ঐ বনমানুষের মতো ছায়াগুলোর নৃশংসতা দেখে খালিদের ছোট মামা জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। সহকারী তার জ্ঞান ফিরানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু কোন লাভ হচ্ছে না!
এদিকে খালিদের স্ত্রী আগেই জ্ঞান হারিয়েছিলো। তার জ্ঞান ফিরানো সম্ভব হচ্ছে না। গাড়িতে খালিদের ছোট মামার এক দূর সম্পর্কের আত্মীয় ছিলো। যার নাম মৌলভী হামিদ পাঠান। তিনি একজন কবিরাজ মানুষ। আলেম ও জ্ঞানীও তিনি। তিনি সবার উদ্দেশ্যে বললেন,
– আমি জানি এখান থেকে কিভাবে বেঁচে ফিরতে হবে! সবাই চুপ করো।
স্তব্ধ জঙ্গলে তার কন্ঠস্বরটা তীরের মতো চার দিকে ছড়িয়ে গেলো। পরিবেশ খুব ভয়ংকর! সবাই থরথর করে কাঁপছে। এমন সময় এ রকম একজন পাশে দাঁড়ালে সবাই বল পায়!
মৌলভী হামিদ পাঠান ঘড়িতে দেখলেন, রাত প্রায় আড়াইটা বাজে। তারপর তিনি মাইক্রো গাড়ি থেকে নেমে নিচে আসলেন! তিনি নিচে পা দিতেই ওপাশে অ্যাম্বুল্যান্স থেকে সহকারী বললো,
– হুজুর, আপনাকেও ওরা মেরে ফেলবে! ওরা খুব ভয়ংকর! দেখলেনই তো। আপনি গাড়িতে উঠুন।
– তুমি একটু চুপ করো তো বাপু!(ধমকের সুরে)
– ঠিক আছে।
সহকারী চুপ হয়ে গেলো। মৌলভী হামিদ পাঠান অ্যাম্বুল্যান্সের পিছনে গিয়ে দাঁড়ালেন। আর সাথে সাথে ভয়ঙ্কর রকমের কিছু আওয়াজ কান ঝালাপালা করে দিলো। অ্যাম্বুল্যান্সের ভিতর সহকারী কান্না শুরু করেছে। তবে খুব চাপা স্বরে! মৌলভী হামিদ পাঠান এক টানে অ্যাম্বুল্যান্সের দরজা খুললেন। আর চিৎকার করে বললেন,
– এই শয়তান তোদের খাবারের ব্যবস্থা করেছি! আমাদের যেতে দে!
বলেই তিনি অ্যাম্বুল্যান্সের ভিতরের লাশের পা ধরে এক টানে বের করে দূরে ছুড়ে ফেলে দিলেন। সবাই অবাক হয়ে গেলো! মৌলভী সাহেবের বয়স এখন প্রায় পঞ্চাশের উপর! আর এই বয়সে উনার শরীরে এত জোর!
লাশটা দূরে গিয়ে ছিচকে পরলো। কিছুক্ষণ পর ঐ আগের মতো অনেকগুলো অবয়ব এসে ঝাঁপিয়ে পরলো লাশটার উপর। অন্ধকারে কিছু দেখা না গেলেও বুঝতে কোন অসুবিধেই হচ্ছিলো না। ঐ অবয়বগুলো লাশটাকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে। তার শব্দ এদিক থেকে শোনা যাচ্ছে। হাড় আর মাংস খাওয়ার কচমচ শব্দে সবার শরীর রি রি করে উঠছে। মৌলভী হামিদ পাঠান তাড়াতাড়ি এসে গাড়িতে বসলেন। আর বললেন,
– ড্রাইভার, গাড়ি চালাও!
মাইক্রো গাড়ির চালক গাড়ি চালানো শুরু করলো। এদিকে সহকারী আ্যাম্বুল্যান্স স্টার্ট দিয়ে চললো। গাড়ি ফুল স্পিডে চলছে। পিছনে ফিরে তাকানোর সময় বা সাহস কারো নেই।
হঠাৎ প্রচন্ড জোরে একটা আওয়াজ হলো। মনে হয় ঐ দৈত্যগুলো নিজেদের মধ্যে মারামারি শুরু করেছে! মৌলভী হামিদ পাঠান জোরে চিৎকার করে বললেন,
– কোন অবস্থাতেই যেন গাড়ি না থামে! গাড়ি চলবে!
অন্ধকারে সামনের সবকিছু ভেঙেচুরে দিয়ে গাড়ি শেষ পর্যন্ত মেন রোডে উঠে আসে। আর সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। এবার সবাই জোরে জোরে কান্না শুরু করে দেয়। মৌলভী হামিদ পাঠান সবাইকে ধমক দিয়ে বললেন,
– সবাই চুপ! আমরা এখনো নিরাপদ স্থানে আসিনি। ওরা এখানেও আসতে পারে!
পাশ থেকে খালিদের স্ত্রী বললো,
– কি বলছেন এসব চাচা!
– আমি একদম ঠিক বলছি। আমরা এখনো নিরাপদ নয়। তাই চুপ!
– ঠিক আছে। আর কাঁদবো না।
সবাই চুপ হয়ে গেছে। মৌলভী হামিদ পাঠান সহকারীকে অ্যাম্বুল্যান্স থামাতে বললেন। আর বললেন,
– তুমি খালিদের ছোট মামাকে নিয়ে এই গাড়িতে এসো!
– কেন হুজুর?
– কথা কম! তাড়াতাড়ি এসো।
– এখুনি আসছি।
সহকারী আর খালিদের ছোট মামা অ্যাম্বুল্যান্স থেকে নামতেই অদ্ভুত রকমের একটা অনুভুতি হয় তাদের! তাদের মনে হতে লাগলো কেউ যেন তাদের দূর থেকে দেখছে! আবার মনে হতে লাগলো কেউ যেন তাদের দিকে দৌড়ে আসছে!
খালিদের ছোট মামা খাটো মানুষ। বারবার এদিকে ওদিকে তাকাচ্ছে। মৌলভী হামিদ পাঠান বললেন,
– তাড়াতাড়ি এসো!
খালিদের ছোট মামা গাড়িতে উঠে বসলো। আর সহকারী বললো,
– আর অ্যাম্বুল্যান্সের কি হবে?
– অ্যাম্বুল্যান্স এখানেই থাকবে!
– না, না হুজুর! অ্যাম্বুল্যান্স ছেড়ে গেলে আমার চাকরি থাকবে না। আমি এটা পারবো না।
– জীবন আগে নাকি চাকরি আগে?
– জীবন তো আগে কিন্তু চাকরি ছাড়তে পারবো না!
সহকারী গাড়িতে উঠতে ইতস্তত করছিলো। হঠাৎ মৌলভী হামিদ পাঠান চমকে উঠলেন। তিনি চারপাশে বারবার তাকাচ্ছেন। তিনি ব্যস্ত হয়ে বললেন,
– তুমি তাড়াতাড়ি ভিতরে এসো। ওরা কিন্তু এসে গেছে! তাড়াতাড়ি..!
সহকারী পিছনে তাকালো। আর দেখলো অনেকগুলো ছায়া তার দিকেই উড়ে উড়ে আসছে। ছায়াগুলো দেখতে ঐ বনমানুষের মতো! ভয়ে তার পা ওখানেই জমে যায়।
তিনি তাড়াতাড়ি গাড়ির দিকে দৌড়ে আসেন। তিনি গাড়িতে এক পা দিতেই ঐ ছায়াগুলো তার আরেক পা ধরে জোরে টান দেয়। এক টানে তার শরীর মাঝখান বরাবর দু টুকরো হয়ে যায়! এক টুকরো গাড়ির ভিতরে আসে। আরেক টুকরো ঐ ছায়াগুলোর কাছে!
গাড়ির সবাই একসাথে ভয়ে চিৎকার করে উঠলো। ড্রাইভার এই নৃশংসতা দেখে জানালা দিয়ে বমি করে দিলো।
মৌলভী হামিদ পাঠান সহকারীর লাশের বাকি অংশও গাড়ির বাহিরে ফেলে দেয়। আর ড্রাইভারকে বলেন,
– গাড়ি চালাও!
ড্রাইভার ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে গাড়ি চালাতে লাগলো। ভয়ে তার চোখে পানি চলে এসেছে। সে কিছু দেখতে পাচ্ছে না। হঠাৎ গাড়ি ব্রেক ফেল করে একটা গাছের সাথে ধাক্কা লাগে। ড্রাইভারের মাথায় লাগে। সে জ্ঞান হারায়। আর বাকিদেরও হালকা আঘাত লাগে। সবাই ভয়ে থম মেরে গেছে। পিছন থেকে কেউ একজন বললো,
– এবার আমাদের কি হবে?
মৌলভী হামিদ পাঠান বললেন,
– কিছুই হবে না। আমরা ঐ শয়তানদের এড়িয়া ছেড়ে এসেছি।
সবাই এবার কান্নাকাটি শুরু করে দিলো। এই ঘটনা ঘটে গেছে তা প্রায় পঞ্চাশ দিন আগে। তাও এখনো ভয়ে কেউ ঐ জঙ্গলে পা রাখে না।
– পুরোটাই ফল্স ছিলো! আমার তো মনে হয় এটা কোন চোরাচালানকারীদের কাজ!
– না খোকাবাবু, তুমি জানো না তাই বলছো। আমি এতক্ষন যা যা বলেছি সব সত্য!