সব_হারিয়ে_যদি_পাই_তোমায় পর্ব:০৩

সকালটা আজ একটু আলাদা।
হয়তো কারণ আমি জানি,আজ আমি কলেজে ভর্তি হতে যাচ্ছি।ভেতরে ভেতরে ভয় করছে, কিন্তু আশাও টগবগ করছে।
রুবিনা ম্যামের দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী আমি যাই গ্রিন হোপ কলেজ এ।ফর্ম জমা দিই, ছবি দিই, সাক্ষাৎকার দিই
সব কিছু ঠিকঠাক।
কলেজ কর্তৃপক্ষ বলে আপনাকে বৃত্তির আওতায় ভর্তি করা হলো। আগামী সপ্তাহ থেকে ক্লাস শুরু।
চোখে পানি এসে যায়।
সারিকা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে।
তোর মুখে হাসি কেন? আবার কোথায় গেলি?”
আমি চুপ করে রই।
আরিয়ান সিঁড়ি দিয়ে নামছে। কানে হেডফোন। মুখে বিরক্তির ছাপ।আমি ওদের কারো কাছে কিছু বলি না।
আমি জানি, এখন কথা নয়, প্রমাণই যথেষ্ট।
আরিয়ান আজকাল অফিসে ঠিক থাকতে পারছে না।
তার গার্লফ্রেন্ড সামীরা, যাকে সে বিয়ে করেছে—
আজকাল অফিসে গিয়ে ঝামেলা করে।ব্যবসার ক্লায়েন্টের সামনেই চিৎকার
তোমার জীবনে আমি আসার পর কিছুই ঠিকঠাক চলছে না, আরিয়ান!আরিয়ান চুপ করে থাকে, কারণ ক্লায়েন্ট চলে যাচ্ছে মুখ কালো করে।
তার অহংকারে প্রথম ফাটল ধরলো।
আরফার ক্লাস শুরু হলো।সবার মাঝে একটু সংকোচ।
কারণ তার পোশাক সাধারণ, কিন্তু চোখে আত্মবিশ্বাস।
একটা মেয়ের সাথে তার বন্ধুত্ব হয় নাম ইরা।ইরাও মধ্যবিত্ত, কিন্তু মেধাবী।তারা একসাথে পড়তে শুরু করে।একটা জুটি গড়ে উঠছে—যারা হার মানে না।
সারিকা এখন সন্দেহ করে আরফা কী করছে।
সে একদিন আরফার ব্যাগ তল্লাশি করে দেখে কলেজের আইডি কার্ড।সেই রাতে আরফাকে ডেকে চিৎকার করে
তুই আমার পায়ের নিচে পড়ে থাকবি, মাথার ওপর না! কলেজে গিয়ে আবার কি নাটক শুরু করেছিস?
আরিয়ান পাশে বসে ছিল।
সে মুখে কিছু বলে না, কিন্তু একপলক তাকায় আরফার দিকে।সেই দৃষ্টিতে হিংসা ছিল, ভয় ছিল, আর অস্বীকার করার ব্যর্থতা ছিল।
আরফা রাতে আলো নিভিয়ে ছোট বাতিতে পড়াশোনা করে।সে জানে, প্রতিটি শব্দ একদিন তার অস্ত্র হবে।
একদিন সে আরিয়ানের চোখে চোখ রেখে বলতে পারবে—
তুমি আমাকে পদদলিত করতে চেয়েছিলে,কিন্তু আমি নিজেই একদিন রাজত্ব করবো।
গ্রিন হোপ কলেজে বার্ষিক সাহিত্য প্রতিযোগিতা চলছে।
বিষয়: সংগ্রামই জীবন
ইরা বলে, তুই অংশ নিবি না?
আরফা একটু দ্বিধায় পড়ে। মঞ্চে ওঠা মানেই তার অতীত প্রকাশ-তবুও সে রাজি হয়।
আরফার রচনার নাম: আমার শাশুড়ি মারা যাওয়ার কিছুদিন পর, আমার স্বামী আমাকে ডিভোর্স দেয়…
ক্লাসরুম নিস্তব্ধ হয়ে যায়।আরফার কণ্ঠ কাঁপছে, কিন্তু চোখে ভয় নেই।প্রতিটি লাইন যেন একটা যুদ্ধের গল্প।
আমি তখন ঘুমোতে যেতাম না—ভোর পর্যন্ত কাজ করতাম।
মা বলতেন, কাজ করো, কারণ তোমার স্বপ্ন কেবল তোমাকেই দেখতে হবে।
শুনে সবার চোখ ছলছল।
প্রথম পুরস্কার, আরফা রহমান
সহপাঠীরা উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দেয়।ইরা জড়িয়ে ধরে তুই পারবি, তুই পারবি!
প্রথম বারের মতো আরফা নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে সম্মান পেল।
আরিয়ান সামীরার উপর ভরসা করে কোম্পানির বড় অংশের দায়িত্ব দিয়েছিল।কিন্তু সে এক ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ ডেটা বিক্রি করেছে।
প্রতিবেদন আসে আরিয়ানের কোম্পানির স্টক পড়ে গেছে, ৪০% ক্ষতি।ক্লায়েন্ট হারাচ্ছে, ব্যাংক ঋণ ফেরত চাইছে।
আরিয়ান ফোঁস করে বলল,সামীরা, তুই আমার পেছনে ছুরি চালালি!
সামীরা হেসে বলে,তুই কি ভেবেছিলি, তোর মতো একজন ব্যর্থ লোকের সাথে আমি সারাজীবন থাকব?
আরফা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে।নিচের রাস্তায় নীরবতা। বাতি নিভে আছে।তার মন আজ একটু শান্ত,কিন্তু সে জানে এই শান্তি ক্ষণস্থায়ী।
আরিয়ান একদিন এই হাত ছুঁতে চাইবে,
কিন্তু সে কি আরফার সম্মান ফেরত দিতে পারবে?
আরিয়ান নিজের রুমে বসে আছে।চোখের সামনে রিপোর্ট, পত্রিকা, ব্যাংকের চিঠি।সব কিছু যেন দুঃস্বপ্নের মত।
যার জন্য মা আমাকে অবহেলা করতে শিখিয়েছিল,
সে-ই আজ আমায় শেষ করে চলে গেল!
দেয়ালে টানানো মায়ের ছবি দেখে বলে, মা, তুমি চলে যাওয়ার পর আমি একদম একা হয়ে গেলাম!
সামীরা সকালে ট্রলি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
তার ঠোঁটে লিপস্টিক, চোখে ঠাণ্ডা অবহেলা।
আরিয়ান বলল,সামীরা, কিছু বলবি না?
সামীরা পিছন ফিরে কেবল একটা বাক্য ফেলে গেল,
তুই তো কখনও কাউকে মানুষ ভাবিস না, আজ নিজেই অমানুষ হয়ে গেছিস।
দরজা বন্ধ হয়ে গেল।আরিয়ানের জীবনে একটা অধ্যায় শেষ।
আলোর মতো হাসছে আরফা।ইরা এসে বলে,
তোর রচনা নিয়ে পত্রিকায় আর্টিকেল ছাপা হয়েছে!
আরফার হাতে রোল করা পত্রিকাটা তুলে দেয় ইরা।
আরফা রহমান এক সাহসী কণ্ঠ,আরফার মুখে প্রশান্তি, চোখে লক্ষ্যের দীপ্তি।
একটি ইমেইল…
প্রেরক: Rubina’s Foundation
বিষয়: Internship Offer
রুবিনা ম্যাম, যে আরফাকে একদিন কাঁদতে দেখে নম্বর দিয়েছিলেন, এখন একটি সুযোগ দিচ্ছেন।তুমি যদি চাও, আমাদের সংগঠনে ইন্টার্ন হিসেবে কাজ করতে পারো।
বেতন কম, কিন্তু শেখার অনেক কিছু আছে।
আরফার চোখ ছলছল।
সে ইমেইলের উত্তরে লেখে,আমি আগ্রহী। আপনার কাছ থেকে শেখার সুযোগ পেলে কৃতজ্ঞ থাকবো।
আরফা:সন্ধ্যায় ইন্টার্নশিপ অফিসে প্রথম দিন। সবাই ভদ্র, সহযোগী।তার চোখে-মুখে অনন্ত জেদ।
আরিয়ান:শূন্য ঘর, শূন্য জীবন।বন্ধুদের কেউ ফোন ধরছে না।জানালার বাইরে তাকিয়ে সে ভাবে,এই শহরে আমায় চেনার কেউ কি আর আছে?
আরফা ফর্মাল পোশাক পরে পৌঁছেছে রুবিনা ফাউন্ডেশনে।
হৃদয় ভরা উদ্দীপনা, চোখে বড় স্বপ্ন।রিসেপশনে থাকা মেয়েটি তাকে ঠাণ্ডা চোখে দেখে বলে,তুমি ইন্টার্ন? ওই কোণে বসো। বেশি কথা বলবে না।
সেই মুহূর্তে প্রথম অচেনা একটা ব্যথা কাঁটার মত বুকের ভেতর ঢুকে যায়।তবে কি অফিসেও মানুষ শ্রেণীভেদ করে?
চোখ নামিয়ে চুপচাপ নিজের ডেস্কে বসে যায় আরফা।
হঠাৎ রুবিনা ম্যাম এসে অফিসের সবাইকে মিটিং রুমে ডাকলেন।
ম্যাম বললেন,নতুন একটি হিউম্যান রিসোর্স প্রজেক্ট হাতে নিচ্ছি। কে কে আগ্রহী?
সবাই হাত তুলল।আরফাও হাত তুলল ধীরে ধীরে।
একজন সিনিয়র, নাম সাদিক, হেসে বলে উঠল,ম্যাডাম, ইনি তো শুধু কাজের লোকের মেয়ে! কাগজ চালাতে জানে কি না সন্দেহ!
রুমে হাসির রোল।
রুবিনা ম্যামের মুখ থমথমে।তিনি কেবল বললেন,আমরা এখানে কাজ করতে এসেছি, ঠাট্টা করতে না। আর হ্যাঁ, আমি আরফাকে এই প্রজেক্টে চাই।
আরফার চোখে তখন জল, কিন্তু সে হাসল।একটা চুপচাপ বিজয়।
আরিয়ান বন্ধু রাজীবের অফিসে গিয়ে দাঁড়ায়,টাকা দরকার, রাজীব। কাজ কিছু পাইনি।
রাজীব ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,আরিয়ান ভাই, সময় বদলে গেছে। এখন আপনি আমার কাছে চাকরি চাইছেনআরিয়ান দাঁড়িয়ে থাকে,তার অহংকারের ইট একে একে খসে পড়ে।
আরফা ফিরে আসে বাসায়।ইরা চায়ের কাপ হাতে এগিয়ে আসে,কেমন ছিল প্রথম দিন?
আরফা হেসে বলল,কঠিন। অপমানের মধ্যেও সুযোগ ছিল। আমি সেটাই বেছে নিয়েছি।
ইরা আবেগে জড়িয়ে ধরল আরফাকে।তুই পারবি, আরফা।

Be the first to write a review

Leave a Reply

We’re sorry you’ve had a bad experience. Before you post your review, feel free to contact us, so we can help resolve your issue.

Post Review

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক গল্প