মেঘমহল-এর অসমাপ্ত অধ্যায়

প্রথম অধ্যায়: অতীতের হিমশীতল ছায়া
দার্জিলিং-এর মাথায় মেঘের চাদর সরিয়ে যখন শতাব্দী প্রাচীন ‘মেঘমহল’ তার ধূসর অবয়ব মেলে ধরল, স্থপতি ইশানী রায়ের শিরদাঁড়া দিয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল। এই গথিক স্থাপত্যের রহস্যময়তা আর ইতিহাসের ভার তাকে যতটা টানছিল, তার চেয়েও বেশি ছিল এক অজানা আতঙ্ক। ক্লায়েন্টের পাঠানো সংক্ষিপ্ত বিবরণে শুধু লেখা ছিল, ‘ঐতিহ্য এবং আধুনিকতার মেলবন্ধন’। ইশানী জানত না, এই মেলবন্ধন শুধু পাথরের হবে না, হবে তার নিজের ক্ষতবিক্ষত অতীতের সাথেও।
কনফারেন্স রুমের ভারী ওক কাঠের দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই সময়টা যেন দশ বছরের জন্য স্থির হয়ে গেল। ঘরের অন্য প্রান্তে, বিশাল কাঁচের জানলার সামনে রাখা চেয়ারে বসে থাকা অবয়বটা ঘুরে দাঁড়াল। আদৃত চৌধুরী।
সেই একই গভীর কালো চোখ, যা একসময় ইশানীর গোটা মহাবিশ্ব ছিল। সেই একই চওড়া কাঁধ, যাতে মাথা রেখে সে নিশ্চিন্তে ঘুমাত। আর ঠোঁটের কোণে সেই একই ব্যঙ্গাত্মক, আত্মবিশ্বাসী হাসি, যা একদিন তার স্বপ্ন আর আত্মসম্মানকে চুরমার করে দিয়েছিল।
“আদৃত! তুমি… এখানে?” ইশানীর গলা শুকিয়ে কাঠ। পেশাদারিত্বের যে বর্মটা সে গত দশ বছরে তিলে তিলে গড়ে তুলেছিল, তা এক মুহূর্তে ভেঙে পড়ার উপক্রম হলো।
আদৃত ধীর পায়ে এগিয়ে এল। তার দামী পারফিউমের পরিচিত গন্ধটা ইশানীর শ্বাসরোধ করে দিচ্ছিল। “অবাক হলে, ইশানী? মেঘমহল আমাদের পারিবারিক সম্পত্তি। এর পুনরুজ্জীবনের দায়িত্ব আমার। আর এই প্রজেক্টের প্রধান স্থপতি যে দেশের সেরা আর্কিটেক্ট, অর্থাৎ তুমি, সেটা একটা ইন্টারেস্টিং সমাপতন, তাই না?”
ইশানীর বুকের ভেতরটা জ্বলে উঠল। ‘সমাপতন’! যে মানুষটা তার আর্কিটেক্ট হওয়ার স্বপ্নকে ‘মেয়েলি বিলাসিতা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিল, আজ সে-ই তার ক্লায়েন্ট!
“আশা করি আমাদের ব্যক্তিগত অতীত আমাদের পেশাদারিত্বের পথে আসবে না, মিস্টার চৌধুরী,” দাঁতে দাঁত চেপে বলল ইশানী।
আদৃত তার আরও কাছে এসে ঝুঁকে দাঁড়াল। তাদের মধ্যে দূরত্ব রইল মাত্র কয়েক ইঞ্চি। ইশানী তার উষ্ণ নিঃশ্বাস নিজের গালে অনুভব করতে পারছিল। আদৃত ফিসফিস করে বলল, “ব্যক্তিগত অতীত তো ভোলার জিনিস নয়, মিস রায়। ওটা তো ইতিহাসের মতোই, চাইলেও মুছে ফেলা যায় না।”
দ্বিতীয় অধ্যায়: ঝড়ের রাত ও কামনার আগুন
দিনের পর দিন মেঘমহলের পুরনো করিডোরে, ধুলোমাখা আসবাবের মধ্যে তাদের সাক্ষাৎ হতে লাগল। স্থাপত্যের নকশা, উপকরণ আর বাজেটের আলোচনায় তাদের পুরোনো ঝগড়ার প্রতিধ্বনি ফিরে আসত। প্রতিটি তর্ক ছিল ক্ষমতার লড়াই, প্রতিটি চাহনি ছিল না বলা কথার বিনিময়।
সেদিন সন্ধ্যায় নিয়তি যেন তাদের জন্য এক অন্য চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিল। আকাশ ভেঙে নামল তুমুল বৃষ্টি, সাথে হাড় কাঁপানো ঝোড়ো হাওয়া। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ল্যান্ডস্লাইডের খবর এল। দার্জিলিং শহর থেকে মেঘমহল সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। ফেরার কোনো উপায় নেই।
মেঘমহলের কেয়ারটেকার তাদের দুজনকে লাইব্রেরি ঘরে ফায়ারপ্লেসের সামনে বসিয়ে দিয়ে গেল। বাইরে প্রকৃতির তাণ্ডব, আর ভেতরে দুজন মানুষের হৃদয়ে জমে থাকা এক দশকের ঝড়। হাতে হুইস্কির গ্লাস। আগুনের লালচে আভা তাদের মুখে রহস্যময় ছায়া ফেলছিল।
নীরবতা অসহ্য হয়ে উঠলে আদৃতই প্রথম কথা বলল। “সেদিন রাতেও এমনই বৃষ্টি ছিল, ইশানী। যেদিন তুমি আমার জীবন থেকে চিরদিনের জন্য হারিয়ে গিয়েছিলে।”
হুইস্কির গ্লাসটা ঠক করে টেবিলে রাখল ইশানী। “আমি হারাইনি, আদৃত। তুমি আমাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলে! কারণ আমি তোমার ট্রফি ওয়াইফ হতে রাজি ছিলাম না। আমি তোমার নামের ছায়ায় বাঁচতে চাইনি। আমার নিজের একটা আকাশ তৈরির স্বপ্ন ছিল!”
“আর আমি সেই আকাশে ডানা মেলার আগেই তোমার ডানা কেটে দিতে চেয়েছিলাম,” আদৃতের কণ্ঠে গভীর অনুশোচনা। সে উঠে এসে ইশানীর সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। “আমি ভয় পেয়েছিলাম, ইশানী। তোমার তেজ, তোমার প্রতিভা, তোমার উড়ানকে আমি ভয় পেয়েছিলাম। আমার পুরুষতান্ত্রিক অহংকারের কাছে আমার ভালোবাসা হেরে গিয়েছিল।”
ইশানীর চোখ ঝাপসা হয়ে এল। এই স্বীকারোক্তি শোনার জন্য সে দশটা বছর অপেক্ষা করেছে। কিন্তু এখন এর কী অর্থ?
“অনেক দেরি হয়ে গেছে, আদৃত।” সে উঠে দাঁড়াতে চাইল।
আদৃত এক ঝটকায় তার হাত ধরে নিজের দিকে টানল। ইশানী টাল সামলাতে না পেরে সরাসরি তার কোলে এসে পড়ল। আদৃতের বলিষ্ঠ হাত তার কোমরটা এমনভাবে জড়িয়ে ধরল, যেন আর কোনোদিন ছাড়বে না।
“দশটা বছর, ইশানী… প্রতিটা রাত আমি তোমার শরীরের গন্ধ খুঁজেছি। প্রতিটা সকালে তোমার মুখটা ভেবে আমার দিন শুরু হয়েছে। অন্য কোনো নারী আমার জীবনে সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারেনি। বলো, এটাও কি অর্থহীন?”
আদৃতের উষ্ণ নিঃশ্বাস, তার গলার গভীর স্বর, ফায়ারপ্লেসের উত্তাপ আর হুইস্কির নেশা—সব মিলে ইশানীর প্রতিরোধকে গলিয়ে দিচ্ছিল। সে কিছু বলার আগেই আদৃতের ঠোঁট তাকে গ্রাস করল।
এটা কোনো সাধারণ চুম্বন ছিল না। এটা ছিল দশ বছরের জমানো তৃষ্ণা, ক্ষোভ, অনুশোচনা আর তীব্র কামনার এক বিস্ফোরণ। ইশানীর হাত আদৃতের চুলের মুঠি ধরল, তার নখগুলো আদৃতের পিঠে গভীর ক্ষত তৈরি করল। বাধা দেওয়ার পরিবর্তে সে আরও মরিয়া হয়ে সাড়া দিল। তাদের জিহ্বা একে অপরের সাথে এক আদিম যুদ্ধে লিপ্ত হলো—যেখানে জয় বা পরাজয় নেই, আছে শুধু একে অপরকে পুরোপুরি অনুভব করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা।
আদৃত তাকে কোলে নিয়েই উঠে দাঁড়াল। ফায়ারপ্লেসের সামনে পাতা পুরু পশমের কার্পেটের ওপর পরম যত্নে নামিয়ে আনল। আগুনের আলোয় তাদের চোখ একে অপরের দিকে নিবদ্ধ। আদৃতের হাত ইশানীর শাড়ির আঁচল সরিয়ে তার কাঁধে এসে থামল। আঙুলের ডগা দিয়ে সে ইশানীর গলার কাছে, সেই পরিচিত তিলটার ওপর হাত বোলালো। ইশানীর সারা শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল।
আদৃত ঝুঁকে এসে তার গলায়, কাঁধে, কানের লতিতে চুম্বন করতে লাগল। প্রতিটি চুম্বনে সে যেন ক্ষমা চাইছিল, প্রতিটি স্পর্শে সে যেন তাদের হারিয়ে যাওয়া সময়কে ফিরিয়ে আনার শপথ নিচ্ছিল। ইশানীর শাড়ি, ব্লাউজ, পেটিকোট কখন যে তার শরীর থেকে খসে পড়েছে, সে খেয়াল করেনি। আদৃতের শার্টের বোতামগুলো সে নিজেই উন্মত্তের মতো ছিঁড়ে ফেলল।
ফায়ারপ্লেসের সোনালী আলোয় তাদের নগ্ন শরীর দুটো যেন একে অপরের জন্য তৈরি এক নিখুঁত শিল্পকর্ম। আদৃত মুগ্ধ চোখে ইশানীর শরীরের প্রতিটি ভাঁজ, প্রতিটি রেখা দেখছিল। দশ বছরে তার শরীর আরও পরিণত, আরও আকাঙ্ক্ষিত হয়ে উঠেছে।
“তুমি আরও সুন্দর হয়ে গেছো,” ফিসফিস করে বলল আদৃত।
তার ঠোঁট এরপর নেমে এল ইশানীর বুকের উপত্যকায়। তার জিহ্বার উষ্ণ, ভেজা স্পর্শে ইশানীর শরীর ধনুকের মতো বেঁকে গেল। তার মুখ থেকে অস্ফুট শীৎকারের শব্দ বেরিয়ে এল। আদৃতের হাত তখন তার মসৃণ পেট পেরিয়ে আরও দক্ষিণে, তার নারীত্বের কেন্দ্রে পৌঁছে গেছে। ইশানীর শরীরের গোপন পাপড়িগুলো আদৃতের আঙুলের চাপে উন্মোচিত হলো, আর বহু বছর ধরে জমানো অমৃতরসে সিক্ত হয়ে উঠল।
ইশানী আর পারছিল না। সে আদৃতকে নিজের ওপর টেনে নিল। “আর অপেক্ষা করাস না, আদৃত… আমাকে তোর করে নে… এখুনি…”
আদৃত আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। তাদের শরীর এক হয়ে গেল। ইশানীর মুখ থেকে একটা চাপা আর্তনাদ বেরিয়ে এল। এটা শুধু শারীরিক মিলন ছিল না, এটা ছিল দুটো ভাঙা আত্মার বহু বছর পর নিজেদের সম্পূর্ণ করার মরিয়া প্রচেষ্টা। তাদের ছন্দের তালে তালে ফায়ারপ্লেসের আগুনটাও যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ঘামের নোনতা স্বাদ, ঘন ঘন নিঃশ্বাসের শব্দ আর চামড়ার ওপর চামড়ার ঘর্ষণের শব্দ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। আদৃতের প্রতিটি ধাক্কা ইশানীর শরীরের গভীরে এক তীব্র, অসহ্য সুখের ঢেউ তুলছিল। সে আদৃতের পিঠ আঁকড়ে ধরে নিজেকে সেই ঢেউয়ে ভাসিয়ে দিল।
তৃতীয় অধ্যায়: ভোরের আলোয় নতুন সমীকরণ
যখন ভোরের প্রথম আলো কাঁচের জানলা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করল, তারা তখনও একে অপরকে জড়িয়ে কার্পেটে শুয়ে ছিল। ফায়ারপ্লেসের আগুন নিভে ছাই হয়ে গেছে, কিন্তু তাদের শরীরের উত্তাপ তখনও গরম।
ইশানী চোখ খুলল। আদৃত তার দিকেই তাকিয়ে ছিল। সেই চোখে এখন কোনো ব্যঙ্গ নেই, আছে এক গভীর প্রশান্তি আর ভালোবাসা।
“শুভ সকাল,” আদৃত ইশানীর কপালে একটা দীর্ঘ চুম্বন এঁকে দিল।
ইশানীর হঠাৎ করেই বাস্তব জ্ঞান ফিরে এল। সে কী করল! এক রাতের দুর্বলতায় সে তার দশ বছরের লড়াইকে অর্থহীন করে দিল? সে উঠে বসতে চেষ্টা করল।
আদৃত তার হাতটা ধরল। “পালানোর চেষ্টা করিস না, ইশানী। কাল রাতে যা হয়েছে, তা কোনো ভুল ছিল না। ওটা অনিবার্য ছিল।” সে উঠে বসল। “আমি জানি, কথা দিয়ে সব ঠিক করা যায় না। কিন্তু আমি তোমাকে হারাতে চাই না। আর একবারও না।”
আদৃত তাকে মেঘমহলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা দেখাল। “আমি শুধু একটা হোটেল বানাতে চাই না। আমি এখানে একটা আর্ট অ্যান্ড আর্কিটেকচারাল ইনস্টিটিউট খুলতে চাই। আর আমি চাই, তুমি হবে তার প্রধান। মেঘমহল তোমার ক্যানভাস, ইশানী। তুমি তোমার ইচ্ছেমতো একে রাঙিয়ে তোলো। তোমার স্বপ্নকে আমি আর কোনোদিন ছোট করব না।”
ইশানীর চোখে জল। যে স্বপ্নকে অস্বীকার করার জন্য আদৃত তাকে ছেড়ে গিয়েছিল, আজ সে-ই সেই স্বপ্নকে উড়ান দেওয়ার জন্য তার পাশে দাঁড়াতে চাইছে।
তাদের সম্পর্কটা সেই সকালে এক নতুন মোড় নিল। এটা আর শুধু প্রাক্তন প্রেমিক-প্রেমিকার সম্পর্ক ছিল না। এটা ছিল দুজন পরিণত মানুষের, যারা তাদের ক্ষতচিহ্ন নিয়েই একে অপরকে নতুন করে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছিল। তাদের দিনের বেলার তর্কগুলো এখন আরও গভীর আলোচনায় পরিণত হলো, আর তাদের রাতগুলো ভরে উঠল তীব্র আবেগ আর আবিষ্কারের আনন্দে। মেঘমহলের প্রতিটি কোণা, প্রতিটি ঘর তাদের অসমাপ্ত প্রেমের নতুন অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে রইল।
একদিন বিকেলে, মেঘমহলের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে তারা পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। আদৃত পেছন থেকে এসে ইশানীকে জড়িয়ে ধরল। তার ঠোঁট ইশানীর কাঁধে ডুবিয়ে দিয়ে সে ফিসফিস করে বলল, “আমাদের গল্পের শেষটা এখনও লেখা বাকি, স্থপতি সাহেব। আর আমি চাই, সেই গল্পের নকশাটা তুমি আর আমি একসাথে তৈরি করি।”
ইশানী তার হাতের ওপর নিজের হাত রাখল। সে জানত, পথটা সহজ হবে না। পুরনো ক্ষত হয়তো মাঝে মাঝে জানান দেবে। কিন্তু বহু বছর পর, তার জীবনে একটা সুর ফিরে এসেছে। অসম্পূর্ণ, কিন্তু একান্তই তাদের নিজস্ব। আর সেই সুরের টানেই সে আর একবার সবকিছু বাজি রাখতে প্রস্তুত ছিল। মেঘমহলের অসমাপ্ত অধ্যায় এবার সম্পূর্ণ হওয়ার অপেক্ষায়।

Be the first to write a review

Leave a Reply

We’re sorry you’ve had a bad experience. Before you post your review, feel free to contact us, so we can help resolve your issue.

Post Review

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক গল্প