দেখতে পেল, বাথরুমের আয়নাটা ভেজা, অথচ কেউ স্নান করেনি। আয়নায় ছোট্ট একটা দাগ—একটা আঙুল দিয়ে ভেতর থেকে লেখা “HI”.
রাহুল এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
শরীরে হিম স্রোত বয়ে যায়।
রাতে সে ছাদে উঠে দেওয়ালটাকে ঠুকঠুক করে বাজিয়ে দেখে।
একটা অংশে শব্দটা একটু ফাঁপা লাগে।
সে ঠেলে দেখে, ইটের একটা অংশ সরে গেল — ভেতরে অন্ধকার ঘর।
ভিতর থেকে ঠান্ডা হাওয়া আর একটা তীব্র ঘামের গন্ধ বেরিয়ে এল।
হাতের টর্চ জ্বালিয়ে রাহুল দেখে…
ঘরের এক কোণে একটা চেয়ারে বসে আছে এক পুতুল — মাথা ঘোরানো, চোখ দুটো আঁধারে চকচক করছে।
চেয়ারের পেছনের দেওয়ালে লেখা —
“আমি এখানেই থাকি। তুমি কেন ঢুকলে?”

৪. পুতুল নড়ছে… অথবা রাহুল পাগল হয়ে যাচ্ছে?
পরদিন থেকে রাহুলের আচরণ পাল্টাতে থাকে।
সে রাতে জেগে বসে থাকে। দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে।
সে বলে — “ও কথা বলছে। আমায় কিছু বোঝাচ্ছে।”
অন্বেষা ভয় পায়।
সে মনোবিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে।
মনোবিদ বলেন — “কোনও অবচেতন ট্রিগার হতে পারে, তার পুরনো মানসিক চাপ থেকে। সাইকোজেনিক হ্যালুসিনেশন।”
কিন্তু এর মধ্যেই ঘটে যায় কিছু যা বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
একদিন রাতে অন্বেষা ঘুম ভেঙে দেখে, ঘরের দেয়ালের এক কোনা দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে… লালচে রঙের…
সে টর্চ জ্বালিয়ে দেখে — পেছনের দেয়ালের মধ্যে একটা হাত।
পাথরের মতো শক্ত, নখ কাটা নেই, আর… সেই পুতুলটার মতোই বাঁকানো।

৫. শেষ রাত, আর একটা প্রশ্ন
রাহুল জানায়—“আমি জানি সে কে।
সে এই বাড়ির আগের মেয়ে। তাকে সেই ঘরে বেঁধে রাখা হয়েছিল…
বাবা-মা ওকে মানসিকভাবে অস্থির বলতেন।
কিন্তু সে শুধু লেখালেখি করতে চাইত।
আর এখন… সে আমার গল্পের চরিত্র হতে চায়।
আমার হাত ধরে লিখতে চায়।”
শেষ রাতে অন্বেষা শুনতে পায় রাহুল একাই কাঁদছে।
ভোরের দিকে সে ছুটে এসে জানায়—
> “ও আজকে বাইরে বেরোতে চায়।
আমার ভিতরে ঢুকে গেছে।
তুমি বাঁচো, আমি পারব না।”

৬. শেষের দৃশ্য
রাহুল হারিয়ে যায়।
বাড়ি খালি। পুলিশ খোঁজে তাকে, বাড়ি মালিক জানায় — এরকম ঘটনা আগে হয়েছে।
এমনকি সে ঘরের আসল দরজা এখনও তালাবদ্ধ।
কেউ জানে না, ঘরের ভিতরে আসলে কী আছে।
সেই বাড়ির ছাদে এখনো অদ্ভুত ঠান্ডা হাওয়া বয়।
কেউ কেউ বলে রাতে পুতুলের মতো একটা মেয়ে দেখা যায় জানালার ফাঁকে।
শেষে শুধু একটা লাইনঃ
“তাকে দাও দেয়ালের জায়গা…
না হলে সে তোমার মনে বাসা বাঁধবে।”

Be the first to write a review

Leave a Reply

We’re sorry you’ve had a bad experience. Before you post your review, feel free to contact us, so we can help resolve your issue.

Post Review

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক গল্প