রাত গভীর হলে খাটের নিচ থেকে আঁচড় কাটার শব্দ পাওয়া যায়। এই শব্দ আবার রুবিনা ছাড়া কেউই শোনে না। সাজ্জাদকে একদিন ডেকেছিলো, সে ঘুম ঘুম গলায় বললো- “কি?”
“ওঠো না! খাটের নিচে… কে যেনো বসে আছে!”
“উম্মম্ম…”
রুবিনা ভয়ে ভয়ে সাজ্জাদের দিকে সরে এলো। সমস্যাটা দিনদিন মাত্রা অতিক্রম করে যাচ্ছে, আসলেই বোধহয় তাঁর সাইকিয়াট্রিস্ট বা এমন একটা কিছু দেখানো দরকার। যদিও এখন পর্যন্ত আঁচড় কাটা আর নিচু গলায় হাসির শব্দ ছাড়া অন্য কিছু শোনে নি সে। রুবিনা নিতান্ত সাহসী মেয়ে বলেই এতোদিন বিষয়গুলোকে পাত্তা না দিয়ে এসেছে, শোনার ভুল বা গুরুত্বহীন একটা কিছু ভাবতো। তবে আজকাল মনে হচ্ছে ব্যাপারটা একেবারেই হেলাফেলা করার মত বিষয় না আসলে, বিশেষত গত পরশুর ঘটনাটার পর। ইতিমধ্যেই ব্যাপারটা তাঁর স্নায়ুর ওপর যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করেছে। এখনই এর একটা স্থায়ী সমাধান করা না হলে সবকিছু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে…
পরশুও সবকিছু শুরু হয়েছিলো আঁচড় কাটার মধ্য দিয়ে। এতোদিনে এ শব্দটার সাথে রুবিনা অভ্যস্ত হয়ে এসেছে দেখেই কি না- তাঁর ঘুম ভাঙ্গলো অনেক পরে। ততক্ষণে খাটের নিচ থেকে মাঝে মাঝে কিল দেয়ারও শব্দ আসছে। সাজ্জাদের দিকে না ফিরেও রুবিনা স্পষ্ট বুঝতে পারলো নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছে ছেলেটা। খানিকক্ষণ বৃথাই কাঁধ ধরে ঝাকালো সাজ্জাদের। অল্প বাদেই অবশ্য কিল আর আঁচড়ের শব্দ থেমে হঠাৎই চুপচাপ হয়ে গেছিলো সবকিছু, কিন্তু ঐ আচমকা নৈঃশব্দ রুবিনার কাছে আরো ভয়ংকর বলে মনে হতে থাকে। মনে হয়- এক শীতল নীরবতা ফুঁড়ে এখনই কোনো বিজাতীয় মন্ত্রোচ্চারণের ফিসফিসানি রুবিনার কানে আসবে কাছ থেকে ! খু…ব কাছ থেকে…
কে যেনো বিছানার চাদর ধরে টানছে। এই প্রথম রুবিনা সত্যিই খুব ভয় পেলো। পাগলের মত সাজ্জাদকে ঝাঁকাতে লাগলো ঘুম ভাঙ্গানোর জন্য। সাজ্জাদ ঘুম থেকে উঠে দেখে রুবিনা বড় বড় করে শ্বাস নিচ্ছে। কোনোমতে এলোমেলো উচ্চারণে বললো- “কে যেনো…. বিছানার চাদর ধরে টানছে..”
সাজ্জাদ দ্রুত উঠে গিয়ে লাইট জ্বালানোর পর আবার সব স্বাভাবিক। চাদরের একটা অংশও গতানুগতিক অবিন্যস্ততার বাইরে উল্লেখযোগ্যভাবে কুঁচকে নেই। কোথাও থেকে- রুবিনার ভাষ্য অনুযায়ী- আচড় বা কিলের শব্দও শোনা যাচ্ছে না। প্রতিবারের মত এবারও সাজ্জাদ খুব বিরক্ত হলো। চোখমুখ বিকৃত করে বললো- “কালকেই তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো। রাত-বিরাতে আজাইরা চিল্লাচিল্লি । ভালো লাগে না এইসব আর..”
রুবিনা নিজেও অবাক হয়ে গেছিলো। একটু আগেই কি ভীষণ অস্থিরতার আভাস ছিলো পুরো রুম জুড়ে, অথচ এখন সব স্বাভাবিক। লাইট নিভিয়ে সাজ্জাদ এসে শুয়ে পড়া মাত্রই হালকা নাক ডাকার শব্দ শুনতে পেলো। রুবিনার কেনো জানি একটু অভিমান হলো হঠাৎ, নাহ! আর সে ডাকবে না মানুষটাকে.. যত খারাপই কিছু হোক। তাছাড়া এমনও তো হতে পারে- সত্যি সত্যি তাঁর কোনো মানসিক সমস্যা হচ্ছে। ভুত বলে কি আসলে কিছু আছে নাকি! বিনা কারণেই বোধহয় সে ভয় পেয়ে এসেছে এতোদিন।
ঘুমিয়ে পরার আগ মুহূর্তে ঠিক কি মনে করে রুবিনা ওর মোবাইলের টর্চটা জ্বালালো। তারপর তাক করলো সেদিকে- যেদিক থেকে বিছানার চাদর টেনে ধরার অনুভূতি টের পাওয়া যাচ্ছিলো। এলইডির উজ্জ্বল সফেদ আলোয় চোখে সয়ে আসার পর রুবিনা দেখতে পায়- সেখানে গাঢ় করে নেলপলিশ আঁকা দু’টো হাত বিছানার চাদর খামচে আছে। সোনালি চুলের কোন এক মেয়ে যেনো পানির নীচ থেকে ভেসে আসার মত করে ওর মাথাটুকু ওপরে তুলছে খু….ব ধীরে, একটু একটু করে… গোটা চুল তার লাল হয়ে ছিলো রক্তে। সে মেয়ের মুখ-চোখ দেখার আগেই, রক্তভেজা চুল আর হাত দেখে অজ্ঞান হলো, অথবা ঘুমিয়ে পরলো রুবিনা।
***
এর মাসখানেক আগের কথা….
রুবিনার খালা শাশুড়ি এসেছিলো বিদেশ থেকে। চলে যাওয়ার দিন ওদেরকে সি অফ করতে রুবিনারা সবাই গেলো এয়ারপোর্ট। বিদায় দিয়ে ফিরতে ফিরতে রাত তিনটা। ফেরত আসার পথেই ঘটনাটা ঘটেছিলো। এয়ারপোর্ট রোডে, নিকুঞ্জ পৌছানোর ঠিক আগে আগে রুবিনাদের গাড়িতে ছোটখাট একটা এক্সিডেন্ট হয়। গভীর রাত হওয়ায় রাস্তা প্রায় ফাঁকাই ছিলো তখন। সেই ফাঁকা রাস্তাতে, কথা নেই বার্তা নেই, একটা মেয়ে ছুটে এসে ধাক্কা খেলো গাড়ির সাথে। যে গতিতে রুবিনাদের রেন্ট এ কারের গাড়ি ছুটছিলো, তাতে মেয়েটার হাড়-মাংস চূর্ণ হয়ে যাওয়ার কথা, কিন্তু কোনো এক অদ্ভুত কারণে গাড়ি থেকে নামার পর আশেপাশে আর কাউকে দেখা গেলো না ! ওখানে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে যাওয়া আহত কারো শরীর পড়ে নেই। পুরো ব্যাপারটাই যেনো ঘটেছে চোখের পলকে, যেনো ধাক্কা খাওয়ার বিষয়টা ছিলো চোখের ভুল। ভেলকিবাজি!
গাড়িতে শুধু রুবিনা, সাজ্জাদ আর রুবিনার বৃদ্ধ শাশুড়িই ছিলেন। সাথে ড্রাইভার। তন্ন তন্ন করে খোজার পরও কাউকে না পেয়ে সবাই গাড়িতে ফিরে এলো। রুবিনার শ্বাশুড়ি বলছিলেন- “পরিষ্কার দ্যাখলাম বিদেশিগো মত দেখতে এক ছেড়ি আইয়া উইড়া গাড়ির উপরে পরলো…”। খুব অস্বস্তিকর একটা নীরবতা কাজ করছিলো গাড়ির মধ্যে, বিশেষত রবিনার শাশুড়ির বর্ণনা শোনার পর পরিস্থিতি কেমন গুমোট হয়ে উঠলো। সেই অস্বস্তিকর অবস্থাকে আরো ঘোলাটে করে তোলে ড্রাইভার সাহেবের একটা কথা। সে নীচু গলায় ড্রাইভ করতে করতে বলছিলো-
“এতোদিন জিনিসটা বিশ্বাস করি নাই, কিন্তু আজকে নিজে দেখলাম..”
“কী?”- সাজ্জাদ জানতে চাইলো।
“এয়ারপোর্টের এই রাস্তার একটা বদনাম আছে। অনেক ড্রাইভাররে কইতে শুনছি, এই রাস্তায় নাকি রাইতের বেলা এক বিদেশি মাইয়া হাঁটে। যখন তখন চলন্ত গাড়ির উপরে ঝাঁপ দিয়া পড়ে মাইয়াডা। সবাই ভাবে বুঝি একটা এক্সিডেন্ট হইছে, কিন্তু গাড়ি থেইকা নামনের পর আর কেউ কিছু খুইজা পায় না…”
“ধুর, আজাইরা সব গল্প!”
রুবিনা ভয়ে ভয়ে বললো- “সত্যি হতেও তো পারে। আজকে তো নিজের চোখেই দেখলাম…”
“আরে ধুর ধুর। দেখো গিয়ে কোনো নেশাখোর হয়তো রাস্তা পার হওয়ার সময় বেকায়দা ধাক্কা খেয়েছে। আঘাত গুরুতর না দেখে আবার অন্যদিকে চলে গেছে তাড়াতাড়ি …এইজন্যই মনে হয় খুঁজে পাই নি আমরা।”
“কিন্তু মা যে দেখলো!”
সাজ্জাদ গলা নিচু করে বলে- “আরে বুড়ো মানুষ কি না কি দেখেছে… বাদ দাও…”
বাকি পথটা অবশ্য নির্বিঘ্নেই কাটলো। শুধু সিড়ি দিয়ে দোতলায় ওঠার সময় রুবিনার কেমন জানি গা ছমছম করতে থাকে। মনে হলো- ওদের সাথে বোধহয় অশরীরী কেউ আছে ! এমন একজন যার অস্তিত্ব শুধু দুর্ভাগ্যই বয়ে আনে মানুষের জন্য, ধাক্কা খাওয়া-টাওয়া ওগুলো ছিলো যার শুরু…
সে জোর করে চিন্তাটাকে মাথা থেকে দূরে সরিয়ে রাখলো। ঘুমে চোখদু’টো বন্ধ হয়ে আসছিলো রীতিমত।
***
“স্যার, শুনলাম আপনি নাকি আরবান মিথ নিয়ে গবেষণা করেন? এয়ারপোর্ট রোড নিয়ে কোনো গল্পের কথা কি আপনার জানা আছে?”
ছেলেটাকে আগে কোথাও দেখেছি বলে মনে করতে পারলাম না। নাম বলেছে- সাজ্জাদ। বেসরকারী একটা কোম্পানিতে এক্সিকিউটিভ পদে চাকরি করে । সত্য বলতে ফার্স্ট ইম্প্রেসন বলে যে একটা ব্যাপার আছে, তাতে ছেলেটাকে খুব একটা পছন্দ হয় নি আমার। চেহারায় উদ্ধত ভাব, তাছাড়া চোখদু’টোও কেমন যেনো অপ্রকৃতিস্থ। অস্থির অস্থির পাগলের মত দৃষ্টি…
“হ্যাঁ আছে। কিন্তু তাঁর আগে বলেন, আমার খোঁজ আপনি কিভাবে পেয়েছেন? তার থেকেও বড় কথা- এসব জনশ্রুতি বা বানানো গল্প- যা-ই বলেন না কেন- এগুলো শুনে আপনার কি লাভ?”
“লাভ আছে। দুই মাস আগে আমার স্ত্রী আত্মহত্যা করেছিলো… স্যার একটু পানি খাবো…”- ছেলেটা ঢকঢক করে পানি খেয়ে তাঁর অসমাপ্ত কথাটুকু শেষ করলো- “আমার ধারণা ওর সুইসাইডের সাথে এয়ারপোর্ট রোডের কোনো না কোনো সম্পর্ক আছে, তাছাড়া…”
আমি কৌতূহলী চোখে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। এখন আবার তাঁর জন্য মায়া লাগছে। বেচারার অপ্রকৃতিস্থ চাহনি আর উদভ্রান্তের মত দৃষ্টির পেছনে এতো দুর্ভাগ্যজনক এক বাস্তবতা আছে- সেটা আরো আগেই অনুমান করা উচিত ছিলো বোধহয়। আমি মনোযোগ দিয়ে সাজ্জাদের কথাগুলো শুনতে থাকি চুপচাপ।
“আমার স্ত্রীর ডাক নাম ছিলো রুবিনা। ও মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত এসব আদিভৌতিক ব্যাপারস্যাপারে বিশ্বাস করতাম না আমি, কিন্তু রুবিনা প্রায়ই নানারকম অদ্ভুত অদ্ভুত সব কথা বলতো। কে এক বিদেশি মেয়ে নাকি রক্তভেজা মুখে খাটের নীচে শুয়ে আছে, প্রায়ই নাকি সে ওখান থেকে বের হওয়ার জন্য আচড় কাটে, মাঝে মাঝে খামচে ধরে বিছানার চাদর… সুইসাইড করার আগের দিন তো ও একরকম পাগলের মতই শুরু করলো। সেদিনই প্রথম, এবং শেষবারের মত আমি এক ভয়ংকর দৃশ্য দেখেছিলাম। মধ্যরাত্রে রুবিনার চিৎকারে ঘুম ভেঙ্গে গেছিলো আমার। কারেন্ট ছিলো না তখন, ও বারবার লাইট জ্বালাতে মানা করলো। কিন্তু আগেই বলেছি- ওসব অশরীরি প্রাণীতে ছোটবেলা থেকেই বিশ্বাস ছিলো না আমার। রুবিনার কথা অমান্য করে মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালানোর সাথে সাথে… দেখি… খাটের নীচ থেকে এক তরুণীর অর্ধেক, ছিন্ন শরীর বেরিয়ে এসেছে। কোমর থেকে নীচের অংশ ছিলো না জিনিসটার, ওখান থেকে নাড়িভুড়ি, রক্তভেজা হাড় এ সব দৃষ্টিগোচর হচ্ছে স্পষ্ট। দেহাবশেষটুকু দুই হাতে ভর দিয়ে সাপের মত হিসহিস শব্দ করতে করতে ধীরে ধীরে নিজের শরীরটাকে ছেচড়ে নিয়ে যাচ্ছিলো রুমের দরজার দিকে। ফ্ল্যাশ লাইটের আলোয় আমি স্পষ্ট দেখলাম- মেয়েটার চুলের রঙ সোনালি, কিন্তু সেটা কালচে হয়ে আছে সম্ভবত রক্তে…. ”
সাজ্জাদ চোখ বন্ধ করলো। বোধহয় সে ধাতস্থ হওয়ার জন্য সময় নিচ্ছে। আমি উঠে দুই কাপ কফি বানিয়ে আনতে আনতে ওকে সামলে নেয়ার মত সময় দিলাম।
“আমরা কতক্ষণ জড়াজড়ি করে ওভাবে বসেছিলাম, ঠিক জানি না। তবে রুবিনা একসময় ঘুমিয়ে পড়লো। আমি অনেক চেষ্টা করেও ঘুম আনতে পারছিলাম না সেদিন। ভোরের আলো ফোটার পর দেখি, মেঝেতে রক্তের ধারা লেপটে আছে। কি করছি কেন করছি- এসব বোঝার আগেই ন্যাকড়া ভিজিয়ে ফ্লোরটুকু পরিষ্কার করে ফেললাম। শুধু মনে হচ্ছিলো- এ দাগ কোনোভাবেই রুবিনাকে দেখতে দেয়া যাবে না, তাহলে সে অপ্রকৃতিস্থ হয়ে উঠবে আরো। এটাও সিদ্ধান্ত নিলাম- এ বাড়ি ছেড়ে আমরা চলে যাবো যত দ্রুত সম্ভব। বড় বাসা একটা নেবো যেনো মা’কেও এনে রাখতে পারি …
কিন্তু সে সুযোগ আর পাই নি, স্যার ! ওদিন সকালেই রুবিনা আত্মহত্যা করেছিলো। যদিও ওর মৃত্যুর পর আমার কেমন একটা যেনো রোখ চেপে গেলো। আমি শুধু পাগলের মত সূত্র খুঁজতে লাগছিলাম। মনে হলো- বিনা কারণে একজন ভালো, সুস্থ মানুষ কি এভাবে আত্মহত্যা করতে পারে? পেপার, ইন্টারনেট ঘেঁটে গত দুই বছরে যত আত্মহত্যার কেস আছে, সব আলাদা করতে লাগলাম একের পর এক। রুবিনার মত এমন চারটা ঘটনা পেয়েছি এখন পর্যন্ত, যেখানে বিয়ের দুই বছরের মাথায় মেয়েটা আত্মহত্যা করেছে। ওহ, আপনাকে বলতে ভুলে গেছি স্যার, রুবিনা যেদিন মারা গেলো, সেদিন ছিলো আমাদের সেকেন্ড এনিভার্সারি…”
আমি শান্ত গলায় বললাম- “আই এম স্যরি সাজ্জাদ। স্যরি ফর ইয়োর লস। কিন্তু.. তোমার কেনো মনে হলো- এয়ারপোর্ট রোডের কোনো কিংবদন্তীর সাথে রুবিনার মৃত্যুর একটা সম্পর্কে আছে?”
“কারণ ঐদিন এয়ারপোর্ট থেকে বাসায় আসার পর থেকেই রুবিনার সমস্যার শুরু। এর আগ পর্যন্ত সে স্বাভাবিকই ছিলো…”- সাজ্জাদ সংক্ষেপে সেদিনকার সে রহস্যময় এক্সিডেন্টের কথা জানালো।
আমরা দু’জনই বেশ খানিকটা সময় চুপচাপ বসেছিলাম, একসময় নীরবতা ভাংলাম নিজেই। মৃদু গলায় সাজ্জাদকে জানালাম- “বাংলাদেশি এক ছেলে কাজের সূত্রে রোমানিয়া চলে গেছিলো বহু বছর আগে। ওখানেই এক বিদেশিনীর সাথে প্রেম হয় তাঁর। বিয়ের দু’বছরের মাথায় বাংলাদেশে এসেছিলো ওরা, কিন্তু ফেরত যাওয়ার সময় এয়ারপোর্ট রোডে, খিলখেতের আশেপাশে ওদের গাড়িটা এক্সিডেন্ট করলো। এতে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করে মেয়েটা। জনশ্রুতি আছে- এরপর থেকে রাত গভীর হলে এক সাদা চামড়ার মেয়েকে নাকি ঐ রাস্তার আশেপাশে হাঁটতে দেখা যায়… ”
“আমার ধারণা তাহলে ঠিক ! তাছাড়া আপনার বর্ণনার সাথে সেদিনকার সে ছিন্নভিন্ন নারীমূর্তিরও চেহারা, চুল- এ সব কিন্তু মিলে গেছে। রুবিনা তো বটেই, আমি নিশ্চিত- খোঁজ নিলে দেখা যাবে অন্য আত্মহত্যার ঘটনাগুলোর সাথেও এ বিদেশিনীর আছর বা কুপ্রভাব- যেটাই বলি না কেন- ছিলো !”- সাজ্জাদ বিড়বিড় করে বোধহয় নিজেকে নিজে শোনানোর জন্যই বললো।
আমার প্রায় মুখে চলে আসছিলো- “এগুলো তো মিথ। বানানো গালগল্প। এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই..”, কিন্তু শেষমেষ চুপ থাকাটাই মনস্থির করলাম। কিছু কিছু সময় মানুষ যুক্তি গ্রহণ করার মত অবস্থায় থাকে না। প্রচন্ড ইমোশোনাল শক, প্রিয়জন হারানোর বেদনা আর দুর্বল মানসিক অবস্থা- সব মিলে সাজ্জাদ ছেলেটা বর্তমানে এমনই এক পর্যায় অতিক্রম করছিলো বলে ধারণা । তাছাড়া আমার নিজেরো কিছু সমস্যা আছে, একবার একটা কিছু মাথার ভেতর ঢুকে গেলে সেটার যথাযথ উত্তর পাওয়ার আগ পর্যন্ত স্বস্তি পাই না, সাজ্জাদ বিদায় নেয়ার আগে মাথায় ওরকমই এক পোকা ঢুকিয়ে গেছিলো। ওর জিজ্ঞাসাটুকু আমার নিজের মাথাতেও ঘুরতে থাকলো…
ধরে নিলাম সাজ্জাদের কথাই সত্যি। হয়তো বেশ কয়েকটা আত্মহত্যার পেছনে এই ভৌতিক ঘটনার হাত আছে। কিন্তু কেন? কেন সেই বিদেশিনী বেছে বেছে নববিবাহিত দম্পতিদের টার্গেট করবে? কেনই বা তাঁদের প্রতি ওর এতো ক্ষোভ? আচ্ছা, এমন কি হতে পারে, নিজে একটা সুখী-সুন্দর জীবন কাটাতে পারার আক্ষেপ ঐ বিদেশিনীর রয়ে গেছিলো? ঐ আক্ষেপটুকুই দীর্ঘশ্বাস হয়ে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে অনেক যুগল দম্পতিদের? অন্যদের মত ওরও নিশ্চই স্বপ্ন ছিলো এক সোনার সংসারের, কিন্তু মেয়েটার জীবন শুরু হওয়ার আগেই তো রোড-এক্সিডেন্টে সব শেষ হয়ে গেলো… আহারে ! আমার কেনো জানি সে রোমানিয়ান তরুণীর হাসিখুশি এক ছবি মনের আয়নাতে ভেসে উঠতে থাকে। মানুষের স্বপ্ন কেমন করে দুঃস্বপ্নে পালটে যায় আসলে !
একটু আগেই যে আমি সাজ্জাদকে অযৌক্তিক কথা বলার কারণে মৃদু তিরস্কার করতে চাচ্ছিলাম, সেই আমিই নানা কাল্পনিক বিষয় নিয়ে ভাবতে থাকি। অনেক শূণ্যস্থান আর জিজ্ঞাসার উত্তর মেলানোর চেষ্টা করি যার বাস্তব কোনো ভিত্তি নেই। একটা সময় বহু কষ্টে চিন্তার লাগাম টেনে বাস্তবতায় ফিরে এসেছিলাম যদিও, স্মার্টফোনটা বের করে তাতে অভ্যস্ত হাতে লিখলাম- “আরবান মিথ ২ঃ এয়ারপোর্ট রোড। বিস্তারিত জানতে হবে আরো.. বিদেশী দেখা যাওয়া কিংবা গাড়ির সাথে ধাক্কা খাওয়ার ঘটনা কেবল শুরু, নববিবাহিতদের ওপর এর প্রভাবটাই মূল মিথ সম্ভবত! ”
(শেষ কথা)
আজ সমস্যাটা অন্যদিনের তুলনায় বেড়েছে। ফারিয়ার কেন জানি খুব অস্বস্তি লাগতে থাকে হঠাৎ। মনে হতে থাকে যেনো ভীষণ অকল্যাণকর আর অমঙ্গলজনক কিছু একটা ঘটতে চলেছে। এখনই একটা কিছু করা না হলে বেশি দেরি হয়ে যাবে…
মিলনকে ডেকে লাভ নেই। ও বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। পাশের রুমে শ্বশুর-শ্বাশুড়ি থাকেন অবশ্য, কিন্তু বয়স্ক মানুষকে এতো রাতে বিরক্ত করতে ইচ্ছা করে না ফারিয়ার। তাছাড়া একদিন শ্বাশুড়িকে এ ঘরে এনে রেখেছিলোও, যথারীতি ভদ্রমহিলা কিছু শোনেন নি। এরপর থেকেই ফারিয়ার ধারণা জন্মাতে শুরু করে- আচ্ছা, সে নিজে কোনো একটা মানসিক সমস্যার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে না তো ! যদি ভৌতিক একটা কিছুই হয়ে থাকবে, তাহলে অন্যদেরও তো অস্বস্তি লাগার কথা…
চিন্তা করতে করতে একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেছিলো সে, আবার আঁচড়ের শব্দে চমকে উঠলো। বৃথাই কিছুক্ষণ মিলনকে ডেকে ওঠাতে চেষ্টা করছিলোঃ”প্লিজ একটু দেখো না, আমার এতো ভয় ভয় লাগছে…”, কিন্তু ছেলেটার কোনো হুঁশই নেই। আচমকা খাটের নীচ থেকে আঁচড় আর কিলের শব্দও হঠাৎ থেমে গিয়েছিলো কেন জানি। পুরো ঘর ততক্ষণে মৃত্যুগন্ধী এক শীতলতায় ভরে উঠেছে । ফারিয়া অনুভব করে পায়ের কাছটায় চাদরের অংশ ধরে কে যেনো টানছে খুব ধীরে। সে চোখ বন্ধ করে কাঁথাটা দিয়ে ঢেকে নিলো চুল পর্যন্ত। নাহ! এতো স্নায়বিক চাপ আর সে নিতে পারছে না…
ঘুমিয়ে পরার ঠিক আগে মুহূর্তে ফারিয়া শুনতে পেলো- কে যেনো ফিসফিস করে বিজাতীয় এক ভাষায় মন্ত্রোচ্চারণের মত শব্দ করছে। আর সারা ঘর যেনো ভরে গেছে কোনো বিদেশী, এক ভীষণ অভিশপ্ত প্রাচীন পারফিউমের গন্ধে !