অকাল ১ম পর্ব

রাস্তার উপর যে মেয়েটার লাশ পড়েছিলো, আমরা কেউ খেয়াল করিনি। ড্রাইভারই প্রথম লাশটা দেখতে পেয়ে হার্ডব্রেক করে। আমরা চমকে যাই। মাইক্রোবাসে করে গ্রামের পথে যাওয়ার সময় রাতের বেলা এক লাশের সামনে পড়া যে কি পরিমান ভয়ানক দৃশ্য হতে পারে, না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না।
হেডলাইটের আলোয় আমরা লাশটা দেখি। তরুণী এক মেয়ের লাশ। চোখ দুটো খোলা, মার্বেলের মতো চকচক করছে। সারা শরীর ফ্যাকাশে হয়ে আছে। মেয়েটার মুখে আতঙ্কের ছাপ।
এমন ভয়ানক দৃশ্য দেখে আমরা ভুলে যাই, কি আনন্দেরই এক দিন কাটিয়েছিলাম আমরা আজকে!
আজ ছিলো শায়লা আপুর বৌভাত। শায়লা আপু, আমার মামাতো বোন।
আজ থেকে তিন মাস আগে, আপু হঠাৎ একদিন বাসায় জানায়, সে বিয়ে করবে। সে একজনকে পছন্দ করে।
মামা তো রেগে আগুন। কি বেহায়া মেয়ে, লাজ-লজ্জা কিচ্ছু নেই। নিজের মুখে বিয়ের কথা বলে। তিনি বেঁচে থাকতে কিছুতেই এই বিয়ে হতে দেবেন না।
অতঃপর, মামা বেঁচে থাকলেন। শায়লা আপুরও বিয়ে হয়ে গেলো।
আপুর যার সাথে বিয়ে হয়, মানে আমাদের দুলাভাই, তার নাম রাতুল। খুবই চমৎকার একজন মানুষ। মামা বাদে আমাদের পরিবারকে তিনি সহজেই পটিয়ে ফেলেন। তার কথাও বেশ সুন্দর, যেকোনো সময়ই আসর জমিয়ে ফেলেন। আমরা সবাই তার ভক্ত হয়ে গেলাম।
বাকি রইলেন মামা।
একদিন রাতুল ভাই গেলেন মামার সামনে। গিয়েই আবেগঘন ডায়ালগ দেয়া শুরু করলেন। ‘আংকেল, আপনি আপনার মেয়েকে ভালোবাসেন, আমিও আপনার মেয়েকে ভালোবাসি। তবে আমার ভালোবাসা কিছুতেই আপনার ভালোবাসার সমান হবে না। আমি জানি, শায়লার জন্য আপনি যা করবেন, তা তার ভালোর জন্যই করবেন। তবে মনে রাখবেন, আপনার মেয়ের জন্য একটা জায়গা সবসময়ই আমার মনে থেকে যাবে।’
মামা পুরনো রোমান্টিক ছবির ভক্ত। এতো আবেগঘন সব সংলাপ শুনে তিনি কেঁদে ফেললেন। রাতুল ভাইকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘বাবা, তোমার সাথেই আমার মেয়ের বিয়ে দিবো।’
বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক হলো। রাতুল ভাইয়ের বাবা-মা একটা শর্ত দিলেন। বিয়ে ঢাকাতে হলেও বৌভাত হবে রাতুল ভাইদের গ্রামের বাড়িতে। তাদের গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জে, ঢাকা থেকে একটু দূরে। বেশ বড় জায়গা জুড়ে তাদের বাড়ি, তারা শরিক-আত্মীয়রা সব একসাথেই থাকেন। ঢাকা থেকে কনেপক্ষকে নিয়ে যাওয়ার সব ব্যবস্থা তারাই করবেন। মামা-মামী এই‌ শর্তে আপত্তি করলেন‌ না।
বিয়ে হলো। বৌভাতও হলো। বৌভাতের অনুষ্ঠান থেকে ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গিয়েছিলো। রাতে গ্রামের পথ ধরে ফিরছিলাম আমরা। আর সেসময়ই, আমাদের মাইক্রোবাসের সামনে সেই মেয়ের লাশটা পড়লো।
আমরা সবাই ভয় পেলাম। কেউ মাইক্রো থেকে নামতে চাচ্ছে না। শেষে রফিক ভাই, আমাদের কাজিনদের মধ্যে সবচেয়ে বড় যে, তিনি নামেন কি হয়েছে দেখার জন্য। সাথে ড্রাইভার।
আমাদের পিছে থাকা আরো দুটো মাইক্রো ততক্ষণে চলে এসেছে, যাতে বড়রা রয়েছেন। তারা পিছনে মাইক্রো থেকে চিৎকার করতে থাকেন, ‘কি ব্যাপার?’
রফিক ভাই আর ড্রাইভার ততক্ষণে ফিরে এসেছেন। তাদের মুখে আতঙ্কের ছাপ।
রফিক ভাই ভয় পাওয়া গলায় বলেন, ‘লাশটা নাই রে।’
আমরা অবাক হয়ে তাকাই। আসলেই, রাস্তায় কোনো লাশ নেই। আমাদের চোখের সামনে আস্ত লাশটা উধাও হয়ে গেছে।
আমরা সবাই ভয় পেলাম। প্রচন্ড ভয়।
ড্রাইভার তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে গাড়ি টান দেন। আমাদের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘দোয়া-দরুদ পড়েন সবাই। অবস্থা সুবিধার মনে হচ্ছে না।’
গ্রামের অন্ধকার রাস্তায় হেডলাইটের আলোতে আমাদের মাইক্রো চলতে থাকে। আশেপাশে ঘন গাছের সারি। হেডলাইটের আলোতে অন্ধকার কাটে না একদমই। গাছগুলো যেন ওঁত পেতে আছে আমাদের ওপর।
গাড়ির ভেতরে সবাই চুপচাপ। সেসময়ই আমার মনে পড়ে দুপুরবেলার কথা।
ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে দুপুরে আমরা রাতুল ভাইদের গ্রামের বাড়িতে পৌঁছাই, তিনটা মাইক্রোবাসে। তাদের বাড়ি বেশ বড়, মাঝখানে বড় উঠোন রেখে চারপাশ ঘিরে বাড়ি, সবগুলোতে তার বাবা-চাচারা থাকেন। আমরা যখন তাদের বাড়িতে পৌঁছালাম, দেখলাম, পুরো বাড়ি জুড়ে কেমন গম্ভীর এক ভাব। এখানে যে আজ এক বৌভাতের অনুষ্ঠান হবে দেখে মনেই হচ্ছে না।
আমরা একটু অবাক হই। রাতুল ভাইয়ের চাচা এসে বলেন, ‘আসলে, একটু তাড়াহুড়া করে আয়োজন তো, সবকিছু গুছিয়ে উঠতে পারি নাই। কিছু মনে করবেন না বেয়াইন সাব।’
আমরা কিছু মনে করি না। শুধু মনে একটা খটকা থাকে।
অনুষ্ঠান কেন যেন তাড়াহুড়ো করে শেষ হয়। সবাই যেন আমাদের তাড়াতে পারলেই বাঁচে।
অনুষ্ঠান শেষে, আমাদের ফেরার সময়, হঠাৎই এক মহিলা লাফ দিয়ে পড়লেন রাতুল ভাইয়ের ওপর। চিৎকার করে বললেন, ‘শয়তান, আর কতো মেয়ের জীবন নষ্ট করবি?’
আশেপাশের সবাই হৈহৈ করে মহিলাকে সরিয়ে দেন। রাতুল ভাইয়ের চাচা বিব্রত মুখে বলেন, ‘আমাদের এক আত্মীয়া। মাথায় একটু সমস্যা আছে।’
আমরা তখন সবই মেনে নিয়েছিলাম। এখন আমি তাকাই রাতুল ভাইয়ের দিকে। রাতুল ভাই আর শায়লা আপু আমাদের মাইক্রোতেই ছিলেন। রাতুল ভাইয়ের মুখটা ফ্যাকাশে। আমাদের মধ্যে লাশটা দেখে সবচেয়ে বেশি ভয় পেয়েছেন তিনি।
এই সময়ের মধ্যে আমরা অনেকদূর চলে আসছি। দূরে শহরের বাতিগুলো দেখা যাচ্ছে। অন্য দুটো মাইক্রো রয়েছে আমাদের পাশেপাশেই। এরমধ্যে আর তেমন কিছু হয়নি।
আরেকটু এগোলেই শহর। আমাদের ভয় কমে যায় একদম।
আমাদের মধ্যে জনি ভাই গপ মারতে ওস্তাদ, নিজেকে সবসময় সাহসী হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করেন তিনি। অথচ ঐ মেয়ের লাশ দেখার ঘটনায় তিনি ভয়ে চুপসে ছিলেন। এবার সবাই তাকে নিয়ে পড়লো। রফিক ভাই বললেন, ‘ভাই, তোর চেহারাটা দেখেছিলি? প্যান্টে পেশাব করা বাকি রাখছিলি শুধু। নাকি তাও করে দিছিস?’
সবাই হেসে উঠলো একসাথে। রাতুল ভাই মুচকি হাসলেন, তবে শায়লা আপু হাসতে লাগলো ‘হি হি’ করে।
সবাই যখন জনি ভাইকে নিয়ে ব্যস্ত, এসময়ই ড্রাইভার তাকালো আমার দিকে। তার চোখে ভয়। আমি তার পাশের সিটেই বসেছি।
সে ভয় পাওয়া গলায় বললো, ‘স্যার, দেখেছেন?’
আমি মাথা নাড়লাম। দেখেছি।
আমাদের সামনের একটা গাছের নিচে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। আমরা একটু আগেই ক্রস করেছি তাকে।
এই মেয়েটার লাশই আমরা রাস্তার ওপর পড়ে থাকতে দেখেছিলাম।
ড্রাইভার ফিসফিস করে বললো, ‘কাউকে কিছু জানানোর দরকার নাই স্যার। আরেকটু গেলেই শহর। এরপর আর কোনো ভয় নাই।’
আমাদের পিছনের সিটে, শায়লা আপু তখনো ‘হি হি’ করে হাসছে। তার হাসি থামছেই না। রাতুল ভাই আপুকে ধরে জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমার কি হয়েছে শায়লা?’ আপু কিছু বলেন না। কেবল হাসতে থাকেন।
এরমধ্যেই গাড়ি থেমে গেল হঠাৎ করে।
গাড়ির হেডলাইট বন্ধ হয়ে গেল। আর একরাশ অন্ধকার যেন গিলে ফেললো আমাদের।
আপুর হাসি তখন মাত্রা ছাড়িয়েছে। পাগলের মতো হাসতে শুরু করে দিয়েছে সে।
এসময়ই, বাইরে থেকে কে যেন টোকা দিলো মাইক্রোবাসের জানলায়। প্রথমে একটা, তারপর দুটো, তার পর অনেকগুলো। চারপাশ থেকে। অন্ধকারে আমরা কিছুই দেখতে পারছি না বাইরের, কেবল টোকার শব্দ শুনছি।
আপু হাসছে, পাগলের মতো হাসছে। রাতুল ভাই ভয় পাওয়া গলায় আপুকে জিজ্ঞেস করলো, ‘শায়লা, এমন করছো কেন?’
শায়লা আপু হাসি থামিয়ে রাতুল ভাইয়ের দিকে তাকালো। ফিসফিস করে বললো, ‘রাতুল, আমি মিতু।’ তার চোখ দুটো টকটকে লাল।
রাতুল ভাই ছিটকে উঠলেন ভয়ে।
ড্রাইভার ততক্ষণে আমার দিকে তাকিয়েছে। ভয়ে, আতঙ্কে তার চোখে পানি চলে এসেছে। সে কাঁদো কাঁদো স্বরে বললো, ‘স্যার, আমাদের পাশের দুটা মাইক্রোকে দেখতে পারছি না। সামনে শহরের আলোও নাই। আমরা পথ হারায় ফেলেছি স্যার। এখন কি হবে?’
আমি সামনে তাকাই। সামনে ভীষণ অন্ধকার।
জানলায় বাড়ির শব্দও তখন বেড়ে গেছে প্রচন্ড রকমে।

Be the first to write a review

2 Responses

Leave a Reply

We’re sorry you’ve had a bad experience. Before you post your review, feel free to contact us, so we can help resolve your issue.

Post Review

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক গল্প