আকর্ষণীয় ফিগারের কাউকে খুঁজছি আমি মনে-প্রানে। চাইলে আপনাদেরও মাপগুলো জানিয়ে দিতে পারি, উচ্চতা কমপক্ষে ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি আর শরীরের মাপ হতে হবে ৩৪-২৪-৩৬।
২.
বছর খানেক আগের কথা, কোন এক সকাল।
শীতের তীব্রতা কিছুটা কমেছে, তবে আমি কম্বল থেকে এখনো বের হইনি, এমন সময় মা এসে ঘরে ঢুকলেন।
“রোহান বাবা, তুই একেবারে দেশে ফিরে আসলি। ফিরে আসার আগে আমাদেরকে একবার জিজ্ঞেসও করলি না। তোর বাবার পেনশনের সমস্ত টাকা খরচা করে গেলি। তোর আয়েই সংসার চলছিলো। এখন কি হবে?”
“মা, সামান্য ধৈর্য্য ধরো, অত দুশ্চিন্তা করোনা। আমিই সব সামলাবো। একেবারে খালি হাতে তো আসি নাই।”
আমি আমার মাকে আশ্বস্ত করতে বললাম কথাটা।
“কিন্তু তুই দেশে করবিটা কি! জমানো টাকা ভাঙ্গতে কয়দিন লাগে দেখবি। তরতরায়ে সব টাকা শেষ হয়ে যাবে। তখন কি উপায় হবে?”
“আহ্ তুমি এত দুশ্চিন্তা করো কেন সবসময়? মাথার উপরে ছাদ আছে আমাদের। মাস শেষে খাওয়া দাওয়ায় কয় টাকা লাগে? আমি একটা ব্যাবস্থা করব।”
“বাবারে, মাস শেষে তোর বাবার ওষুধের পিছনে কয় টাকা যায়, তোর কোনো আন্দাজ আছে? তোর ছোটো বোনটা কিন্তু এখন আর ছোটো নাই। বিয়ের বয়স হয়েছে, সেই খেয়াল আছে?”
“মা শোনো, তুমি এখন এইগুলা নিয়ে দুশ্চিন্তা করোনা। আমার কিছু একটা পরিকল্পনা তো আছেই। আমি সবদিক চিন্তা ভাবনা করেই আসছি। তুমি অকারণ নিজের এবং সেইসাথে বাসার সবার মাথাটা গরম করোনা তো।”
মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। আমি নিজে অবশ্য উঠে আসা দীর্ঘশ্বাসটাকে চাপা দিয়ে কাপড় চেঞ্জ করতে উঠলাম।
আসলে কেউ কারও ব্যাথাটা বোঝেনা। খুব বেশী পড়াশোনা না করা এই আমি বছর পাঁচেক আগে বিদেশ গিয়েছিলাম। বাবা তখন সরকারি চাকরি থেকে অবসরে গেলেন মাত্র। বাবার পেনশন আর গ্রাচ্যুইটির টাকা দিয়েই আমার বিদেশ যাওয়া। ভালোই ছিলাম, টাকা মন্দ আয় করিনি। দেশে বাবা মায়ের সংসার তো চালিয়েছি গত পাঁচটা বছর। কিন্তু পরিস্থিতি খারাপ হতে শুরু করল, আরব বসন্তের ঢেউ আমাদের ফ্যাক্টরীতেও লাগলো। নিয়মিত কর্মী ছাটাই, মালিকের দুর্ব্যবহার সব মিলিয়ে কেমন যেন দমবন্ধ অবস্থা। চলে আসতে বাধ্য হলাম। জমানো কিছু টাকা নিয়ে দেশে ফিরে এসেছি গত মাস খানেক হলো। পরিকল্পনা করা আছে, ব্যবসা করব। নিজের ব্যবসা।
বিদেশে থাকা অবস্থায় দেশের বন্ধু জুয়েল বারবার নিশ্চয়তা দিয়েছিল, ও সাহায্য করবে। ব্যবসার লাইন ঘাট ও খুব ভালো বোঝে। হালকা নেভিব্লু শার্টটা গায়ে চড়িয়ে আমি জুয়েলের খোঁজে বেরুলাম।
“দোস্তো জমানো টাকা ভেঙ্গে খাচ্ছি, আমার তো পুঁজি কম। এভাবে আরও কিছুদিন চললে কিন্তু ব্যবসা শুরু করাই কঠিন হয়ে যাবে। কিছু একটা কর ভাই।”
“সব ঠিক করে ফেলছি দোস্তো। কোনো দুশ্চিন্তা করিস না।” জুয়েল বললো।
“প্ল্যানটা বল, একবার তো বলেছিলি কোনো ব্র্যান্ডের শোরুম দেয়ার ব্যবস্থা করে দিবি। কাপড় চোপড়ের রেডিমেড গার্মেন্টস টাইপ, কথা এগিয়েছে কিছু?”
“ওদিকে যাবোনা, ওই শালারা কমিশন বেশী নিয়ে নেয়। তারচেয়ে তুই নিজেই রেডিমেড গার্মেন্টস কিনে আনবি, ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানি লন ফন রাখবি। চ্যালচ্যালায়া চলবে তোর দোকান, দেখিস।”
“কিন্তু তারজন্যে তো একটা শোরুম লাগবে, নাকি?”
“সেইটার ব্যাবস্থাই তো আগে করছি দোস্তো। উপশহরে ঢোকার মুখে যে গোল চত্বরটা ওইখানে নতুন যে দশতলা হচ্ছে, তার নীচতলার বড় স্পেসটা তোর নামে ব্যাবস্থা করছি। এই মাসেই ডিড ডকুমেন্ট হয়ে যাবে।”
৩.
সামান্য জমকালো অনুষ্ঠান করে আমার শোরুমটা চালু করে দিলাম। পুরোটা এসি করা। সেলস-ম্যান না রেখে ওম্যান রেখেছি। কারণ শাড়ি, কামিজ লেহেঙ্গাই বেশী তুলেছি। ছেলেদের গার্মেন্টসও আছে, তবে কম। চারজন বেশ চটপটে মেয়ে, সাজানো গোছানো চকচকে ডেকোরেশন, উজ্জ্বল আলোর রোশনাইয়ে ঝলমল করে সবসময় শোরুমটা। কোনায় কোনায় রাখা কয়েকটা ম্যানিকিন, ওই যে পুতুল টাইপ মুর্তি। যাদের গায়ে নতুন আসা ড্রেস বা শাড়ি পড়িয়ে দেয়া হয়।
দোকানের সামনের পুরোটা গ্লাস, অনেক দূর থেকেও দেখা যায়। এই শহরে এত বড় শোরুম হয়ত আরও আছে কিন্তু এত স্মার্ট ঝা চকচকে ড্রেসের দোকান আর একটাও নেই। বাজী ধরতে পারি।
প্রথম দিন অসুস্থ শরীর নিয়ে বাবা এসেছিলেন। সাথে মা, বোন এবং কিছু বন্ধুবান্ধব। বাবা অনেক দোয়া করে গেলেন। স্থানীয় মুরুব্বীরাও হাত মিলিয়েছিলো সাথে।
কিন্তু দোয়াতে কোনো লাভ হলোনা। তিন মাস ছয় মাস পেরিয়ে গেল। কিন্তু দোকানটা জমলোনা। জমানো টাকার প্রায় পুরোটাই চলে গিয়েছিলো দোকানের এডভান্স, ডেকোরেশন আর মাল তুলতে। গত ছয়মাস যা বিক্রীবাটা হয়েছে তাই দিয়ে শুধু খরচাটা উঠেছে। ইতিমধ্যে ব্যাংকলোনও নিয়েছি কিছুটা। সংসার চালাতে হিমসিম খাচ্ছি। সবকিছু অসহ্যের পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। পরামর্শ করার জন্যে জুয়েলকে খুঁজছি কিছুদিন ধরে, কিন্তু ওর দেখা নেই। ব্যাটা ডুব মেরেছে। শেষ পর্যন্ত খুঁজতে খুঁজতে একটা আড্ডায় ওকে পেলাম।
“দোস্তো, স্বপ্ন তো সব ধুয়ে মুছে যাচ্ছেরে। কি করি এখন, একটা পয়সা নাই। বিক্রী যা হয় তা দিয়ে তো দোকান চালানো যাবেনা। একটা কিছু উপায় কর।”
আমার গলায় ব্যাকুলতা টের পেল জুয়েল। আলতো স্বরে কিছু প্রশ্ন করলো।
“সেলসে যারা বসছে, ওদের ব্যবহারে কোনো সমস্যা নাই তো? আচ্ছা তোর কাপড়ের কোয়ালিটি দেখে আনিস তো? রং ওঠেনা তো? দাম কি বেশী রাখা হয়ে যাচ্ছে?”
ওর প্রতিটা প্রশ্নেই আমি এদিক ওদিক মাথা নাড়িয়ে গেলাম। হতাশা জুয়েলকেও ছুঁয়ে যাচ্ছে, এটা বুঝতে পারছি।
“শালা তোর চেহারাতে নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা আছে!
নইলে কাস্টমার আসেনা কেন?”
আমি চুপ করে রইলাম। নিজের প্রশংসা নিজে করতে হয়না, কিন্তু মায়ের পাশাপাশি আমার পুরো পাড়া আমাকে রাজপুত্র বলেই ডাকে। জুয়েলও তা জানে।
“একটা মিলাদ দিবি? নতুন করে একটু দোয়া কালাম পড়ে ফুঁ দিয়ে দিলে যদি ফাড়া কাটে।”
ওর এই ধরনের বিক্ষিপ্ত কথায় আমার হতাশা আকাশ ছুঁতে চাচ্ছে। এটাতো ছেলেখেলা না, আমার এবং আমার পুরো পরিবারের সার্ভাইভের প্রশ্ন। আর অল্প কিছুদিনের মাঝে টেকসই কোনো সমাধান বের করতে না পারলে ভাত আর লবনও পেটে জুটবেনা।
“শোন রোহান, একটা কাজ করতে পারিস। তুই সেলসে যে মেয়েরা থাকে ওদের চেঞ্জ কর। সুন্দর দেখে কাউকে এপয়েন্ট কর।”
আমি বুঝলাম, জুয়েল আমাকে আর হেল্প করতে পারবেনা। আড্ডা থেকে বের হয়ে রিকশা নিয়ে নিলাম। কড়া রোদ আজ মাথার উপরে, তবুও হুডটা ফেলে দিলাম। নিজেকে কষ্ট দিতে ইচ্ছে করছে। সামনের অনেকখানি পথ দুইদিকে ধানক্ষেতের মত। রাস্তার দুইপাশে কোনো গাছও নেই। রিকশাওয়ালার মাথায় তবুও একটা বাঁশের তৈরী কিষানদের টুপির মতন। আমার কোনো আড়াল নেই। কিছুক্ষণের মাঝেই টপটপ করে ঘাম বাওয়া শুরু করলো। আমি চোখে ঘোলা দেখা শুরু করলাম, মনে হচ্ছে মরীচিকা দেখছি। সবকিছু তিরতির করে কাঁপছে। কখন চলন্ত রিকশা থেকে গড়িয়ে পড়েছিলাম জানিনা। জ্ঞান ফেরার পরে বুঝলাম হাতে পায়ের কিছু জায়গায় ছিলে গিয়েছে। মাথাতেও সম্ভবত সামান্য আঘাত পেয়েছি। রিকশাওয়ালা রাস্তার পাশে বসিয়ে দিয়ে বাতাস করছে।
ঠিক এমন সময়ে বজ্রপাতের মত একটা বুদ্ধি উঁকি দিয়ে গেলো আমার আঘাত প্রাপ্ত মাথায়। আঘাতের সাথে এই বুদ্ধিপ্রাপ্তির আসলেই কোনো সম্পর্ক আছে কিনা আমি ঠিক ঠাহর করতে পারলাম না।
এরপর দিন থেকেই আমার সন্ধান শুরু হলো, একটা আকর্ষণীয় ফিগারের মেয়ে লাগবে। যে করেই হোক।
৪.
পরের কয়েকদিন সারা শহর খুঁজেও মনে ধরার মত কাউকে পেলাম না। ভাবলাম জুয়েলের সাহায্য নেই। একদিন ভোরে ওর বাসায় গিয়ে হাজির হলাম, ওদের বাসায় কখনোই তেমন আসা হয়না। দেশের বাইরে যাওয়ার আগে একবার এসেছিলাম। সেই প্রায় ছয় বছর আগে।
দরজায় নক করা মাত্র খুললো জেরিন। জুয়েলের ছোটোবোন। ওকে দেখেই মুহুর্তের জন্যে দম বন্ধ হয়ে এলো আমার। ঘরের মধ্যে রেখে আমি সারা শহর খুঁজে বেড়াচ্ছি! জেরিন সম্ভবত এখন আঠারো। এর আগে যখন দেখেছিলাম তখন একেবারে বাচ্চা একটা। যৌবন দেবতার কৃপায় জেরিন এখন পূর্ণ নারী। আমি এমন কোনো অভিজ্ঞ নই এইসব ব্যাপারে, তবুও মনে হল বাড়ির মাচানের লকলকিয়ে বেড়ে ওঠা লাউডগার সাথে জেরিনকে এখন সইজেই তুলনা করা যায়। রুপ কিংবা লাবন্যে ঢলঢল করছে পুরো শরীর। শরীরের প্রতিটা বাঁক একেবারে নিখুঁত। উচ্চতা ঠিক সাড়ে পাঁচ ফিট হবেই হবে। ঠিক যেমনটা আমার প্রয়োজন ছিল।
“রোহান ভাইয়া কেমন আছেন আপনি। কতদিন পরে এদিকে এলেন। আমাদের কথা তো আপনার নিশ্চয়ই মনেই পড়েনা।”
“না জেরিন, আসলে খুব ব্যস্ত ছিলাম, এখনো আছি।”
“তাই বলে একবারও বাসায় আসবেন না, দেশে তো ফিরেছেন অনেকদিন হয়ে গেলো। আমার কথা পুরাই ভুলে গিয়েছেন, তাই না?”
“জুয়েল কোথায়? ও কি বাসায় আছে?”
ওর করা প্রশ্নে কিছু সত্যতা তো আছেই তাই কথা ওদিকে আর বাড়তে দিলাম না।
“হ্যাঁ আছে, আমি ডেকে দিচ্ছি। আমি প্রতিদিনই ভাইয়াকে আপনার কথা জিজ্ঞেস করি। বাসাতে আনতেও বলি। কিন্তু ভাইয়া আনেনা। আপনার ফোন নাম্বারও দেয়না।”
“কেন জরুরী কোনো বিষয়? কিছু বলতে চাও?”
কথোপকথনের গতি বৈচিত্র্যে বুঝতে পারছি, একটা বেশ মজার ব্যপার ঘটতে চলেছে। জেরিনকে দেখেই মাথায় থাকা পরিকল্পনাটা বেশ একটা গতি পেয়েছে। এবং তা বাস্তবায়ন করতে হলে জেরিনকে আমার পটাতে হবে। কিন্তু ওর কথা শুনে মনে হচ্ছে, ও বহুদিন আগ থেকেই পটে আছে। যাকে বলে, মেঘ না চাইতেই জল একেবারে। নিজেকে একটু থামালাম। দেখিই না কোথাকার পানি কোথায় গড়ায়।
খুব বেশিদিন থামতে হলোনা আমাকে। আমার ধারনা ভুল ছিলোনা। জেরিন আমার প্রেমে হাবুডুবু খেয়েই ছিলো। আমি বরং ওকে হাতে ধরে ভাসালাম। এবং অবশ্যই আমার নৈতিকতাটাকে চাপা দিয়ে। নইলে ঘনিষ্ঠ বন্ধুর বোন, এই ব্যপারটা হয়তো আমাকে বাধা দিত, শক্তভাবে।
শহর থেকে একটু দুরে যে বিল, আজ সেখানে বেড়াতে এসেছি আমি আর জেরিন। আমার কাঁধে মাথা রেখে দুরের আকাশে উড়তে থাকা দুটো চিলের দিকে চেয়ে আছে মেয়েটা।
“আচ্ছা তুমি সারাক্ষণ কি এত দুশ্চিন্তা করো বলোতো।”
“নাহ্ তেমন কিছুনা তো।” আমি অস্ফুটে বললাম।
“তুমি না বললেও আমি টের পাই, তোমার দোকানটা ভালো চলছেনা, তাই না?”
“সত্যি বলতে আসলে জেরিন, খুব চাপে পড়ে গিয়েছি জানো। সংসার চালাতে পারছিনা। বাবার ব্যাংকে, ব্যালেন্স পুরো শুন্য। আমিও লোনে ডুবে যাচ্ছি।”
“দুশ্চিন্তা করোনা। সব ঠিক হয়ে যাবে নিশ্চয়ই।”
“জানিনা কবে ঠিক হবে। বোনটার বিয়ের বয়স হয়ে গিয়েছে। এবং ওর বিয়ের পরেই না আমাদের বিয়ের কথা তুলতে পারব বাসায়।”
আমার এই কথায় জেরিন সামান্য লজ্জা পেলো।
“তুমি এত দুশ্চিন্তা করবেনা, যদি কখনো কোনোরকম সাহায্য লাগে, আমাকে শুধু একটাবার মুখ ফুটে বলবে। আমি আমার পুরো অস্তিত্ব নিয়ে তোমার পাশে থাকব।”
জেরিনের গালে আলতো ঠোটের ছোঁয়া বুলিয়ে বললাম
“তোমায় ভালোবাসি, আজীবন ভালোবাসবো। তুমি শুধু আমার পাশে থেকো, তবেই হবে।”
৫.
বছর দুয়েক পরের কথা,
আজ আমার বিয়ে। বেশ ধুমধাম করেই বিয়েটা হচ্ছে। হবে নাইবা কেন! শহরের সবচেয়ে বড় শোরুমের মালিকের বিয়ে বলে কথা। এই দুইবছরে জৌলুস আরও বেড়েছে আমার দোকানের। লাখ টাকা দামের লেহেঙ্গাও পাওয়া যায় এখন এবং মোটামুটি নিয়মিত বিক্রীও হয়। ঈদ কিংবা বিয়ের শপিং করতে লোকে এখন আর রাজধানীতে যায়না।
নিজেদের টয়োটা প্রিমিও গাড়িটা থেকে আমার মা হাতে ধরে বৌমাকে নামালেন।
“আসো মা, চল ভেতরে যাই। তোমাদের ঘরে নিয়ে যাই তোমায়।”
আমার বউটা বেশ লাজুক আছে, এক হাত ঘোমটা দিয়ে মুখটা ঢেকে রেখেছে।
“মা আমি বাবাকে নিয়ে আসছি তোমরা এগিয়ে যাও।”
“না না কি বলিস, তোরা দুজনে একসাথে ঘরে ঢুকবি। তোর বাবাকে দোলন ধরবে নাহয়। দোলন কই দোলন।”
ছোটোবোন দোলন এগিয়ে এসে বাবাকে নিয়ে এগিয়ে গেলো, আমি বউয়ের পাশাপাশি হেটে ঘরের চৌকাঠের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।
যে কেউই বলবে আমাদের জুড়িটা মানিয়েছে। আমার চেয়ে ইঞ্চি চারেক ছোটো হবে ঈশিতা। সম্ভবত পাচ ফুট দুই ইঞ্চি। সত্যি বলতে আমার পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চির উচ্চতায় আমার পাশে কখনোই সমান উচ্চতার জেরিন কে মানাবেনা। কিংবা ওর পরে আরও যে দুজন মেয়ের খোঁজ আমি পেয়েছিলাম সেই নন্দিতা কিংবা শায়লা, আসলে ওদের কারও পাশেই আমাকে মানাতোনা। ওদের সবারই উচ্চতা ছিলো একদম আমাকে ছুঁইছুঁই।
পাক্কা পাঁচ ফুট ছয়। আর ওদের সাথে যে প্রেমময় ঘনিষ্ঠতা, সেটাও ছিলো পরিকল্পনাময়। ঘর বাধার স্বপ্ন ওরা দেখলেও আমি কখনোই দেখিনি।
৬.
তেরো বছর বয়সী জয়িতার আজ জন্মদিন। শালিনীর শত ব্যস্ততাতেও সে তার মেয়েকে নিয়ে তাই শপিংয়ে এসেছে। জয়িতা ইতিমধ্যে তার শখের জুতো আর কিছু কসমেটিকস কিনেছে। তারপর মায়ের সাথে লাঞ্চ করেছে শহরের সবচেয়ে বিখ্যাত চাইনিজ রেস্তোরাঁয়। এবার আসল গিফট কেনার পালা, জামা কিনবে। জামা বলতে লেহেঙ্গা। জয়িতা স্কুল থেকে বাসায় যাওয়া আসার পথে আগেই দেখে গিয়েছে কয়েকবার। যেই লেহেঙ্গাটা পছন্দ হয়েছে ওর সেইটা এত সুন্দর যে চোখ ফেরানো যায়না। কিন্তু অনেক দাম। তবে যেহেতু ওর জন্মদিন তাই মা নিশ্চয়ই কিছু বলবেনা। ওদের গাড়ি এসে দাঁড়ালো উপশহরে ঢোকার মুখের গোল চত্বরে যে দশতলা বিল্ডিংয়ের নীচতলায় শহরের সবচেয়ে বড় শোরুম, তার সামনে। এই শোরুমের নাম শুনেছেন শালিনী কিন্তু কখনো আসা হয়নি। নামটা বেশ অন্য রকম, অন্তত এই শহরের তুলনায়।
“ওয়াক্স মিউজিয়াম।”
শোরুমের মালিক নাকি একসময় বিদেশে ছিলো। ওয়াক্স মিউজিয়ামে কাজ করতো, তাই এমন নাম!
এই দোকানের সব ড্রেসই নাকি হটকেকের মত, আনা মাত্রই বিক্রী হয়ে যায়।
শালিনী গাড়ি থেকে নেমেই অবাক হলেন, কি অদ্ভুত সুন্দর লেহেঙ্গা গায়ে জড়িয়ে আছে তিনটে ম্যানিকিন।
জয়িতা বলে উঠলো,
“মা এই লেহেঙ্গাটার কথা তোমায় বলেছিলাম। আমার খুব পছন্দ হয়েছে।”
শালিনী জবাব না দিয়ে শোরুমের গ্লাস ভেদ করে তাকিয়ে রইলেন আরও কিছুক্ষণ। তার মনে একটা অদ্ভুত কৌতুহল তৈরী হয়েছে,
আচ্ছা এই ড্রেসগুলো কি আসলেই এত সুন্দর?
নাকি দেখতে একেবারে জীবন্ত এবং খুব সুন্দর, লম্বা নিখুঁত ফিগারের তিনটা ম্যানিকিনের গায়ে পোষাক গুলো চড়ানো হয়েছে বলে এত সুন্দর লাগছে!