ব্যক্তিগত #পর্বঃ০২

চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানুষের হাড়।
ঠিক সেই সময় আমি পেছন থেকে খুব পরিচিত নারীকন্ঠে শুনলাম,
ব্যক্তিগতকে কখনো জানতে হয়না।
কথাটি শুনে যেই আমি পেছন ফিরতে যাবো ঠিক সেই সময় আমার মুখে রুমাল চেপে ধরা হলো।
ঘটনার আকস্মিকতায় আমি কিছু বুঝে উঠতে পারার আগেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলাম আফ্রিকান মাগুরভর্তি পুকুরটিতে।
মৃত্যু যখন আসে তখন তাকে থামিয়ে রাখা যায়না, আবার যখন মৃত্যু আসেনা তখন তাকে হাজার চেষ্টা করেও আনা যায়না।
কথাটি সত্য। কেননা, অজ্ঞান অবস্থায় ক্ষুধার্থ আফ্রিকান মাগুর ভর্তি পুকুরে ফেলে দেবার পরও আমি কেনো বেঁচে উঠবো।
তবে, একটা জিনিস আমার মাথায় ঢুকলোনা। সাধারণত ক্লোরোফর্ম দিয়ে অজ্ঞান করলে আধঘন্টা, একঘন্টার মধ্যে হুশ ফিরেনা। কিন্তু আমার ১০ মিনিটেই ফিরলো। হুশ ফেরার পর পাড়ে উঠে একটা জিনিস আবিষ্কার করলাম, আর সেটা হলো আফ্রিকান মাগুর মানুষ খায় কি না, আগে তা আমার জানা ছিলনা। তবে, মানুষ খেকো হলে মানুষেরা আর যাই হোক এর চাষ তো করতোনা।
তাহলে, মানুষগুলোকে কে খেয়েছে? এবং ঠিক তখনই আমি আবিষ্কার করলাম, আমার গায়ে হাত পায়ে অনেকগুলি জোক লেগে আছে। একে একে তাদের ছাড়িয়ে পানিতে ফেলতে আবিষ্কার করলাম মাগুরের পাশাপাশি ধারালো দাঁতের কিছু মাছ রয়েছে।
পুরোপুরিভাবে পুকুরটার দিকে তাকিয়ে ধরতে পারলাম, পুকুরটা তিনভাগে বিভক্ত। সামনের অংশে আফ্রিকান মাগুর মাছ, যাদের দেখে সবাই ভাববে মাছ চাষ করা হয়। আর পেছনের দিকে দুই ভাগে বিভক্ত। একভাগে জোকের চাষ করা হয়, আরেকভাগে পিরানহা মাছের চাষ।
অর্থ্যাৎ, পুকুরটাকে মৃত্যুকূপ হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। পার্টিশন রেখে ফ্লো এমন ভাবে করা হয়েছে যাতে প্রথমে দেহ থেকে সব রক্ত জোক শুষে নিয়ে ফেলে। তারপর, সেখান থেকে দেহ চলে পিরানহার পার্টিশনে। ওখানে পিরানহা দেহের মাংস খেয়ে নিবে। তারপর চলে আসবে আফ্রিকান মাগুরের কাছে। কোন প্রকার মাংস অবশিষ্ট থাকলে তা আফ্রিকান মাগুর খেয়ে ফেলবে। এতে করে শুধু পাওয়া যাবে হাড়। তারপর সেই হাড়কে গায়েব করে দিয়ে একটা মানুষকে সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেলা যাবে।
কিন্তু, কেনো?
এই কেনো’র পাশাপাশি প্রশ্ন জাগে শায়লা তাহলে আমাকে ওই সিস্টেম অনুযায়ী ফেললো না কেনো? তাহলে, শায়লা কি কোন কারণে আমাকে বাঁচাতে চেয়েছিলো?
সে যাই হোক, আমাকে যেভাবেই হোক, এখান থেকে বের হতে হবে। কেননা, এখানে বেশিক্ষণ থাকলে আমার মৃত্যু অবধারিত। তাই, আমি চারপাশ ঘুরে বের হবার পথ খুঁজতে লাগলাম। সবকিছু ঘুরে দেখার পর আমি বুঝতে পারলাম, এখান থেকে বের হবার পথ একটাই। সামনের ঐ দরজাটা। কিন্তু ওটা দিয়ে এখন বের হওয়া যাবেনা। বের হতে হলে রাতে বের হতে হবে। কারণ, রাতে এখানে ভীড় থাকবে। এবং সেইসময় ভীড়ে কে বের হলো সেদিকে কেউ খেয়াল করবেনা।
সুতরাং, আমার হাতে এখনো অনেক সময়। এবং এই সময়ে আমাকে এই পুকুরের থেকে যা যা তথ্য সংগ্রহ করা যায়, সংগ্রহ করে নিতে হবে।
আমি এদিক ওদিক খোঁজাখুঁজির পরও কোন তথ্যা না পেয়ে হতাশ হয়ে যাচ্ছিলাম, আর ঠিক তখনই দরজার পাশের পাইপটা দিয়ে একটি লাশ আসতে দেখলাম। লাশটা স্লাইড করে এসে সরাসরি পড়লো জোঁকের পার্টিশনে, তারপর পিরানহা, তারপর আফ্রিকান মাগুরের কাছে। চোখের সামনেই লাশ থেকে হাড়ে পরিণত হলো একটা শরীর।
এর মধ্যে রাত হয়ে গেলো। হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ পেলাম আমি। শব্দ শুনেই আমি পুকুর পাড়ের নীচের দিকে লুকিয়ে গেলাম। দূর থেকে একটা আলোকরশ্নি এগিয়ে আসছে, আর ঠিক তখনই আমি অনুভব করলাম, আফ্রিকান মাগুরেরা আমার পায়ের কাছে ঘুরঘুর করছে। অর্থ্যাৎ, যেভাবেই হোক আমাকে এখান থেকে উঠতে হবে। এসব ভাবতে ভাবতে আলোটা আমার বরাবর চলে এলো। কাছে আসতেই আমি তাকে জাপটে ধরলাম। সে কিছু বলার আগেই মুখ চেপে ধরলাম। তারপর সোজা নিয়ে গেলাম জোঁকের পার্টিশনে।
লোকটা ভয়ে ভয়ে বললো,
আমারে ছাইড়া দেন, আমি কিছু করিনাই।
আমি বললাম, তাহলে বল কিভাবে বের হবো?
লোকটি বললো, চুপচাপ আমারে অনুসরণ করে যাবেন। আপনারে বাইর করার দায়িত্ব আমার।
আমি সন্দেহ নিয়ে বললাম, তোরে অনুসরণ করতে যাবো কেন? তুই তো শেষে ধরা খাওয়াই দিবি।
লোকটি বললো, স্যার, আমার ডিউটি নাই আজকে। তাও ডিউটি নিসি। কারণ, আপনি এখানে আছেন।
আমি অবাক হয়ে বললাম, আমি আছি দেখে তুই ডিউটি নিলি কেন?
লোকটি বললো, স্যার, আমার মেয়েরে আপনি বাঁচাইছিলেন। মনে আছে, মেহেরুন্নেসার কথা?
আমি লোকটার গা থেকে হাত সরিয়ে নিলাম। তারপর বললাম,
চলেন আমারে পথ দেখান। এবার আপনার পালা আমারে মুক্ত করার।
লোকটির দেখানো পথ অনুসরণ করে আমি দরজা দিয়ে বেরিয়ে আস্তে আস্তে পতিতাপল্লী থেকে বের হয়ে যাচ্ছিলাম। আর, ঠিক তখনই আমি সামনে পড়ি শায়লার।
শায়লা আমাকে দেখেও না দেখার ভান করে চলে গেলো।
আর, শায়লার এই কাজে আমি অবাক না হয়ে পারলাম না। শায়লা আসলে কি চাচ্ছে? কি করতে চাচ্ছে সে? ও কি আমার হয়ে কাজ করতেছে? না কি সবই কাকতালীয়?
এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে আমি পতিতাপল্লী থেকে বের হয়ে গেছি টেরও পাইনি।
মেহেরুন্নেসার বাবার ডাকে বুঝতে পারলাম, আমি মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে এসেছি।

পতিতাপল্লী থেকে বের হয়ে আমি সোজা চলে এলাম অফিসে। আপাতত, আমার জন্য ঘর মোটেও নিরাপদ নয়। অফিসে বসে বসে আমি নিখোঁজ কেসের ফাইলগুলো খুঁজতে শুরু করলাম। এবং সেখান থেকে আবিষ্কার করলাম গত এক সপ্তাহে নিখোঁজ কেস ২১ টা। এবং এই ২১ টা কেসের ভিক্টিমদের সর্বশেষ রাতের ৮ পর্যন্ত খোঁজ পাওয়া গিয়েছিলো।
অর্থ্যাৎ, ধারণা করা যায়, এদের পতিতাপল্লীতে যাবার অভ্যেস আছে। কেননা, প্রায়দিনই ৮টা -১০ টা এদের খবর পাওয়া যেতোনা।
এরপর, ভিক্টিমদের অবস্থান অনুসন্ধান করে জানা যায়, তারা পতিতাপল্লীর আশে পাশেই ছিলো নিখোঁজ হবার শেষ মুহুর্তে।
এই নিখোঁজ হবার কেসগুলোর ফাইলগুলো ঘেটে আর বিশেষ কোন তথ্যই উদ্ধার করতে পারলাম না। পতিতাপল্লী যাওয়া ছাড়া এদের আর কোন সম্পর্কই খুঁজে পাওয়া গেলোনা ভিক্টিম হবার জন্যে। সুতরাং, এই ফাইলগুলো আমার কোন কাজে লাগবেনা। তাহলে, কি করা যায়?
চিন্তা করতে করতে আমি একটার পর একটা সিগারেট টানতে লাগলাম। কিন্তু, কোন ক্লু খুঁজে বের করতে পারছিলাম না।
তখন হঠাৎ আমার গুরুর দীক্ষার কথা মনে পড়লো। তিনি বলেছিলেন,
যখন কোন কিছুতে সেটা কাজ হোক কিংবা ক্রিমান কেইস হোক কি করতে হবে বুঝতে পারবা না, তখন মেডিটেশন করতে বসে যাবা। মেডিটেশনের ফলে মাথা ঠান্ডা হবে। আর, মাথা ঠান্ডা হবার পর যেখান থেকে শুরু হয়েছিলো সেখান থেকে পুনরায় ভাবতে শুরু করবা। দেখবা, একটা না একটা পথ চলে আসবে তোমার সামনে।
আমি গুরুর কথা মেনে মেডিটেশন শুরু করলাম। তারপর, প্রথম থেকে ভাবতে লাগলাম।
পুরো কেইসটার সূচনা হয়েছিলো শায়লা থেকে। তারপর, সেই পতিতালয়, তারপর পুকুর।
যেহেতু, পতিতালয়ের রহস্য বের করার জন্যে এতোকিছু করছি সুতরাং পতিতালয় এখন কোন কাজে দিবেনা। তারপর, পুকুরের সবকিছু জানা হয়ে গেছে। তাহলে, বাকী থাকলো শায়লা।
শায়লার প্রায় সবটাই আমার জানা। তাহলে, শুরু করবো কি দিয়ে?
আর ঠিক তখনই মাথায় এলো ব্যক্তিগত শব্দটি।
শায়লার ব্যক্তিগত একটা অংশ আমার জানা নেই, যা আমেরিকায় থাকাকালীন ঘটেছিলো।
সুতরাং, আমাকে এই বিষয়টাকে উদ্ধার করতে হবে।
আমি শায়লার সেই সময়কার ঘটনার সাথে সম্পর্কযুক্ত মানুষদের খুঁজতে লাগলাম। আর ঠিক সেই সময় আমার মনে পড়লো শায়লার ল্যাপটপের কথা, যেটা ও আমাকে কখনো ধরতে দেয়নি।
আমি ল্যাপটপের রহস্য ভাঙার জন্য পিস্তলটা সাথে নিয়ে বের হয়ে গেলাম আমার বাসার উদ্দেশ্যে।
সময় এখন সকাল ১০ টা। শায়লার এখন কোনভাবেই বাসায় থাকার কথা না। আমি বাসার সামনে এসে দেখলাম, ঘর তালাবদ্ধ। অর্থ্যাৎ, শায়লা বের হয়ে গেছে।
ঘরের চাবিটি দিয়ে তালা খুলে আমি ভেতরে ঢুকে গেলাম। ভেতরে ঢুকে এদিক ওদিক ঘুরে মাথাটাকে একটু শান্ত করলাম। তারপর, চলে গেলাম আমাদের রুমে।
আমার রুমের এদিক ওদিক দেখে ল্যাপটপটিকে আবিষ্কার করলাম শায়লার ড্রয়ারে; যেখানে ও সবসময় রাখে।
ল্যাপটপটি অন করে দেখলাম পাসওয়ার্ড প্রটেক্টেড। এটা শায়লার সবচেয়ে ব্যক্তিগত বস্তু, সুতরাং এটার পাসওয়ার্ড সবচেয়ে কঠিন হবে। প্রথমবার আমাদের জানা পাসওয়ার্ড দিতে খেয়াল করলাম হিন্টসে দেওয়া আছে, “case starting word”।
আমি খানিকটা অবাক হলাম। তাহলে, কি শায়লা জানে আমি ওর ল্যাপটপ ঘাটবো? আর যদি জেনেই থাকে, তবে এখানে রাখলো কেন? রাখলো তো রাখলো পাসওয়ার্ডের হিন্টসই বা দিলো কেন?
ও কি আমাকে সাহায্য করতে চায়? যদি চায়, তাহলে নিজে থেকে কিছু বলছেনা কেনো?
না কি সবই কাকতালীয়?
এসব কথা ভাবতে ভাবতে আমার খেয়াল হলো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাকে ল্যাপটপ থেকে তথ্য উদ্ধার করতে হবে। এসব ভাবাভাবির জন্য পরেও অফুরান্ত সময় আমি পাবো।
সুতরাং, কেস শুরু করার শব্দটি লিখে ল্যাপটপের লক খুলতে হবে। সেই শব্দটা কি?
শায়লা না পতিতালয়?
পতিতালয় লিখে টাইপ করতে দেখি পাসওয়ার্ড ইনকারেক্ট। নীচে লেখা আসছে, আর একবার ভুল পাসওয়ার্ড দিলে ল্যাপটপ ফরম্যাট হয়ে যাবে।
আমি একটু ভেবে শায়লা লিখে এন্টার বাটনে চাপ দিতে গিয়েও দিলাম না। শায়লা মুছে দিয়ে ব্যক্তিগত লিখে এন্টার বাটনে চাপ দিলাম।
এবং ল্যাপটপের লক খুলে গেলো। ল্যাপটপের লক খুলতেই হোমস্ক্রিনে ভেসে উঠলো শায়লার পাশে তারচেয়ে একটু বেশী বয়সী লোকের ছবি। অর্থ্যাৎ ল্যাপট স্ট্যান্ডবাইতে ছিলো।
আমি মোবাইল বের করে লোকটার ছবি তুলে রাখলাম। এরপর স্লাইড করতেই ভেসে আসলো একটা লেখা, যার অর্থ আমার বোধগম্য হলোনা। আমি সেটিরও ছবি তুলে রাখলাম।
এরপর, আরো ঘাটতে যাবো ঠিক তখনই ঘরের দরজা খোলার শব্দ পেলাম।
সুগন্ধীর কল্যানে বুঝতে পারলাম শায়লা ঘরে প্রবেশ করেছে। এবং ঠিক তখনই আমার খেয়াল হলো, শায়লার ড্রয়ারে যে পিস্তলটি থাকে সবসময় সেটি আজ ড্রয়ারে ছিলোনা….

Be the first to write a review

Leave a Reply

We’re sorry you’ve had a bad experience. Before you post your review, feel free to contact us, so we can help resolve your issue.

Post Review

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক গল্প