প্রতিরাতে লোকটাকে আমি আমার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। স্বপ্নে। লোকটাকে আমি চিনতে পারি না, অন্ধকারে ঢাকা পড়ে থাকে তার চেহারা। কিন্তু তবুও বুঝতে পারি, সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।
আমি ধরফর করে উঠে বসি। বিছানার পাশে রাখা টেবিল ক্লকটাতে দেখি রাত তিনটে বাজে। প্রত্যেকদিন রাত তিনটে বাজতেই এই স্বপ্নটা দেখি আমি। আমার ভয় হয়, ভীষণ ভয় হয়। পাশে শুয়ে থাকা শাহেদকে ডেকে তুলি আমি।
শাহেদ ঘুম থেকে ওঠে বিরক্তি নিয়ে। এরপর কিছুক্ষণ চুপচাপ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলে, ‘আবার দেখেছো স্বপ্নটা?’
‘হু।’
‘স্বপ্ন তো শুধু স্বপ্নই। ভয় পাবার তো কিছু নেই।’
‘এক স্বপ্ন তবে প্রতিদিন কেন দেখি? তাও একই সময়ে?’
‘সারাদিন এই স্বপ্নটা নিয়েই চিন্তা করো তো, তাই স্বপ্নটা বারবার দেখো।’
‘আর একই সময়ে?’
‘দিয়া, এটা তো তোমাকে অনেকবার বলেছি। আমাদের শরীরটা ঘড়ির মতো। সে যখন কিছুতে অভ্যস্ত হয়, তখন বারবার সেই কাজটাই করতে থাকে। তোমার অভ্যাস পরে গেছে তিনটার দিকে ওঠার, তাই তুমি তিনটার দিকেই ওঠো। ওঠার আগে র্যাপিড আই মুভমেন্ট হয় তোমার, সেই স্টেজেই স্বপ্নটা দেখো। এখানে অলৌকিক বা আধিভৌতিক কিছু নেই।’
আমার খুব ভালো লাগে শাহেদের কথা শুনতে। প্রতিদিন একই কথাই শুনি, তবু আমার আবার শোনা চাই। নইলে আমার ভয় কাটে না। আমি এরপর শাহেদকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ি। শাহেদও তার দুহাত প্রসারিত করে আমাকে টেনে নেয় ওর বুকের কাছে। আমি ছোট বাচ্চার মতো গুটিশুটি মেরে তার দুহাতের ভেতর ঢুকে পড়ি। শাহেদ তার নাক ডুবিয়ে দেয় আমার চুলে।
আমার ভয়টা কাটতে থাকে ধীরে ধীরে।
শাহেদের সাথে আমার বিয়েটা হয়েছিলো পারিবারিকভাবে। অথচ বিয়ের এক সপ্তাহের ভেতরেই আমরা একজন আরেকজনের এতো আপন হয়ে গেলাম, দেখলে কেউ বিশ্বাসই করতো না আমাদের পরিচয় মাত্র কয়েকদিনের। ও নিপাট ভদ্রলোক। এত্তো কেয়ারিং! একটা মেয়ে আদর্শ স্বামী হিসেবে যেমনটি চায়, ও ঠিক তেমনটাই। আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, আরো আগে কেন দেখা হলো না ওর সাথে? তবে এই ছোট্ট জীবনের আরো কয়েকটা দিন বেশি কাটাতে পারতাম ওর সাথে! শাহেদ কথাটা শুনলেই হো হো করে হেসে ফেলে। হাসতে হাসতেই বলে, ‘দিয়া, তুমি পাগল।’ আমি মুগ্ধ হয়ে ওর হাসি দেখি। একজন মানুষের হাসি এতো সুন্দর হয় কিভাবে?
আমাদের সম্পর্কে কেবল আমার স্বপ্নের সমস্যাটাই কাটার মতো বিঁধে।
শাহেদ সেদিন ওর এক বন্ধুর কাছে আমাকে নিয়ে গিয়েছিলো। তিনি সাইক্রিয়াটিস্ট। বেশ হাসিখুশি মানুষ। হাসতেই হাসতেই বললেন, ‘শাহেদ কি আপনাকে খুব দুশ্চিন্তায় রাখেন ভাবি? এমন উল্টোপাল্টা স্বপ্ন দেখতে থাকেন যে।’
‘না তো ভাই।’
‘যাই হোক, কিছু ওষুধ লিখে দিচ্ছি আপনাকে। নিয়মিত খাবেন। এসব স্বপ্ন আর দেখতে হবে না তখন।’
আমি নিয়মিত ওষুধ খাওয়া শুরু করি। আমার স্বপ্নের সমস্যাটাও কেটে যায় ধীরে ধীরে।
আমার সুস্থ হয়ে ওঠায় শাহেদ খুব খুশি হয়। ওর খুশি আরো বাড়িয়ে দিতেই বুঝি ওর মালয়েশিয়ায় ট্রেনিংয়ের চিঠিটা আসে। এক মাসের ট্রেনিং। ট্রেনিংয়ে যাবার আগেরদিন ওর ভীষণ মন খারাপ। আমাকে বলে, ‘তোমাকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করছে না বুনি। এতোটা খারাপ লাগবে এতোদিন বুঝিনি। আজ এতো খারাপ লাগছে কেন?’
আমি মুচকি হেসে বলি, ‘তুমি একটা পাগল।’
‘হু। তোমার সাথে থাকতে থাকতে পাগল হয়ে গেছি। আগে ভালো ছিলাম।’
শাহেদ মাঝে মাঝে আমাকে বুনি বলে ডাকে। আমার শুনতে ভালো লাগে। এয়ারপোর্টে ওকে যখন উঠিয়ে দিতে গেছি, ওর চোখে তখন পানি। কাঁদো কাঁদো গলায় বললো, ‘বুনি, খুব খারাপ লাগছে।’
আমিও চোখের পানি মুছে বললাম, ‘ফোনে প্রথমে বুনি বলে না ডাকলে আমি কিন্তু কথাই বলবো না।’
শাহেদ চলে গেল।
সেদিন রাতে, বাড়িতে আমি একা। মা অনেকবার ফোন করে বলেছিলেন বাড়ি যেতে, আমি যাইনি। শ্বাশুড়িমাও ফোন করেছিলেন, জিজ্ঞেস করেছিলেন এসে থাকবেন কি না আমার সাথে। আমি না করে দিলাম। আম্মা এমনিই অসুস্থ, শুধু শুধু কি দরকার এতো কষ্ট করবার।
রাত বারোটা বাজতেই আমি দরজা-জানালা বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম। ঘুম আসছিলো না। রাত পৌনে তিনটা, সেসময়েই আমি দরজা খুলবার শব্দ পেলাম।
কেউ ঢুকেছে আমাদের ফ্ল্যাটে।
আমি নিঃশ্বাস আটকে পড়ে রইলাম। আমার বেডরুমের দরজার লক খুললো ধীরে ধীরে। এরপর, এক দীর্ঘ মানুষ, ছায়ার মতো নিঃশব্দে ঢুকে পড়লো রুমে। ধীরে ধীরে সে এগিয়ে আসতে লাগলো আমার বিছানার কাছে। বিছানার পাশে এসে সে দাঁড়ালো, তারপর একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো আমার দিকে। স্বপ্নে লোকটিকে যেভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখতাম, ঠিক সেভাবে।
স্বপ্নে লোকটার চেহারা আমি দেখতে পেতামনা। বাস্তবে দেখলাম। শাহেদ। জানালা দিয়ে আসা পাশের ফ্ল্যাটের আলোয় পরিচিত মুখটাকে দেখেও আমার ভীষণ অচেনা লাগলো। কি হিংস্র জিঘাংসা ফুটে উঠেছে ওর মুখে।
আমি শুধু জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন?’
‘তোমাকে আর ভালো লাগে না বুনি। আমার অফিসের অরুনিমা তোমার থেকেও অনেক সুন্দর। তোমাকে ছাড়তে পারলেই শুধু ওর সাথে থাকতে পারবো।’
আমি কান্না আটকে বললাম, ‘তবে ছেড়েই দিতে।’
‘আরে বোকা নাকি। তোমাকে ছাড়লে বিয়ের কাবিনের বিশ লাখ টাকার যে হ্যাপা, সেটা কে সামলাবে? তার উপর তোমার বাপের সম্পত্তিটাও তো পাবো না। তুমি মরলেই সব আসবে আমার হাতে। বাপের একমাত্র মেয়েকে বিয়ে করার এই মজা।’
আমার মনটা ঘৃণায় ভরে গেল। একটা কথাও বলতে পারলাম না।
শাহেদ বিছানা থেকে বালিশ উঠিয়ে নিতে নিতে বললো, ‘বুদ্ধিটা অরুনিমাই দিয়েছিলো। আমার বদলে আরেকজন চলে গেছে ট্রেনিংয়ে। কিন্তু কাগজে কলমে নাম আছে আমার। সো, খুব সুন্দর একটা অ্যালিবাই পাওয়া গেল। তোমার মারা যাবার খবর শুনে কাল আসবো ঢাকায়। মানে, আমার বদলিটা আসবে।এরপর কিছুদিন মায়াকান্না কাঁদবো। পরিবার আমাকে আবার দ্বিতীয় বিয়ের চাপ দিবে। আমি না না করবো। শেষমেষ পরিবারের চাপে রাজি হবো। অরূনিমা তখন ভালো মানুষের মতো এগিয়ে আসবে। আমার দায়িত্ব নিবে। সারাজীবন একসাথে সুখে থাকবো আমরা। কি সুন্দর প্ল্যান, তাই না?’
আমি ঘৃণাভরে তাকালাম শাহেদের দিকে।
শাহেদ বলে চলেছে, ‘এই প্ল্যানের ভাইটাল সমস্যা এখন তুমি।তুমি মরে গেলেই প্ল্যানটা স্মুথলি তরতর করে এগিয়ে যাবে। কোনো চিন্তা করো না দিয়া, বেশি কষ্ট দিবো না। শুধু একটু নিঃশ্বাসটা আটকাতে হবে। ঠিক আছে?’
শাহেদ এগোতে লাগলো আমার দিকে। আমি চিৎকার করতে চাইলাম, কিন্তু পারলাম না। গলা দিয়ে কোনো শব্দই বের হলো না। শেষে কেবল আমি শাহেদের মুখটা দেখলাম। জিঘাংসায় ভরা মুখ, ঝুকে আছে আমার দিকে। আমার আর কিছু মনে নেই।
যখন আমার জ্ঞান ফিরলো, তখন সকাল। অনেকগুলো উদ্বিগ্ন মুখ ঝুকে আছে আমার দিকে। আমার মাথাটা ভেজা ভেজা লাগছে। কে যেন পানি ঢালছে মাথায়।
মাথা ভার ভার লাগছে। উঠে বসলাম। ঘরভর্তি মানুষ গিজগিজ করছে। সবাই আমার আত্মীয়-স্বজন। এরা সবাই বাসায় এসেছেন কেন?
রাতের কথাটা তখনি মনে পড়লো।
শাহেদ দৌড়ে এসেছে ততক্ষণে। দুহাতে আমার কাঁধ ধরে বললো, ‘দিয়া, তুমি ঠিক আছো?’
আমি ভয় পাওয়া চোখে শাহেদের দিকে তাকালাম।
আমার শ্বাশুড়িমা ততক্ষণে শাহেদের কান মুচড়ে ধরেছেন। তিনি চিৎকার করেই বলতে লাগলেন, ‘বদ, এরপরও কি কেউ ঠিক থাকে? ট্রেনিং ক্যান্সেল হয়েছে, সোজা করে বললে কি হতো? না, এসেছে বউকে চমকে দিতে। মেয়েটা যদি ভয়ে মরে যেত, তাইলে কি করতি?’
শাহেদ কাঁচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আমি ততক্ষণে বুঝতে পেরেছি ব্যাপারটা। রাগে গা জ্বলে যাচ্ছে। এতোজন আত্মীয়-স্বজনের মাঝেও নিজেকে সামলাতে পারলাম না, চিৎকার করে বলে ফেললাম, ‘তুই একটা পাগল।’
শাহেদ গোমড়ামুখে বললো, ‘আগে ছিলাম না। তোমার সাথে থাকতে থাকতে পাগল হয়ে গেছি।’