তাহারা

নোভা আপু ভয় পাওয়া গলায় বললেন, ‘ও যে আমার হাত টানতো প্রতিরাতে, আমি টের পেতাম।’
আমি বসে আছি রান্নাঘরে। নোভা আপু চা বানিয়েছেন। বিখ্যাত মালাই চা। চায়ের সাথে চলছে গল্প। আপুর নিজের জীবনের ঘটনা। আমি তন্ময় হয়ে শুনছি। মুন্সীগঞ্জের বাতাসে আজকে বৃষ্টির ঘ্রাণ, বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় গল্প শুনতে ভালো লাগছে।
‘ছেলেটা ছোট। নয় দশ বছর বয়েস। রাতে সে আমার হাত ধরে টানতো। প্রতিদিন রাতে, একই সময়ে। ছেলেটাকে আমি চিনতাম না।’
‘তারপর? ছেলেটা হাত টেনে পালিয়ে যেত?’
‘না। আমার ভেঙে যেত ঘুম। ঘুম ভেঙে প্রতিরাতে দেখতাম ঠিক সাড়ে তিনটা বাজে।’
আমি হতাশ। ঘুমের গল্প। আমরা ভাবছিলাম সত্যি সত্যি দেখতো।
‘তবে একটা জিনিস দেখতাম, জানিস?’
‘কি?’
‘ঘুম ভেঙেই দেখতাম, হাতে পাঁচ আঙুলের দাগ পড়ে আছে।’
ইন্টারেস্টিং ব্যাপার। আমি চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছি। আপুর আম্মু রান্নাঘরে এসে ঘুরাঘুরি করে চলে গেছেন। আমার দিকে একবার তাকিয়েছিলেন, আমি কিছু বললাম না। গল্প শোনায় মশগুল তখন।
আপু বলে চললেন, ‘এই যে প্রতিরাতে এরাম স্বপ্ন দেখছি, অনেককেই বলেছিলাম। কেউ বিশ্বাস করতো‌ না। সবাই বলতো স্বপ্ন তো স্বপ্নই। স্বপ্ন কখনো সত্যি হয়? আর হাতের ছাপের ব্যাপারটা বলতো যে আমি নিজেই ঘুমের ঘোরে হাত চাপা দিয়ে এরকম ছাপ বানিয়েছি‌। কথাটা অবশ্য সত্য হতেও পারে। ছাপটার সাথে আমার হাতের সাইজ মিলে যেত।’
আমরা চুমুক দিলাম চায়ের কাপে। বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আপুদের রান্নাঘরের টিনের চালে খুব সুন্দর শব্দ করছে তৈরি করছে বৃষ্টির কণা।
আমি বললাম, ‘তাহলে কি? কেইস তো সলভড।’
‘না রে না। কেইস সবে শুরু।’
আপু তার মায়াবী মুখটায় অদ্ভুত হাসি ফুটিয়ে বললো, ‘আমার মাথাব্যথাটা হঠাৎ করে বাড়ির সবার মাথাব্যথা হয়ে গেলো। কেন জানিস? কারণ বাড়ির অন্যরাও ছেলেটাকে দেখা শুরু করলো।’
বিকট শব্দে বাজ পড়লো। আমি আঁতকে উঠলাম। কি বলে আপু? এটা কি সম্ভব?
‘আম্মু একদিন রাত তিনটায় উঠেছেন বাথরুমে যাবেন বলে। উঠোন পেরিয়ে বাথরুম। উঠোনের কোণায় আমার ঘর। মা দেখেন, আমার ঘরের ভেতর থেকে জানালার গরাদ ধরে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। দশ বছর বয়স। ছেলেটার মুখে হাসি। হাসিমুখে মাকে দেখছে সে। রাত তখন তিনটে। চারদিক অন্ধকার।’
আমাদের ভেতর ভয়ের এক স্রোত বয়ে গেলো। জিজ্ঞেস করলাম, ‘তারপর?’
‘তারপর মা চিৎকার করলো। লোক জড়ো হলো। ছেলেটা ততক্ষণে নাই।’
আপু নিজের জন্য বানানো চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘আমার চা টা ভালো হয় নাই। চিনি কম দিয়েছি তো। ডায়েট করলে যে কতো কি মেইনটেইন করতে হবে, আল্লাহ মালুম।’
আমি বললাম, ‘তারপর কি হলো?’
নোভা আপু একটু চুপ করে থেকে বললো, ‘এরপর অনেকেই দেখতে পারতো ছেলেটাকে। প্রথমে আমার ঘরেই দেখতো। এরপর উঠোনে। এরপর এর ওর ঘরে। পুরো বাড়ি ঘুরে বেড়াত ছেলেটা। ঠিক রাতের বেলায়। রাত তিনটা চারটার দিকে।
আমরা প্রথমে ভয় পেতাম। খুব ভয়। এরপর ভয়টা একটু কমলো। ছেলেটা তো ঘুরেই বেড়াচ্ছে। ক্ষতি তো কিছু করছে না। থাকুক না হয় আমাদের সাথে। মানুষের সাথে সাথে একটা জ্বীন বাচ্চাও আমাদের বাড়িতে বড় হোক।’
চুলার আগুনটা বাতাসে কাঁপছে। ঘরে আর আলো নেই। ইলেকট্রিসিটি চলে গেছে। গ্রামে এই সমস্যা, ঝড় বৃষ্টি হলেই কারেন্ট নাই।
জিজ্ঞেস করলাম, ‘তারপর কি হলো?’
‘তারপর? তারপর আরেকটা ব্যাপার হলো। সবাই একজন মহিলাকে দেখা শুরু করলো বাসায়। প্রথমে মা ই দেখলেন। রাতে বাথরুমে যাচ্ছেন, দেখেন রান্নাঘরে কে বসে আছে। চুলা ধরাচ্ছে। মা প্রথমে ভেবেছিলেন বড় চাচি। জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি করেন ভাবি এতো রাতে?’ মহিলাটা মায়ের দিকে ফিরলো। অদ্ভুত এক হাসি দিলো। এরপর মায়ের চোখের সামনে থেকেই উধাও হয়ে গেলো।
এরপর অনেকেই দেখলেন মহিলাকে। রাতে উঠোন ঝাঁট দেয়। রান্না করে। রান্না খাবার অবশ্য কে খায় জানি না।‌মাঝে মাঝে দাওয়ায় বসে গুণগুণ করেও গান‌ গায়।’
আমি বাইরে দাওয়ার দিকে তাকালাম। এখন সন্ধ্যারাত, ভয়ের কিছু নাই। দাওয়ায় আপুর ফ্যামিলি বসে আছে। আংকেল, আন্টি আর শিকু। নোভা আপু চুলার আঁচ বাড়িয়ে দিলেন। আরেক কাপ চা বসাবেন হয়তো।
‘তারপর কি হলো আপু? গল্প শেষ করো।’
নোভা আপু চায়ের কাপে দ্বিতীয় চুমুক দিয়ে বললেন, ‘ছেলে আর মহিলা আসছে সমস্যা নাই। সমস্যা হলো অন্য জায়গায়। এক রাতে আমার ঘুম ভেঙেছে। কেন ভেঙেছে জানি না। ভাবলাম ঐ ছেলেটাই ভাঙিয়েছে। উঠে জানালার দিকে তাকিয়েছি। দেখলাম, একটা লোক তাকিয়ে আছে আমার দিকে। তার চোখে ভয়ানক হাসির ছাপ। আমার যে কি ভয় লাগলো। আমাদের বাসায় জ্বীনের উৎপাত, এতোদিনে ব্যাপারটা আমাদের গা সওয়া হয়ে যাওয়ার কথা। অথচ সেই মুখ দেখে আমার ভয়টা একটুও চাপতে পারলাম না। ভীষণ জোরে চিৎকার দিলাম। পরিবারের সবাই দৌড়ে এলো। লোকটা নাই।’
আপু চুলায় চায়ের কেটলি বসিয়েছেন। চা ফুটছে। আমি গল্পের বাকি অংশ শোনার আগ্রহে। আপু চুলার আঁচ একটু কমিয়ে বসলেন চুপচাপ। আমি বললাম, ‘এরপর কি হলো আমি বলি। তোমার ফ্যামিলির সবাই ঐ লোকটাকেও দেখা শুরু করলো, তাই না? যেরকম ঐ মহিলা আর ছেলেটাকে দেখেছিলো?’
আপু রহস্যময় ভাবে হেসে বললেন, ‘না।’
‘তবে।’
আপু চোখ নামিয়ে বললেন, ‘পরের রাতে আব্বু, আম্মু আর শিকুর রুমে ওরা হানা দিলো। ওরা তিনজন। লোকটা, মহিলাটা আর ছেলেটা। তিনজনকেই মে*রে পুঁ*তে ফেললো বাড়ির পেছনে। আমাকে বাঁচিয়ে রাখলো। তাদের পরিবারে মেয়ে নেই। আমাকে তাদের বাঁচিয়ে রাখা দরকার।’
আমি হো হো করে হেসে বললাম, ‘আপু, এতোক্ষণ বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলছিলা, তাই না? একটা জ্বীন পরিবার তোমাদের বাড়িতে হা*মলা করে পরিবারের সবাইকে মে*রে ফেলে বাড়ি দখল করে বাঁচিয়ে রাখছে শুধু তোমাকে। এটা কি বিশ্বাস করা যায়? তুমি চাপা মারছো।’
আপু ম্লান হেসে বললো, ‘তোর মনে হলো কেন, আমি চাপা মারছি?’
‘কারণ তোমার ফ্যামিলি এখনও বেঁচে আছে।’
‘কোথায়?’
‘ঐ যে দূরে দাওয়ায় বসা।’
‘তুই আমার ফ্যামিলির কাউকে দেখেছিস?’
‘না দেখিনি। শুধু তোমার মুখেই শুনেছি। তোমার বাবা, মা আর তোমার দশ বছরের ভাই শিকুর কথা।’
আপু আমার দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বললো, ‘ঐটা আমার ফ্যামিলি না। ওরা অন্য কেউ। জ্বীন বা অন্য কিছু। আমাকেও ওরা একদিন মে*রে ফেলবে। আমাকে বাঁচা তুই। আমাকে বাঁচা।’
আপুর চোখে ভয়। প্রচন্ড ভয়।
আমি দাওয়ার দিকে তাকালাম। দাওয়ায় বসা তিনজন এখনও আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের চোখ দুটো স্থির। মুখে ভয়ংকর হাসি। হাসিটা মানুষের না। কোনো মানুষ এভাবে হাসতে পারে না, কখনোই না।

Be the first to write a review

2 Responses

Leave a Reply

We’re sorry you’ve had a bad experience. Before you post your review, feel free to contact us, so we can help resolve your issue.

Post Review

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক গল্প