রাত প্রায় ১টা। কুসুমবাগ — পূর্ব ভারতের এক পুরনো রেলস্টেশন, বহু বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে। এখন সেখানে কেউ আসে না, কোনো ট্রেন থামে না।
কিন্তু সেই রাতে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল এক লোক — নির্মল ঘোষ, বয়স আনুমানিক পঁয়তাল্লিশ। চোখে ক্লান্তি, মুখে বিষাদ। কাঁধে ব্যাগ, হাতে একটা পুরনো রেল টিকিট।
নিজেই ফিসফিস করে বলছিল,
“আজ রাতেই ট্রেনটা আসবে… আমি জানি। আমার টিকিট আছে।”
চারপাশে নীরবতা। মাঝে মাঝে ফ্লাডলাইট জ্বলে উঠছে, আবার নিভে যাচ্ছে। বাতাস ভারী। ঝিঁঝিঁ পোকার আওয়াজ আর হঠাৎ হঠাৎ নিঃশব্দতা—সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত আতঙ্ক।
নির্মল একসময় রেলের চাকরি করতেন। স্ত্রী মারা গেছেন পাঁচ বছর আগে। তারপর ছেলে অয়নও আত্মহত্যা করে—ঠিক এই কুসুমবাগ স্টেশনেই, ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে।
তারপর থেকেই নির্মল মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। একা থাকেন, কারো সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন না। মাঝেমধ্যে বলতেন,
“অয়ন মাঝরাতে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে… আমি শুনতে পাই ওর গলা।”
আজ রাতেও সেই অপেক্ষা।
হঠাৎ পেছনে একটা আওয়াজ। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন—স্টেশনের এক পুরনো বেঞ্চে বসে আছে একটা ছেলে, মুখ নিচু করে। নিঃশব্দ।
নির্মল আস্তে এগিয়ে গেলেন। গলা কাঁপছে।
“অয়ন… তুই?”
ছেলেটা মাথা নাড়িয়ে না বলল। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে হেঁটে গেল প্ল্যাটফর্মের একদম শেষ প্রান্তে।
নির্মল পেছন পেছন গেলেন। কিন্তু গিয়ে দেখলেন — কেউ নেই। চারপাশে আবার সেই নীরবতা।
ঠিক তখনই দূরে একটা হুইসেল।
স্টেশন বন্ধ থাকলেও একটা পুরনো ট্রেন ধোঁয়ার মধ্যে মোড়া হয়ে ধীরে ধীরে স্টেশনে ঢুকছে।
না কোনো আলো, না যাত্রী। গার্ডও নেই।
দরজা খুলে গেল নিজে থেকেই।
নির্মল কেমন ঘোরে পড়ে ট্রেনে উঠে পড়লেন। ভিতরে অদ্ভুত ঠান্ডা। কামরার প্রতিটি আসনে বসে আছে সাদা কাপড়ে ঢাকা কিছু ছায়া।
সবাই যেন তাকিয়ে আছে তার দিকেই।
এক জায়গায় বসে আছেন একজন মহিলা। মুখ দেখা যাচ্ছে না, কণ্ঠস্বর চেনা।
“তুমি অনেক দেরি করে ফেলেছ, নির্মল।”
তিনি কাঁপা গলায় বললেন,
“তুমি… বর্ণালী?” (স্ত্রীর নাম)
মহিলা কিছু বললেন না। পাশে বসা এক অন্ধ পুরুষ ধীরে ধীরে বলে উঠল,
“ঘড়ি আটকে গেছে… ট্রেন চলছে না…”
এরপর গোটা কামরা হঠাৎ কেঁপে উঠল। জানালার বাইরে তাকিয়ে নির্মল দেখলেন — ট্রেন চলছে না, একটা লোহার সেতুর উপর দাঁড়িয়ে আছে। নিচে অন্ধকার জঙ্গল। আর কোনো রেললাইন নেই।
তিনি চিৎকার করে উঠলেন —
“না! এটা কোনো ট্রেন না! এটা একটা ফাঁদ! নামতে হবে!”
তখনই কামরার একপ্রান্তে খুলে গেল একটা দরজা — নিচের দিকে নামার অন্ধকার সিঁড়ি। আর সেই সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা ছেলে — তার ছেলে, অয়ন।
ছেলেটি শান্ত গলায় বলল,
“বাবা, এবার চল।”
নির্মল চোখের জল ফেলতে ফেলতে বললেন,
“তুই তো… তুই তো মরে গেছিস!”
ছেলেটি জবাব দিল,
“আর তুমি?”
পরদিন সকালে, কাছের গ্রামের একজন বৃদ্ধ স্টেশনের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। দেখতে পেলেন — প্ল্যাটফর্মের একদম শেষে পড়ে আছে এক পুরুষের দেহ।
পুলিশ এলো। রিপোর্ট লেখা হলো —
“অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তি, বয়স আনুমানিক ৪৫। হৃদরোগে মৃত্যু হয়েছে।
তার হাতে একটি পুরনো রেল টিকিট পাওয়া গেছে — যাতে লেখা:
‘কুসুমবাগ থেকে গন্তব্য: অজানা। সময়: ১:৪৪AM।’
অথচ সেই স্টেশন তো বহু বছর আগেই বন্ধ হয়ে গেছে…”