বাংলাদেশের উত্তরে ছোট্ট একটি গ্রাম, মাটিডাঙ্গা। সারা বিশ্বে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে, যে ছোঁয়ার বাদ যায়নি বাংলার কোনো গ্রাম। কিন্তু মাটিডাঙ্গা গ্রামে এখনো পুরানো কাঠের বাড়ি, উঠানে শীতের রোদ, আর ঝিঝি পোকার ডাক টিকে আছে। এই গ্রামের শেষ প্রান্তে একাকী বাস করেন একজন ষাট ছুঁইছুঁই বৃদ্ধ। তার স্ত্রী হালিমা বেগম গত বছর না ফেরার দেশে চলে গেছেন। তার দুই ছেলে এক মেয়ে। বড় ছেলে মামুন ঢাকায় ব্যাংকে চাকরি করে, পরিবার নিয়ে সে ঢাকায় থাকে। গ্রামে তেমন একটা আসে না। ছোট ছেলে মাসুদ বিদেশ থাকে। ওখানেই এক বাঙালি মেয়েকে বিয়ে করে সংসার করে। দেশে আসে না বহু বছর। আর এক মাত্র মেয়ে রুবি কুমিল্লায়, শ্বশুর বাড়ি থাকে। মাঝে মাঝে বাবাকে দেখতে গ্রামে আসে।
মোতালেব মিয়া স্ত্রী মারা যাওয়ার পর একাকীই বাস করেন। দিনে বেশির ভাগ সময় তিনি বারান্দায় বসে কাটান। আর রাত হলেই বসেন দক্ষিণের জানালার পাশে, আপন চাদর মুড়ি দিয়ে, হাতে কলম আর সাদা কাগজ নিয়ে। বেশির ভাগ সময় তিনি স্ত্রীকে চিঠি লিখে কাটিয়ে দেন। সারাদিন কী করলেন না করলেন সব লিখেন চিঠিতে।
********
জ্যৈষ্ঠ মাসের ভ্যাপসা গরম। যদিও সন্ধ্যা দিকে একটু বৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু মনে হচ্ছে বৃষ্টিটা গরমের তাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। দক্ষিণের জানালা দিয়ে হালকা বাতাস বয়ে আসছে। মোতালেব মিয়া ঘরের লাইটটা জ্বালিয়ে জানালের পাশের টেবিলটাতে গিয়ে বসলেন। একটা সাদা কাগজের পৃষ্ঠা আর হাতে খলম নিয়ে লেখা শুরু করলেন,
“প্রিয়তমা হালিমা,
আজ অনেকদিন পর কলম ধরলাম। গত কিছুদিন অসুস্থ ছিলাম যার ফলে আপনাকে লেখা হয়নি কিছু। লিখব কীভাবে? বিছানা থেকেই তো উঠতে পারিনি। জানি আমার এসব চিঠির কোনো গন্তব্য নেই। ডাকপিয়ন এসে পৌঁছে দিবে না। তবুও লিখি, শুধু নিজের বুকের ভারটা কিছুটা হালকা করার জন্য। আপনি তো জানেন, আমি এমনিই বেশি কিছু বলতাম না কখনো। মুখ গোমড়া থাকত বেশির ভাগ সময়। কিন্তু আপনি বুঝতেন, শব্দ ছাড়াও কত কথা বলা যায়।
আপনি চলে যাওয়ার পর এই বাড়ি, এই উঠানে, এমনকি তালগাছটার পাতার নড়াচড়াও যেন থেমে গেছে। অথচ মানুষ বলে সময় চলে যায়। কেবল আমার ঘড়িটার কাটা দাঁড়িয়ে গেছে সেই দুপুরেই, যেদিন আপনার নিঃশ্বাস পড়া থেমে গেল চিরতরে। আপনি কি জানেন, আপনার মৃত্যুর পর ছয় মাস পর্যন্ত আমি প্রতিবেলায় খাওয়ার প্লেটে দু’জনের জন্য ভাত পরিবেশন করতাম? আমি জানতাম আপনি খাবেন না, কিন্তু আপনাকে ছাড়া খেতে ইচ্ছে করত না। আজও প্রায় আমি বারান্দায় বসে থাকি রাত নামা অবধি, ঠিক যেমনটা আপনি বসে থাকতেন আমার ফেরার অপেক্ষায়। আপনি ছিলেন আমার অপক্ষোর মানুষ। আর এখন আমি হয়েছি আপনার জন্য অপেক্ষামান।
আপনি জানেন, এই মাটিডাঙ্গা এখন আর আগের মতো নেই। আগে সন্ধ্যা হলেই উঠানগুলোয় হারিকেন জ্বলত, এখন লোডশেডিং হলেও মোবাইলের আলোয় কিশোরেরা সিনেমা দেখে। আমাদের সেই বাঁশের বেড়ার ঘরটা এখন পাকা বানানোর কথা ভাবছে ছেলেরা কিন্তু আমি অনুমতি দিচ্ছি না। তারা তো জানে না কেন দিচ্ছি না। এই কুড়েঘরের প্রতিটা বাঁশের গায়ে আপনার হাতের ছোঁয়া আছে। এটা আমি কীভাবে ভাঙতি দিই বলেন আপনি? আপনার অনুপস্থিতি আজও পূর্ণ হয়েছে বলে মনে হয় না। প্রতিটা সকালে ঘুম ভাঙার পর কিছুক্ষণ বোঝা লাগে, কী যেন নেই… তারপর বুঝি আপনি নেই। পুকুরঘাটে আর কেউ দাঁড়িয়ে চুল বাঁধে না, উঠানে আর কেউ কথা শুকাতে দেয় না, সন্ধ্যা বেলায় কেউ এসে বলে না,
‘চা খাবেন?’
আর আমি? আমি শুধু বসে থাকি গোধূলি পর্যন্ত প্রতিদিন। আমি কীভাবে বেঁচে আছি জানেন? অপেক্ষায়। হয়তো একদিন আসবে, যেদিন এই চিঠিগুলো পৌঁছে যাবে আপনার কাছে। সেদিন আপনিও অপেক্ষা করে থাকবেন, তালগাছের নিচে দাঁড়িয়ে। হাত তুলে বলবেন,
‘আপনি্ এলেন?’
ইতি,
আপনার মোতালেব।”
এতটুকু্ লিখেই তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। পরনের চশমাটা খোলে রাখলেন টেবিলে। আর এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন বাইরে। আবারও বৃষ্টি শুরো হয়েছে। বৃষ্টির ছিটকে জানালা দিয়ে তার গায়ে এসে পড়ছে। মোতালেব মিয়া টেবিলে মাথা রাখলেন। তার বড্ড ক্লান্ত লাগছে।
*******
বিদেশ থেকে ছেলে ভিড়িও কল দিয়েছে। মোতালেব মিয়া কিছুক্ষণ ছেলে আর নাতির সাথে কথা বলে কাটিয়ে দিলেন। রাতে খাবারের পর তিনি আবারো খাতা আর কলম নিয়ে বসে লেখা শুরু করলেন,
“প্রিয়তমা,
আজ সারাটা দিন বারান্দায় বসে কাটিয়ে দিলাম। সকালে একটু বৃষ্টি হয়েছিল, তখন পুরানো সেই গন্ধটা এনেছিল বাতাসে। জানেন, আপনার চুলে বৃষ্টির জল পড়লে কী সুন্দর গন্ধ পেতাম! সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ল আজ। যখন মাঠ থেকে ফিরলেই বলতেন,
‘তাড়াতাড়ি পোশাক পালটে নেন, জ্বর হয়ে যাবে।’
আপনি বড্ড যত্ন করতেন। জানেন, আজ দুপুরে আমাদের মেয়ে রুবি ফোন করেছিল। ও বলল,
‘আব্বা, আসি না আপনার কাছে কিছুদিন?’
আমি বলিনি, কিন্তু ভেতরটা কেঁদে উঠল। বললাম,
‘তুই থাক জামাই সন্তান নিয়ে ভালোভাবে, আমার আর কী দরকার?’
কিন্তু আপনি জানেন, আপনি চলে যাওয়ার পর এই ঘরে আর কেউ আসে না। শুধু এই চিঠিগুলোর শব্দে কথা বলা হয় আমার। রুবি এখন শহরে থাকে, বড় ফ্ল্যাটে। ওর ছেলেটা, নবীন আমাকে চেনে না ঠিক মতো। সেইদিন ভিডিও কল করে বলল,
‘এই লোকটা কে?’ আমি শুধু হাসলাম। আমি যে শুধুই অচেনা মুখ হয়ে গেছি নিজের নাতির কাছে।
এক সময় আপনি বলেছিলেন,
‘গ্রামটা থাকুক আমাদের মতো, শান্ত, সহজ, মাটির মতো ঘ্রাণযুক্ত।’
আপনার সেই কথাগুলো আজ গ্রামের কেউ মনে রাখেনি। এখন সবাই ব্যস্ত। কেউ আর পুকুরঘাটে গল্প করে না, কেউ সন্ধ্যায় হারিকেন জ্বালিয়ে গীত গায় না। বাজারে গেলেই দেখি, মোবাইলের দোকান বেড়েছে, বইয়ের দোকান হারিয়ে গেছে। আর আপনি জানেন, হাসেনা চাচীর ছেলে মকবুল সে না কি ইউটিউবে কিছু করে। আমাকে ছবি তুলতে বলেছিল। বলল,
‘চাচা, আপনাকে ভাইরাল করে দেবো?’
আমি হেসে বললাম,
‘বাবা, আমি তো তোমার চাচা, কোনো ভাইরাল না।’
আপনি থাকলে হয়তো বলতেন,
‘ছেলেটা ভালোই বলছে, ছবিটা তুলে ফেলেন না কেন?’
তবে আমি জানি, আপনি জানতেন আমার ছবি তো কেবল আপনার চোখেই মানায়। আজ বিকেলে একটা জিনিস খেয়াল করলাম। আমার চোখে আর ঠিক ভাবে দেখি না। কিন্তু আমি যে এখনো সন্ধ্যা নামা অবধি পথের দিকে চেয়ে থাকি, যদি আপনি কখনো ফিরে আসেন সেই ছেলেবেলার মতো পায়ে হালকা শব্দ তুলে।
আমি জানি আপনি আর ফিরবেন না। তবু আমার বেঁচে থাকার মানে হয়ে দাঁড়িয়েছে আপনার জন্য বসে থাকা। একটা চিঠি, একফালি স্মৃতি আর অগোছালো বারান্দাটা।”
আপনার,
মোতালেব….”
হটাৎ তিনি লক্ষ করলেন, তার চোখে জল। আজ বহুদিন পর তিনি কাঁদছেন। তিনি উঠে বারান্দায় চলে গেলেন। আর নিশব্দে কাঁদতে লাগলেন মেঘে ঢাকা আকাশের দিকে তাকিয়ে।
******
জানালার পাশেই রাখা পুরানো দিনের সেই কাঠের আলমারি। মোতালেব মিয়া সেই আলমারির পাশে বসে খাতা কলম নিয়ে আবার লেখা শুরু করলেন তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে।
“প্রিয়তমা,
আজ সকালে আলমারি খুলতে গিয়ে আপনার ব্যবহৃত চিরুনি খুঁজে পেলাম। কাঠের তৈরি, হাতের ছাপ এখনো আছে যেন। কত বছর হয়ে গেল আপনি নিজের হাতে এই চিরুনি দিয়ে আমার চুল আছড়ে দিতেন! আমি বলতাম,
‘এটা মেয়েলি কাজ।’
কথাটা শোনে আপনি রাগ হতেন, আবার আদরও করতেন। আসলে ওইসব রাগের আড়ালেই তো ছিল আপনার ভালোবাসার গভীরতা।
আপনার কথা ভাবতেই আজ মনটা ভেসে গেল। সেই দুপুরগুলোর কথা মনে পড়ল, যখন আমরা নতুন বিয়ে করেছি। আপনাকে প্রথম ‘আপনি’ বলেছিলাম, মনে আছে? আপনি হেসে বলেছিলেন,
‘তুমি বললে ভালোবাসা কমে যাবে না কি?’
আমি মাথা নিচু করে বলেছিলাম,
‘আপনি বললে আমার ভয় কমে যায়।’
আজ এত বছর পরও এই আপনি সম্মোধনটা ছাড়তে পারিনি। আপনি বললে আমার বুকটা হালকা হয়ে যায়।
পুকুরের কোণায় সেই তালগাছের নিচে আজও আমি বসে থাকি, ঠিক যেভাবে আপনার সঙ্গে বসতাম। তালগাছটা সেই আগের মতোই আছে, শুধু এখন পাশের জায়গাটা খালি। বাতাস বইলে মনে হয় আপনি হাঁটছেন, শাড়ির আচঁলে শব্দ হয়। মাঝে মাঝে তো বুকের ভেতর এমন কাঁপুনি ধরে, মনে হয় হয়তো আপনি এসে বলবেন,
‘চলেন ঘরে যাই, সন্ধ্যা হয়ে এসেছে।’
কিন্তু সন্ধ্যা আসে, রাত নামে, আর আমি একা ফিরে আসি। জানেন, এই ঘরটায় এখন আর আগের গন্ধটা নেই। সেই রান্নার গন্ধ, সেই আলতা পরা পায়ের চলার শব্দ কিংবা আপনার কাশির পরিচিত ধ্বনি সবই ফিকে হয়ে গেছে। তবুও মাঝে মাঝে ভুল করে মনে হয় আপনি আছেন। আমি এখনও চায়ের কাপটা জোড়া করে রাখি সাথে আপনারটাও। আজ হঠাৎ করেই ভাবছিলাম আপনি যদি থাকতেন, রুবি আর তার ভাইদের দূরে চলে যাওয়া আপনাকে কষ্ট দিত কি না। আমি প্রতিদিনই মনে করি, সন্তানরা এখন ব্যস্ত সময় নেই তাদের। কিন্তু আপনি থাকলে হয়তো বলতেন,
‘ওদের সময় দেন। ভালোবসা ঠিকই ফিরে আসে।’
আপনি কি এখনও বিশ্বাস রাখেন ভালোবাসায়? আমি জানি আপনি চিরকাল অপেক্ষার মানে বোঝাতে জানতেন। আপনার মৃত্যুর কয়েকদিন আগেও আপনি বারন্দায় বসে বলেছিলেন,
‘আপনার জন্য চা রেখেছি, ঠান্ডা হয়ে গেলে আর ভালো লাগবে না।’
এখন আমি চা বানিয়ে রেখে দিই আপনার জন্য। যদিও জানি আপনি আর চুমুক দিবেন না। শুধূ বাতাসে সুগন্ধ রেখে যাবেন। আমি জানি আমার এই চিঠিগুলো কেউ পড়ে না, কেউ সাড়া দেয় না। তবুও আমি লিখে যাচ্ছি। এগুলো আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আপনার জন্য এই একা পৃথিবীতে আমি প্রতিদিন সকালকে সন্ধ্যায় এনে দিয়ে বলি, ‘আজও আপনি আসলেন না?’
আপনার মোতালেব।….”
লেখা শেষ করতেই তার গা কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এসে গেল। সন্ধ্যায় মসজিদ থেকে ফেরার পথে বৃষ্টিতে ভিজতে হয়েছিল যার ফলে বোধহয় জ্বর এসেছে। মোতালেব মিয়া রাতের খাবার না খেয়েই শোয়ে পড়লেন বিছানায়। তারা সারা শরীর কাঁপছে।
*****
আজ নিয়মের ব্যতিক্রম করে বিকেল বেলায় চিঠি লিখতে বসে গেলেন মোতালেব মিয়া। উঠানের উত্তর পাশে জাম গাছটার ছায়ায় বসে লেখা শুরু করলেন আজকের দিনের চিঠি।
“প্রিয়তমা,
আজ ইদের দিন। সকালবেলা উঠেই অজান্তে বলে ফেলছিলাম, ‘আপনি সেমাই দিবেন না?’ তারপরই থেমে গেলাম। মনে পড়লো আপনি তো নেই। এই বাড়িতে আজ আর কারো হাসির শব্দ নেই। উঠানে আর আর কেউ পানিতে পা ভিজিয়ে চিলতে রোদে জামা শুকাতে দেয় না। গরুর গলায় ঘুঙুর নেই, গৃহস্থলির ব্যস্ততাও নেই। সব আছে, অথচ সব নেই। মনে পড়ে, এক সময় এই বাড়িতে প্রতিটা কোণ ইদের আগে সাফসুতরো করা হতো। আপনি নিজ হাতে কাঁঠালপাতা ধুয়ে পাটিসাপ্টা বানাতেন। ভোরের ঘুম ভাঙার আগে আপনি রান্নাঘরে ব্যস্ত থাকতেন। আমি বাইরে গিয়ে চায়ের পানি বসাতাম, আর চুপিচুপি আপনার বানানো সেই সেমাই চুরি করে খেতাম। আপনি বকা দিয়ে বলতেন,
‘নামাজে যাওয়ার আগে না খাবেন? এখন খাচ্ছেন কেন?’
তখন বুঝতাম না, আপনি শুধু খাবার নয় আমার শরীরটাও কেমন করে চিনতেন।
এই যে রুবির নতুন সাদা জামা আপনি পছন্দ করে কিনেছিলেন। তখন তো আর আমরাও খুব সামর্থ্যবান ছিলাম না। তবুও আপনি দামি সেই জামাটা এনেছিলেন। এখন রুবি নিজেই মা হয়ে গেছে, শহরে থাকে। তবুও প্রতি ইদে জানালার দিকে একবার তাকিয়ে ভাবি মেয়েটা হয়েতো একবার আসবে। কিন্তু আসে না!
আপনি থাকলে হয়তো বলতেন,
‘চলেন আজ আমরা দুজুনে সেমাই খাই। বাকিদের ফিরতে দেন।’
কিন্তু এখন শুধু আমি আর বাড়ির এই ছায়া।
আজ আমি দুপুরে একাই সেমাই বানিয়েছি। যেমনটা আপনি করতেন। যদিও স্বাদ আপনার মতো হয়নি। চোখে একটু ঝাপসা লেগে গিয়েছিল, দুধ বেশি পড়ে গিয়েছিল।
জানেন, আপনার ব্যবহৃত ইদের ওড়নাটা আজও আলমারিতে তুলে রাখা। মাঝে মাঝে খোলা হলে হালকা আতরের গন্ধ পাই। আপনার গন্ধ। জানেন, আপনার ঘ্রাণই তো আমাকে প্রতিদিন বুঝিয়ে দেয়, আপনি হারিয়ে যাননি, আপনি রয়ে গেছেন। শুধু দেখা দেন না আর।
আমি জানি এই চিঠির কোনো উত্তর নেই। তবু প্রতিটা শব্দ যেন আপনাকে ছুঁয়ে যায়। আমার অপেক্ষা শুধু আপনাকে ঘিরেই। আজকের ইদের শুভেচ্ছা নিন।
আপনার মোতালেব।….”
খাতা বন্ধ করে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন মেঘলা আকাশের দিকে। টুপটুপ করে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তার। বড় ছেলে দেশে থাকা সত্যেও বাবার সাথে এই ইদেও দেখা করত এল না। তার প্রতিটা সন্তান কেমন যেন হয়ে গেছে। তিনি আর নিতে পারছেন না। এখন কেবল এই দুনিয়া ছেড়ে গেলেই বাঁচেন। তার ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসল।
******
মোতালেব মিয়ার শরীর কয়েকদিন ধরে বেশ খারাপ। অল্প কিছুদন আগে ঢাকা থেকে বড় ডাক্তার দেখিয়ে এসেছেন। ছোট ছেলে অনেক বছর পর দেশে এসেছে বউ বাচ্চা নিয়ে। একটু আগেই ছেলের বউ চা রেখে গেছে টেবিলে, কিন্তু তার উঠে চায়ের কাপটা নিতে ইচ্ছে করছে না। শীত শীতও লাগছে হালকা। গায়ে চাদর মুড়ি দিয়ে বসলেন। বালিশের পাশে রাখা খাতাটা নিয়ে আবার লেখা শুরু করলেন,
“প্রিয়তমা,
আজ আর লিখতে ইচ্ছে করছিল না। হাত চলে না। মনে কাঁপ ধরে গেছে। তবুও লিখছি। কারণ, আমার তো আর কিছু করার নেই।
আপনি চলে যাওয়ার পর আমি প্রতিদিন এই জানালার পাশে বসে থেকেছি। যেদিন আপনি মারা যান, সেদিন দুপুরে ঝড় হয়েছিল। জামগাছটা তখন কী ভয়ানক ভাবে কাঁপছিল। আমি জানতাম না সেটা আমার জীবনের শেষ সবুজটুকু নেড়ে দিচ্ছে।
তারপর থেকে কেবল দিন কাটে। সকাল, দুপুর, বিকেল। আমি চিঠি লিখে গেছি। আপনি কখনো জবাব দেননি। তবু আমি বিশ্বাস করতাম আপনি পড়েন। কারণ আপনি তো ছিলেন এমনই। কথা কম বলতেন, অনুভবটা গভীর করতেন। আজ আর শরীরটা চায় না বসে থাকতে। মনে হচ্ছে, কেউ যেন ডাকছে। খুব চেনা সেই ডাক। আপনার গলার স্বর। মনে হয় আপনি বলছেন,
‘চলেন, এবার অনেক হয়েছে। এবার একসাথে হাঁটি।’
আপনি জানেন তো আমি অপেক্ষা করতে পারি। আমার ভালোবাসা তো এমনই। কোনো দাবি নেই, কেবল পাশে থাকার ইচ্ছে। আজ সেই ইচ্ছের দিন শেষ হলো। এই চিঠিগুলো কেউ পাবে না। হয়তো বাতাসে উড়ে যাবে কিংবা সাদা খামে চুপচাপ পড়ে থাকবে এই পুরানো টেবিলের কোণে। কিন্তু আপনি তো জানেন, আমি লিখেছি।
প্রিয়তমা, আমি আসছি। এবার আর দেরি নয়।
আপনার মোতালেব।…..”
এতটুকো লিখেই তিনি চোখ বন্ধ করলেন। ধীরে ধীরে কমে আসতে লাগল শ্বাস প্রশ্বাস। একসময় বন্ধ হয়ে গেল বুকের উঠনামা। বাইরে তীব্র বেগে দক্ষিণ দিক থেকে ছুটে এল ঝড়। সেই ঝড় শুকনা মাটিকে ভিজিয়ে দিয়ে গেল। শেষ হয়ে গেল মোতালেব মিয়ার অপেক্ষার দিন। টেবিলের এক কোণে পড়ে রইল তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে লেখা সব চিঠি।