নির্বাক গলির ডাকঘর

#নির্বাক_গলির_ডাকঘর
#মিলনস্বর
পর্ব ১

( একটি রাজনৈতিক কল্প-রহস্য, যেখানে ইতিহাসের নিষিদ্ধ কণ্ঠ আর একটি রাষ্ট্রের নিঃশব্দতা মুখোমুখি হয় এক ছায়ানাট্যে।)

ঢাকার শহরটা তখনও জেগে থাকত রাত দশটার পর। চায়ের দোকানগুলো নিঃশব্দে কাঁপত ট্রানজিস্টার বেতারের শব্দে, যেটা প্রতিনিয়ত খবর দেয়— অথচ কারো গায়ে লাগে না। গলির মুখে তখনও ছেলেরা পল্টুর পানের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, যেন শহরের রাজনীতি তাদের দাঁতেও লেগে আছে। ১৯৮২ সালের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ, কুয়াশা শহরের ঘাড়ে চেপে বসেছে, আর পুরান ঢাকার গলি যেন অতীতের ক/ঙ্কা/ল হাতে নিয়ে হেঁটে বেড়ায়।

ঢাকার আকাশ তখন ধূসর। শহরের বুক ছিঁড়ে তৈরি হওয়া গলিগুলো এতটাই সরু যে, কোনো রিকশাও সহজে মোড় নিতে পারে না। পুরনো দালানগুলো যেন মৃ/ত্যু/র আগে জমে থাকা আ/ত্মার মত, একেকটি জানালা থেকে যেন শত বছরের ক্লান্তি ঝরে পড়ে। এমনই এক রাতে আকিব হায়দার দাঁড়িয়ে ছিল তার বাসার ছাদে। গায়ে চাদর, হাতে এককাপ তেতো লাল চা। শহরের বাতাসে বারবার ভেসে আসছিল শীতের জমাট বৃষ্টির গন্ধ।

তার স্ত্রী মায়ার নি/খোঁ/জ হওয়ার তিন মাস কেটে গেছে। পুলিশ বলে, ‘বউ পালাইছে। বিবাহিতা নারী নি/খোঁ/জের কেস নিতে পারি না, যদি না আত্মীয় স্বজন নিশ্চিত হয় হ/ত্যা/কা/ণ্ড।’ কিন্তু আকিব জানে, মায়া পালায়নি। সে একজন গল্প-সংগ্রাহক। পুরোনো পত্রিকা কেটে রাখত, মুদ্রিত কাগজের গন্ধে নিঃশ্বাস নিত। সে বলে, ইতিহাস মানে কোনো গল্প নয়— ইতিহাস মানে জীবিত মানুষের ভয়।

ঠিক তখনই ডাকপিয়ন একটি চিঠি নিয়ে আসে, সাদা খামে, তাতে শুধুমাত্র লেখা:

“আকিব হায়দার, ৩৩/বি বকশীবাজার লেন, ঢাকা-৭”

আর প্রেরকের জায়গায় শুধু লেখা:

“নির্বাক গলির ডাকঘর”

আকিব প্রথমে ভেবেছিল ভুল। এমন ঠিকানা নেই। ডাকঘর নেই, অঞ্চল নেই, এলাকা তো দূরের কথা। খাম খুলে সে কাঁপা হাতে চিঠিটি বের করল। চিঠির অক্ষরগুলো জলের রেখায় ভিজে গেছে, তবু পড়া যায়। হাতের লেখা— মায়ার।

“আকিব,

তুমি হয়তো এখন রাতের ছাদে দাঁড়িয়ে আছো, গায়ে চাদর। আমি দেখছি তোমায়। জানি, তুমি এখনও খুঁজছো আমাকে। জানি, কারো মুখে আমার নাম তুললেই কেমন থমকে যাও। তুমি যেটা জানো না, সেটা হলো: আমি মৃ/ত। অন্তত, শহরটা আমাকে আর চিনে না।

কিন্তু আমার মৃ/ত্যু হঠাৎ নয়। সেটি ঘটেছে ধীরে, দিনের পর দিন, যেভাবে কাগজে লেখা মুছে যায়।

এই চিঠি আমি লিখে গিয়েছিলাম এক ডাকঘরে, যেটা এখন কেউ খোঁজে না। যদি ঠিকঠাক পৌঁছায়, তাহলে বুঝবে, শহরের গু/ম হয়ে যাওয়া মানুষরা কোথায় যায়। যদি না পৌঁছায়, তাহলে বুঝে নিও, সবশেষ আমিও নির্বাক হয়ে গেলাম।

তোমার,
মায়া”

চিঠির নিচে আবারও লেখা: নির্বাক গলির ডাকঘর, ঢাকা-৭।

আকিবের শরীর হিম হয়ে গেল। সে বসে পড়ল, ছাদের ঠান্ডা রেলিংয়ের পাশে। হাতে থাকা চায়ের কাপটি পড়ে গেল, মেঝেতে লাল চায়ের ছিটে জমল, অনেকটা র/ক্তে/র মতো।

এই শহরের কোথাও একটা অদৃশ্য ডাকঘর আছে, যেখান থেকে মৃ/তে/রা চিঠি পাঠায়। আর কেউ একজন তার নামে ঠিকানা লিখে, তার খোঁজে কোনো প্রাচীন যন্ত্রণার দরজা খুলে দিয়েছে।

সকালবেলা আকিব গিয়েছিল তার অফিসে, ‘দৈনিক যুগদৃষ্টি’-তে। সেখানে আজকাল কেউ মাথা গলায় না। দেশজুড়ে সেনাশাসনের আবহ, সাংবাদিকতা এখন গলির দেয়ালে শব্দ লেখার মতো। টিকে থাকতে হলে খবর বেচো, সত্য না—ভাবমূর্তি। তবু আকিব এখনো লিখে, নি/খোঁ/জ মানুষদের গল্প। সেইসব গল্প যেগুলো কাগজে ছাপা হয় না, হয় শুধু ফাইলের নিচে চুপচাপ জমে থাকা শব্দ।

অফিসের কোণার সেই ছায়াঘেরা ডেস্কটাতে বসে সে আরও একবার চিঠিটি দেখে। হাতের লেখার প্রতিটি বাঁক তার চেনা—ওটা মায়া ছাড়া কারো নয়। সে বারবার পড়ে। প্রতিবার নতুন কিছু বোঝে। প্রতিবার গলায় কাঁটা জমে যায়।

তিন বছর আগে, ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে মায়াকে প্রথম দেখেছিল সে ঢাবির কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে। হাতে ছিল পুরানো পত্রিকার কা/টা, তাতে লেখা: ‘প্রতিরোধ নামে গোপন প্রতিবাদপত্র ফের বিতরণ বন্ধ।’ মায়া তখন বলেছিল, “তুমি সাংবাদিক হয়ে যদি সত্যিকে ভয় পাও, তাহলে ইতিহাস তোমার হাতেই শ্বাসরোধ করবে।”

তখন থেকেই মায়া তার কাছে শুধু একজন মানুষ নয়—একটা প্রশ্ন, একটা প্রতিধ্বনি, যে শহরের নীরবতায় ফাটল ধরাতে চায়। সেই মায়া আজ নেই। কিন্তু তার চিঠি এসেছে। একটা গোপন, কাল্পনিক, অসম্ভব ঠিকানা থেকে।

সন্ধ্যায় আকিব হাঁটছিল পুরান ঢাকার অলিগলিতে। এক বৃদ্ধ চা-ওয়ালা, বদরুল চিশতি, তার দীর্ঘদিনের চেনা। তার দোকানের পেছনের দেয়ালে এখনো ঝুলে আছে বঙ্গবন্ধুর বিবর্ণ পোস্টার, নিচে লেখা— “সত্যের মৃ/ত্যু নেই।” বদরুল হল সেইসব মানুষের একজন, যারা অতীতের আলোতে বর্তমান দেখে। সে জানে পুরান ঢাকার ভেতরে শহরের আ/ত্মা এখনো কাঁপে।

চা খেতে খেতে আকিব জিজ্ঞেস করল, “চাচা, ‘নির্বাক গলি’ নামে কোনো জায়গা কি পুরান ঢাকায় ছিল কখনো?”

বদরুল চা ঢালতে ঢালতে থমকে গেল। “তুমি কী করে জানলা এই নাম?”

“একটা চিঠি এসেছে ওখান থেকে।”

চুপচাপ চা ঢালার শব্দ কয়েক সেকেন্ড কেবল বাজল। তারপর বদরুল বলল, “শুনেছি অনেক বছর আগে… আশি-সত্তরের দিকে, একদল লোক গু/ম হইত। শহরের এক গলি ছিল, যেইখানে গেলে মানুষ ফেরত আসত না। ওগো বলত ‘নির্বাক গলি’। ঠিকানা থাকত না, শুধু হাওয়ায় নাম ভাসত।”

আকিব হেসে ফেলল, “মানে শহরের ভূ/তের গল্প?”

বদরুল এবার তার দিকে তাকাল, খুব নিচু স্বরে বলল, “ভূ/তের চেয়ে ভয়ংকর জিনিস হইল রাষ্ট্র।”

রাতে ঘরে ফিরে আকিব খোঁজ শুরু করে পুরাতন ম্যাপ, ডাকঘরের তালিকা, এমনকি পুরানো টেলিফোন ডিরেক্টরিও। কোথাও নেই ‘নির্বাক গলি’। তবে সে খুঁজে পায় এক পুরাতন রেকর্ড—১৯৭৩ সালে এক প্রস্তাবিত ডাকঘরের নথি, যার জায়গার নাম লেখা ছিল “ডাকঘর-ঢাকা-৭, অস্থায়ী”। এরপর তার পাশেই হাতের লেখায় লেখা:

“চালু হয়নি। পরিত্যক্ত। সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি।”

তখনই তার দরজায় কড়া নড়ে। মধ্যরাত প্রায়। দরজা খুলতেই একজন অচেনা লোক হাতে একটা ছোট খাম দিয়ে বলল, “এইটা আকিব সাহেবের জন্য। কেউ বাইরে দিল।”

খাম খুলে দেখল, ভিতরে একটুকরো ছবি—মায়ার হাসিমুখ। আর পেছনে লেখা:

“তোমার খোঁজ, আমার মৃ/ত্যু ডেকে আনবে। তবু এসো। নটরডেম সিঁড়িতে।”

আকিব চুপ করে বসে থাকে অনেকক্ষণ। খোলা জানালা দিয়ে ঢুকে পড়া বাতাসে তার গলা শুকিয়ে আসে। সে জানে, এই যাত্রা শুধু মায়ার জন্য নয়—এই শহরের অদৃশ্য ইতিহাস খুঁজে পাওয়ার জন্য, যাকে কেউ বলতে চায় না, শুধু দেয়ালে দেয়ালে নিঃশব্দে লেখা থাকে।

সেখান থেকেই শুরু হবে এই শহরের গভীরতম গু/মে/র ইতিহাস খোঁজার এক প্রগাঢ় অভিযান। নটরডেম সিঁড়ির ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকবে কেউ, যার চোখে হয়তো মায়ার ছায়া আছে, বা মৃ/ত্যু।

আর আকিব হায়দার বুঝবে—সাংবাদিকতা শুধু পেশা নয়। এটা শহরের ছায়ায় হাঁটতে থাকা এক নিষিদ্ধ ধর্ম।

[চলবে…]

Be the first to write a review

Leave a Reply

We’re sorry you’ve had a bad experience. Before you post your review, feel free to contact us, so we can help resolve your issue.

Post Review

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক গল্প