আরফা জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছেন। বৃষ্টি থেমেছে, শহর যেন ক্লান্ত নিঃশ্বাস ফেলছে। তাঁর মনে হচ্ছে, আমি আর ভাঙবো না। আমি শুধু জিতবো…
হঠাৎ দরজায় টোকা।দরজা খুলতেই সামনে আরিয়ান।
কিন্তু আজ তার চোখে কোনো অহংকার নেই, নেই কোনো প্রশ্ন,শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।তুমি আমাকে মাফ করো না ঠিক আছে।কিন্তু আমাকে অন্তত তোমার পাশে দাঁড়াতে দাও।
আরফা চুপ করে থাকে।আজ যদি কেউ তোমার পেছনে ছুরি চালায়, তাহলে আমি যেন আগাতে পারি তোমার জন্য বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে…একটুও নড়েন না আরফা, কিন্তু তাঁর চোখের কোণ ভিজে ওঠে।
ওদিকে, সারিকা ও মোহিন একসাথে এক গোপন অফিসে ব্যবসার ফাঁদ পাতছে।কিন্তু তারা জানে না, এক নতুন ছদ্মবেশী কর্মী ওদের সকল তথ্য গোপনে পাঠাচ্ছে ARFA ENTERPRISE- এর লিগ্যাল টিমের কাছে।
এই ছদ্মবেশী কর্মী আর কেউ নয়, আশফাক।হ্যাঁ, সে আরফার কাছে ফিরে এসেছিল সত্যিই, কিন্তু এবার সে তার সেই এক সময়ের ভুল বন্ধুত্বের ঋণ শোধ করতে চায়।
অফিসে সকাল, এক অদ্ভুত মুহূর্ত,,সকালে অফিসে আসেন আরফা, দেখে আরিয়ান ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের ডেস্কে বসে কাজ করছে।সে উঠে দাঁড়ায়:তুমি যদি চাও, আমি চলে যাবো। আমি কোনো সহানুভূতি চাই না। শুধু কাজ করতে চাই।
আরফা বলে:তোমাকে একটা সুযোগ দিলাম। যদি সত্যি নিজেকে প্রমাণ করতে পারো— তাহলে নিজের জন্য না, আমার জন্য করবে।আরিয়ান অবাক হয়ে চুপ করে যায়।
সে জানে, এটিই তার জীবন পাল্টে দেবার শুরু।
কাজ শেষে আরফা নিজের অ্যাপার্টমেন্টে ফেরে, হঠাৎ শুনতে পায় নিচে আরিয়ান দাঁড়িয়ে গিটার বাজাচ্ছে।একটি গান,,চাইনি ভুলে যেতে, তবুও ভুলে গেছি,তোমায় হারিয়ে ফেলে, আজ নিজেকে হারিয়েছি…
আরফা চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে বারান্দায়।
তারপর নিচে নেমে আসে।আরিয়ান বলে:তুমি চাইলে আমি আজ রাতটা গাইতে গাইতে কাঁদবো…
আরফা:তুমি যদি আবার চলে যাও? আবার ভেঙে দাও?
আরিয়ান (চুপ থেকে)তাহলে তুমি চড় মেরে থামিয়ে দিও। কিন্তু আমাকে একবার জোড়া লাগাতে দাও এই ভাঙা সম্পর্ক।
চোখে চোখ পড়ে তাদের।এক চুম্বন।নিরব, নরম, রক্তময় ভালোবাসার চুম্বন।পুরো শহর নীরব হয়ে শোনে, এক অপ্রকাশিত ক্ষমা যেন জমে পড়ে ঠোঁটে।
পরদিন সকালেই আরফার টেবিলে এক নোট,তোমার পাশে দাঁড়িয়েছি ঠিক আছে। কিন্তু সারিকা ও মোহিন আমাকে ছেড়ে দেবে না। তুমি সাবধানে থেকো। – আশফাক
সকাল বেলা, আরফা অফিসে ঢোকার আগেই এক ভয়াবহ ইমেইল ছড়িয়ে পড়ে পুরো প্রতিষ্ঠানে।ভিডিও,,আরিয়ান আর সারিকার একটা ব্যক্তিগত মুহূর্তের রেকর্ড, যা ছিল বহু পুরনো, কিন্তু এখন কেটে-ছেঁটে এমনভাবে বানানো হয়েছে যেন,আরিয়ান এখনো সারিকার সঙ্গে সম্পর্ক রাখছে।
স্টাফরা ফিসফাস করছে, ক্লায়েন্টদের ফোন আসছেএকের পর এক।আরফা চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকেন,,তার চোখ শুধু দেখে:আরিয়ান কেমন অসহায় মুখে পায়ের নিচে মাটি খোঁজে,,না, সে কিছু বলে না।
আরিয়ানকে পুলিশ অফিস থেকে তুলে নিয়ে যায় অভিযোগ?সারিকার কোম্পানি থেকে অর্থ চুরির।সারিকা নিজেই নালিশ করেছে।আরিয়ান বোঝে না, সে এতটা নিচে নামতে পারে সারিকা!
সে ফোন করে আরফাকে।আরফা… প্লিজ… আমি দোষী না… আমি জানি না কেন… কিন্তু যদি তুমি চাও আরফা:আমি জানি তুমি দোষী না, আরিয়ান। আমি ব্যবস্থা নিচ্ছি।
সে নিজে গিয়ে থানায় উকিল পাঠায়,এক প্রাইভেট ডিটেকটিভ নিয়োগ দেয়,পুরনো ভিডিওর মেটাডেটা বিশ্লেষণ করে দেখা যায় ভিডিও এডিটেড,মোহিন নামের ছেলেটির আরেকটি ব্ল্যাকমেইলিং রেকর্ড সে হাতে পায়
আরফা বলে:তোমরা ভাবছিলে আমি একা?একজন নারীর প্রতিটি অপমান সে গিলে ফেলে, কিন্তু ভুলে না।এই অপমানের দাম আমি সুদে-আসলে তুলবো।
আশফাকের প্রমাণ,আশফাক ছদ্মবেশে সারিকা ও মোহিনের সমস্ত কথোপকথন রেকর্ড করে দেয় আরফার হাতে।তারা প্ল্যান করেছিল,
১) আরফার অফিস হ্যাক
২) আরিয়ানকে ফাঁসিয়ে ব্যবসার সিকিউরিটি নষ্ট করা
৩) আরফার প্রতিপক্ষ কোম্পানিকে তার সমস্ত ক্লায়েন্ট লিস্ট বিক্রি করে দেওয়া
আরফা সবকিছুর ভিডিও ও অডিও প্রমাণ নিয়ে যায়,সংবাদমাধ্যমে।এক রাতেই সারিকা এবং মোহিন গ্রেপ্তার।তাদের কোম্পানির শেয়ার ধ্বসে পড়ে।আরিয়ান ছাড়া পায়।
আরিয়ান, মুক্ত হয়ে আরফার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে।আমি তো ভেবেছিলাম আমি পুরুষ,,কিন্তু তুমি আজ প্রমাণ করলে, তুমি একাই যুদ্ধ করতে পারো, আমিও তোমার পাশে থাকার যোগ্য না।তোমার ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য আমি ছিলাম না। তবু… থাকবো যদি চাও।
আরফা চুপ।তার চোখ ভিজে, ঠোঁট শুকনো।
সে ধীরে বলে:প্রেমে থাকা মানে যুদ্ধ করা নয়। প্রেমে থাকা মানে পাশে থাকা।তুমি যদি পারো পাশে থাকো— যুদ্ধ করতে হবে না।
এইবার আর শুধু ঠোঁট নয়,এইবার বুকের ভিতর জমে থাকা কষ্ট, লজ্জা, ব্যথা আর ভালোবাসা সব মিলিয়ে,একটা দীর্ঘ আলিঙ্গন।সেদিন বৃষ্টি নামে না।কারণ আকাশ জানে, আজ কান্নার দিন নয়।
রাতের শেষে সকাল,আরিয়ান এখন আর আগের মতো অহংকারী নেই।ভাঙা মানুষ।তবুও… নিজেকে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।আরফা পাশে থেকেও—আলাদা।মনে শান্তি নেই, ভিতরে একটা টান, এক অজানা অস্থিরতা।
আজ তারা প্রথমবার,একসাথে অফিস যাচ্ছে।কিন্তু একটা কথা কেউ কাউকে বলেনি,,আমরা কি আবার একে অপরকে ভালোবাসতে পারি?
সন্ধ্যায় একটা বিজনেস পার্টিতে আরফা যাচ্ছে একা।
পার্টিতে আসে রাহাত সাদ,দুবাই রিটার্ন, একাধিক কোম্পানির মালিক।
সে সরাসরি বলে—মিস আরফা, আপনি যদি আমার পার্টনার হতে রাজি থাকেন,বিজনেস পার্টনার না, লাইফ পার্টনার,তবে পুরো মিডল ইস্টের মার্কেট আমি আপনাকে দিয়ে দিবো।সবার সামনে।আরফা হেসে বলে,আপনি হয়তো বাজারের রাণী খুঁজছেন,আমি রাজ্য গড়ি, নিজের হাতেই।
এই প্রস্তাবের পুরো ঘটনাটা দেখে ফেলে—আরিয়ান।সে ফিরে যায় বাসায়, কিছু বলে না।রাতভর দরজা বন্ধ করে রাখে।অফিসেও আসে না।
পরদিন, আরিয়ান ডেস্কে একটা চিঠি দেখে।চিঠি – আরফার হাতের লেখায়,তুমি জানো, আমি কেন না করলাম তাকে?কারণ কেউ একজন আমার ভাঙা জীবনটার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
আমি জানি, তার হাতে অনেক পাপ, অনেক ভুল…
কিন্তু আমি তার সেই হাত ধরতে চাই আবার,যদি সে হাত বাড়ায় সত্যি করে,,
আরিয়ান ছুটে যায় আরফার কাছে,কিছু না বলে…
দু’হাতে ধরে তার কাঁধ,চোখের দিকে চায়।আমি এখনও ভালোবাসি তোমাকে, আরফা।
আরফা বলে না কিছু,শুধু এগিয়ে এসে কাঁধে মাথা রেখে ফিসফিস করে,এইবার কিন্তু ছেড়ে যাওয়া যাবে না… আমি সত্যিই ভালোবেসে ফেলেছি।
রাতে দু’জনে একসাথে রান্না করে।আরফা: নুন দিয়ে দাও
আরিয়ান: তুমি আছো, আমার জীবনে নুন দিয়ে লাভ কী?
আরফা: তুমি না একসময় ঘৃণা করতে?
আরিয়ান: তুমি না একসময় সইতে!
হাসাহাসি…ধাক্কাধাক্কি… একটুখানি চুম্বন… তারপর লুকানো চুলে আঙুল…
রাহাত সাদ—যে প্রকাশ্যে আরফাকে প্রস্তাব দিয়েছিল,আজ সে তার অপমানের প্রতিশোধ নিতে উঠে পড়ে লেগেছে।
তার প্রথম টার্গেট—আরফার কোম্পানি।বাজারে গুজব ছড়ায়:আরফা নাকি ব্যক্তিগত সম্পর্ক ব্যবহার করে বিজনেস ডিল করে!পত্রিকায় মিথ্যা সংবাদ,অনলাইনে কুৎসা—সবকিছু পরিকল্পিত!
রাহাত তার এক সাবেক কর্মচারীকে দিয়ে,একটি ভুয়া হ্যারাসমেন্ট মামলা করে আরফার নামে।আরিয়ান দেখে ক্ষেপে যায়।সে নিজেই দাঁড়ায় আরফার হয়ে কোর্টে।
সবার সামনে বলে—এই মেয়েটি এক সময় আমার স্ত্রী ছিল,
আমি জানি সে কে। তার সততা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুললে,
প্রথমে আমাকে পার করতে হবে!
এইদিকে সারিকা জেল থেকে ছাড়া পায়—আরিয়ান যার জন্য আরফাকে ডিভোর্স দিয়েছিল,
সে এখন ফিরেছে নতুন পরিচয়ে।সে একটি বড় বহুজাতিক কোম্পানির ম্যানেজার হয়ে ঢুকেছে আরফার কোম্পানির প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপে।তাদের মিশন—আরফাকে ধ্বংস করা।
সারিকা দেখে আজকের আরফা কে—গর্জন করে ওঠে,
একটা কাজের মেয়ে, আজ শহরের টপ বিজনেস আইকন?
তার মাথা গরম হয়ে যায়।
রাহাত এক রাতে আরফাকে ফোন করে বলে—আরিয়ান তো তোমাকে ঘৃণা করত,আমিই তো পাশে ছিলাম সব সময়…আরিয়ান ফোনটা দেখে ফেলে,আরফার উপর বিশ্বাস নড়বড়ে হয়।
তারা কথা বলা বন্ধ করে।অফিসে মুখোমুখি হলেও,
দৃষ্টি বিনিময় হয় না।
এক রাতে আরিয়ান আরফার ডেস্কে একটা ডায়েরি খুঁজে পায়।পড়তে গিয়ে দেখতে পায় পাতা জুড়ে লেখা—আজ অফিসে আরিয়ান একটু হাসলো।মনে হলো, সে আগের মতো ফিরছে।আমি চাই না সে কষ্ট পাক।আমি জানি, ও আমাকে একদিন ক্ষমা করবে।আমি এখনো তার স্ত্রী, মনের ভিতরে।💔
আরিয়ান ডায়েরি বন্ধ করে চোখে জল নিয়ে চুপ করে বসে থাকে।পরদিন সকালে আরফার টেবিলে একটা চিরকুট, তুমি কি আবার আমার স্ত্রী হতে পারো?অফিসে নয়, জীবনের ঠিকানায়… আরিয়ান
আরফা তাকিয়ে থাকে চিরকুটে…কোনো উত্তর দেয় না, শুধু একবার তাকিয়ে মিষ্টি হেসে যায়।