শিকল পর্ব০৪

এরপর ইমরান সবার উদ্দেশ্য বলে দেয় যে আবির গান গাবে। এখন আর না করার কোন রাস্তা নেই আবিরের। মায়া শুধু আবিরের দিকে তাকিয়ে আছে। আবিরও মায়ার দিকে তাকিয়ে গিটারটা হাতে নিয়ে বসে গান ধরে,
সবই বুঝি,
তবু অবুঝের মতো।
তোমায় খুঁজি,
নিয়ে হারানোর ক্ষত।
আজও ভাবি,
কেন বেদনার মতো,
হৃদয়ে আঁকি,
নীল প্রজাপতি শত।
ফেরাতে পারিনি আমি,
পারিনি তোমার হতে।
তুমিতো গিয়েছো চলে,
দ্রুতলয়ে আলোর পথে।
সবই বুঝি,
তবু অবুঝের মতো।
তোমায় খুঁজি,
নিয়ে হারানোর ক্ষত।
আজও ভাবি,
কেন বেদনার মতো,
হৃদয়ে আঁকি,
নীল প্রজাপতি শত।
সেই যে ভালোবেসে,
হৃদয়ের পাল তুলে।
প্রেমের বৈঠা নিয়ে,
অজানায় গিয়েছো চলে।
ফেরাতে পারিনি আমি,
পারিনি তোমার হতে।
তুমিতো গিয়েছো চলে,
দ্রুতলয়ে আলোর পথে।
সবই বুঝি,
তবু অবুঝের মতো।
তোমায় খুঁজি,
নিয়ে হারানোর ক্ষত।
আজও ভাবি,
কেন বেদনার মতো,
হৃদয়ে আঁকি,
নীল প্রজাপতি শত।
এই যে আলো থেকে,
আঁধারে দিয়েছো ঠেলে।
কী যে একা একা লাগে,
চোখ ভিজে লোনা জলে।
ফেরাতে পারিনি আমি,
পারিনি তোমার হতে।
তুমিতো গিয়েছো চলে,
দ্রুতলয়ে আলোর পথে।
সবই বুঝি,
তবু অবুঝের মতো।
তোমায় খুঁজি,
নিয়ে হারানোর ক্ষত।
আজও ভাবি,
কেন বেদনার মতো,
হৃদয়ে আঁকি,
নীল প্রজাপতি শত।
গানটা শেষ করলে সবাই জোরে তালি দিয়ে উঠে। অসম্ভব সুন্দর গেয়েছে আবির গানটা। গানটা সবার মনকে ছুয়ে দিয়েছে। গানটা যাকে ডেডিকেট করে গাওয়া হয়েছে তার হৃদয় ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। তার চোখে অশ্রুর বিশাল বড় ঢেউ অপেক্ষা করছে আছড়ে পড়ার। সে অপলক অশ্রুকাতর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার হারিয়ে যাওয়া ভালবাসার মানুষটার পানে। সে আর কেউ নয় মায়া। গান চলা কালিন সময়ে আবিরের যে কি কষ্ট হয়েছে তা কখনো কেউ বুঝবে না। ইমরানের সাথে মায়ার ঘনিষ্ঠতা আবিরকে ভিতর থেকে শেষ করে দিচ্ছিলো। বুকের ভিতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছিলো ওর। কিন্তু এটাই এক নির্মম বাস্তবতা।
পরিস্থিতির কাছে হেরে গিয়ে আমরা মাঝে মাঝে এরকম বাস্তবতার শিকার হই। আবির হয়তো মায়াকে বলতে পেরেছিল ও ওকে ভালবাসে। কিন্তু অনেকেতো বলতেই পারে না। একতরফা ভালবেসে ভালবাসার মানুষটাকে সুখে দেখে দুফোঁটা অশ্রু ফেলে চলে যায়। আর কখনো ফিরে তাকায় না। এই মুহূর্তে আবিরও তা চাচ্ছে। ওর একতরফা ভালবাসা নিয়ে এখন থেকে চলে যেতে যাচ্ছে।
গান শেষ হলে সবার প্রশংসা শুনে আবির চলে যেতে নেয়। ইমরান কাকে যেন ইশারা করে। ইমরান এই সময়টার জন্যই অপেক্ষায় ছিল। মায়া যেতে নিলে ইমরান ওকে কথার জালে ফাসিয়ে দিয়ে আটকে দেয়। কিছুক্ষণ পর ইমরান মায়াকে ছেড়ে দেয়৷ মায়া দ্রুত বাইরে এসে দেখে আবির একটা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে আছে৷ মায়া এই দৃশ্য দেখে স্তব্ধ হয়ে যায়। ওর ক্ষতবিক্ষত হৃদয়টায় যেন আরো ক্ষত হয়। মায়া আস্তে করে বলে উঠে,
~ আবির…
আবির পিছনে ঘুরে তাকিয়ে দেখে মায়া। ও আঁতকে উঠে। ও মেয়েটাকে ছাড়িয়ে মায়ার কাছে ছুটে আসে৷ এসে অস্থির হয়ে বলে,
– তুমি যা ভাবছ মোটেও তা নয়। আমি চলে যাচ্ছিলাম। হঠাৎই এই মেয়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে আর বলে আমাকে নাকি সে পছন্দ করে। আমি তাকে ছাড়াতে চেষ্টা করছিলাম। সত্যি আমি শুধু তোমাকে..
~ থামলে কেন বলো???
– না। আমার আর সেসব বলার অধিকার নেই। তুমি এখন অন্যকারো৷ আমার মায়া আমার মনেই আছে। আমি তার স্মৃতিগুলো নিয়েই বেঁচে থাকবো।
মায়া সময় নষ্ট না করে দ্রুত বলে,
~ আবির তোমাকে আমার কিছু বলার আছে। এসব কিছ….
– আরে মায়া তুমি এখানে!!! আমি তোমাকে পুরো বাড়ি খুজতেছি। আবিরও যে সাথে। তা ভাবির সাথে কি কথা হচ্ছিলো হুম?? (ইমরান)
– তেমন কিছু না। দোস্ত আমি এখন যাই। পরে কথা হবে।
ইমরান আবিরের কানে কানে গিয়ে বলে,
– তোর ভাবিকে নিয়ে আজ রাতে সেই মজা করবো বুঝলি। কল টল দিস না আবার। হাহা।।
আবির অনেক কষ্টে হাসি দিয়ে ঘুরে চোখের জল ছেড়ে দিয়ে চলে আসে। আর পিছনে ফিরে তাকায় নি। মায়া অসহায় ভাবে কান্নাসিক্ত দৃষ্টিতে আবিরের চলে যাওয়া দেখছিল।
এরপর মেহমানরা খাওয়া দাওয়া শেষ করে ধীরে ধীরে সবাই চলে যায়। মায়া জামা পরিবর্তন করে রুমের এক কোণে চুপচাপ নিথর হয়ে পড়ে আছে। ইমরান রুমে এসে দরজা লাগিয়ে মায়ার সামনে বসে সিগারেট একটা ধরিয়ে বলে,
– কি আবিরকে সব বলতে নিয়েছিলে তাইনা?? তা পারলে বলতে??
মায়া মাথা নিচু বসে আছে। চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। ইমরান একটা সুখটান দিয়ে হাসতে হাসতে বলে,
– বললেও বা লাভ কি হতো?? আবিরের সামর্থ্য আছে তোমার বাবার চিকিৎসা করানোর?? ও পারতো চিকিৎসা করাতে?? যেখানে টাকা নাই সেখানে কোন ভালবাসাও নাই। টাকাই হলো সব।
মায়া মাথা তুলে মলিন কণ্ঠে বলে,
~ আপনার কাছে টাকাই সব তাই না??টাকা দিয়ে আপনি সব করতে পারলেও কখনো কারো ভালবাসা অর্জন করতে পারবেন না। কারণ টাকা দিয়ে কারো মন কিনা যায় না। আর আমার আবির আমার মন পেয়েছে। তার জন্য টাকা লাগে নি।
– এসব সস্তা কথা আমাকে শুনাবা না। এই আরাম আয়শের জীবন আবির কখনো তোমাকে দিতে পারবে না। এই দামী দামী যা আছে সব তোমার আর আমারই। আর কি চাই তোমার??
~ একমুঠো সত্যিকারের ভালবাসা। যা আপনার কাছে নেই। আপনার কাছে অাছে বিষাক্ত লোভ। আমাকে ভোগ করার বিষাক্ত লোভ আছে শুধু আপনার। কীসের জন্য আর অপেক্ষা করছেন?? নিন আমাকে ভোগ করে আপনার মনের জ্বালা মিটান। কি আর করবেন জানোয়ারের মতো আমাকে খাবেন। নিন শেষ করে দিন।
ইমরান মায়ার কথা আর শুনতে না পেরে ঠাস করে একটা থাপ্পড় মেরে দেয়। মায়া গালে হাত দিয়ে অঝোরে কাঁদতে থাকে। মায়াকে মেরে ইমরানের খারাপ লাগছে। ইমরান মায়াকে মানানোর জন্য ওর কাছে যেতে নিলে মায়া কাঁদতে কাঁদতে বলে,
~ আমাকে ছুবেন না। দূরে যান আমার থেকে। দূরে যান।
ইমরান রাগ করে বাইরে চলে যায়। গাড়ি নিয়ে হোটেলে গিয়ে অনেক নেশা করে। এটা ওর পুরনো অভ্যাস। ইমরান প্রচুর নেশা করে। নেশা করে একটা মেয়ে নিয়ে ডিলাক্স রুমে চলে যায়। আর অন্যদিকে মায়া একা ওর জীবনের মতো অন্ধকার রুমে বসে শুধু চোখের পানি ফেলছে৷ ইমরান যদি ওকে সত্যি সত্যি মন থেকে বিয়ে করতো তাহলে হয়তো মায়া ইমরানকে একসময় মেনে নিতে পারতো। কিন্তু ইমরানকে মায়ার ঘৃনা হয়। কীভাবে একটা লোক এতটা খারাপ হয়। মায়াকে আপন করে পাওয়ার জন্য এত্তো কিছু!!
মায়ার চেয়ে কিছুগুণ বেশী হলেও কষ্টে আছে আবির। রাস্তার ধারে রেলিং এর উপর বসে আসে। আশে পাশে কোথাও কোন মানুষ নেই। লোক শূন্য পুরো জায়গা। মাঝে মাঝে কয়েকটা গাড়ি খুব স্পিডে চলে যাচ্ছে। আজ মায়াকে অসম্ভব সুন্দর লাগছিল। আবির কিছুটা সময় হলেও মন ভরে ওকে দেখেছে। কাউকে সত্যিকারের ভালবাসকে কখনোই এতো সহজে ভুলা যায় না। সেখানে ৬ টা বছর ওরা একে অপরের সাথে ছিল। আজ মায়ার বাবা সুস্থ থাকলে হয়তো এতো কিছু হতো না৷ আবির যেভাবে হোক মায়াকে ওর করে নিত। কিন্তু ইমরানের শিকলে মায়া আর আবির দুজনই বন্দী। আবির ঠিক করেছে ও এ শহর ছেড়ে মাকে নিয়ে অনেক দূরে চলে যাবে। অন্যকোনো শহরে ছোট একটা চাকরি নিয়ে মাকে নিয়ে থাকবে। এ শহরটা বড্ড জালিম প্রেমিকের প্রতি। এখানে আবেগের কোন দাম নেই। মুখোশ পড়া মানুষগুলো তাদের আসল রূপ দেখাতে বিন্দুমাত্র সংকোচ করে না। তাদের নতুন রূপগুলো বড্ড জ্বালায়। তাই এ শহরকে বিদায় দেওয়াই আবির সঠিক মনে করে। আবির বাসার দিকে হাঁটা ধরে একরাশ হারানোর কষ্ট নিয়ে।
পরদিন সকালে,
সারারাত ফুর্তি করে ইমরান খুব সকালে বাসায় এসে পড়ে। ইমরান রুমে ঢুকলে মায়ার ঘুম ভেঙে যায়। মায়া দেখে ইমরান নেশা করে এসেছে। গা থেকে বিশ্রী মদের গন্ধ আসছে৷ ইমরান টালমাটাল অবস্থায় মায়ার কাছে গিয়ে বলে,
– সারারাত অন্য মেয়ের সাথে ছিলাম। এরপর কিন্তু আর তা হবে না। তোকে প্রতিদিন রাতে চা….
চাই বলতে গিয়েই বিছানায় শুয়ে পড়ে। মায়ার বমি আসছে ইমরানকে দেখে। ঘৃনায় মনে চাচ্ছে এখনই মেরে ফেলবপ ইমরানকে। কীভাবে এসব খারাপ কাজ করে নিজের স্ত্রীকে এসে বলে। মায়া আর না পেরে ফ্রেশ হয়ে নিচে চলে যায়। এসব জঘন্য মানুষের কাছে ও থাকতে পারবে না। মায়া নিচে এসে নাস্তা বানায়।
এভাবে ইমরানের সাথে যুদ্ধ করে কয়েকটা দিন চলে যায়। আজ মায়ার বাবার অপারেশন। মায়া খুব চিন্তায় আছে। ইমরান এত্তো খারাপ যে, সে নিজে না এসে আবিরকে এই দায়িত্ব দিয়েছে। ইমরানের এই কান্নাকাটি ড্রামা ভালো লাগে না। তাই আবিরকে পাঠিয়েছে।
আবির মায়া আর ওর মাকে স্বান্ত্বনা দিচ্ছে। একটুপরই অপারেশন শুরু হবে। খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি অপারেশন এটি। মায়া আর মায়ার মা খুব চিন্তায় আছে। মায়ার মা বাইরে বসে কুরআন পড়ছেন। মায়া পাশে বসে আল্লাহ আল্লাহ করছে। আবির মায়ার কাছ থেকে দূরে গিয়ে বসে। ওর খুব ইচ্ছা হচ্ছে মায়ার পাশে বসে ওর বুকে মাথা রেখে মায়া বসে থাক। এতে যদি মায়ার একটু চিন্তা কমে। হঠাৎই মায়া আবিরের দিকে তাকায়। দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে। আজ ওদের মাঝে কত্তো দূরত্ব। মায়া অসহায় ভাবে আবিরের দিকে তাকিয়ে আছে। ইশারায় কাছে আসতে বলে। আবির না চাওয়া স্বত্তেও উঠে মায়ার পাশে গিয়ে বসে। মায়া আর কিছু না ভেবে আবির হাতটা শক্ত করে ধরে বসে থাকে।
অনেকটা সময় পেড়িয়ে যায়। মায়ার বাবার অপারেশন আল্লাহর রহমতে সফল ভাবে সম্পূর্ণ হয়। মায়া আর মায়ার মা প্রচন্ড খুশী। মায়া আবিরকে আড়ালে এসে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দেয়। আবির মায়াকে ওর বুকে জড়িয়ে ধরে নি। চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। মায়া আবিরের জড়িয়ে ধরা না পেয়ে ওর দিকে তাকিয়ে দেখে আবির অন্য দিকে তাকিয়ে আছে। মায়া আবিরকে ঠাস করে ছেড়ে দেয়। আর দৌঁড়ে চলে যায়। আবির দুফোঁটা চোখের জল ছেড়ে দিয়ে চলে আসে। কারণ এরপরই ইমরান এসে বাকিটা দেখে৷
এরপর ১ সপ্তাহ চলে যায়। মায়ার বাবা এখন অনেকটাই সুস্থ। মায়া ওর বাবাকে পেয়ে খুব খুশী। বাবা-মা দুজনকেই পেয়ে মায়া অনেক খুশী। কিন্তু ভিতরে ভিতরে আবিরের জন্য এখনো ওর মন কাঁদে। ইমরানকে কখনো মায়া মেনে নিতে পারবে কিনা জানে না। কিন্তু আবিরকে আজও ও অনেক ভালবাসে। অনেক।
ইমরানের বাসায়,
এখন রাত ১১ টা বাজে। মায়া জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশে সুন্দর চাঁদটাকে দেখছে। চাঁদের মাঝে ওর আর আবিরের অনেক পুরনো স্মৃতিগুলো মনে পড়ছে। হঠাৎই মায়াকে পিছন থেকে ইমরান জড়িয়ে ধরে আর ওর কানে কানে বলে,
– আজ তোমাকে আপন করে দিব। কেউ আমাকে আটকাতে পারবে না। কেউ না।

Be the first to write a review

2 Responses

  1. Yo, 42vnbet! This site’s got some serious potential. Checked it out, and I’m liking the vibe. Thinking this might become my new go-to spot. Worth a shot, for sure! Check it out! 42vnbet

Leave a Reply

We’re sorry you’ve had a bad experience. Before you post your review, feel free to contact us, so we can help resolve your issue.

Post Review

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক গল্প