শিকল পর্ব০২

মায়ার উপর থেকে ঘোমটা সরে গেলে মায়া তাকিয়ে দেখে এ যে ইমরান। ইমরান মায়ার দিকে তাকিয়ে আছে। মায়া ইমরানকে দেখা মাত্রই মাথা নিচু করে ফেলে। ইমরান এখনো মায়ার দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎই ও ওর হাতের আঙুল দিয়ে মায়ার গালে স্পর্শ করে। মায়া মূহুর্তেই কেঁপে উঠে। ইমরানের দিকে তাকায়। ইমরান বাকা করে একটা হাসি দেয়। আর বলে,
– তোমাকে এভাবে দেখার জন্য কত বছর ধরে অপেক্ষায় ছিলাম। আজ তা পূরণ হলো। অসম্ভব সুন্দর লাগছে তোমাকে।
মায়া ইমরানের কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে যায়। ওর ভিতরে এখন যুদ্ধ চলছে। ও কি করবে কি বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না। ইমরান আবার কিঞ্চিৎ হেসে বলে,
– যাও দ্রুত জামা চেইঞ্জ করে আসো। আমার আর তড় সইছে না।
মায়া আঁতকে উঠে। চোখ বড় করে বলে,
~ মানে!! কেন??
– কি প্রশ্ন করছ এসব?? বুঝো না?? তোমাকে আপন করে নিব এখন। একদম আপন।
মায়ার বুকটা ভিতর দিয়ে দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। এ কেমন লোকের সাথে বিয়ে হলো যে একটু সময় না দিয়েই ওর সবকিছু কেড়ে নিতে চাচ্ছে। মায়ার চোখ অশ্রুতে ভরে আসে। ও কান্নাসিক্ত কণ্ঠে বলে,
~ আমাকে একটু সময় দিন। আমি এখন এসব করতে পারব না। আমি প্রস্তুত না।
– কেন কি হয়েছে?? আমাকে পছন্দ হয়নি?? আমাকে মেনে নিতে পারছ না??
~ আমাকে একটু সময় দিন প্লিজ। (অসহায় ভাবে)
ইমরান এক লাফে বিছানা ছেড়ে অট্টো হাসিতে ভেঙে পড়ে। হাসতে হাসতে বলে,
– ও মায়া..মায়া..মায়া…আর কত অভিনয় করবে?? সত্যিটা কেন বলছ না।
মায়া আশ্চর্য হয়ে বলে,
~ কীসের সত্যি??
– তুমি তো চেয়েছিলে এখানে আমার জায়গায় ও আসুক। কী চাও নি??
মায়া ভীতু গলায় বলে,
~ কে??
– হাহা হাহা মায়া, কে আবার!! তোমার ৬ বছরের প্রেমিক, আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু, আবির। হাহা।
মায়া ইমরানের কথা শুনে যেন আকাশ থেকে পড়ে। আবির আর মায়ার সম্পর্কে ওরা নিজেরা ছাড়া আর কেউ জানতো না। কিন্তু ইমরান কি করে জানলো!! মায়া হতভম্ব হয়ে গিয়েছে। গলা শুকিয়ে আসছে। ইমরানের চেহারা ধীরে ধীরে কেমন জানি পরিবর্তন হচ্ছে। এতো দিনের ইমরান দেখতে শান্ত আর ভদ্র ছিল। কিন্তু এখন কেমন জানি অন্যরকম লাগছে। ইমরান ওর বিশাল রুমে পিছনে হাত দিয়ে হাঁটছে আর বলছে,
– কি অবাক হচ্ছো?? অবশ্য হওয়ারই কথা। কারণ এই সব কিছু আমারই করা। আজ হয়তো তোমার আর আবিরের বিয়ে হতো যদি সেই ভার্সিটির ২য় বর্ষে তুমি আমার চোখে না পড়তে। সেদিন প্রথম তোমাকে দেখেই আমি তোমাকে পছন্দ করি। তোমার এই কামুক শরীর আমাকে পাগল করে দেয়। আমি ভেবেছিলাম তুমি সিঙ্গেল। কিন্তু একদিন আমার চোখে তুমি আর আবির ধরা পরো। তোমাদের দুজনের মিষ্টি মধুর আলাপ আমি অনেকক্ষণ বসে শুনি। কিন্তু তোমরা বুঝতে পারো নি। সেদিন থেকেই লেগে পড়ি তোমাকে আমার করার জন্য। আবির থেকে তোমাকে আলাদা করার জন্য।
মায়া ইমরানের দিকে হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আর অঝোরে নিঃশব্দে কাঁদছে। ইমরান হাঁটতে হাঁটতে ওর পকেট থেকে সিগারেটের কেইসটা বের করে একটা সিগারেট মুখে নিয়ে জ্বালিয়ে একটা বড় টান দিয়ে ওর বিছানার কাছের সোফাটায় গিয়ে বসে আবার বলতে শুরু করে,
– আর কেঁদে লাভ নেই। তুমি এখন শুধু আমার৷ আর কারো না। আবিরের সাথে শত্রুতা ভুলে বন্ধুত্ব করার একমাত্র কারণ ছিলে তুমি। এরপর ওকে আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু বানাই। যাতে ওর সবকিছুর প্রতি আমার কন্ট্রোল থাকে। ওকে আমার অফিসে কাজ দিয়ে, ফ্ল্যাট দিয়ে ওকে কিনে নেই। যাতে ও অন্য কোথাও না যেতে পারে। এরপর সুযোগ খুঁজি শুধু তোমাকে আমার করার জন্য। আর সেই সুযোগটাও খুব তাড়াতাড়ি পেয়ে যাই। তোমার বাবাকে সুস্থ করার জন্য যে টাকা প্রয়োজন তা আমি দিয়ে তোমাকে কিনে নি। হাহা। মায়া…তুমি আমার কেনা বউ বুঝলে। তোমাদের ৬ বছরের ভালবাসা আমি টাকা দিয়ে এক মূহুর্তে শেষ করে দিয়েছি। হাহা। দেখলে টাকার কি ক্ষমতা?? আজ টাকা আছে বলেই তুমি আমার কেনা বউ। আমি যা বলব তোমাকে তাই মানতে হবে৷ কিছুই করতে পারবে না বা বলতে পারবে না। উফফ টাকা আর টাকা। হাহা।
ইমরান মায়ার দিকে তাকিয়ে হাসছে আর সিগারেট টেনে যাচ্ছে। আর মায়া?? সেতো পাথর হয়ে গিয়েছে। এসব কিছু যেন ওর কাছে বিষাক্ত এক স্বপ্ন মনে হচ্ছে৷ ও মনে মনে বলছে, “এখনো কেন এই স্বপ্ন ভাঙছে না?? কেন?? আমার যে আর সহ্য হচ্ছে না৷ দম বন্ধ হয়ে আসছে।” ইমরান আবার বলে,
– তোমার এই কামুক শরীর আমি এমনভাবে স্পর্শ করবো যে তুমি আবিরকে আর কখনো স্বপ্নেও মনে করবে না। হাহা।
মায়া আর না পেরে জোর গলায় বলে উঠে,
– বন্ধ করুন। দয়া করে বন্ধ করুন। একটা মানুষ কীভাবে এত্তো খারাপ হতে পারে!! আপনার মধ্যে কী মনুষ্যত্ববোধ বলতে কিচ্ছু নেই?? একটা বার ভাবেন নি আমাদের কথা?? একবার কী আপনার বিবেক আপনাকে থামায় নি??
মায়া কথা বলা শেষ করতে না করতেই ইমরান রক্ত চক্ষু লাল করে রাগী ভাবে মায়ার কাছে গিয়ে ওর গাল দুটো এক হাত দিয়ে চেপে ধরে রাগী কণ্ঠে বলে,
– এই মেয়ে তুই কোন সাহসে আমার সাথে এভাবে কথা বলিস?? তুই আমার টাকা দিয়ে কেনা৷ আমি যা ইচ্ছা বলব বা করব। তোর কোন কিছু বলার অধিকার নেই। তোকে পাওয়ার জন্য আর এই শরীর ভোগ করার জন্যই এতো কিছু করেছি। এতো বছর অপেক্ষা করেছি। শুধু তোকে পাওয়ার জন্য৷ তুই ওকে ভুলবি। তুই শুধু আমার হবি।
ইমরান এই কথা বলেই মায়াকে বিছানায় ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। মায়া অঝোরে কান্নায় ভেঙে পড়ে। এ কোন নরকে ও এসে পড়েছে। ওর সবকিছু জ্বলে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাচ্ছে৷ ইমরান আবার মায়াকে বিছানায় চেপে ধরে ওর একদম কাছে এসে বলে,
– তোর এই শরীর আমি এখন চাইলেই ভোগ করতে পারি। কিন্তু আমি তা করবো না। আমি কি করবো জানিস?? আমি কাল আবিরকে বলব, সারারাত আমি তোর সাথে কি কি করেছি। এসব মিথ্যা শুনে ও তোকে ঘৃনা করবে। ওর ভিতর থাকা তোর প্রতি ভালবাসাটা মরে যাবে৷ তখন তোকে ভোগ করবো। কারণ তোরা আমার শিকলে বন্দী। যা জামা পরিবর্তন করে এসে ঘুমায় পর। নাহলে আমার পুরুষত্ব কিন্তু পশুত্বে চলে যাবে৷
মায়া আর এক মূহুর্ত বিছানায় না থেকে ভয়ে ওর জামা কাপড় নিয়ে কোনভাবে ওয়াশরুমে চলে যায়। দরজা লাগিয়ে দিয়ে নিঃশব্দে হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়ে। ইমরান এখনো শান্ত হয়নি। ও ওর ফোনটা নিয়ে ওয়াশরুমের পাশে আসে। আর আবিরকে ফোন দেয়। প্রথম বার না ধরলেও দ্বিতীয় বার আবির ফোন রিসিভ করে। ইমরান বলে উঠে,
– দোস্ত কেমন আছিস??
– আছি। কিন্তু তুই এই রাতে কল দিলি??(অস্ফুট স্বরে)
– দোস্ত মায়া যে কি সুন্দর। আহ!! ওকে এখন আমার করে নিব বুঝলি। কিছু টিপস দেনা আমায়। ও খুব অস্থির হয়ে আছে।
আবির ইমরানের কথা শুনে ঠাস করে মাটিতে বসে পড়ে। ওর রুমটা এমনিই অন্ধকার ছিল। ও এসব ভেবেই এতোক্ষণ অস্থির হয়ে ছিল। ও ভেবেছে মায়া হয়তো আজ ইমরানকে এসব কিছুই করতে দিবে না। কিন্তু ও ভুল। মায়া তো অস্থির হয়ে আছে৷ ইমরান আবিরকে চুপ দেখে বলে,
– কি হলো বল?? তুই না আমার বেস্ট ফ্রেন্ড।
আবিরের মুখটা যেন লেগে আসছে। কেমন বোবা হয়ে গিয়েছে এই কথা শুনে। ভিতর থেকে কথাই বের হচ্ছে না৷ আবির অনেক কষ্টে বলে,
– দোস্ত মা ডাকছে আমি যাই।
বলেই ফোন কেটে দেয়। আর সাথে সাথে মায়া কাঁদতে কাঁদতে বের হয়ে ইমরানের কাছ থেকে ফোন নিয়ে চিৎকার করে বলতে থাকে,
~ আবির… আবির..আমি কিছু করিনি। কিচ্ছু করিনি। উনি মিথ্যা বলছে..আবির…
ইমরান ছো মেরে মায়ার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে হাসতে হাসতে বলে,
– তোর আবির যা শোনার শুনছে। ওকে আর কিছু বললেও লাভ নেই।
ইমরান হেঁটে হেঁটে ওর বিছানায় এসে শুয়ে পড়ে৷ রুমের লাইট অফ করে দেয়। আর মায়া পিছনে এসে দেয়ালের সাথে মিশে মাটিতে বসে পড়ে। রুমটা এখন ওর জীবনের মতো অন্ধকার। মায়া আবিরের কথা ভেবে অঝোরে কাঁদতে থাকে। ওর চিৎকার করে খুব কাঁদতে ইচ্ছা করছে। হাউমাউ করে কাঁদতে ইচ্ছা করছে। আবির ওকে এখন ঘৃনা করবে। সব শেষ।
অন্যদিকে আবিরও দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে মাটিতে বসে মাথার চুলগুলো ধরে অন্ধকারে কাঁদছে। সেকি কান্না। ও ভাবতেই পারছে না ইমরানের সাথে মায়া মিশে আছে৷ আবিরের শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। যেন এখনই মরে যাবে। এরা দুজন দুই প্রান্তে একজনের শিকলে আটকানো। ওদের মুক্তি নেই। ওরা শিকলে বন্দী।

Be the first to write a review

2 Responses

Leave a Reply

We’re sorry you’ve had a bad experience. Before you post your review, feel free to contact us, so we can help resolve your issue.

Post Review

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক গল্প