কলকাতার বাইরের এক পুরনো ফ্ল্যাট কমপ্লেক্স – নাম ‘আলোকধারা’। নামটা যতই আশাব্যঞ্জক হোক, ভিতরের গল্প কিন্তু একেবারে অন্ধকারে ঢাকা।
এই গল্প আমি লিখছি কারণ আমি জানি, কেউ বিশ্বাস করবে না। কিন্তু আমি চাই না কেউ আমার পথ অনুসরণ করুক। চাই না কেউ সেই একই ভুল করুক…
ঘটনাটা শুরু ২০২২ সালের জানুয়ারিতে। আমি, অনির্বাণ চক্রবর্তী, পেশায় গ্রাফিক ডিজাইনার, সদ্য ডিভোর্সের পরে নিজের মতো করে একা থাকার জায়গা খুঁজছিলাম। ব্যস্ত শহরের কোলাহল থেকে দূরে একটু নিঃশব্দ, একটু বাতাস আর একটু সূর্য – এমন একটা ফ্ল্যাট খুঁজছিলাম।
তখনই এক উটকো দালাল মারফত খোজ পেলাম আলোধারা-র 9C ফ্ল্যাটের। দাম তুলনামূলক কম, বারান্দা দক্ষিণমুখী, ছাদে গাছগাছালি, এবং আশেপাশ বেশ শান্ত।
ফ্ল্যাটটা পুরনো, ১৯৮০ সালের গাঁথুনি। কিন্তু বেশ মজবুত, কাঠের জানালা, লোহার রেলিং, এবং একটা বিষণ্ণ সৌন্দর্য আছে যেন। মালিক বৃদ্ধ, একেবারে গলা কাঁপানো গম্ভীর মানুষ। বললেন, “এটা আমি নিজে থাকতাম একসময়… এখন আর থাকি না। আপনি নিতে পারেন, শুধু একটা কথা মনে রাখবেন — ছাদের দরজা বন্ধ রাখবেন। ওটা খোলা ঠিক নয়।”
আমি হেসে বলেছিলাম ছাদ তো সবাই ব্যবহার করে। উনি কিছু বললেন না, শুধু একটু হাসলে। আমি আর কথা বাড়াইনি…
—
প্রথম কিছুদিন ভালই কাটছিল। অফিস থেকে ফিরতাম, চা করে বারান্দায় বসে থাকতাম। পাশের ফ্ল্যাটে একটা বয়স্ক দম্পতি থাকতেন, নিচতলায় এক কলেজ পড়ুয়া ছেলে।
তবে বেশ কিছু খেয়াল করতে শুরু করলাম।
রাত বারোটা পেরোলেই ফ্ল্যাটের পেছনের দেওয়ালে এক অদ্ভুত আওয়াজ হতো — যেন কেউ ঠুকঠুক করছে, ভারী কিছু ঘষে নিচ্ছে। আমি পাশের ফ্ল্যাটে জিজ্ঞেস করলাম, তারা বলল, কই আমরাতো কিছু শুনিনি। আপনি হয়তো ঘুমের ঘোরে শুনছেন। আমি মনে মনে ভাবলাম তাহলে হয়তো তাই হবে….
একদিন রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে দেখি, ফ্ল্যাটের ভিতরের সব আলো বন্ধ হয়ে গেছে। আমি নিশ্চিত ছিলাম, লাইট জ্বালানো ছিল। বিছানা ছেড়ে বেরোতেই দেখি বারান্দার জানালাটা খোলা। বাতাস নেই, তবুও পর্দা ধীরে ধীরে দুলছে — যেন কারো নিঃশ্বাসে নড়ছে।
—
এরপর থেকে কিছু ছবি তুলতে শুরু করলাম ঘরের, সময় ধরে খেয়াল রাখতে। ধরা দিল অদ্ভুত বিষয় — আমার ফোনে মাঝরাতে ২:১৯ মিনিটে ছবি উঠছে, যেখানে আমি নেই, অথচ আমার বিছানায় কেউ বসে আছে।
প্রথমে ভাবলাম গ্লিচ। কিন্তু ছবিগুলো খুলে দেখতে গিয়েই বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল।
তিনটি ছবি। তিনটিই আমার খালি ঘরের। অথচ প্রতিটিতে বিছানার ঠিক মাঝখানে বসে আছে এক ছায়া।
চুল মুখে ঝুলে পড়েছে, হাতগুলো হাঁটুতে, মাথা নিচু। মুখ পুরোপুরি দেখা যাচ্ছে না, তীব্র একটা অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ল বুকের গভীরে।
আমি থরথর করে কাঁপতে লাগলাম। মোবাইলটা হাত থেকে ছিটকে মেঝেতে পড়ল। গা, হাত, পা ঠান্ডা হয়ে গেল। ঠোঁট শুকিয়ে এল। মাথার মধ্যে শুধু একটা শব্দ বাজছিল — “এটা আমি দেখিনি… আমি তো জানি না… আমি তো ঘরে একা ছিলাম।”
কিছুক্ষণ একভাবে বসে থাকার পর নিজেকে বোঝাতে লাগলাম — “হয়তো মোবাইলের সমস্যা। হ্যাঁ, নিশ্চয়ই তেমনই কিছু। AI গ্লিচ, শ্যাডো, টেকনিক্যাল গন্ডগোল…
আমি ধীরে ধীরে ফোনটা তুললাম। সিম খুলে চেক করলাম, রিস্টার্ট করলাম। ভয় পেলে চলবে না, নিজেকে বারবার বললাম — “আমি যুক্তিবাদী, আমি এসব মানি না।”
বাকী রাতটা জেগেই কেটে গেলো…
পরের দিন সকালে নিজেকে বোঝাতে লাগলাম.. এইসব কিছুইনা, একটা খারাপ স্বপ্ন মাত্র। কিন্তু কিছুতেই নিজেকে সামলাতে পারছিনা, সারাক্ষন একটা ভয় তারা করছে, রাতের ঘটনাই বারবার মনে পড়ছে… বাধ্য হয়ে দালাল কে ফোন করলাম, একবার, দুবার, তিনবার….. বারবার একটা জবাবই শুনতে পেলাম.. এই সিমের কোন বৈধতা নেই।
বাড়ির মালিককে যে ফোন করবো ভুল করে ওনার নাম্বারটা রাখা হয়নি। পাশের ফ্লাটে বাড়িওয়ালার নাম্বার চাইতে গেলাম, কিছুক্ষণ ওয়েট করার পর ভদ্রলোক নাম্বার দিলেন, নাম্বার ডায়াল করতে গিয়ে দেখি ওপরে লেখা রিনা চক্রবর্তী আমি ভাবলাম হয়তো ভদ্রলোকের মেয়ে অথবা বউ হতে পারে.. নম্বার ডায়াল করলাম – জবাব পেলাম এই মুহূর্তে আনরিচেবল, কি করবো বুঝতে পারছি না, বন্ধুবান্ধবকে ঘটনাটা জানালে নিশ্চয়ই আমাকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করবে…. সেটা আমার কাছে আরও ভয়ঙ্কর।
—
এক রাতে সাহস করে ছাদে উঠলাম। ফ্ল্যাটের ছাদে আগে কখনও যাইনি। ছাদের দরজাটা ভারী, মরচে ধরা। তালা নেই, কিন্তু দরজা নিজে থেকেই একরকম আটকে থাকে। ঠেলেই খুলতে হয়।
ছাদে উঠে দাঁড়াতেই কেমন যেন বাতাস স্তব্ধ হয়ে গেল। চারপাশে একটা শব্দও নেই। আশেপাশে নীরবতা এতটাই, গা ছমছমে মনে হচ্ছিল – কোনো প্রাণী নেই এখানে। যেন কিছুই বেঁচে নেই। কুকুরের ডাক নেই, পাখির শব্দ নেই, এমনকি দূর থেকে কারও হাঁটার আওয়াজও না।
একেবারে নিঃশব্দ, মৃত্যুস্তব্ধ।
ফ্ল্যাটের মাথায় এক কোণায় একটা লোহার কাঠামো ছিল — হয়তো পুরোনো ওয়াটার ট্যাংকের জায়গা। সেখানে সাদা কিছু একটা ঝুলছে। আমি কাছে গিয়ে দেখি, একটা ছেঁড়া শাড়ি। আর ঠিক নিচেই জলের দাগ। জলের নয়, সেটা ঘন, কালচে লেপটে থাকা কিছু। যেন শোকে জমে থাকা ছায়া।
হঠাৎ মনে হলো, আমার ঘাড়ে কেউ নিঃশ্বাস ফেলছে। খুব ঠান্ডা, ভেজা, ঘামের মতো গন্ধ। আমি পেছনে তাকাতে সাহস পাইনি, আমার সারা শরীর বরফের মতন ঠান্ডা হয়ে গেল, সম্পূর্ণ অবশ হয়ে গেছে হাত, পা ১ ইঞ্চি ও নড়তে পারছি না কেউ যেন আমার পা দুটোকে সিমেন্ট দিয়ে জমিয়ে ফেলেছে। কিভাবে ছাদ থেকে নেমে এসেছিলাম কিছু মনে নেই…
—
পরদিন থেকে দরজা বন্ধ, জানালা বন্ধ। ফ্ল্যাট ছেড়ে দিতে চাইলাম। মালিককে ফোন করলাম, আশ্চর্য আজ প্রথম চেষ্টাতেই রিং হচ্ছে। ওপাশে এক মহিলা কণ্ঠস্বর বললেন হ্যালো, আমি একটুও দেরি না করে কোন ভনিতা না করে বললাম আমি ফ্ল্যাটটা ছেড়ে দিতে চাই একটু অসুবিধার কারণে, মনে হল উনি একটু থতমতো খেয়ে গেলেন, উনি বললেন আপনি কে বলছেন কোথা থেকে বলছেন, এবার আমি একটু থতমতো খেয়ে সংক্ষেপে ওনাকে ফ্ল্যাটের বিবরণ এবং অ্যাড্রেস বললাম। ওপারের কণ্ঠস্বর আমাকে ধমক দিয়ে বললেন- আমার বাবা সাত বছর আগে মারা গেছেন আপনি কি আমার সাথে মজা করছেন, এই কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমার হাত-পা আবারো ঠান্ডা হয়ে গেল, আমার কানের ভেতর কোন শব্দই পৌঁছাচ্ছে না, কানের ভেতর থেকে মনে হচ্ছে যেন গরম কিছু বেরোচ্ছে………
তাহলে যিনি ফ্ল্যাটটা দেখিয়েছিলেন? যিনি চাবি দিয়েছিলেন? তিনি কে?
আমি আবার ছাদে উঠি। দরজা বন্ধ। তালা দেওয়া। ঠিক সেই তালা, যার চাবি আমার কাছে নেই।
আমি এখন আর ঘুমাতে পারি না। রাতে ঘুমোলে একটা আওয়াজ শুনি — আমার দরজার ওপারে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। সে খুব ধীরে বলছে,
“তুই তো নিজেই উঠেছিস… এখন নামবি কবে?”
—
শেষবার আয়নায় নিজেকে দেখেছিলাম তিনদিন আগে। এখন আয়নায় আমার মুখ নেই। শুধু চোখ, খুব স্পষ্ট।
আমি এখনও 9C-তে থাকি। কিন্তু জানি না আমি কে। আমি কি তখন নামতে পারিনি?
তুমি যদি আলোধারা অ্যাপার্টমেন্টে যাও — ছাদের দিকে তাকিও না। আয়নার সামনে দাঁড়িও না।
কারণ, হয়তো আমি এখনও আছি। শুধু আমাকে আর আমার মতো দেখায় না।