অভিশপ্ত ঘড়ি

জুলাই মাস, ২০০৫ সাল।
উত্তর কলকাতার এক পুরোনো গলি — রামতনু দত্ত লেন।
তিনতলা এক খড়খড়ে বাড়ির চিলেকোঠা ঘর খালি হয়েছিল সদ্য, আর সেই ঘরে উঠে আসে ঋত্বিক সরকার — ইতিহাসের একজন গবেষক।
বয়স ৩৩, নিঃসঙ্গ, মিতভাষী মানুষ।
পুরোনো দলিল, ঘোলা স্মৃতি আর একাকীত্ব — তার একমাত্র সঙ্গী।
চিলেকোঠার ঘরটা দেখতে ছোট, কিন্তু বাসযোগ্য।
কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উঠে একপাশে টিনের ছাঁদে ঢাকা বারান্দা, অন্যদিকে ঘর — ভিতরে একটা খাট, কাঠের আলমারি, এক কোণে ধুলোপড়া ট্রাঙ্ক, আর উত্তর দেওয়ালে টাঙানো একখানা প্রাচীন দেয়ালঘড়ি।
ঘড়ির কাঁচে মরচে, কাঁটা থেমে আছে বহু বছর।
ঘর দেখাতে এসে বাড়ির মালিক বলেছিলেন,
“ঘড়িটা চলে না মশাই। তবে মাঝে মাঝে নড়েও ওঠে…
যখন ঘরের ভিতর কেউ একা থাকে।
ভয় পাবেন না, আমি বললাম তো — কেবল ঘড়ি!”
বৃদ্ধের মুখে হাসি ছিল, তবে সে হাসিতে ছিল না নিশ্চিন্ততা।

প্রথম ক’দিন ভালোই কেটেছিল।
ঋত্বিক তার কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিল।
সারাদিন কলেজ লাইব্রেরিতে, বিকেলে চা আর নোটস।
চিলেকোঠা হওয়ায় বাতাস চলাচল কম, কিন্তু জানালার ফাঁক দিয়ে দূরের শব্দ মাঝে মাঝে কানে আসে —
পেপারওয়ালার হাঁক, বা স্কুল থেকে ফেরার হাসি।
তবে সন্ধে নামলেই ঘরটার ভেতর যেন একটা নরম অন্ধকার জমতে শুরু করে।
ঘরের বাতাস ভারী লাগত,
জানালা বন্ধ থাকলেও পর্দা দুলে উঠত হঠাৎ।
আর প্রতিদিন রাত ঠিক ২টা ১৯ মিনিটে, ঘড়ির কাঁটা হালকা কাঁপে —
একবার মাত্র।
টিক।
প্রথম প্রথম ভেবেছিল পুরনো যন্ত্রাংশের খামখেয়ালিপনা।
কিন্তু একই সময়ে, একই শব্দ…
এমনকি একদিন টেবিলের ঘড়িতে মিলিয়ে দেখে চমকে গিয়েছিল —
দুটো ঘড়ির সময় হুবহু মিলেছে।

চতুর্থ রাতে ঘটনা ঘটল।
সে পাণ্ডুলিপি পড়ছিল — বৃষ্টি হচ্ছিল বাইরে।
টিনের ছাঁদে ধাক্কা মারছিল একটানা জলবিন্দু।
ঘরের বাতাসে ভিজে কাঠের গন্ধ, সঙ্গে একরকম চাপা কিছু —
যার ব্যাখ্যা নেই, ব্যাখ্যার প্রয়োজনও নেই।
ঘড়ির দিকে চোখ গেল —
২টা ১৮।
সে বই বন্ধ করে চুপচাপ বসে রইল।
ঘড়ির কাঁটা অচেনা নিয়মে চলতে শুরু করল নিজের মতো —
২:১৮:৪০… ২:১৮:৫9… ২:১৯…
আর সেই মুহূর্তেই
ঘরটা যেন নিঃশ্বাস আটকে ফেলল।
চারপাশে শব্দ থেমে গেল।
আলো নিস্তেজ, বাতাস স্তব্ধ,
একটা অদৃশ্য দেয়াল যেন নামল চোখ আর বাকি পৃথিবীর মাঝখানে।
ঋত্বিক হঠাৎ অনুভব করল —
তার পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
পিঠ বেয়ে ঠান্ডা ঘাম গড়িয়ে পড়ল, বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ বেড়ে চলেছে।
তার চোখ গেল জানালার কাচের দিকে।
সেখানে দুটো ছায়া দেখা যাচ্ছিল —
একটা তার নিজের,
আর অন্যটা… এক নারীর।
মাথায় খোঁপা বাঁধা, পাতলা আঁচল কাঁধে, গলা পর্যন্ত অস্পষ্ট।
ঋত্বিক দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু নড়তে পারছিল না।
জিভ শুকিয়ে কাঠ, কণ্ঠ রুদ্ধ।
পা যেন মেঝেতে আটকে গেছে।
তার কানে এল — ধীরে ধীরে, নিঃশ্বাসের মতো —
একজন নারী নিঃশ্বাস ফেলছে। খুব কাছে… খুব নীচু গলায়।
সে ফিসফিস করে বলল:
“কে?”
কোনো উত্তর নেই।
কিন্তু যেন অদৃশ্য কিছু ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসছে।
ঋত্বিক এক ঝটকায় পেছনে ঘুরে দাঁড়াল —
কেউ নেই।
তবে সামনে তাকাতেই গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল —
জানালার কাচে এখনো স্পষ্ট ছিল সেই ছায়ামূর্তি।
একটা গন্ধ টের পেল —
পুরনো কাপড়ের, পচা রজনীগন্ধার, ভিজে চুলের মতো…
ঘরটা যেন এখন কেবল একটা ঘর নয় —
একটা জাদুঘরের মতো, যেখানে সময় থেমে আছে, কিন্তু কেউ এখনো ঘুরে বেড়ায়।

সকালবেলা সূর্যের আলোয় ঘরটা আবার স্বাভাবিক।
তবু ঋত্বিক জানে, কিছু একটা পাল্টে গেছে।
ঘরের প্রতিটি কোণ, প্রতিটি ছায়া এখন চেনা মনে হয় না।
সে ওই ট্রাঙ্কটা খুলল —
ভেতরে পুরোনো কাপড়, ফ্রেমছেঁড়া ছবি, আর একখানা চিঠি।
চিঠির কাগজ হলুদ হয়ে গেছে।
হাতে লেখা অক্ষরগুলো কিছু অস্পষ্ট, তবু একটা অংশ স্পষ্টভাবে পড়া যায়:
“তুমি বলেছিলে, ফিরবে।
আমি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে থেকেছি প্রতিদিন —
তুমি আসোনি।
আমার সময় থেমে গেছে…..
চিঠিতে নাম নেই, তারিখও নেই।
শুধু কাগজে আঙুলের ছাপ — যেন কেউ ছুঁয়ে গিয়েছে বহুদিন আগে।

ঋত্বিক এরপর আর ঘড়ির দিকে তাকায় না।
তবে সে জানে,
ঘড়িটা থেমে নেই।
তার ভিতরে কেউ হয়তো আবার সময় গুনছে।
রাত গভীর হলে,
কেউ যেন ঘরের মেঝেতে হেঁটে বেড়ায়।
নিঃশব্দে, ধীরে ধীরে —
আর তার ঘাড়ের কাছে অনুভব হয় এক শীতল নিঃশ্বাস।
ঋত্বিক এখন আর চিলেকোঠায় থাকে না।
তবু এখনও মাঝেমাঝে রাতে ঘুম ভেঙে গেলে সে কানে শুনতে পায় একটাই শব্দ —
টিক… টিক… টিক…

Be the first to write a review

Leave a Reply

We’re sorry you’ve had a bad experience. Before you post your review, feel free to contact us, so we can help resolve your issue.

Post Review

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক গল্প