উর্মি আপুর বিয়ে হয়েছে চার বছর হলো। এই চার বছরে একটা বারও সে শ্বশুরবাড়িতে যায়নি। যায়নি বললে অবশ্য ভুল হবে, যেতে পারেনি। তার শ্বশুর শাশুড়ি চায়নি আপু কখনো তাদের বাড়িতে আসুক। আপুর উপর প্রচন্ড রাগ ছিলো তাদের।
এইবার আপু শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছে। শুধু আপু আর দুলাভাই নন, সঙ্গে আমিও আছি। আমাদের উপর ভীষণ প্রেশার। যেভাবেই হোক, তার শ্বশুর শাশুড়ির মান ভাঙাতে হবে। আপু আর আমি ভীষণ অপটিমিস্টিক, ভাইয়া প্যাসিমিস্টিক। তিনি মুখ চোখ শুকনো করে বসে আছেন।
আমার আর আপুর অপটিমিস্টিক হবার খুব ভালো একটা কারণ আছে। আমাদের কাছে একটা টুলস আছে আপুর শ্বশুর শাশুড়ির রাগ ভাঙানোর। সেটা হলো মিম্পি। আপুর দুবছরের মেয়ে। গোপন সূত্রে আমরা খবর পেয়েছি, আপুর শাশুড়ি মিম্পিকে দেখার জন্য খুব অস্থির হয়ে আছেন। এই জন্যই সাহস করে আপুর শ্বশুরবাড়িতে আসা। না হলে কে ইচ্ছা করে বাঘের গুহায় পা রাখে?
আপুর শ্বশুড়বাড়িতে ঢুকে আমি সত্যি বাঘ দেখার মতো ভয় পেলাম। আপুর শ্বশুর বসে আছেন উঠানে। চেয়ারে। তার মুখটা গম্ভীর। আমি ক্লাস নাইনে থাকতে একবার কার্ড খেলার সময় ধরা খেয়েছিলাম। বাবার কাছে বিচার গিয়েছিলো। বাবার অমন গম্ভীর মুখ আমি আর কখনো দেখি নাই। আপুর শ্বশুরের মুখটা দেখে বাবার সেই গম্ভীর মুখটাকে এখন বেবিফেস বেবিফেস লাগছে।
আপুর শ্বশুর জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেন এসেছিস?’
ভাইয়া চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। কিছু বলছেন না। আমি ভাবছি ভাইয়া এখনো কিভাবে দাঁড়িয়ে আছে। ভাইয়ার জায়গায় আমি থাকলে হাঁটু কাঁপতে কাঁপতে বসে যেতাম। ভাইয়ার এখন উচিত মিম্পিকে দুহাতে নিয়ে আংকেলের মুখের সামনে ধরা। মিম্পির মুখটা বেশ মায়াবী। এই মুখ দেখলে নিশ্চয়ই তার রাগ ভাঙবে।
ভাইয়া আপুর কাছ থেকে মিম্পিকে কোলে নিচ্ছেন। তাহলে আমি যা ভাবছি ভাইয়াও মনে হয় সেই প্ল্যানই করেছেন। তবে ভাইয়াকে আংকেলের সামনে মিম্পিকে ধরা লাগলো না। তার আগেই আন্টি মানে মিম্পির দাদি চলে এলেন। মিম্পির দিকে আড়চোখে তাকাতে তাকাতে বললেন, ‘তোদের সাহস তো কম না? এতোবড় অপরাধ করে কোন মুখে বাসায় পা রাখিস? একটুও কি ভয় নাই তোদের? এসেই যখন পড়েছিস, তোদের বিচার করবো। কঠিন বিচার করবো। এখন যা, হাতমুখ ধুয়ে উপরের কোণার বেডরুমে চলে যা। পরে কথা বলবো তোদের সাথে। তুমি এখন ওদের কিছু বলো না। একটু জিরোক, তারপর ওদের নিয়ে বসবে।’ শেষ কথাগুলো আন্টি আংকেলকে উদ্দেশ্য করে বললেন। যদিও তার চোখের দিকে আন্টি তাকালেন না।
আমরা হাতমুখ ধুয়ে উপরের ঘরে চলে গেলাম। মনটা ফুরফুরে লাগছে। বুঝতে পারছি, আন্টি থাকতে আর ভয় নাই। যতো যাই হোক, তিনি আংকেলকে সামলে নেবেন।
দুপুরের খাবার চলে এলো। দুজন মহিলা খাবার নিয়ে এসেছেন। পিছনে পিছনে আন্টিও এসেছেন। তিনি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। ভাইয়া আর আপু দুজন আন্টির কাছে গেলেন। আন্টি মাথা নিচু করেই বলতে লাগলেন, ‘এমন কাজ তুই কিভাবে করলি বল তো শাহেদ? অন্তত আমাদের তো ব্যাপারটা জানাতে পারতি। আমি আর তোর আব্বা কতো কষ্ট পেয়েছি তুই কি বুঝতে পারছিস?’
আপু আর ভাইয়া মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের আসলে কিছুই বলার নেই। কি মনে করে হুট করে দুজনে বিয়ে করে ফেলেছেন, সেটা তারা নিজেরাই জানেন। আমাদের বাসাতেও অবশ্য এই সমস্যা হয়েছিলো, প্রথমে দুজনের কাউকেই আব্বু আম্মু মেনে নেননি। পরে মিম্পি হবার পরে একটু একটু করে যোগাযোগ শুরু হয়। এখন তো সবকিছু স্বাভাবিক।
মিম্পি ছোট ছোট পা ফেলে ওর বাবা মার কাছে এলো। আন্টি ওকে দেখে চোখ মুছে ওকে কোলে তুলে নিলেন। মিম্পি বাধা দিলো না। ও ভীষণ মিশুক। যে কারো কোলে উঠে যায়। এইবার অবশ্য মনে হয় বুঝতে পারছে, যিনি ওকে কোলে নিয়েছেন, তার সাথে কোনো রক্তের টান আছে। ওর ছোট ছোট তুলতুলে হাত দিয়ে আন্টির গাল ধরতে লাগলো বারবার। আন্টি ওর গালে আলতো করে চুমু খেলেন। মিম্পি হেসে উঠলো খিলখিল করে।
আমরা ভেবেছিলাম, আপুর শ্বশুরের সাথেও এভাবেই সম্পর্কটা স্বাভাবিক হবে। মিম্পিকে কোলে নিয়েই তিনি আপু আর দুলাভাইকে মাফ করে দিবেন। কিন্তু তা হলো না। তিনি আমাদের সামনেই আসলেন না। আন্টিকে কড়া নির্দেশ দিয়ে দিলেন, যে কয়দিন আমরা এই বাড়িতে আছি, তার সামনে যেন না যাই। আমরা সেই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে লাগলাম।
আপুর শ্বশুরের সাথে ভাব না হলেও বাড়ির অন্যদের সাথে ভাব হয়ে গেলো। ভাইয়ার চাচাতো ভাইরা সব দল বেধে ভাইয়া , আপু আর মিম্পিকে দেখতে এলো। ভাইয়ার ছোট চাচার ছেলে রাসেল, প্রায় আমার সমবয়সী। ওর ডাকনাম দুদামিয়া। এইরকম নাম কেন, সে কখনো আমাকে বলে নাই। তবে তার সাথে আমার খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। আমাকে নিয়ে সে পুরো গ্রাম ঘুরে দেখাতে লাগলো। গ্রামে আমি এর আগেও অনেক ঘুরেছি, তাই ওদের গ্রামটাকে খুব অসাধারণ কিছু মনে হলো না।
রাসেল অনেক জায়গা ঘুরিয়ে একটা টং দোকানে নিয়ে এসে বললো, ‘তোমাদের ভাগ্য খারাপ বুঝলা। একটা বাজে সময়ে গ্রামে এসেছো।’
আমি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললাম, ‘হ্যাঁ, নদীতে মাছ নাই, শীতকাল না বলে হাঁসগুলার শরীরে চর্বি নাই। এই কথা তুমি মোটামুটি পঞ্চাশবার বলে ফেলছো।’ চায়ে অত্যধিক পরিমাণ চিনি দেয়া হয়েছে। খেয়ে মজা পাচ্ছি না।
রাসেল বললো, ‘ঐগুলো তো আছেই, সাথে অন্য একটা ব্যাপারও আছে। তোমরা শহরের মানুষ, শুনে হাসবা। তাই লজ্জায় বলতেও পারছি না।’
‘আরে, বলো বলো। হাসবো কেন শুধু শুধু?’
রাসেল গলার স্বরটা একটু নিচু করে বললো, তোমরা যে চাচার বাড়িতে আছো, মানে আমার চাচার বাড়ি, বাড়ির পিছে একটা জঙ্গল আছে, দেখছো?’
‘না, জঙ্গল কই? সুপারির বাগান দেখলাম।’
‘সুপারির বাগানের পিছে একটা জঙলার মতো আছে। বেশ বড় একটা জঙলা। আগে মানুষের ভিটা ছিলো, এখন কেও থাকে না। তার পাশে আছে একটা পুকুর। অনেক পুরানো পুকুর। শ্যাওলা পড়ে নোংরা ময়লা হয়ে গেছে। ঐটা কেউ ব্যবহারও করে না। পুকুরের পাড়ে একটা বটগাছ আছে, বটগাছের নিচে একটা মাটির ঘরের মতো আছে। অনেকে বলে মন্দির, অনেকে বলে শ্মশান। আসলে যে কি, কেউ বলতে পারে না।’
আমি বললাম, ‘ইন্টারেস্টিং ব্যাপার তো। দেখতে যেতে হবে।’
‘ঐটা দেখতে যাওয়া যাবে না।’
‘কেন?’
রাসেল কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে বললো, ‘ঐ পুকুরটা মানুষ খায়।’
‘কি?’
‘হ্যাঁ। প্রতিবছর এরকম সময় ঐ পুকুরে ডুবে একজন বা দুজন মানুষ মারা যায়। প্রতিবছর। কেন এমন হয় কেউ বলতে পারে না। গ্রামের মানুষ ভয়ে ঐ পুকুরের আশেপাশে যায় না। তবুও প্রতিবছর ঐখানে লোক মারা যায়। এই সময়টাতেই মারা যায়।’
‘আরে ধুর, এমনটা হয় নাকি?’
‘বললাম না, বিশ্বাস করবা না।’
‘আরে, বিশ্বাস করবো না কেন? এরকম ঘটনা অনেক পুকুর নিয়েই আছে। ঢাকা ভার্সিটির একটা পুকুর নিয়েও এমন কথা আছে, প্রতিবছর সেখানে লোক মারা যায়। কিন্তু কি ব্যাপার জানো, এসবের সবকিছুর পেছনেই কোনো না কোনো কারণ আছে, খুঁজলেই পাবা। ঢাবির পুকুরটা নিয়ে শুনেছিলাম, ওখানে যিনি মারা গেছেন, তিনি দুপুরের খাবার পর গোসল করতে গিয়েছিলেন। খাওয়ার পর মাসল অনেকটা রিল্যাক্স হয়ে যায়, ভালোমতো সাঁতার কাটা যায় না। তাই হয়তো উনি ডুবে গিয়েছিলেন।’
‘তাহলে আমাদের পুকুরটা নিয়ে কি কাহিনী? ওখানে নিশ্চয়ই কেউ খাওয়ার পর সাঁতার কাটতে যায় নাই।’
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম, ‘আমার মনে হয়, ঐখানে কেউ কখনো যায় না, ব্যাপারটা ঠিক না। অনেকেই যায়। আমার মনে হয়, সেই পুকুরে বেশ বড় বড় মাছ আছে। মাছ ধরতেই অনেকে যায়। গিয়ে কোনো কারণে মারা পরে।’
রাসেল বললো, ‘মাছ ধরার ব্যাপারটা সত্যি। আমি নিজেও কয়েকবার মাছ ধরতে গেছি। বড় বড় কালাবাউস মাছ পাওয়া যায় ঐ পুকুরে, খেতে খুব টেস্ট। তবে মাছ ধরতে গিয়ে মানুষ মারা কেন যাবে? আর সবাই যে কেবল মাছ ধরতে যায়, তাও না। যাদের মাছ ধরার ইচ্ছা নাই, তাদেরও ঐ পুকুরে মরতে হয়েছে।’
‘কিরকম?’
‘আজকে না, কালকে বলবো। আজকে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। বাড়ি ফেরা লাগবে।’
রাতে খাওয়া দাওয়ার পর আমার রুমে শুতে গেলাম। আমার রুম থেকে ঐ সুপারি গাছের বাগানটা দেখা যায়। বাগানের ওপাশেই জঙলা। ঐ জায়গাটা কেমন একটু আলো আলো হয়ে আছে। আলেয়া নাকি? কেই বা বলতে পারে?
পরদিন সকালে উঠে কাউকে কিছু না বলে আমি সেই জঙলার দিকে গেলাম। না গেলেই ভালো হতো। একটা বড় সাপের চামড়া দেখলাম। এ জায়গায় সাপ আছে নির্ঘাত। সাপের কামড়েই মনে হয় অনেক লোক মারা যায়। দোষ পড়ে নিরীহ পুকুরের।
পুকুরটাও দেখলাম। চারদিকে গাছপালা ঘেরা নির্জন এক পুকুর। সকালের রোদও গাছপাল ভেদ করে পুকুরে আসতে পারছে না। জায়গাটা বেশ নিস্তব্ধ। কোনো পাখির ডাক নাই, পোকার শব্দও নাই। নিজের হার্টবিটের শব্দ মনে হচ্ছিলো নিজেই শুনতে পারছি।
জায়গাটায় এসে আমার ভীষণ গা ছমছম করছিলো। কেন এমন করছিলো, কে জানে?
বাসায় এসেই আংকেলের সামনে পরে গেলাম। পুকুরের চিন্তা আমার মাথা থেকে উধাও হয়ে গেলো। আংকেল প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘তোমরা যাবা কবে?’
আমি কোনোরকমে বললাম, ‘আংকেল, কালকেই চলে যাবো।’ টের পেলাম, আমার গলায় আমার নিজের স্বর বের হলো না। কে যেন আমার গলার বদলে কোলাব্যাঙের গলা সেট করে দিয়েছে।
ভাইয়া আর আপুর ভীষণ মন খারাপ। আংকেলের সাথে সম্পর্ক ভালো না করেই বাসায় ফিরতে হবে। পরদিন সকাল থেকেই তারা কাপড়-চোপড় গোছানো শুরু করলেন। আমি রাসেলের সাথে বাইরে গেলাম। গ্রামটা শেষবারের মতো একটু দেখে যাই।
রাসেল আমাকে একটা বাসায় নিয়ে এলো। ছোট্ট একটা বাসা। টিনের ঘর। ভেতরে এক মহিলা বসে তরকারি কুটছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘এখানে কেন এনেছো?’
‘তোমাকে কালকে বললাম না, যে সবাই শুধু মাছ ধরবার জন্যই ঐ পুকুরটার ধারে যায় না, অন্য ব্যাপারও থাকে। এই চাচির মেয়ে গতবছর মারা গেছেন ঐ পুকুরে ডুবে। মেয়ে হারিয়ে যাওয়ার পর দুদিন ধরে পুরো গ্রাম চষে ফেলা হয়েছিলো। মেয়েকে পাওয়া যাচ্ছিলো না। দুদিন পর ঐ পুকুরের পাড়ে মেয়েটার লাশ পাওয়া যায়। চাচির একমাত্র মেয়ে। এখনো চাচি ঠিক হয় নাই। মাঝে মাঝেই পাগলামি করেন।’
চাচি আমাদের কথাগুলো শুনতে পান নাই। আমাদের দেখেই হাসিমুখে আমাদের বসতে দিলেন। একটা প্লেটে মুড়ি আর গুড় খেতে দিলেন। মুড়ি খেতে খেতেই দেখলাম তার মুখের ভাব বদলে গেলো। হাসিখুশি মানুষটা কেমন গম্ভীর হয়ে গেলো। আমাদের দিকে তাকিয়ে কান্না কান্না গলায় বললেন, ‘জানো বাবা, মেয়েটার স্কুল যাবার বয়স হয়েছিলো। ওর বাবা কয়েকটা বাচ্চাদের বই কিনে নিয়ে এসেছিলো, সেটাই উল্টায় পাল্টায় দেখতো। আগামী বছরই স্কুলে ভর্তি করার ইচ্ছা ছিলো। এর মাঝেই সব শেষ।’
আমরা সান্তনা দিচ্ছিলাম। কিন্তু সান্তনায় কোনো কাজ হচ্ছিলো না।
চাচি বলেই চললেন, ‘আমার আরো সাবধান হবার উচিত ছিলো বাবা। পুষ্কনির মানুষটার ডাক দেয়ার সময় চলে আসছিলো, মেয়েকে তখনই আগলায় রাখার দরকার ছিলো। আমি পারি নাই। আমার জন্যই আমার মেয়ে মরছে।’
আমি বললাম, ‘এমন করে বলেন কেন চাচি? আপনার জন্য মেয়ে কেন মারা যাবে। এটা একটা অ্যাক্সিডেন্ট। আর পুষ্কনির মানুষ মানে কি?’
চাচি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ও, তুমি জানো না? ঐ পুষ্কনির নিচে একটা মানুষ থাকে। অনেক অনেক বছর ধরেই আছে। আমার শ্বশুর-দাদা শ্বশুর, তাদের বাবা-দাদারাও ঐ মানুষটার কথা জানতো। ঐ মানুষটা পুকুরের নিচে শুয়ে থাকে সারা বছর। শুধু এরকম সময়ই ঘুম থেকে উঠে। এরপর একটা দুইটা মানুষকে ধরে পুকুরের মধ্যে নিয়ে যায়। ডাক দিয়ে নিয়ে যায় নিশির ডাকের মতো, ঐ ডাক কেউ এড়াতে পারে না। ওদের রক্ত চুষে শরীরটা পানির ওপর ছেড়ে দেয়। আমার মেয়েরও এমন করেছিলো। ওর শরীরে কোনো রক্ত ছিলো না।’
আমরা ওঠার উপক্রম করছি। এর মধ্যেই চাচি হঠাৎ আমাকে ডাকলেন। বললেন, ‘তোমাদের বাসায় একটা ছোট্ট মেয়ে আছে না?’
মিম্পির কথা বলছে নিশ্চয়ই। আমি বললাম, ‘জ্বি।’
‘ওরে সাবধানে রাইখো। মানুষটা কিন্তু বাচ্চাদের রক্ত খাইতে বেশি পছন্দ করে।’ চাচি কেমন শীতল গলায় বললেন কথাটা। আমার ভালো লাগলো না।
ঘরে ফেরবার পথে রাসেল বললো, ‘কি বুঝলা।’
‘বুঝলাম মেয়েকে হারিয়ে উনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। উল্টাপাল্টা বকতেছেন।’
‘তোমরা শহরের মানুষরা কিছুই বিশ্বাস করো না। এইখানে আমরা কতো কিছুই দেখি। কাউকে বলতে পারি না হাসাহাসির ভয়ে। যুক্তি দিয়া দুনিয়ার সবকিছুর ব্যাখ্যা করা যায় না।’
‘না, করা যায়। আচ্ছা, যাই হোক, তোমার দুদামিয়া নামটার কারণ আমি জানতে পেরেছি। ছোটবেলায় তুমি আন্টি মানে আমার বোনের শাশুড়িকে বিয়ে করতে চাইতা। এইজন্য তোমার নাম হয়েছে দুদামিয়া। বরিশালের ভাষায় দুদা মানে হলো চাচা। আমি কি ঠিক বলেছি?’
রাসেল আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘তুমি আমার কুটুম মানুষ দেখে কিছু বললাম না। না হলে মেরে নাক মুখ একদম ফাটিয়ে ফেলতাম।’
আমার বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো। বাড়ির কাছাকাছি এসেই দেখলাম, কে যেন প্রচন্ড আতংকে ছুটে বেড়াচ্ছে। উর্মি আপু! আপু আমার কাছে এসে প্রচন্ড ভয় নিয়ে বলতে লাগলেন, ‘মিম্পিকে দেখেছিস? মিম্পিকে?’
না। কোথায় যাবে মিম্পি? এই রাতের বেলা?
চারিদিকে খোঁজ পড়ে গেলো। মিম্পিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মেয়েটা একটু চঞ্চল হলেও মাকে ছেড়ে কোথাও যায় না সাধারণত। আপু আজ একটু রান্নাঘরে গিয়েছিলো মিম্পিকে বাইরের ঘরে ঘুম পাড়িয়ে। ফিরে এসেই দেখে মিম্পি নেই।
কে যেন খবর দিলো দুই বাসা পরে এক চাচির বাসায় মিম্পিকে দেখা গেছে। সবাই ছুটলো সেখানে। আমার কেন যেন মনে হচ্ছিলো মিম্পিকে ঐ বাড়িতে খুঁজে পাওয়া যাবে না। ঐ বাড়িতে থাকলে এতোক্ষণে মিম্পির খোঁজ এসে যেত। মিম্পি ঐ বাড়িতে নেই।
ঘরে ঢুকলাম। টেবিলের ওপর ছোট্ট চার্জেবল টর্চলাইট রাখা। ওটা নিয়েই বেরিয়ে পড়লাম। মিম্পিকে খুঁজতে হবে।
আজকে আকাশটা কেমন যেন। বিকেল থেকেই মেঘ হয়ে ছিলো। রাত নামার পরও মেঘ কাটেনি। আকাশে কোনো তারা নেই। মেঘের ফাঁক দিয়ে বাঁকা একটা চাঁদ উঁকি মারছে একটু পর পর। নিস্তব্ধ রাত্রিবেলা চাঁদটাকে কেমন রহস্যময় মনে হয়।
আমি সুপারি বাগানের দিকে হাঁটতে থাকি। চাঁদ না থাকায় বাগানটা ভীষণ অন্ধকার। মিম্পির নাম ধরে ডাকি। দু তিনটা ঝিঁঝিঁ পোকা সাড়া দেয়। মিম্পির সাড়া পাওয়া যায় না।
সুপারি বাগানে মিম্পি নেই। আর সামনে এগোতে ইচ্ছা করে না। মিম্পির এতোদূর আসার কথা নয়। আমারও ঐ পুকুরটার ধারে যেতে ইচ্ছে করে না। ফিরে আসতে যাবো, মনটা কেমন যেন খচখচ করতে থাকে। একটু দেখে আসি না পুকুরের ধারটা। যদি কিছু পাই।
আমি টর্চের অল্প আলোয় পুকুরপাড়ের দিকে এগোই। এখানে অন্ধকার আরো ভীষণ। অনেক অন্ধকার জমাট বেঁধে যেন পাথরের মতোন শক্ত হয়ে গেছে।
পুকুরপাড়ের ধারটা খুব নির্জন। সুপারিবাগানে যে ঝিঁঝিঁ ডাকছিলো দুয়েকটা, এখানে তাও নেই। নিস্তব্ধ অন্ধকার বুকে কেমন একটা চাপ এনে দেয়। আমি টর্চের আলো পুকুরের চারধারে মারি। যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে ভাগা লাগবে।
পুকুরের আশেপাশে কিছু নেই। তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে হবে। যতো দ্রুত সম্ভব।
আমি ফেরার জন্য ঘুরেছি, হঠাৎ কিছু একটা দেখে যেন চোখ আটকে গেলো। পুকুরপাড়ে বটগাছটার কাছে কিছু একটা দাঁড়িয়ে আছে। ভয়ে আমার বুকে কামারের হাপড় পেটা শুরু হয়ে যায়। আমি ডাকি, ‘কে? কে?’ কোনো সাড়া আসে না।
আমি টর্চের লাইটটা সেদিকে ধরি। ভয়ে আতংকে আমার মুখ হা হয়ে যায়। মিম্পি ঐ পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে আছে। একা।
আমি ছুটে মিম্পির কাছে যাই।ওকে জড়িয়ে ধরি বলি, ‘মামা, তুমি এখানে কি করো? চলো বাড়ি চলো। সবাই খুঁজছে তোমাকে।’
মিম্পি আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। কেমন ভাবলেশহীন চোখ। যেন আমার কথা শুনতে পায়নি।
আমি ওকে কোলে তুলে নেই। বাড়ির দিকে এগোই।তখনই একটা শব্দ আসে আমার কানে। পানিতে কিছুর শব্দ। কি যেন ভেসে আসছে পুকুর থেকে।
আমি পুকুরে টর্চের আলো ধরি। প্রথমে কিছুই দেখতে পাই না। একটা নারকেল যেন পুকুরে ভেসে আছে। ভাসতে ভাসতে আমাদের দিকে আসছে।
এরপরই ব্যাপারটা আমি টের পাই। ওটা নারকেল না। একটা মানুষ। একটা মানুষ পুকুরে ভেসে ভেসে ভয়ংকর গতিতে এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে।
আমি দৌড়ে পালাতে চাই। কিন্তু কে যেন আমার পা টা বেঁধে ফেলেছে মাটির সাথে।
মানুষটা পুকুর থেকে উঠে আসে। তার সারা গা সবুজ।শ্যাওলা পড়েছে শরীরে। সে এসে মিম্পিকে ছো মেরে নিয়ে নেয় আমার কাছ থেকে। এরপর এগোতে থাকে পুকুরের দিকে।
আমি কি করবো বুঝতে পারছি না। একটা শুকনো ডাল পড়েছিলো পুকুরের পাড়ে। সেটা নিয়ে ওটাকে বাড়ি দিতে যাই। কাজ হলো না। ডালের বাড়িতে ওটা কোনো ভ্রূক্ষেপই করে না।
হঠাৎ, হঠাৎ করেই বুঝতে পারি জায়গাটা বেশ আলোকিত হয়ে গেছে। আরেকজন কে যেন টর্চ নিয়ে চলে এসেছে এই পুকুরের ধারে। লোকটা কাছে আসতেই দেখি, আপুর শ্বশুর। আমাকে তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘এখানে কি করছো? কি হয়েছে?’
আমি কোনোরকম কাঁদো কাঁদো স্বরে বলি, ‘আংকেল, মিম্পিকে নিয়ে যাচ্ছে।’
আংকেল টর্চ মেরে একবার সেই মানুষটাকে দেখলো। এরপর একটুও ইতস্তত করলো না। একেবারে পুকুরে নেমে ঝাঁপিয়ে পড়লো মানুষটার ওপর। সেটা তখনও পুকুরে তলায় ডুব দিতে পারেনি।
দুজনের ধস্তাধস্তি শুরু হলো। মিম্পি মানুষটার হাত থেকে ছাড়া পেয়ে গেছে। আমি পুকুরে নেমে মিম্পিকে উঠিয়ে নিয়ে এলাম। আংকেল মানুষটার সাথে ধস্তাধস্তি করতে করতেই একবার আমার দিকে তাকালেন, মিম্পিকে উঠিয়ে নিয়েছি দেখে খুশি হলেন যেন, একটু হাসলেন। আমি তাকে এর আগে কখনো হাসতে দেখিনি। মিম্পি ভয়ে কাঁপছে। ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে পুকুর পাড়ে উঠে এলাম। এরপর পুকুরের দিকে তাকালাম। পুকুর একদম শান্ত। কোনো আন্দোলন নেই। কোনো মানুষ নেই।
মিম্পিকে আপুর কাছে দিয়ে আমরা অনেকেই গেলাম পুকুর পাড়ে, লাঠিসোটা নিয়ে। অনেক খোঁজাখুঁজি করা হলো, পুকুর পাড়ে, পুকুরে নেমে। আংকেলকে খুঁজে পাওয়া গেলো না।
সেইদিনের পর আরো সাতদিন ছিলাম আমরা ঐ বাড়িতে। প্রতিদিন পুকুরপাড়ে গিয়ে বসে থাকতাম। আংকেলকে যদি একবার দেখা যায়। অন্তত আংকেলের শরীরটা যদি ভেসে ওঠে। রাসেল বলেছিলো, কেউ এই পুকুরে পড়লে দুইদিনের ভেতরেই তার লাশ পাওয়া যায়। কিন্তু সাতদিন চলে গেলো, আংকেলের কোনো হদিস পাওয়া গেলো না। আংকেলের কি হয়েছে, কোথায় গেছেন তিনি, একবারও জানতে পারলাম না আমরা।
সাতদিন পর আমরা ঢাকায় চলে আসি। এরপর আর আপুর শ্বশুরবাড়িতে যাওয়া হয়নি আমার। আপুর শাশুড়ি এখন আপুদের সাথে ঢাকাতেই থাকেন। মাঝেমাঝে তারা গ্রামে যান। আমি কখনো যাই না।
দুইবছর কেটে গেছে সেই ঘটনার পর। এখনো আংকেলের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। পুকুরটা এখনও তেমনই আছে। শুনেছি, পুকুরটা ভরাট করে ফেলার একটা প্রস্তাব দেয়া হয়েছিলো প্রশাসনের পক্ষ থেকে। এলাকাবাসীরা মানেননি। তারা পুকুরটাকে ভীষণ ভয় পায়। পুকুরের ভেতরে যে বাস করে, তাকে ভয় পায়। তাকে কোনোভাবেই রাগাতে চায় না তারা।
তবে এখন মাঝে মাঝে আমি স্বপ্ন দেখি। অদ্ভুত একটা স্বপ্ন। দেখি, পুকুরের তলদেশে, গভীর পানির নিচে, আংকেল বসে আছেন, চুপচাপ। তার মুখ চোখ খোলা, চুল দাড়ি বড়বড়, সেই চুল দাড়ি পানিতে ভাসছে। তিনি বেঁচে আছেন না মরে গেছেন, বোঝা যাচ্ছে না। তার সামনে অন্ধকার। সেই অন্ধকারে কেউ একজন বসে আছে। তার সারা গায়ে শ্যাওলা। হাতের তালুতে আঁশ।
মানুষটা আমার দিকে তাকায়। আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। অদ্ভুত এক ভয় আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে, সারারাত।