সন্ধ্যা ৭টা। ঢাকা শহরের গলি ঘেঁষে ছোট এক বাসায় মিলল এক তরুণীর লাশ। বয়স মাত্র ২৪। নাম — সায়রা রহমান।
তার ঘরে কোনো অগোছালো জিনিস নেই, দরজা ছিল ভেতর থেকে বন্ধ, জানালায় গ্রিল, চাবিও ভেতরে। অথচ, মেয়েটি মারা গেছে বিষক্রিয়ায়।
পুলিশ বলল, “আত্মহত্যা।”
কিন্তু তার মায়ের কান্নাভেজা গলায় ছিল শুধু একটাই কথা —
“আমার মেয়ে নিজেকে মারতে পারে না!”
এই মামলায় নিযুক্ত হলো একজন অদ্ভুত গোয়েন্দা —
নাম রোহান হালদার।
অবিবাহিত, নিঃসঙ্গ, কিন্তু অসম্ভব পর্যবেক্ষণশক্তি আর বিশ্লেষণ ক্ষমতা সম্পন্ন।
রোহান প্রথমেই খেয়াল করল — মেয়েটির বিছানার পাশের ডায়েরিতে কিছু লেখা ছিল, কিন্তু হঠাৎই লেখা থেমে গেছে। শেষ কথাটি ছিল:
> “তোমার সব কথা আমি মেনে নিয়েছি। কিন্তু এই একটুকু…”
এবং ঠিক পাশেই একটা খাম — ভেতরে একটি পুরনো ছবির টুকরো। তাতে অর্ধেক মুখ – অচেনা এক পুরুষের। কে সে?
রোহান বুঝতে পারল, এই মৃত্যু “দেখতে” আত্মহত্যা, কিন্তু ভেতরে বিপুল অন্ধকার লুকিয়ে আছে।
সে মেয়েটির ফোন রিকভারি করল।
শেষ কল — বিকেল ৩:১২ মিনিটে। একজন নাম্বার — “অজ্ঞাত”।
আর ভয়েস রেকর্ডারে এক অদ্ভুত শব্দ —
> “তোমার সময় ফুরিয়ে এসেছে…”
রোহানের মনে এক প্রশ্ন —
কী সেই সময়?
কে ফোন করেছিল?
আর সায়রা কী বলতে চেয়েছিল শেষ লেখায়?
গল্পের শেষ পৃষ্ঠায় লেখা ছিল একটিই লাইন:
> “এই চিঠি যদি কেউ খুঁজে পায়… ওকে থামাও… ও আরও মেয়েদের খুঁজছে…”
গোয়েন্দা রোহান হালদার সায়রার মৃত্যুর রহস্য খুঁজতে গিয়ে বারবার সেই একটা অর্ধেক ছবি আর শেষ চিঠির টুকরোর কথাই ভাবছিল।
ছবির অর্ধেক মুখটিতে ছিল হালকা দাঁড়ি আর কপালে এক ছোট্ট দাগ।
আর সেই ডায়েরির শেষ লাইন —
> “তোমার সব কথা আমি মেনে নিয়েছি। কিন্তু এই একটুকু…”
রোহান সায়রার কলেজে গেল। ওখানে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে জানল —
সায়রা কিছুদিন ধরে এক ছেলেকে নিয়ে খুব টেনশনে ছিল। সে তার “পুরনো শিক্ষক” বলে পরিচয় দিত। কিন্তু মেয়েটি তার নাম কাউকে বলেনি।
এরপর সে গেল ফোন কোম্পানিতে — শেষ যেই “অজ্ঞাত” নাম্বার থেকে কল এসেছিল, তার লোকেশন ট্রেস করে বের হলো —
নরসিংদীর এক পরিত্যক্ত স্কুলবাড়ি!
রোহান সেখানেই রওনা দিল।
বিকেলের আলো মরে যাচ্ছে, ঝাপসা বাতাসে স্কুলবাড়ি আরও অদ্ভুত লাগছিল। দরজা বন্ধ, কিন্তু ভাঙা দেয়ালের ফাঁক দিয়ে সে ভেতরে ঢুকল।
হঠাৎ এক ঘরে গিয়ে দেখল — দেয়ালে লাল কালি দিয়ে লেখা:
> “তোমরা কিছুই জানো না। সায়রা ছিল শুধু শুরু…”
আর ঠিক নিচে রাখা ছিল আরও তিনটি মেয়ের ছবি —
একজনকে রোহান চিনল — সে গত বছর নিখোঁজ হওয়া স্কুলছাত্রী রুহি।
বাকি দুই জন অচেনা।
তার মাথার ভেতর কেবল একটাই শব্দ ঘুরপাক খাচ্ছে —
“এই কেসে শুধু বিষক্রিয়া নয়, এখানে চলছে কিছু সিরিয়াল…”
হঠাৎই পাশের ঘরে কিছু আওয়াজ।
রোহান ছুরি হাতে এগিয়ে গেল, পেছনে পড়ল তার টর্চের আলো —
আর সেখানে দাঁড়িয়ে এক লোক, যার মুখে হালকা দাঁড়ি, কপালে দাগ…
ছবির সেই অর্ধেক মুখ মিলল পুরোপুরি!
লোকটা হেসে বলল,
— “সবাই ভাবে, মেয়েগুলো আত্মহত্যা করেছে… অথচ আমি শুধু তাদের সত্যিটা দেখিয়েছি।”
রোহানের চোখে তখন শুধু সায়রার ডায়েরির লাইন ভাসছে…
> “ও আরও মেয়েদের খুঁজছে…”
নরসিংদীর সেই ভাঙা স্কুলঘরে দাঁড়িয়ে আছে রোহান… তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই লোকটি আস্তে আস্তে কাছে এগিয়ে আসছে।
চোখেমুখে অদ্ভুত শান্তি, যেন সে নিজের কোনো পাপ অনুভবই করছে না।
সে বলল,
— “তোমরা সবাই ভাবো আমি খুন করি। কিন্তু আমি শুধু ‘ভাঙা’ মেয়েদের মুক্তি দিই…”
রোহানের গলা শুকিয়ে আসে, তবু সে দৃঢ় গলায় জিজ্ঞেস করে,
— “সায়রাকে তুমি বিষ খাইয়ে মেরেছো, তাই না?”
লোকটা হাসল।
— “না। আমি শুধু ওকে ভয় দেখিয়েছিলাম। ও নিজেই খেয়ে ফেলেছিল, কারণ ও জানত ওর কথাগুলো কেউ বিশ্বাস করবে না…”
রোহানের বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
হঠাৎ লোকটা ছুরি বের করল।
রোহান সঙ্গে সঙ্গে পিছিয়ে গিয়ে কাঠের একটা মোটা খুঁটি তুলে নেয়। ঘরে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। কাঁচ ভাঙে, দরজা ধাক্কা খায়।
এক পর্যায়ে রোহান ছুরিটা কেড়ে নিয়ে লোকটাকে চেপে ধরল।
লোকটা তখনও ফিসফিস করে বলল—
— “আমি কাউকে খুন করিনি। তারা নিজেরাই মরেছিল… আমি শুধু ওদের অতীতটা সামনে এনেছিলাম…”
রোহান হঠাৎ থমকে গেল।
— “কোন অতীত?”
লোকটা বলল,
— “ওরা সবাই সেই পুরোনো মামলার সাক্ষী ছিল… একটা হোস্টেলে ঘটে যাওয়া মেয়েদের নির্যাতনের, যেখানে আমি শিক্ষক ছিলাম… কিন্তু আমি বরখাস্ত হয়ে গিয়েছিলাম, শুধু অভিযোগেই। কোনো বিচার হয়নি। তারপর একে একে খুঁজে বের করলাম সেই মেয়েদের যারা আমার বিরুদ্ধে বলেছিল…”
রোহানের হাতে ছুরি, চোখে পানি।
সে বুঝল, এই লোকটা শুধুই এক খুনি নয় — এক ভেঙে পড়া অতীতের অভিশাপ, যে নিজেকে ন্যায়বিচার ভাবতে ভাবতে দানব হয়ে উঠেছে।
পুলিশ আসে।
লোকটাকে গ্রেফতার করা হয়।
রোহান সায়রার মায়ের হাতে ডায়েরিটা ফেরত দেয় —
আর সেই ডায়েরির শেষ পাতায় সায়রার নিজের হাতে লেখা এক চিঠি ছিল:
> “আমি জানি, ও আমাকে ছাড়বে না।
কিন্তু যদি আমার চিঠি কেউ পায় —
তাহলে শুধু এটুকু বলো আমার মাকে —
আমি সাহস হারাইনি। আমি লড়েছি…
শেষ পর্যন্ত।”
সায়রার মা সেই চিঠি পড়ে হাউমাউ করে কাঁদলেন।
আর রোহান? সে আকাশের দিকে তাকিয়ে শুধু বলল —
“তুমি হেরে যাওনি, সায়রা। তুমি শেষ চিঠিতে সত্য লিখে গিয়েছিলে।”