আমার ভাইয়ের যেদিন জন্ম হলো, ঠিক তার আগের দিন রাতে আমার আব্বা রাতে দেরি করে বাড়ি ফিরলেন। বাচ্চা পেটে থাকার কারণে আম্মা ভীষণ রকমের অসুস্থ। শীতের রাত একটা পশমিনা শালে কোনমতে নিজের শরীরটা ঢেকেঢুকে আমাদের দুই বোনকে ভাত খাইয়ে দিলেন।
তারপর বিছানায় শুয়ে কাৎরাতে থাকলেন। আম্মার অবস্থা দেখে আমি অনবরত কাঁদছি। চাচারা বাইরে চলে গেলেন আব্বাকে খুঁজতে। আমাদের এক দাদী হাসিমুখে একগামলা গরম পানি নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। আমি তখন রীতিমত কাঁপছি।
কে যেন আমাদের পাশের রুমে নিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিল। আব্বা এলেন মাঝরাত পার করে। উনি হাসতে হাসতে বাসায় এসেছেন।উনার হাতে মস্ত বড় একটা টু ইন ওয়ান। আব্বা একজিবিশন ( Exhibition) গিয়ে লটারিতে টু ইন ওয়ান জিতেছেন।
আমি ঘুমের মাঝেই শুনছি আব্বা আম্মার নাম ধরে ডাকছেন। সকাল হলো। ঘুম ভাঙলো বিড়ালের মিউমিউ শব্দে। আমার ছোটবোন বিড়ালের মালিক। যদিও তার বয়স মাত্র চারের কাছাকাছি তবুও সে একটি বিড়াল, চারটে মুরগী ও একটা ঝগড়াটে টাইপের মোরগের মালিক।
ফুপু এসে আমাদের কোলে করে খাটের মাঝখানে আঙুল দিয়ে দেখালেন ‘ দেখো দেখো তোমাদের ভাই হয়েছে।‘
তখন আমি পাঁচ রিমি মোটে সাড়ে তিন। তবুও আমরা আবিষ্কার করলাম বিড়াল না আমার ভাইটা মুঠো পাকানো হাতটা মুখে দিতে চাইছে, না পেড়ে মায়া মায়া করে কাঁদছে। ভাইয়ের দুঃখে আমাদের দুই বোনের প্রান ফেটে গেল, আমি ভাইয়ের হাতটা ধরে তার মুখে পুরে দিতে চাইলে ফুপুর কড়া ধমক খেলাম। ভাই যেন আমাদের পুতুল।
প্রায়ই কোলে নিয়ে বসে থাকতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আম্মার কড়া নিষেধ।
ভাই একটু বড় হলে আব্বা ভাইকে একটা রিক্সা কিনে দিলেন। আম্মার শুরু হলো ফটোসেশন। প্রায়ই ভাইকে নিয়ে গিয়ে ( রিক্সা সহ) বিভিন্ন ভঙ্গিমায় ছবি তোলেন।
এই গোল্লা গাল্লা টাইপের বাবুটা যে আমাদের ভাই ভাবলে বেশ একটা গর্ব হয়। আব্বা তখন ঢাকায় থাকেন আমরা পাবনায় দাদাবাড়ি থাকি। প্রতিবার আসার সময় অনেক খেলনা ও নানান রকম খাবারের সাথে চটের ব্যাগে আরেকটি ভারি বস্তু নিয়ে আসেন।
ব্যাগের উপরে থাকে অন্য খাবার আম্মা ভয়ে ভয়ে আব্বাকে জিজ্ঞেস করেন ‘এনেছো? ‘
আব্বা হেসে বলেন ‘ আনবো না? আশ্চর্য নইলে বাচ্চা খাবে কি?
বস্তুটি একটি পাঁচ পাউণ্ডের দুধের কৌটা।
যা আমাদের দুই বোনের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতে হয়। আমরা বড় তাই আমাদের জন্য বরাদ্দ গরুর দুধ। যা দুধওয়ালা দিয়ে যায়। গ্লাসে করে বা ভাতের সাথে সেই দুধ খেতে আমাদের অসহ্য লাগে। আমাদের মন পড়ে থাকে মিটসেফের উপরের তাকে। সেখানে গ্রাইপ ওয়াটার, চিনির কৌটার পেছনে থাকে ‘রেড কাউ ‘ গুড়ো দুধ। যা আমাদের দুই বোনের জান প্রাণ।
একদিন রিমি চুপিচুপি গিয়ে কৌটা খুলে দুই চামচ দুধ একসাথে মুখে দিয়ে দিল। সাথে সাথে গেল ওর দম আঁটকে। আম্মা দৌঁড়ে এসে ওর মুখে পানি দিলেন। দুধ গলে বেচারা নিঃশ্বাস নিতে পারলো।
একদিন ভাই হাঁটতে শিখলো। তারপর কথাও শিখে গেল। টুকটুক করে অদ্ভুত কিছু শব্দ বলতো সে। তার মাঝে একটা হচ্ছে ‘ তুং তুং ‘।
তার মানে সে বাইরে বেড়াতে যাবে রিক্সায় করে। একদিন আব্বা তাকে স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। আমি তার অভিভাবক বোন সাথে গেলাম। তখনও মায়েদের এতো স্কুলে গিয়ে বসে থাকার নিয়ম শুরু হয়নি। আম্মা আর ফুপু তাই স্কুল ছুটির আগে আগে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন।
একদিন আব্বা লিচু কিনে এনেছেন সেদিন আমার ফুপা সবার প্রিয় খালেক স্যার ( পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ) লিচু কিনে এনেছেন। সে সারাদিন ভাত না খেয়ে লিচু খেলো। তারপর পুরো রাত পেটের ব্যথায় সে কি চিৎকার। আম্মা পেটে তেল মালিশ করে দিলেন। আব্বা নাগবাবুর কাছ থেকে হোমিওপ্যাথি ঔষধ এনে দিলেন, কিছুতেই কিছু হয় না।
ভাইয়ের কান্না দেখে আমরা দুই বোনও কাঁদতে লাগলাম।
এর কয়েকদিন পরেই
ছোট খালার বিয়ে হলো। আমার ভাই ঘোষনা দিল। মামা দুষ্টু লোক তাই খালামনিকে বিয়ে দিয়েছে। সে তার এত্তো ভালো দুই বোনকে কিছুতেই বিয়ে দেবে না।
সে খেলতে যেতো দূরে দূরে। তখন তো এতো বিধিনিষেধ ছিল না। রাস্তার ধারের ছোট ছোট সাদা একরমের ছোট্ট ফুল ফুঁটতো। একদিন তার বন্ধুর কাছ থেকে সে শিখলো এই ফুল চুষে খেলে মিষ্টি মধু পাওয়া যায়। তারপর থেকে সে এই গাছ দেখলেই টেনে হিঁচড়ে আমাদের জন্যও নিয়ে আসতো।
কারো বাগানে জবা গাছ দেখলে আর রক্ষা নেই, সে অবশ্যই আমাদের জন্য জবা ফুল পেড়ে আনতো। ইচ্ছে থাকুক না থাকুক আমাদের খেতে হবেই। রাজ্যের যত অদ্ভুত জিনিসের স্বাদ সে কখনো একা নেয়নি। রিমিকে সঙ্গী করেছে। আর আমার জন্য লুকিয়ে চুড়িয়ে নিয়ে এসেছে। বড়ই, জাম তার মাঝে অন্যতম।
শিউলি ফুল দিয়ে মালা গাঁথায় রিমি ছিল ওস্তাদ প্রকৃতির। সেই মালা সে আমাকে পরিয়ে খুব আনন্দ পেতো। ঘুরে ফিরে দেখতো আর বলতো আপা তোকে তো রাজকন্যার মতো লাগছে। কিন্তু তার এক কথা বোন সে বিয়ে দেবে না। স্কুল থেকে প্রায়ই এটা ওটা কিনে এনে ওকে দিতাম একদিন না পেলেই তার মন খুব ভার হতো।
একটা দাঁত পড়লেও পকেটে রাখতো আমায় দেখাবে বলে।
আমাদের ভাবনা এক,
আল্লাহ্র ইচ্ছে অন্যরকম। ও যখন ক্লাস ফাইভে পড়ে তখন আমার বিয়ে হয়ে যায়।
ওর এসএসসির আগেই রিমির বিয়ে হয়। আব্বা বেঁচে নেই ১০ ও ১৬ বছর বয়সে সেই তখন আমাদের একমাত্র অভিভাবক।
কিন্তু ওর একটা কথা আল্লাহ্ কবুল করেছেন। ও আমাদের দুই বোনের একজনের বিয়ের সময়ও উপস্থিত থাকেনি। কোথায় যেন দৌঁড়ে পালাতো।
আমাদের দুই বোনের বৌভাতেও ও আসেনি। এতো লোকজন দেখে ওর নাকি ভয় লাগছিল। দুই অনুষ্ঠানেই এসে বাইরে থেকে ফিরে গেছে।
আজ ওর জন্মদিন কী আর দেবো ! ছোটবেলার সেই জবা ফুল উপহার দিলাম। দেখি ওর মনে আছে কি না সেই জবা ফুলের স্মৃতি। শুভ জন্মদিন ‘ভাই’।