বোবা বউ

নিঝুমের সাথে আমার বিয়েটা হবে কেউ আশা করেনি! আমার মা তো প্রায় না করেই বসেছিল। বাবা তেমন কথা বলেনি। উনি জানেন আমি কেমন, আমি যাই করব তা অবশ্যই ভালো হবে। কিন্তু মা কিছুতেই মানতে পারছিলেন না। অবশ্য না মানতে পারারই কথা। কোনো মা চায় না তার ছেলে একটা বোবা মেয়েকে বিয়ে করে ঘরে আনুক!
ছেলের বউয়ের সাথে যদি কথা না হয় তাহলে কিভাবে সংসার চলবে। তবে আমি প্রায় জোড় করেই নিঝুমকে বিয়ে করেছি।
(বিয়ের আগের কাহিনী)…
চাকরি পাওয়ার পর যখন আরামে দিন পার করছি। সেই সময় মা এসে আমাকে বিয়ের বাজারে ঢুকিয়ে দিলো। উনি এতদিন অনেক সহ্য করছেন। আর পারছেন না। এতদিন তিনি পুরো রাজ্য শাসন করেছেন।এখন অন্য একজনকে সেই জাঁতাকলে পিষতে চান। এতেই তার মজা! আসলে মহিলাদের কুটনৈতিক চাল এতো বেশি যে আমিও বুঝতে পারি না! তখন আর উপায় থাকে না কিছু করার। কেঁদে দে মা ছেড়ে বাচি অবস্থা! সে যাই হোক। মায়ের কথা মতো বেশ কয়েকটি মেয়েকে দেখেছি। কিন্তু আসল কথা হচ্ছে আমার কেমন জানি সুবিধের মনে হচ্ছে না।
তাই আমিও না করে যাচ্ছি। এর পর নিঝুমকে দেখতে গিয়েছি। তখন পর্যন্ত জানতাম না নিঝুম কথা বলতে পারে না। প্রথমে তো নিঝুমকে দেখে ঝটকা খেয়েছি। নিঝুম দেখতে মোটামুটি সুন্দরি। আমার পছন্দ হয়ে গেলো হঠাৎ করেই। মা আমাকে ওর সাথে আলাদাভাবে কথা বলতে বলল। নিঝুম আমাকে ওর রুমে নিয়ে গেলো। সাজানো গুছানো রুম। নিঝুম দেখতে যেমন খুব সাধারণ তেমনি ওর রুমের চেহারাও সাধারণ। নিঝুমের দিকে তাকিয়ে দেখি কেমন ঝিম মেড়ে বসে আছে। আমি ওর দিকে তাকিয়ে বলি,
– তোমার কি এই বিয়েতে মত আছে??
নিঝুম কিছু না বলে চুপ করে আছে। আমার কেন জানি মনে হলো এই মেয়ের অন্য রিলেশন আছে। এরকম একটা মেয়ের রিলেশন থাকবে না এ কেমন কথা! তবুও একটু চেষ্টা করলাম। আবার বললাম।
– আচ্ছা, তোমার কি অন্য রিলেশন আছে??
এবার আর নিঝুম চুপ করে থাকলো না। দমকে কেঁদে উঠলো। আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম। মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে ভেবাচেকা খেয়ে গেলাম। নিঝুম হাত দিয়ে ইশারা করে বলল, ও কথা বলতে পারে না! আমি থ হয়ে গেলাম। এমনটা ভাবিনি কখনো। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো । আমার কি হয়ে গেলো বুঝতে পারলাম না। এমন কোনদিন হয়নি । আমি আস্তে করে উঠে দু হাত দিয়ে ওর মুখ তুলে ধরলাম । গাল বেয়ে মুক্তোর মত চোখের পানি গড়িয়ে পরছে । মুছে দিয়ে হাসি মুখে তাকালাম।
– আমাকে পছন্দ হয়?
ও আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। আমি আবার বলি,
– পছন্দ হয় আমাকে?
মাথা নাড়িয়ে হ্যা বলল।
– বিয়ে করবে আমায়?
নিঝুম লজ্জায় মাথা নিচু করে থাকলো। একটু পর ইশারায় বলল,
– আপনার মা?
আমি বলি,
– মাকে তো আমি মানিয়ে নিবো। তুমি রাজি কি না বলো ??
ও কিছু না বলে চুপ করে থাকলো। আমি যা বুঝে নেওয়ার বুঝে নিয়েছি। তবে ঘটনা এখানেই থেমে থাকলো না। আমিও মাকে বলিনি যে নিঝুম কথা বলতে পারে না। ভেবেছি বিয়ের পর বলবো। তখন মা আর নাও করতে পারবে না। কিন্তু কিভাবে জানি মা জেনে গেলো। এর পর থেকেই মা জেদ ধরে বসে আছে এ বিয়ে হবে না । তবুও মাকে বুঝিয়েছি আমি । শুধু নিঝুমের জন্যে । জানি না কি দেখেছি ওর মাঝে। তখন শুধু মনে হয়েছিল ওকে না হলে আমার জীবন পুর্নতা পাবে না।
.
বিয়ের পর বুঝেছি নিঝুম কতটা অভিমানী মেয়ে। অল্প কয়েকদিন এই বাসায় সবার মন জয় করে নিয়েছে। বেশ চটপটে মেয়ে। কয়েকদিনেই মায়ের সঙ্গি হয়ে গেলো । তবে ওর একটা স্বভাব হচ্ছে…. কেউ কিছু বললে রাগ হবে না শুধু হাসে । কিন্তু একটু বকা দিলে মুখ ফুলে বসে থাকে । অভিমানী মেয়েটি কারো উপড়ে রাগ করলে তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে। বিয়ের পর তো ও ভয়ে ভয়ে ছিল। কখন আমার মা বকে এটা করতে পার না ওটা করতে পার না বলে। তাই সব কাজ আগে ভাগে শেষ করে রাখে। আর শুকনো মুখে মায়ের আশেপাশে ঘুরাঘুরি করে। আমি দেখি আর হাসি। আমার মা ও বেশ পারে মুখ গম্ভীর করে অর্ডার করেন। কিন্ত ভুল তো হবেই। সেটা হয়ে গেলো রান্নার সময়ই।
মা আবার নিজে রান্নাঘরে না গেলে শান্তি পান না। কিন্তু সেদিন তার কোমরের বেথা টা বেশ ভালোভাবেই ধরেছে। তাই বিছানা থেকে উঠতেও পারেনি। এদিকে আমার অফিসের দেড়ি হয়ে যাচ্ছে। তাড়াহুড়োয় নিঝুম ডালটা পুড়ে ফেলল। বুঝলাম আজকে নিশ্চিত কিছু একটা হবে। মা এসে প্রথমে পুড়ে যাওয়া ডাল দেখল। এর পর নিঝুমের দিকে তাকিয়ে বলল,,
– তুমি তো লাঠসাহেব এর মেয়ে তাই না। গরিবের ঘরের ডাল না পুড়ালে তোমার শান্তি হবে না তো।
নিঝুমের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি। মুখটা যেন শ্রাবনের আকাশ হয়ে গেছে। চোখ দুটো ছল ছল করছে। মাকে জড়িয়ে ধরে হাপুস হুপুস করে কান্না করতে লাগলো। মা তো অবস্থা দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। তিনি ভাবতেও পারেননি এমন কাজ করবে নিঝুম। নিঝুমকে নিজের কাছ থেকে ছাড়ালেন। চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বললেন,,
– খুব তো নাটক পার? কিভাবে মানুষকে বশ করতে হয় সেটাও। বলে মা হেসে দিলো।
মায়ের মুখে হাসি দেখে নিঝুম আবার মায়ের কাঁধে মুখ লুকালে মা মুখ ঝামটা দিয়ে উঠলেন।
– উহু ঢং আর ভালো লাগে না তো। এই বুড়ো বয়সে এভাবে নড়াচড়া করলে তো কোমর ভেঙ্গে পরবে।
মা ও নিঝুমের কাণ্ড দেখে হাসি পায়। পারেও বটে মা। মা তার বউমার সাথে যেভাবে গল্প শুরু করলেন, মনে হচ্ছে আজকে না খেয়ে অফিস যেতে হবে। এই হচ্ছে নিঝুম! কথা বলতে না পারলে কি হবে? নিজের অধিকার আদায় করতে সে নিজেই পারে।
.
সেদিন অফিস ফেরত এসে দেখি নিঝুম কি যেন সেলাই করছে। আমাকে দেখ পিছনে লুকালে, চোখ দিয়ে ইশারা করি, কি? ও মাথা দুলিয়ে বলল, কিছু না। আমি কিছু বলি না। ও উঠে গেলো তোয়ালা আনতে। আমি আস্তে উঠে গিয়ে ওয়ারড্রব খুলে দেখি একটা ছোট কাথা। কেবল সেলাই অবস্থায় আছে। বাইরে গিয়ে নিঝুমকে ধরে ফেলি। ইশারায় বলি ঘটনা কি? যা বলল, তার সারমর্ম হচ্ছে আমি বাবা হতে যাচ্ছি! বাবা! আমার তো কাপাকাপি অবস্থা। মাকে ডাকি । দেখি মায়ের অবস্থা আমার থেকেও খারাপ। কোমরের ব্যাথা ভুলে আনন্দে লাফাচ্ছে। পরিবারে নতুন কেউ আসবে তার আনন্দে। এ আনন্দ সবার থেকেই আলাদা। আমি নিঝুমের দিকে তাকিয়ে থাকি। এক চিলতে লজ্জা মিশ্রিত হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। মুখে একটা বড় দায়িত্ব নেওয়ার অদম্য সাহসিকতা। আমি জানি নিঝুম পারবে। ওকে পারতেই হবে।
আচ্ছা আমরা কি পারিনা কোন প্রতিবন্ধিকে বিয়ে করতে ??
হয়তো নিঝুম কথা বলতে পারতো না , হয়তো সে তার মুখে তার ভাষা প্রকাশ করতে পারতো না কিন্তু বাকি কোনো দিক থেকে তো সে একটুও কম নয় । বোবা হয়েছে তো কি হয়েছে ?? সেও তো একটা মেয়ে , আর পাচটা মেয়ের মত তারও কত হাজার স্বপ্ন আছে , তা কি আমরা পুরন করতে পারিনা ??

Be the first to write a review

Leave a Reply

We’re sorry you’ve had a bad experience. Before you post your review, feel free to contact us, so we can help resolve your issue.

Post Review

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক গল্প