অদৃশ্যের ভয়

বাথরুমের দরজা খুলে বের হয়ে রুপন্তী চিৎকার করে বললো, ‘এই ফাজিল। তুমি বাথরুমের দরজা ধরে ধাক্কাচ্ছিলে কেন?’
আমি ভীষণ অবাক হয়ে বললাম, ‘আমি? আমি বাথরুমের দরজা ধরে ধাক্কাচ্ছিলাম? কে বললো?’
রুপন্তী ভীষণ রেগে গিয়ে বললো, ‘অ্যাই, ফাইজলামি করবা না একদম।‌ ঘরে তুমি বাদে আর কে আছে? তুমি বাদে এইরকম বাজে ফাজলামি আর কে করবে আমার সাথে?’
রুপন্তী চুল মুছতে মুছতে বারান্দার দিকে চলে গেলো। এই সময়টায় ওকে ভীষণ সুন্দর লাগে। সকালের সোনালী রোদ যখন ওর ভেজা চুল বেয়ে ঝরে ঝরে পড়তে থাকে, মনে হয় যেন পুরাণের অপ্সরারাও ওকে দেখলে পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়বে। আজ ও রেগে আছে। রেগে থাকার জন্যই হয়তো ওর সৌন্দর্য বেড়ে গেছে বহুগুণ।
আমি চুপি চুপি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। এরপর ওর কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বললাম, ‘রুপন্তী, তুমি চিন্তাও করতে পারবে না তোমাকে কি অপরুপ লাগছে দেখতে। অবশ্য কল্পনা করতে পারবে।‌ বাংলা সংখ্যামালায় পাঁচ নামের একটা সংখ্যা আছে। অদ্ভুত সুন্দর একটা সংখ্যা।‌ রেগে তোমার মুখখানা হয়েছে একদম ঠিক পাঁচের মতো সুন্দর।’
রুপন্তী আমার দিকে ভেজা তোয়ালে ছুঁড়ে মেরে বললো, ‘যাও, এক্ষুনি অফিসে যাও। আমি আধাঘণ্টা বারান্দায় থাকবো। এই আধঘন্টার মধ্যে নাস্তা খেয়ে রেডি হয়ে অফিসে চলে যাবে। আধাঘন্টা পর ঘরে এসে যদি তোমার মুখ দেখি, তাহলে কিন্তু খবর আছে তোমার।’
আধাঘণ্টা লাগলো না। আমি পনেরো মিনিটের মধ্যেই খেয়ে দেয়ে রেডি হয়ে অফিসের জন্য বেরিয়ে গেলাম। ভেবেছিলাম বের হবার সময় রুপন্তী হয়তো দরজার সামনে এসে দাঁড়াবে একবার। কিন্তু রুপন্তী আর এলো না।
অফিসে কাজের চাপে আর কোনোদিকে তাকানোর ফুসরৎ পেলাম না। লাঞ্চ আওয়ারে মোবাইল বের করে দেখি হোয়াটসঅ্যাপে ২৩০টা ম্যাসেজ।‌ সবই রুপন্তীর। ‘অফিসে পৌঁছেছো?’ ‘কাজের চাপ বেশি?’ ‘বস কি আজকেও বকেছে?’ ‘লাঞ্চ আওয়ারে ফোন দিবে?’ – এধরনের ম্যাসেজ।‌ রুপন্তী কখনো স্যরি বলে না। স্যরির বদলে এসব ভুংভাং ম্যাসেজ দিয়ে কনভারসেশন শুরু করতে চায়। আমার কাছে এসব ম্যাসেজই ওর স্যরি।
রফিক ভাই আমার পাশে বসতে বসতে বললেন, ‘কি মিয়া, মোবাইল দেখে হাসো কেন একা একা? ভাবির ম্যাসেজ দেখো নাকি?’
আমি মোবাইল পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে বললাম, ‘ঐ তো ভাই, তেমন কিছু না।’
রফিক ভাই হাসতে হাসতে বললেন, ‘নতুন বিয়া তো, এখন সবকিছুতেই মজা লাগবে।‌ দুদিন পর দেখবা বউয়ের ম্যাসেজ দেখে আর মজা লাগতেসে না। কারণ ম্যাসেজ খুললেই খালি আলু আর পটলের ফর্দ।’
আমি বললাম, ‘ভাই, সেটা ব্যাপার না।‌ একটা জিনিস নিয়ে একটু ঝামেলায় আছি। এইটা নিয়ে একটু খিটমিট চলতেসে রুপন্তীর সাথে।’
‘কি সমস্যা? শারীরিক?’
‘আরে না ভাই, কি যে বলেন। নতুন বাসা নিয়েছি তো।‌অদ্ভুত ব্যাপার স্যাপার ঘটতেসে কিছু। তা নিয়েই খিটিমিটি।’
‘কিরকম?’
‘এই ভাই, মাঝে মাঝে মনে হয় বাথরুমে ঢুকলে কেউ দরজা ধরে ধাক্কাধাক্কি করছে।’
‘তোমার ক্ষেত্রে হয় এরকম, না শুধু ভাবির ক্ষেত্রে হয়?’
‘রুপন্তীরই বেশি হয় এরকম।’
ভাই চোখ টিপে বললেন, ‘এইরকম ফাজলামি করে ধাক্কাধাক্কি না করে ডাইরেক্ট দরজা খুলে ঢুকে যাবা। শরমের কি আছে?’
‘আরে না ভাই, আমি তো ধাক্কাই না।’
‘আরে আমার কাছে মিথ্যা বলে লাভ কি? তোমারে কি আমি চিনি না? গতবার নতুন জয়েন্ট‌ এডিটর স্যারের টয়লেটের দরজা তো বাইরে থেকে তুমিই লাগায় দিসিলা। স্যার পরে ভয় পেয়ে বাচ্চাদের মতো কান্নাকাটি শুরু করে দিসিলো। এখনও স্যার কালপ্রিটটাকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন।’
আমি মুখ কাচুমাচু করে বললাম, ‘ভাই, কি যে বলেন? আমি কি এইরকম কাজ করতে পারি বলেন? আমি যে কি পরিমান ভদ্র আপনারাই তো জানেন।’
ভাই হেসে ফেলে বললেন, ‘না, তুমি না বললে তো জানাই হতো না আমার।’
বিকেলে বাসায় একটু তাড়াতাড়ি ফিরবো ঠিক করেছিলাম। যেদিন রুপন্তী সকালবেলা রেগে যায়, সেদিন বিকেলবেলায় ওর প্রেম উথলে ওঠে। এই ছ’মাসের বৈবাহিক জীবনে এই ব্যাপারটা আমি টের পেয়েছি। তাই অফিস শেষের আধ ঘন্টা আগেই স্যারের রুমে গিয়ে দরজায় মুখ বাড়িয়ে বললাম, ‘স্যার, আমাকে একটু ছেড়ে দিতে হবে। বউয়ের শরীরটা একটু খারাপ।’
স্যার আমাকে দেখে ভীষণ এক সুন্দর হাসি দিয়ে বললেন, ‘এসো বৎস এসো, তোমাকেই তো খুঁজতেসি। একটা আর্টিকেল লিখতে হবে। এইটা শেষ না করে যেতে পারবা না অফিস থেকে। কালকের প্রথম এডিশনেই ছাপতে হবে এটা।’
আমি বললাম, ‘স্যার, আমাকে আজকের মতো ছাড়া যায় না?’
‘না। তুমি সবসময়ই কাজে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যাও। আজকে কোনোভাবেই তোমাকে ছাড়ছি না।’
মেজাজটা খারাপ হয়ে গেলো। আর্টিকেল লিখতে বসলাম। ভেবেছিলাম গরম গরম কোনো আর্টিকেল হবে, বড় আপার গোপন নথি প্রকাশ অথবা সাদেক ভাইয়ের দেশে আগমন টাইপ কিছু। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম সেগুলো কিছুই না। একটা অতি নিম্নমানের আর্টিকেল। দেশে বাথরুমে পড়ে কতোজন মারা গেছেন তার পরিসংখ্যান টাইপ।
বুঝলাম আমাকে আটকানোর জন্যই স্যার এই ঘৃণ্য চাল চেলেছেন। মন খারাপ করে টাইপ করছি, সুমন্ত এসে বললো, ‘রিতম ভাই, আপনি চলে যান। আপনার আর্টিকেলটা আমি লিখে দিচ্ছি।’
আমি বললাম, ‘থাক থাক, তুমি কেন কষ্ট করবা?’
‘আরে না ভাই। আজকে আপনার হয়ে আমি প্রক্সি দিয়ে দিচ্ছি। আগামী শুক্রবার আমার প্রক্সিটা আপনি দিয়েন। নিতুরে নিয়ে একটু ধানমন্ডি লেক যাওয়া লাগবে। অনেকদিন পর ডেট করতে রাজি হয়েছে মেয়েটা।’
সুমন্তকে একটা থ্যাংক ইউ দিয়ে তাড়াতাড়ি অফিস থেকে বের হয়ে দৌড়ালাম। অফিসের নিচেই ফুলের দোকান। রুপন্তীর সাদা ফুল পছন্দ। দেখি একটাও সাদা ফুল নাই। কয়েকটা রজনীগন্ধার স্টিক আর একটা গোলাপ নিয়েই দৌড়ে উঠলাম বাসে। বাসে ঝুলে ঝুলে গিয়েও ফুল কয়েকটা বাঁচিয়ে রাখলাম মানুষের ভীড়ভাট্টা থেকে।‌ রুপন্তীর জন্য কেনা ফুল, এমনি এমনি তো নষ্ট হতে দিতে পারি না।
বাসার কাছাকাছি পৌঁছেই জ্যাম। বাস থেকে নেমে হাঁটা শুরু করেছি। পনেরো বিশ মিনিট হেঁটেই বাসা। এর আগে গলির মোড়ের সুপার শপটায় ঢুকবো। রুপন্তীর জন্য এক বক্স চকলেট নিবো।‌ ফোনে হোয়াটসঅ্যাপ ম্যাসেজের নোটিফিকেশন বাজলো।‌ হাতে নিয়ে দেখলাম রুপন্তীর ম্যাসেজ। ‘এতো দেরি করছো কেন?’ আমি রিপ্লাই দিলাম, ‘দেরি হবে। ঘন্টাখানেক লেগে যেতে পারে।’ রিপ্লাই সেন্ড করতেই রুপন্তী অ্যাংরি ইমোজি দিলো। আমি দেখে হাসছি, এর মধ্যেই সুমন্তর ফোন। ফোনটা কানে ধরলাম। সুমন্ত বললো, ‘ভাই, আর্টিকেলটা লিখে আপনার মেইলে সেন্ড করেছি। একটু দেখেন।’
‘আচ্ছা, দেখতেসি।’
‘ইন্টারেস্টিং আর্টিকেল ভাই। আপনি তো না পড়েই চলে গেলেন। গত দশ বছরে বাংলাদেশে যতোগুলো অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, তার বেশিরভাগই হয়েছে বাথরুমে। এমন না যে সব ভিক্টিম বাথরুমে পড়েই মারা গেছেন‌। অনেক ক্ষেত্রে ভিক্টিমের বাথরুমে পড়ে যাওয়া বা আঘাত পাওয়ার কোনো চিহ্ন নাই। সে জাস্ট মরে গেছে।’
‘বুঝলাম। সুমন্ত, আমি দেখে তোমাকে জানাই।’
‘ঠিক আছে ভাই। ব্যাপারটা আমার কাছেও অদ্ভুত লাগসে, জানেন। এরকম ঘটনা নাকি বাড়তেসে আস্তে আস্তে। রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২০ এ এরকম ভিক্টিম পাওয়া গেছে ২,৭২৩ জন, করোনার পর এভাবেই মৃত্যু সর্বাধিক। সেসময়টা মানুষজন ঘরে ছিলো, ঘর থেকে তেমন বের হয় নাই, মানা যায়। বাইরে দুর্ঘটনার চেয়ে ঘরেই দুর্ঘটনা ঘটসে বেশি, প্লাস কোভিডে আক্রান্ত হয়ে অনেকে দূর্বল ছিলো, বাথরুমে পড়ে মারা গেছেন। কিন্তু ২০২২ এ তো দেশে করোনা ছিলো না, লকডাউনও উঠে গেছিলো। সেসময়ই এইরকম মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৫,৭৩২ জন। গত বছর হয়েছে ৬,৯৪৫ জন। এই বছর এখনো কাউন্টিং।’
‘আচ্ছা। তোমার তো খুব ইন্টারেস্ট মনে হচ্ছে ব্যাপারটায়?’
‘ইন্টারেস্ট আছে ভাই। আমার ইন্টারেস্ট আছে। কেন আছে, বলতেসি। গত বছর আমার বড় খালাতো বোন বাথরুমে পড়ে মারা যান। আপু প্রেগন্যান্ট ছিলেন ছ’মাসের। সবাই বলতো আপু দুর্বল ছিলেন হয়তো, তাই হয়তো মাথা ঘুরে পড়ে গেছিলেন। আমি দুদিন আগেই আপুর সাথে দেখা করে এসেছিলাম। আপুর মধ্যে দূর্বলতার কোনো চিহ্ন দেখি নাই।‌ শি ওয়াজ হেলদি অ্যাজ অলওয়েজ। আরো ব্যাপার আছে ভাই, ‘ সুমন্তর কণ্ঠ কাঁপছে উত্তেজনায়, ‘ভাই, আপার শরীরে আঘাতের কোনো চিহ্ন ছিলো না। যখন বাথরুমের দরজা ভাঙা হলো, দেখা গেলো সে জাস্ট বসে আছে মেঝেতে। তার মুখে ভয়ের চিহ্ন। কোনো কিছু দেখে প্রচন্ড ভয় পেয়েছে সে।’
আমি বললাম, ‘সুমন্ত, তোমার ইন্টারেস্টের ব্যাপারটা বুঝতে পারছি। আমি তো এখন একটু ব্যস্ত। আর্টিকেলটা দেখে এখনই কারেকশন দিয়ে দিচ্ছি। আর কালকে তোমার আপুর ব্যাপারটা নিয়ে ডিটেইলস আলাপ‌ করবো।’
‘ও আচ্ছা, স্যরি ভাই। আপনাকে বিরক্ত করলাম।’
‘আরে না, ইটস ওকে।’
চকলেট কিনে বাড়ি চলে গেলাম। কলিংবেল চাপলাম। বেশ কিছুক্ষণ ধরে কলিংবেল চাপছি, কেউ দরজা খুলছে না।
আমার কেমন একটু ভয় ভয় লাগলো। আমি ফোন বের করে রুপন্তীকে ফোন দিলাম।‌ বাড়ির ভেতর থেকে ফোন বাজার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। কেউ ফোন উঠাচ্ছে না।
আমার তখন প্রচন্ড আতংক। দরজায় বাড়ি দিচ্ছি, কলিংবেল বাজাচ্ছি, ফোন দিচ্ছি। কিছুতেই কিছু হচ্ছে না।‌ কোথায় রুপন্তী? কি হয়েছে ওর?
পুলিশে ফোন করবো। ৯৯৯ এ কল দিয়েছি, এসময়ই দরজা খুললো। রুপন্তী দাঁড়িয়ে। মুখে দুষ্টু হাসি।
আমি বললাম, ‘এমন করলে কেন তুমি?’
‘আরে, তুমি ফাজলামো করতে পারো, আর আমি পারি না? বললে তো ঘন্টাখানেক লাগবে আসতে। তাই ঠিক করেছিলাম, ঘন্টাখানেক পরেই দরজা খুলবো। কিন্তু তোমার এতো বাড়াবাড়িতে আর পারলাম না।’
আমি রুপন্তীকে জড়িয়ে ধরলাম। ও বললো, ‘ছাড়ো, আজব, সবাই দেখে ফেলবে।’ লজ্জায় লাল হয়ে গেছে ও।
ঘরে ঢুকতেই রুপন্তী বললো, ‘তোমাকে স্যরি বলার আছে আমার।’
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘স্যরি? তুমি বলবে স্যরি? আজকে চাঁদ কি পশ্চিম দিক দিয়ে উঠছে?’
‘ফাজলামি করো না তো। শুনো, বলছি। আজকে দুপুরে একা ছিলাম তো বাসায়, সেসময় বাথরুমে গেছিলাম একবার। সেসময়ও মনে হয়েছিলো কেউ দরজা ধরে ধাকাচ্ছে। আমার মনে হয় বাতাসের কাজ এটা। তাই এরকম মাঝে মাঝে মনে হয়। তোমাকে সকালে এইসব নিয়ে একটু বকা দিয়েছিলাম। তাই স্যরি।’
আমি বললাম, ‘আমারও একটু স্যরি বলার আছে।’
রুপন্তীও অবাক হয়ে বললো, ‘আজব তো। কেন?’
‘আসলে সকালে আমি নিজেই তোমার বাথরুমের দরজা ধাক্কাচ্ছিলাম। তোমাকে রাগাতে খুব ইচ্ছে করছিলো, রাগলে তোমাকে দেখতে অনেক সুন্দর লাগে তো, তাই।’
রুপন্তী আমার বুকে একটা কিল মেরে বললো, ‘তুমি একটা শয়তান, একটা বান্দর, একটা ইয়ে।’
রুপন্তীকে কাছে টানতে চাইলাম। ও বললো, ‘না, আগে শাওয়ার সেরে আসো। ঘামের গন্ধে টেকা যাচ্ছে না।’
বাথরুমে এসে শাওয়ার ছেড়ে দিলাম। শীতল পানির স্রোতে গা জুড়িয়ে যাচ্ছে। চোখ বন্ধ করে মুখে সাবান মাখলাম, মাথায় শ্যাম্পু দিলাম। ঝর্ণার নব খুঁজতে খুঁজতেই একটা ব্যাপার মাথায় এলো। মানুষের মন খুবই অদ্ভুত, এটা যারা বলেন, আসলেই মিথ্যা বলেন না। মানুষের মনে অদ্ভুত অদ্ভুত সময়ে অদ্ভুত অদ্ভুত কথা উদয় হয়। দাদার যেদিন কুলখানি ছিলো, সেদিন আমার মাথায় একটা ছড়া বাজছিলো। ‘তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে, সব গাছ ছাড়িয়ে, উঁকি মারে আকাশে।’
সবাই যেখানে কান্নাকাটি করছেন, দোয়াদরূদ পড়ছেন, তখন এই ছড়াটা কেন আমার মাথায় বাজছিলো কেবল, আমি জানি না। কিছুতেই ছড়াটা মাথা থেকে বাদ দিতে পারছিলাম না‌।
আজকেও, এই শাওয়ারের ঠান্ডা পানির স্রোতের নিচে দাঁড়িয়ে, মাথায় মুখে সাবান মাখামাখি হয়ে শাওয়ারের নব খুঁজতে খুঁজতে আমার একটা কথা মাথায় এলো। আমার সন্ধ্যার সেই আর্টিকেলের কথা। সুমন্তর লেখাটা আমি তখনই পড়ে ওকে ‘ঠিক হয়েছে’ জানিয়ে দিয়েছিলাম। আর্টিকেলটা ইন্টারেস্টিং, সন্দেহ নেই। বাথরুমে কেন পড়ে মারা যাচ্ছে মানুষ, তার কুল কিনারা হচ্ছে না। আর্টিকেলে যে পরিসংখ্যান দেয়া হয়েছে, তা ডকুমেন্টেড রিপোর্ট অনুসারে। এর বাইরেও যে কতো ঘটনা ঘটছে, আমরা তো জানি না। কেন হচ্ছে এমন?
আমার ছোট বেলায় দাদি একটা কথা বলতেন। মানুষ সবচেয়ে দুর্বল থাকে বাথরুমে থাকা অবস্থায়। কারণ সে সময়টায় সে থাকে একা। তার সাহায্য করার মতো কেউ থাকে না। এজন্যই আমাদের ধর্মে টয়লেটে ঢোকার আগে দোয়া পড়ে যাওয়ার জন্য বলা হয়। কারণ টয়লেটে খারাপ কিছু থাকতে পারে। আধুনিক বাড়ির ডিজাইনে বাথরুম আর টয়লেট তো আলাদা করা হয় না। বাথরুমেও একই অবস্থা, এখানেও মানুষ সম্পূর্ণ একা থাকে। একা একজন মানুষ, ছোট্ট একটা ঘর। যেখানে তাকে সাহায্য করার জন্য কেউ থাকে না। যেকোন কিছু হতে পারে তার সাথে সেখানে।
কথায় কথা টানে। আমার মাথাতেও তেমনি এক কথার সাথে চেইন রিয়্যাকশনে যেন অনেক কথা উঠে এলো। ছোটবেলায় আমি একা বাথরুমে যেতে ভয় পেতাম। আমার মনে হতো, বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করলেই আমি একা হয়ে যাবো, তখন কেউ একজন উঁকি দিবে ভেন্টিলেটরের কার্নিশ দিয়ে। আমি জানি, শুধু আমি নই, অনেক বাচ্চারই এমন ভয় হয়। কেন হয়? সব বাচ্চা এমন কমন একটা ভয় কেন পায়? সত্যি কি কিছু টের পায় তারা?
আমাদের বিয়ের পর এই বাড়িতে আসার পর থেকেই আমি আর রুপন্তী অনেক কিছু ফেস করেছি। সবই বাথরুমকে নিয়ে। আমরা দুজনেই তো থাকি বাসায়, আর কেউ থাকে না। বাথরুমে ঢুকলেই দরজা ধাক্কানো হয় মাঝে মাঝে। রুপন্তী যদিও বলেছে বাতাস, কিন্তু বাতাস নাড়ালে কি এতো জোরে শব্দ হয় দরজায়? তারপরও আছে। একবার আমি বাথরুমে ছিলাম। কারেন্ট চলে গিয়েছিলো। আমার মনে হয়েছিলো, আমি কারো নিঃশ্বাস নেবার শব্দ পেয়েছিলাম। রুপন্তী একবার আমাকে বলেছিলো, সে যখন বাসায় একা ছিলো, এক দুপুরবেলা, তখন তার মনে হয়েছিলো, বাথরুমের দরজা ভেতর থেকে কেউ ধাক্কা দিচ্ছে। একবার রাতে ঘুমের ঘোরে আমাদের বেডরুমের অ্যাটাচড বাথরুমের দরজাতেও আমি এরকম ধাক্কানোর শব্দ পেয়েছিলাম।‌ ঘুমের ঘোরে চোখ মেলেছিলাম আমি। দেখেছিলাম দরজার ফাঁক দিয়ে কে যেন তাকিয়ে আছে, একটা মানুষ বা মানুষের মতো কেউ, তার চোখদুটো লাল…
আমার কেমন যেন দম বন্ধ লাগছে। শাওয়ারের নব খুঁজে পাচ্ছি না। দেওয়ালের এখানে ওখানে হাতড়াচ্ছি, তবুও খুঁজে পাচ্ছি না। আমার ভয় লাগছে, ভীষণ ভয়। আমার মনে হচ্ছে, বাথরুমের এই ছোট্ট নীল দম বন্ধ পরিবেশে আমি একা নই। আরো একজন আছে। কেউ একজন আছে আমার সাথে।
আমি কোনোরকমে সাবানের ফেনার মধ্যেই চোখটা একটু খুলে নব খুঁজতে লাগলাম। আমার হাতের পাশেই নব। অথচ আমি খুঁজে পাচ্ছিলাম না। চোখ আবার বন্ধ করে নব ঘুরিয়ে শাওয়ার ছেড়ে দিলাম। শাওয়ারের শীতল ধারায় আমার সাবান ভেসে যাচ্ছে। চোখ জ্বলছিলো, পানিতে সেটাও ধুয়ে নিলাম। মোটামুটি সাবানের ফেনা চলে যাওয়ার পর চোখ মেলে তাকালাম। এখন আমার আর ভয় লাগবে না। আমার সাথে যে কেউ আছে, সেই অনুভূতিটা আর থাকবে না।
অথচ চোখ মেলেই আমি ভয়ে জমে গেলাম। আমার চোখ বাথরুমের মেঝেতে স্থির হয়ে রইলো।
বাথরুমের মেঝেতে রুপন্তী পড়ে আছে। তার চোখদুটো সম্পূর্ণ খোলা। প্রচন্ড আতংক আর ভয়ের ছাপ সেই চোখদুটোতে।
******
গল্প শেষ করে সুমন্ত ভাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বুঝলা সোয়েব, এর বাইরে রিতম ভাইয়ের কাছ থেকে আর কোনো কিছুই জানতে পারি নাই। এর পর আর তিনি কিছুই বলেন না। খালি হাসেন। পাগলের মতো হাসেন।‌ তাকে সিডাটিভ দিয়ে রাখতে হয়।’
সুমন্ত ভাই আমার মামাতো ভাইয়ের বন্ধু, আমি অদ্ভুতুড়ে গল্প শুনতে পছন্দ করি জেনে এই গল্পটা তিনি বলেছিলেন আমাকে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভাই, রুপন্তী ভাবি কিভাবে মারা গিয়েছিলো, এটা কি জানা গেছে?’
‘হ্যাঁ। স্ট্রোক করসিলো, বাথরুমে থাকা অবস্থাতেই স্ট্রোক করে বাথরুমের ফ্লোরে পড়েছিলেন।‌ সবার ব্যাখ্যা হচ্ছে, ভাবির লাশ দেখে সহ্য করতে পারেন নাই রিতম ভাই, তাই তার মাথা খারাপ হয়ে যায়। এর পিছনে যুক্তিও আছে। সে যে সন্ধ্যায় ভাবির ম্যাসেজ পাবার কথা বলেছিলো, যেখানে ভাবি লিখেছিলেন যে এতো দেরি হচ্ছে কেন, এই ম্যাসেজ তার মোবাইলে পাওয়া যায় নাই। তার মানে সন্ধ্যার পর ভাবির সাথে দেখা হবার যেসব ব্যাপার ঘটেছে, সবই তার মনের কল্পনা। এটাই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাপার।’
আমি বললাম, ‘কিন্তু কোনো একটা ব্যাপার আছে, তাই না ভাই? এজন্যই আপনি এই থিওরিকে সাপোর্ট করছেন‌ না।’
সুমন্ত ভাই মাথা ঝুঁকিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ। ভাবি যদি দুপুরেই মারা গিয়ে থাকেন, তাহলে সন্ধ্যায় দরজা খুললো কে? রিতম ভাই নিজে খোলেননি, তার জামা বা প্যান্টের পকেটে কোনো চাবি পাওয়া যায়নি। দরজা ভাঙারও কোনো চিহ্ন নেই। ভাবি যখন দুপুরে বাথরুমে ঢুকেছেন, তখন নিশ্চয়ই বাথরুমের দরজা ভেতর থেকে লাগিয়েই বাথরুমে ঢুকেছিলেন, মেয়েরা একা বাসায় থাকলেও বাথরুমের দরজা না‌ লাগালে স্বস্তি পায় না। অথচ রিতম ভাইকে কিন্তু ভাবির বাথরুমের দরজাও ভাঙতে হয়নি। ভাবি যদি বাথরুমের ভেতর মরেই পড়ে থাকেন, আর তিনি যদি একাই থাকেন বাথরুমে, তাহলে বাথরুমের দরজা খুললো কে?’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার থিওরি কি তবে?’
সুমন্ত ভাই উদাস চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘আমার কোনো থিওরি নাই। জগতে এমন অনেক কিছুই হয়, যার রহস্য আমরা ভেদ করতে পারি না। মানুষ মহাকাশে দু একটা স্যাটেলাইট পাঠিয়ে আর সাগরতলে দুই একটা সাবমেরিন পাঠিয়েই ভাবে যে সে সম্পূর্ণ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড দখল করে ফেলেছে। কিন্তু আসলে তা না। আমাদের এই পরিচিত জগতের বাইরেও আরেকটা জগত আছে, যার সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না।‌ সেই জগতের কাছে আমরা অসহায়। ভয়ংকর অসহায়।

Be the first to write a review

Leave a Reply

We’re sorry you’ve had a bad experience. Before you post your review, feel free to contact us, so we can help resolve your issue.

Post Review

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক গল্প