সে আসে

আমার বিয়ের রাতে আমার বর একটা তাবিজ গিফট দিলো। আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘এটা কি?’
আমার বর সাজু খানিকটা লজ্জা পেয়েই বললো, ‘তাবিজ।’
‘সেটা তো বুঝতেই পারছি‌। কিন্তু এটা কেন?’
‘সময় আসুক। বুঝবা।’
আমার ভীষণ রাগ লাগলো। বান্ধবীদের কাছে এতো এতো গল্প শুনেছি বিয়ের রাতের, তাদের বর হিরের আংটি, রুপোর নেকলেস- এসব কিছু উপহার দেয়, আর আমি কিনা পেয়েছি তাবিজ। তাও খুব দামি কোন তাবিজ না, সস্তা টিনের কালো সুতা পরানো তাবিজ। সুতাটাও ছোট। ওটা গলায় দেয়া যাবে না, হাতে বাঁধতে হবে।
রাগে সে রাতে আমার ঘুম এলো না। সাজু খানিকক্ষণ মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে আমাকে কাছে টানবার চেষ্টা করছিলো, কিন্তু আমার মেজাজ চড়া দেখে শেষমেষ ভোঁসভোঁস করে নাক ডাকতে লাগলো। আর আমার উঠলো আরো রাগ- নিজের উপর, নিজের কপালের ওপর। কেন যে এই ছেলেটার প্রেমে পড়তে গেলাম! কেন যে বাবা-মার অমতে একে বিয়ে করতে গেলাম!
আমার বাবা-মা বিয়েতে অমত করলেও বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। কন্যাদানের ব্যাপার-স্যাপার সব সুন্দর মতোই সমাধা করেছেন। যাওয়ার আগে মা আমাকে ধরে অনেক কান্নাকাটি করেছেন। কাঁদতে কাঁদতে বলেছেন, ‘এতো আদরে বড় হয়েছিস তুই, এরকম গরীব ঘরে গিয়ে থাকবি কেমনে?’
আমিও কাঁদতে কাঁদতে মাকে জড়িয়ে ধরে বলেছি, ‘আমি থাকতে পারবো মা। তুমি শুধু দোয়া করো।’
বড় মুখ করে একথা বলে এলেও ওদের বাড়ি এসে বেশ ধাক্কা খেয়েছি। সাজুদের বাসা আমি আগে দেখিনি। বাসাটা মোটামুটি বড়, কিন্তু আগের আমলের। সাজুর দাদার যখন কিছু টাকা-পয়সা ছিলো, তখন তিনি জমি কিনে বাসাটি করেন। কিন্তু বাসাটা করার পরপরই তাদের অবস্থা পড়ে যায়। অনেকে বলে, এই বাসা করতে গিয়েই ধার-দেনা করে অভাবে পড়ে ওদের পরিবার। অতো টাকা পয়সা না থাকলেও কেন ধার-দেনা করে সাজুর দাদু বাসাটা করতে গেলেন, তা কেও জানে না।
এই বিরাট বাসায় মাত্র চার রুমে মানুষ থাকে, আর অন্য রুমগুলো পুরোপুরি খালি। দোতলার এক রুমে থাকে সাজুর বাবা-মা, উনাদের রুমটাই সবচেয়ে ছোট। অথচ তারা আগে সবচেয়ে বড় রুমটা নিয়েই থাকতেন। তাদের যা আসবাবপত্র সব সাজু আর তার বোনের রুমে পার করে দিয়েছেন ওরা বড় হওয়ার পর, তাই তাদের আর বড় রুম লাগবে না বলে এই ছোট রুমে উঠে এসেছেন। সত্যি বলতে, সাজুদের বাড়িতে সবচেয়ে বেশি আমার ভালো লেগেছিলো ওর বাবা-মাকেই। কি ভীষণ অমায়িক দুজন মানুষ, তাদের সাথে সারাজীবন এমন বড় বাড়িতে কেন, কুঁড়েঘরেও থাকা যায়।
এরপরের রুমটা মেঘার। মেঘা, সাজুর ছোট বোন। অনার্স ফাইনাল ইয়ারে এখন। ওর জন্য ছেলে খোঁজা হচ্ছে, ভালো ছেলে পেলেই বিয়ে দেওয়া হবে। মেঘা আমার সাথে খুবই ভালো ব্যবহার করলো, কিন্তু আমার কেন যেন মনে হলো, ও আমাকে পছন্দ করে না।
এরপর প্যাসেজের শেষ রুমটা সাজুর। বলতে একটু লজ্জা লাগছে, এখন থেকে রুমটা আমারও। একটা ছেলের সাথে একই রুমে থাকতে হবে এখন থেকে, ভাবতেই কেমন একটা লজ্জা-লজ্জা ভাব আমার মনটাকে রাঙিয়ে দিচ্ছে বারবার।
আর দোতলার আমাদের উল্টোপাশের সবচেয়ে বড় রুমটা সাজুর ফুফুর। তিনি আর তার মেয়ে এখানে থাকেন। ফুফুটি বিধবা, মেয়ে ছোট থাকতেই তার স্বামী মারা গিয়েছিলেন। এরপর থেকে তিনি এখানেই থাকেন। তার মেয়েটার বয়স মেঘার মতোই‌। মা আর মেয়ে- দু’জনের একজনও আমাকে পছন্দ করেনি। এখানে আসার পর থেকেই তাদের কথায় আর আচরণে বারবার এ কথাই আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন। যেমন ঘরে ঢোকার সাথে সাথেই ফুফু বললেন, ‘ওমা , বউ কই?’
আসমা, মানে ফুফুর মেয়েটি বললো, ‘এই তো বউ, মা।’
ফুফু হেসে কুটিকুটি হয়ে বললেন, ‘তা এর রুপেরই এতো গল্প শুনলাম। কি আজব! সুন্দরী কি আজকাল সব মেয়েকেই বলে রে?’
আসমা বললো, ‘ভাইয়ার পছন্দ মা, বোঝো না। তার তো ভালো জিনিস আর ভালো লাগে না।’
আমি অবাক হয়ে গেলাম ওনাদের কথা শুনে। এমন কথা কেউ বলতে পারে, কখনো ভাবতেও পারিনি।
যাই হোক, রাতে সাজুর কাছ থেকে অমন তাবিজ গিফট পেয়ে আরেকটা ধাক্কা খেলাম। তখন বারবার বাবা-মার কথা মনে হচ্ছিলো। মনে হচ্ছিলো, তারা ঠিকই বলেছেন, আমি এ বাড়িতে থাকতে পারবো না। এদের মানসিকতার সাথে আমার মানসিকতা হয়তো যাবে না।
আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম‌। ঘুম ভাঙলো মাঝরাতে। কেন ঘুম ভাঙলো, বুঝতে পারছিলাম না।
পুরো বাড়ি অন্ধকার। কিছু দেখা যায় না। কিছুক্ষণ শুয়ে থাকতেই চোখে অন্ধকার সয়ে এলো। এখন একটু একটু দেখতে পারছি। আমি সাজুকে ডাকলাম, ‘এ্যাই, শুনছো। এ্যাই।’
সাজু হুমহুম কেমন একটা আওয়াজ করে আবার ঘুমিয়ে পড়লো।
আমি আবার ওর গা ধরে ঝাঁকি দিলাম, ‘এই সাজু এই। উঠো।’
সাজু ধরমর করে উঠে বললো, ‘কি? কি হয়েছে?’
আমি বললাম, ‘আমার খুব টয়লেট পেয়েছে। একটু টয়লেটে নিয়ে চলো।’
সাজু আমার হাত ধরে টয়লেটে নিয়ে চললো। ওদের বাড়িটা একটু পুরনো আমলের তো, অ্যাটাচড বাথরুম বলে কিছু নেই। বারান্দার শেষ মাথায় টয়লেট। সাজু বারান্দার লাইট জ্বালিয়ে আমাকে বারান্দার শেষ মাথায় নিয়ে গিয়ে বললো, ‘তুমি ভেতরে যাও। আমি বাইরে দাঁড়াচ্ছি।’
আমি টয়লেট সেরে বের হলাম। দেখি, বারান্দা অন্ধকার। সাজু নেই। ওদের বাড়ির আশেপাশে তেমন বাড়ি বা ল্যাম্পপোস্টও নেই যে বারান্দাটায় একটু আলো আসবে‌। আজকে রাতে বুঝি অমাবস্যা, চাঁদও নেই। বারান্দায় থিকথিকে অন্ধকার। আমি একটু একটু করে আমাদের রুমের দিকে যেতে থাকলাম। রুমের সামনে এসে একটু সাবধানে দরজা খুলে দেখে নিলাম, আমাদের রুম কিনা। অন্য কারো রুমে ঢুকে পড়লে কেলেংকারি হবে। হ্যাঁ, আমাদেরই রুম। সাজু ঘুমিয়ে আছে। ঘুমের ঘোরে আমাকে রেখেই চলে এসেছে, আমার বাথরুম থেকে বের হওয়ার জন্য অপেক্ষা করেনি।
আমি রুমে ঢুকতে যাচ্ছি, এসময়ই কেমন শব্দ হলো। পিছনে তাকিয়ে দেখি, একটা বাচ্চা দাঁড়িয়ে আছে।
বাচ্চাই তো ওটা। দশ বারো বছরের ছেলের মতো, বারান্দার একদম শেষমাথায়। কিন্তু এমন কেন বাচ্চাটা? কারো শরীর অতো শুকনা হয়? যেন কংকালের ওপর চামড়া পরে আছে কেউ, বুকের পাঁজর সব দেখা যাচ্ছে।
অন্ধকার চোখে সয়ে আসায় দেখতে পেয়েছি বাচ্চাটাকে, কিন্তু বাচ্চাটার সেই শুকনো অবস্থা দেখে অবাক হইনি। অবাক হয়েছি অন্য জিনিস দেখে। অবাক না, ভয় পেয়েছি আসলে। ভীষণ ভয়।
সেই অন্ধকার বারান্দার শেষমাথায় দাঁড়িয়ে যে বাচ্চাটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে, তার চোখ লাল। অসম্ভব, টকটকে লাল। একদম রক্তের মতো।
আমি চিৎকার করে উঠলাম। আমার চিৎকার শুনে সাজু দৌড়ে এলো। বললো, ‘কি হয়েছে?’
বাচ্চাটা নেই ততক্ষণে।
আমি সাজুকে বললাম, কি দেখেছি।
সাজুর মুখটা চুপসে গেল ভয়ে। আমাকে বললো, ‘তাড়াতাড়ি এসে শুয়ে পড়ো। রাত অনেক হয়েছে।’
আমি বিছানায় এসে শুলাম। সাজু লাইট নিভাতে গেলেই আমি বললাম, ‘আজ লাইটটা জ্বালানো থাক, প্লিজ।’
সাজু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, ‘আচ্ছা।’ বলে লাইট না নিভিয়ে বিছানায় এসে শুয়ে পড়লো। আমি ভাবলাম ওর দিকে ফিরে ওর বুকে একটু মাথা রাখে জিজ্ঞেস করবো কি হলো ওটা, ওটা কি ছিলো, কিন্তু ততক্ষণে সে নাকডাকা শুরু করেছে।
আর তখনই কারেন্টটা চলে গেল। আমার মুখটা ছিলো জানালার দিকে। আমি সভয়ে দেখলাম, একটা বাচ্চা ছেলে সেই দোতলার জানলার ওপাশ থেকে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখদুটো টকটকে লাল।
আমি চোখ বন্ধ করে মনে মনে বললাম, ‘তুমি সত্যি না। তুমি সত্যি না। তুমি, আমার মনের কল্পনা।’বলেই চোখ খুললাম। দেখলাম, বাচ্চাটা জানালায় নেই। সে আমার বিছানার কাছে। একদম আমার মুখোমুখি।

Be the first to write a review

Leave a Reply

We’re sorry you’ve had a bad experience. Before you post your review, feel free to contact us, so we can help resolve your issue.

Post Review

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক গল্প