ছন্নছাড়া কালো যাদু

আমার নাম শাকিল। আমি কুমিল্লার হোমনা উপজেলার ঘারমোড়া গ্রামের বাসিন্দা। আমাদের পরিবার বেশ পুরোনো, সুখ-শান্তিতেই চলছিল, কিন্তু কয়েক মাস ধরে এক অদ্ভুত অশান্তি আমাদের ঘিরে ধরেছিল। মূল কারণ ছিল আমার চাচা আব্দুল ও আমাদের পাশের বাড়ির কালাম চাচার জমি সংক্রান্ত বিরোধ।
বিষয়টা ছিল এমন—আমার চাচার জায়গায় কালাম চাচা কয়েক বছর আগে কিছু গাছ রোপণ করেছিলেন। যদিও জমিটা আমাদেরই ছিল, কিন্তু কালাম চাচা ধীরে ধীরে জায়গাটা দখল করার ফন্দি আঁটছিলেন। চাচা কয়েকবার বলার পরও তিনি গাছগুলো কেটে ফেলেননি। একদিন রাগের মাথায় চাচা নিজেই গিয়ে সব গাছ কেটে দিলেন।
বিকেলের দিকে কালাম চাচা বাড়ির সামনে এসে চিৎকার করতে লাগলেন। তার চোখ রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছিল, কণ্ঠস্বরে একটা অদ্ভুত কম্পন ছিল। তিনি চাচার দিকে তর্জনী উঁচিয়ে বললেন,
“আব্দুল! তুই কল্পনাও করতে পারবি না আমি তোর কী হাল করব! আমার জায়গার গাছ কেটে তুই ভুল করেছিস। এখনো সময় আছে, আমার জায়গা আমাকে বুঝিয়ে দে, নাহলে এমন পস্তাবি যে তোর নিজের মুখের দিকে তাকাতে সাহস হবে না!”
চাচা তাকে পাত্তা না দিয়ে বলেছিলেন, “জমি আমার, তোর কিছু করার থাকলে কর!”
কালাম চাচা তখন শুধু একবার ফুঁ দিয়ে বললেন, “ঠিক আছে, সময়ই বলবে!”
আমরা কেউ তখন ভাবতেও পারিনি, সত্যিই সময় এক ভয়ঙ্কর খেলা খেলতে চলেছে।

ঘটনার মাত্র তিন দিন পর থেকেই চাচার আচরণ বদলে যেতে লাগল। প্রথমে তিনি কিছুটা ক্লান্ত অনুভব করছিলেন, খাবারে অরুচি হচ্ছিল, তারপর শুরু হলো অদ্ভুত সব উপসর্গ। শরীর শুকিয়ে যেতে লাগল, গায়ের রঙ কালচে হয়ে গেল, আর চোখের মণি কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে উঠল। রাতের বেলা তিনি ঘুমানোর সময় চমকে উঠে বসতেন, বলতেন, কেউ যেন তার গলা চেপে ধরছে।
আমরা ভয় পেতে লাগলাম। ডাক্তার দেখিয়েও কোনো কাজ হলো না, ওষুধেও কোনো উন্নতি হচ্ছিল না। বরং চাচা দিন দিন আরও খারাপ হয়ে যাচ্ছিলেন। একদিন রাতের বেলা আমাদের বাড়ির উঠোনে ভয়ানক এক দৃশ্য ঘটল।
আমার মা হঠাৎ বাইরে কিছু একটা ছায়ার মতো নড়াচড়া করতে দেখে চিৎকার করে উঠলেন। আমরা দৌড়ে গিয়ে দেখি, চাচা উঠোনে দাঁড়িয়ে আছেন, অথচ তার চোখ দুটো পুরো সাদা! তার মুখের কোণে বিকৃত এক হাসি, আর তিনি ফিসফিস করে কি যেন বলছিলেন,
“আমি মরছি না… আমাকে কেউ মারতে পারবে না…”
তারপরই বিকট এক শব্দ হলো, যেন ঝড়ো হাওয়ার মধ্যে শিস বাজছে! চাচা হঠাৎ কাশতে কাশতে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। তার মুখ থেকে কালো তরলের মতো কিছু বের হলো, আর শরীরটা কাঁপতে লাগল।
আমার বাবা কোরআনের আয়াত পড়তে লাগলেন, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে আয়াত যত পড়া হচ্ছিল, চাচার শরীর তত বেশি কাঁপছিল!
ওই রাতের পর থেকে পুরো বাড়িতে এক ভয়ানক আতঙ্ক নেমে এলো।

পরদিন সকালে আমার দাদাজান বললেন, “এটা কোনো সাধারণ রোগ না, এর পেছনে কিছু আছে।”
গ্রামের মুরুব্বিদের সঙ্গে আলোচনা করার পর জানা গেল, কিছুদিন ধরেই কালাম চাচা গভীর রাতে গ্রামের শেষ প্রান্তে থাকা এক রহস্যময় মানুষের সঙ্গে দেখা করছিলেন। মানুষটা ছিল এক বৃদ্ধ, যাকে সবাই এড়িয়ে চলত। কেউ বলত, সে মানুষের শরীরের উপর শক্তি প্রয়োগ করতে পারে, কেউ বলত, সে অদ্ভুত এক বিদ্যা জানে, যা মানুষকে ধীরে ধীরে শেষ করে দেয়।
আমি, আমার বন্ধু রফিক ও শরিফ সিদ্ধান্ত নিলাম, সত্যিটা খুঁজে বের করতেই হবে।
রাতের বেলা আমরা লুকিয়ে গেলাম গ্রামের শেষ প্রান্তের সেই পুরোনো পোড়োবাড়ির কাছে, যেখানে কালাম চাচাকে কয়েকবার যেতে দেখা গেছে। রাত গভীর হলে দেখি, তিনি সত্যিই সেখানে উপস্থিত! তার সামনে বসে আছে সেই রহস্যময় বৃদ্ধ। বৃদ্ধের সামনে একটা মাটির হাঁড়ি, যার ভেতর কালো ধোঁয়া উঠছিল।
বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বলল, “তোর শত্রু এখন তিলে তিলে শেষ হচ্ছে। কিন্তু মনে রাখিস, একবার শুরু করলে আর ফিরে আসার পথ নেই!”
কালাম চাচা মাথা নেড়ে বললেন, “আমি শুধু ওকে শেষ হতে দেখতে চাই!”
আমাদের শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। আমরা বুঝলাম, এখানে কোনো ভয়ানক কিছু হচ্ছে!

পরদিন রাতে চাচার অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে গেল যে, মনে হলো, তিনি আর সকাল দেখবেন না। তার নখ লম্বা হয়ে গেছে, চামড়ার নিচে অদ্ভুত কিছু নড়তে দেখা যাচ্ছে!
রাত আনুমানিক তিনটা বাজে। হঠাৎ বিকট এক চিৎকারে আমাদের ঘুম ভাঙল। আমরা ছুটে গিয়ে দেখি—চাচার শরীর শূন্যে ভাসছে! তার মুখে একটা অদ্ভুত বিকৃত হাসি, আর চোখ দিয়ে যেন আগুন বের হচ্ছে!
আমার বাবা আতঙ্কে কোরআনের আয়াত পড়তে লাগলেন, কিন্তু চাচার ঠোঁট থেকে তখনো সেই একই কথা বের হচ্ছে,
“আমি মরছি না… আমাকে কেউ মারতে পারবে না…”
হঠাৎ তার শরীর কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে পড়ে গেল, আর তার মুখ দিয়ে একসঙ্গে অনেকখানি কালো তরল বের হলো।
সবাই দৌড়ে গেল, কিন্তু যখন তার মুখের দিকে তাকালাম, দেখি—তার চোখদুটি ফাঁকা!
ওঝা এসে বলল, “এটা কোনো সাধারণ মৃত্যু নয়, এটা ছন্নছাড়া কালো যাদুর প্রভাব! তার আত্মা এখনো মুক্ত হয়নি। সে ফিরে আসতে পারে, যেকোনো সময়!”
আমরা সবাই স্তব্ধ হয়ে গেলাম।
কালাম চাচা আর কখনো আমাদের বাড়ির দিকে ফিরেও তাকাননি। কিছুদিন পর তিনি নিজেও অদ্ভুতভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তার চোখও ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হয়ে গেল, শরীর শুকিয়ে গেল, আর একদিন গভীর রাতে সে নিখোঁজ হয়ে গেল।
আজও সেই বাড়ির উঠোনে মাঝরাতে একটা অদ্ভুত ফিসফিসানি শোনা যায়, যেন কেউ বলছে—
“আমি মরিনি…”

Be the first to write a review

Leave a Reply

We’re sorry you’ve had a bad experience. Before you post your review, feel free to contact us, so we can help resolve your issue.

Post Review

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক গল্প