মূর্তিটা কিনে বাড়ি আনার পরদিনই তন্বী বাড়ি ছেড়ে চলে গেলো। বলে গেলো, ‘এই বাজে মূর্তিটা যতোদিন বাড়ি থেকে না সরাচ্ছো, আমি বাড়ি ফিরবো না।’
আমিও বললাম, ‘তোমাকে বিয়ে করার পর থেকে আমার একটার পর একটা জিনিস ছাড়তে হচ্ছে। এমন কেন হবে? সেক্রিফাইস কি আমি একা করবো? তুমি করবা না? এই মূর্তি থাকবে, আর আমাদের শোবার ঘরেই থাকবে। দেখি তুমি কয়দিন বাবার বাসায় থাকতে পারো।’
তন্বী যাওয়ার পর মূর্তিটি ঠিকই আমাদের শোবার ঘরে এনে রাখলাম। মূর্তিটার তেমন কোনো বৈশিষ্ট্য নেই। আবক্ষ একটা মূর্তি, সিমেন্ট দিয়ে বানানো, কিন্তু এতো সুন্দরভাবে ওটা বানানো হয়েছে, যেন পাথর কুঁদে স্বয়ং মাইকেলেঞ্জেলো ওটা বানিয়েছেন। একটা মানুষের মুখ। বৃদ্ধ মানুষ, জ্ঞানী জ্ঞানী ভাব। চোখে কোনো মণি নেই। এ ধরণের মূর্তিগুলোতে চোখের মণি থাকেও না।
মূর্তিটা আমার যে খুব পছন্দ হয়েছে তাও না। তন্বীকে একটা শিক্ষা দেবার জন্যই মূর্তিটা রেখেছি, নইলে এটা ফেলেই দিয়ে আসতাম। আমাদের বিয়ের একবছর হয়েছে। এই একবছরে ওর কথামতো চলতে চলতে আমি ক্লান্ত। ওর এটা ভালো লাগে না, ওট ভালো লাগে না। নীল রঙের জিনিস ওর পছন্দ না। সব ক্যাটক্যাটে হলুদ রঙ দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছে। হলুদ রঙ আমি দেখতেই পারি না। তবুও ওর জন্য আমার প্রিয় নীল রঙকে সেক্রিফাইস করেছিলাম।
তবুও সে যদি কেবল রঙেই থামতো। সব কিছুতেই ওর খবরদারি। অফিস থেকে ফিরে গায়ের শার্টটা কেন আলনায় না রেখে সোফায় রেখেছি, সেই নিয়ে কতো রাগ সেদিন। পরে হাতে পায়ে ধরে রাগ ভাঙাতে হলো। এতো কি মানা যায়? শেষে ঠিক করলাম ওর একটা শিক্ষার দরকার।
একটা ইন্টেরিওর শপে ঢুকে মূর্তিটা দেখেছিলাম। সেদিন তন্বী ছিলো আমার সাথে। মূর্তিটা দেখে তন্বী ভীষণ ভয় পেয়েছিলো। আমিও ওকে শিক্ষা দেবার একটা উপায় পেয়ে গেলাম। অফিস থেকে ফেরার পথে মূর্তিটা কিনে আনলাম। আর তন্বীও বাড়ি ছেড়ে চলে গেলো।
তবে শপের মালিক আমাকে মূর্তিটা কিনতে মানা করেছিলো। বলেছিলো, ‘স্যার, মূর্তিটা আসার পর থেকেই দোকানে উল্টাপাল্টা ঘটনা ঘটছে। আমরা মূর্তিটা এমনি ফেলে দিবো কয়দিন পর। আপনার এটা কেনার দরকার নাই।’
আমি বললাম, ‘আমি কিনবো, আর এই মূর্তিটাই কিনবো। আমাকে না করবেন না দয়া করে।’
‘আচ্ছা স্যার, নেন। তবে আরেকটা কথা জানিয়ে রাখি। মূর্তিটা তৈরির পর এর মেকার কিন্তু আত্ম*হত্যা করেছিলো।’
মূর্তিটা আমার বেডের কাছের শোকেসের ওপর রেখেছি। বিছানায় শুলে ওটা আমার মাথার দিকে থাকে।
বিয়ের পর আজ প্রথম আমি রাতে একা থাকছি। এর আগে ও বাড়ি গেলে ওর সাথে আমিও ওর বাড়িতে গিয়ে থাকতাম। আজ রাতে আমি একদম একা বাড়িতে। বিয়ের আগে এমন কতো একা থেকেছি। খারাপ লাগতো না। আজ কেন যেন খারাপ লাগছে। তন্বীর সাথে থাকার অভ্যাস হয়ে গেছে। ওকে মিস করছি খুব। তবে যতো যাই হোক, এবার এতো তাড়াতাড়ি ওকে বাড়িতে আনবো না। দেখি ও কয়দিন বাবার বাড়ি থাকতে পারে।
ডিম লাইট জ্বালিয়ে শুলাম। ঘুম আসছে না। ঘর একদম অন্ধকার না করলে মনে হয় ঘুম আসবে না। তাই ডিমলাইটটাও নিভিয়ে দিলাম।
শুয়ে আছি। একটু একটু ঘুম আসছে চোখে। তখনই, আমার মনে হলো, আমার মাথার কাছ থেকে শব্দ আসছে। কে যেন কথা বলছে ফিসফিস করে।
আমার গায়ের লোমগুলো সব দাঁড়িয়ে গেলো।
আমি চুপচাপ শুয়ে রইলাম। কি হলো বোঝার চেষ্টা করছি। নাহ, আর কোনো শব্দ নেই। বাতাসের শব্দ শুনেছি হয়তো। সব চিন্তা বাদ দিয়ে আবার ঘুমানোর চেষ্টা করলাম।
কিছুক্ষণ পর, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম ততক্ষণে। হঠাৎ ঘুম ভাঙলো। কেন ভাঙলো, প্রথমে বুঝতে পারিনি।
পরে বুঝলাম। আমার এই অন্ধকার ঘরে, আমি বাদে আরো কেউ আছে। কারো চাপা হাসির শব্দ পাচ্ছি আমি।
আমি লাফিয়ে উঠে লাইট জ্বালিয়ে দিলাম।
দেখলাম, কেউ নেই। পুরো ঘরে আমি একা। তাহলে কার হাসির শব্দ শুনলাম? আবার আমার মনের ভুল?
লাইট নিভিয়ে শুতে যাবো, হঠাৎ একটা জিনিস দেখে আমার হার্টবিট যেন বন্ধ হয়ে গেলো।
আমি দেখলাম, মূর্তিটার মুখে হাসি। অথচ ওর মুখে কোনো হাসির চিহ্নই ছিলো না আগে, গম্ভীর ছিলো মুখটা। মূর্তিটা মণিহীন চোখে, হাসিমুখে যেন তাকিয়ে আছে আমার দিকে।
আমি মূর্তিটা হাতে নিলাম। আমার হাত কাঁপছে। কাঁপা হাতে সেটাকে নিয়ে ফেলে দিলাম বারান্দা দিয়ে নিচে। চারতলার ওপর থেকে মূর্তি ভাঙার শব্দ পেলাম। বারান্দার দরজাটা লাগালাম। ঘরে এসে ডিমলাইট জ্বালিয়ে শুয়ে পড়লাম।
রাতে আবার কখন ঘুম ভাঙলো জানিনা। দেখি ঘর অন্ধকার, ডিমলাইট নেভানো। বারান্দার দরজা আমার পায়ের কাছে। দরজাটা হাট করে খোলা।
লাইট নেভালো কে? দরজাই বা খুললো কে? আমি বাদে আর কেউ কি আছে ঘরে?
আমি উঠে বসে লাইট জ্বালালাম। আমার মাথার কাছের শোকেসটার দিকে তাকালাম। মূর্তিটা ওখানেই রাখা। তার মুখে আর হাসি নেই। শুরুতে যেমন গম্ভীর ছিলো, ঠিক সেরকম।
আমার তখন চিৎকার করে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাবার কথা। আমি তা করলাম না। আমি এই অদ্ভুত ঘটনার একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে বসলাম। সেসময় আমার মাথাটা এতো ঠান্ডা রেখেছিলাম কিভাবে, নিজেও জানি না।
আমি ব্যাখ্যা দাঁড় করালাম, মূর্তির হাসি থেকে ওটাকে ফেলে দেয়া পর্যন্ত যতো ঘটনা ঘটেছে, সব ঘটেছে আমার স্বপ্নে। কারণ, মূর্তিকে ফেলে দিয়ে দরজা বন্ধ করা আর লাইট জ্বালানো পর্যন্ত সব ঘটনা ঘটেছে আমার দ্বিতীয়বার ঘুম থেকে জাগবার পর। এর আগে লাইট বন্ধই ছিলো, দরজাও খোলা ছিলো, এখন যেমন আছে। তার মানে, দ্বিতীয়বার ঘুম থেকে জেগে ওঠার ব্যাপারটা পুরোপুরি স্বপ্ন।
আমি আবার শুয়ে পড়লাম। শোবার আগে মূর্তিটাকে পাশের ঘরে রেখে দিয়ে আসলাম। ওটাকে নিয়ে যে স্বপ্নটা দেখেছি, সেটা যতো অলীকই হোক, সেটাকে নিয়ে প্রচন্ড একটা ভয় তৈরি হয়েছে আমার মনে।
ঘুমিয়ে পড়লাম। আবারও ঘুম ভাঙলো। পাশের রুমে কারো হাঁটার শব্দ পাচ্ছি।
পাশের রুমে যাবার দরজাটা আমার মাথার দিকে, শোকেসের পাশে। আমি ঘাড় কাত করে উপরের দিকে চাইলাম। একটা মুখ তাকিয়ে আছে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে, আমার দিকে। মুখটা চেনা আমার। সেই মূর্তির মুখ।
আমার আর কিছু মনে নেই। বোধহয় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। সেই জ্ঞান ফিরলো সকালে। মূর্তিটা তখনও পাশের রুমেই আছে। সেটাকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেলাম বাড়ি থেকে। ওটা এখন ওর পুরনো শপে ফেরত দিতে হবে, যতদ্রুত সম্ভব।
শপে ঢুকেই দেখলাম পুলিশের ইউনিফর্ম পরা একজন বসে আছে। শপের মালিক আমাকে দেখে হাসিমুখে বললো, ‘আরে আপনি চলে এসেছেন! একটু পর তো আমিই উনাকে নিয়ে আপনার বাড়ির ঠিকানায় যাচ্ছিলাম।’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কি ব্যাপার?’
মালিক বললেন, ‘উনি এসআই সফিউল্লাহ, এই মূর্তির মেকারের আত্ম*হত্যার ব্যাপারটা দেখছেন। স্যার, আপনিই বলুন না পুরো ব্যাপারটা।’
এসআই সফিউল্লাহ বললেন, ‘এই মূর্তির মেকারের ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে কি পেয়েছি, জীবনেও বিশ্বাস করবেন না। ব্যাটা দেখতে আলাভোলা। কিন্তু তলে তলে ভয়ানক সিরিয়াল কিলার। ওর বেশ কিছু ভিক্টিমের খোঁজ পেয়েছি আমরা।এর মধ্যে একজন ছিলো, যার লাশের ওপর সিমেন্টের ছাঁচ ফেলে উনি একটি মূর্তি বানিয়েছিলেন।’
‘তার মানে আপনারা সন্দেহ করছেন, আমার কেনা মূর্তিটাই সেই মূর্তি?’
‘জ্বি।’
‘যে লোকটার ছাঁচে মূর্তিটা তৈরি করা হয়েছিলো, তার পরিচয় কি জানতে পারি?’
সফিউল্লাহ সাহেব আমার দিকে একটা ফাইল এগিয়ে দিলেন। ফাইল খুলতেই একটা ছবি চোখে পড়লো। একটা লোকের ছবি। লোকটাকে চিনতে পারলাম আমি। কাল রাতে যে মুখটা আমার দরজা দিয়ে উঁকি দিয়েছিলো, সেই মুখটা এই লোকের। ছবিতে লোকটার মুখ হাসি হাসি। মূর্তিটার মুখে আমি যেমন হাসি দেখেছিলাম, ঠিক সেইরকম।
সফিউল্লাহ সাহেব বলতে লাগলেন, ‘খুব বিভৎসভাবে মেরেছে ভাই। ভদ্রলোক বাসায় একা ছিলেন। তার বউ আমেরিকায় ছেলের কাছে গিয়েছিলেন কিছুদিনের জন্য। খুনি কিভাবে যেন খোঁজ পেয়ে রাতের আঁধারে ঢুকে খুনটা করে। দুই-তিনদিন সে সেই বাসায় লাশটার সাথেই ছিলো। সেসময়েই সিমেন্ট দিয়ে লোকটার মুখের ছাঁচ নিয়ে নেয় সে। এরপর নিজের বাসায় গিয়ে পুরো মূর্তিটা বানায়।’
আমি মূর্তিটা ফেরত দিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে এলাম। তন্বীর কাছে যেতে হবে। ওদের বাসায় থাকবো আমি এই কয়দিন, যতোদিন নতুন একটা ভাড়াবাসা খুঁজে না পাচ্ছি। পুরনো বাসায় যে ঘটনাটা ঘটেছে কাল রাতে, তারপর আর একরাতও আমার থাকা সম্ভব না সে বাসায়।