রুবিনা ম্যামের দেওয়া প্রজেক্টে আরফা দুর্দান্ত পারফর্ম করছে।হিসেবপত্র, লোক ম্যানেজমেন্ট, রিপোর্ট—সব কিছুই নির্ভুল।সবাই মুখে মুখে বলে,ওই মেয়ে কাজে দারুণ! এত স্মার্ট!
কিন্তু কেউ কেউ এখনো চোখ রাঙায়। বিশেষ করে সাদিক।
সাদিক, অফিসের সিনিয়র, বয়সে একটু বড়। অহংকারী।
প্রথম দিকে তাকে তাচ্ছিল্য করলেও এখন সে কিছুটা কৌতূহলী।প্রতিদিন সকালে তার ডেস্কে কফি রাখছে কে?
আরফা।
কেন?
আপনি সবার আগে অফিসে আসেন, আপনার টেবিলখালি থাকত, তাই…
সবাইকে তো কফি দাও না?
আপনি তো সবাই না।সাদিক থমকে যায়।
আহত, অপমানিত, হারিয়ে যাওয়া একজন পুরুষ।শহরের রাস্তায় রাস্তায় চাকরি খুঁজে ফিরছে।একটা কোম্পানির ইন্টারভিউতে যায়।বোর্ডরুমে বসে, তাকে একের পর এক প্রশ্ন।
কিন্তু একটাই প্রশ্নে গোঁজ হয়ে যায় আপনি কি কখনো আপনার ব্যাক্তিগত ইগো দিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন?আরিয়ান চুপ করে থাকে। তার চোখে ভাসে আরফার মুখ।সে বোঝে সে ঠিক কাকে হারিয়েছে।
সাদিক আরফার পাশে দাঁড়িয়ে বলে,তোমার মত মেয়ে… তুমি এখানে কতো দিন থাকবে?যতদিন না আমি নিজেই একটা কোম্পানি গড়ি।আমি… তোমাকে হেল্প করতে চাই।
আমি সাহায্য চাই না। আমি পথ চাই।
সাদিক হেসে, অবাক হয়ে চলে যায়।
এক সন্ধ্যায়, কাজ শেষে সাদিক এগিয়ে এসে বলল,চলো না, আজ তোমাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাই। ভালো লেগে যাবে।আরফা একটু থমকে যায়,
ডিনার?
হ্যাঁ। ডিনার না হলে হয় না?আমার ক্লাস আছে আজ, অনলাইন ক্লাস।শুক্রবার ক্লাস?
সাদিক হেসে বলে,তুমি শুধু কাজ আর পড়া—এই দুই জগতে বন্দী। নিজের জন্য একটু সময় রাখো।আরফা মাথা নিচু করে বলে,আমার অত সময় নেই… আর ডিনার দিয়ে যা বোঝাতে চাও, আমি সেটা এখন চাই না।
সাদিক আর কিছু না বলে হালকা হাসি দিয়ে চলে যায়।
কিন্তু চোখে ছিল গভীর কিছু… হতাশা না ভালোবাসা, বোঝা যায় না।
রুবিনা ম্যাম একদিন সবার সামনে বললেন,এই প্রজেক্টের প্ল্যানিংটা করেছে আরফা। ওর প্ল্যানেই আমরা কাজ শুরু করবো।”সবাই বিস্মিত।সাদিকও।
আরফা এবার নিজেকে লুকিয়ে রাখে না।
আস্তে আস্তে উঠে আসে সামনে।
আরিয়ানের সব টাকা gone.
ওই মেয়ে—সারিকা যার জন্য আরিয়ান আরফাকে ত্যাগ করেছিল,
সে এখন এক বড় বিজনেসম্যানের সাথে প্রকাশ্যে রিলেশন করছে।সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি, ভিডিও ভাইরাল।
আরিয়ান পাগলের মতো ঘুরে বেড়ায়।
সারিকাকে ফোন করে, সে ব্লক করে দেয়।
একদিন আরিয়ান তার বন্ধু রায়হানকে ফোন দেয়,ভাই, আমি শূন্য হয়ে গেছি। কেউ পাশে নেই।আরফা ছিল। তাকে তুমি দূরে ঠেলে দিয়েছো।
এক কথায় আরিয়ান স্তব্ধ।তবু সে স্বীকার করতে পারে না।
আমি ভুল করিনি… আমি শুধু ভালোবাসা খুঁজছিলাম।
সে তার পাশের ফ্ল্যাটে থেকে, অফিস করে, ক্লাস করে, মাঝে মাঝে চুপচাপ মায়ের ছবি নিয়ে বসে থাকে।নিজেকে জিজ্ঞেস করে, আমি কি একা হয়ে যাচ্ছি?আমি কি শুধু লড়াই করে বাঁচবো?ভালোবাসা কি আমার জীবনে নেই?
সে জানে, সাদিকের চোখে কিছু আছে,তবে সে নিজেকে আটকে রাখে,কারণ তার ভেতর আজো রয়ে গেছে এক অপমানিত স্ত্রীর ছায়া।আরিয়ানকে সে ভুলতে চায়, তবুও তার স্মৃতি ভুলতে পারে না।
আরফা আজ একটু ক্লান্ত।মাথাব্যথা করছে।
তার ডেস্কে বসে সে চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ বসে ছিল।
হঠাৎ দরজার শব্দ।সামনের ডেস্ক থেকে নিশাত ডেকে বলে,
—ম্যাম, একজন এসেছেন। আপনার সাথে দেখা করতে চাচ্ছেন। নাম বলছেন… আরিয়ান।
একটা কাঁপন যেন ছড়িয়ে যায় আরফার শরীরজুড়ে।
তোমার কী বললাম?
বললাম আপনি ব্যস্ত, কিন্তু উনি বসে আছেন। আর বললেন, আপনি তাকে চিনবেন।
আরফা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।
তার চোখে অদ্ভুত এক কঠোরতা, ঠোঁট জোড়া শক্ত করে বলল,ভেতরে পাঠাও।
আরফা দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল।আরিয়ান ঢুকতেই মাথা নিচু করে বলল,তুমি সত্যিই অনেক বদলে গেছো।
আরফা চেয়ার টেনে বসল।নির্বিকার গলায় বলল,তুমি কী চাও, আরিয়ান?একটা চাকরি।
চুপ…
আরফা তার চোখে চোখ রাখে,তারপর শুধু বলে,আমাকে ডিভোর্স দেওয়ার পর তুমি ভেবেছিলে আমি কোথায় যাবো?
আমি… আমি ভেবেছিলাম হয়তো কারো বাসায় কাজ করবে… হয়তো ফিরে যাবে কোথাও…
আরফা হেসে ওঠে।আর তুমি এখন আমার অফিসে এসে চাকরি চাইছো?
হ্যাঁ। কারণ আমার এখন কিছু নেই। তুমি যা আছো, তার কৃতিত্ব তোমার। আমি সেটা স্বীকার করি।
আরফার মুখে কষ্টের ছায়া,তবুও গলার সুর শক্ত,আমি কাউকে চাকরি দিই কেবল যোগ্যতার ভিত্তিতে, দয়ার নয়।
একটু পরে সাদিক অফিসে ঢোকে।আরিয়ান তখনো বের হয়নি।
দুজনে মুখোমুখি।চোখে চোখ পড়ে যায়।
সাদিক বলে,তুমি?
হ্যাঁ, আমি। তুমি কে?
আমি আরফার পাশে থাকা একজন।
আরিয়ান চলে যায়, আর সাদিক দরজাটা বন্ধ করে বলে,
তোমার এক্স হাজবেন্ড কি এখানে এসেছিল?
-হ্যাঁ।
-চাকরি চাইতে?
-হ্যাঁ।
-দেবে?
-হয়তো। কিন্তু শুধু প্রতিশোধের জন্য নয়।
সাদিক থেমে যায়।
চোখে ছিল একটা ভয়, আর হয়তো একটু ঈর্ষাও।
আরফার অফিসে আসে এক নারী—নাম নাহিদা রহমান।
উনি একজন প্রতিষ্ঠিত বিজনেসউইম্যান।বললেন
,
আমি তোমার কাজ দেখেছি। আমার সাথে একটি ফ্যাশন ব্র্যান্ড নিয়ে পার্টনারশিপ করবে?
আরফা প্রথমে থমকে যায়।তারপর স্মিত হাসি,আমি শুধু কাপড়ের ডিজাইন জানি না, জীবনকে ডিজাইন করতে শিখে গেছি।তাই তো তোমার মধ্যে একটা আগুন দেখলাম।
ঘরে ফিরলে,রাতে ঘুমাতে পারছিল না আরফা।
তার চোখে আজ অনেক স্মৃতি।
মা নেই,যে ঘরটায় সে ঘৃণিত বউ ছিল, সেটা আজ আর নেই,আরিয়ান একসময় তার স্বামী ছিল, এখন এক অফিস অ্যাপ্লিকেন্ট।সাদিক পাশে থাকে, কিন্তু আরফার মন তবু একা।
সে জানে, সামনে অনেক লড়াই।তবু এবার সে একা ভাঙবে না।
রাত গভীর।ঘড়ির কাঁটা দুইটা ছুঁই ছুঁই করছে।
আরফা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।
হঠাৎ ফোনে একটা মেসেজ ভেসে ওঠে….
ধন্যবাদ, আজ আমাকে সময় দেওয়ার জন্য। আমি জানি, আমি তা ডিসার্ভ করি না। – আরিয়ান
আরফা মেসেজটা পড়েই ফোন অফ করে দেয়।
তাঁর চোখে-মুখে ভেজা কুয়াশার মতো অতীতের ছায়া।
সে জানে…
আরিয়ানকে একসময় সে ভালোবেসেছিল, কিন্তু সে ভালোবাসা ছিল নিঃস্বার্থ, অপমানিত।
আজ, ক্ষমতার জায়গা বদলেছে, কিন্তু ক্ষত এখনও তাজা।
পরদিন অফিসে,সকালে অফিসে ঢুকতেই নিশাত জানায়,
আরিয়ান আজ অফিস টাইম শুরু হওয়ার আগে থেকেই এসে বসে আছে। বলছে, যেকোনো ছোট কাজ হলেও সে করতে রাজি।
আরফা চুপচাপ তার কেবিনে ঢুকে যায়।কিছুক্ষণ পরেই আরিয়ানকে ডেকে পাঠায়।
তুমি কি সত্যিই এখানে কাজ করতে চাও?আরিয়ান মাথা নিচু করে বলে,হ্যাঁ, সত্যি চাই। আমি নিজেকে প্রমাণ করতে চাই, একজন লিটারেট ম্যান হিসেবে, একজন কাপুরুষ স্বামী হিসেবে নয়।
আরফার চোখে এবার একটু নরম ভাব।
সে বলে..
একটা ট্রেনিং প্রজেক্টে নিচ্ছি তোমাকে। পারলে থাকবে, না পারলে চলে যাবে। আমিও কোনো অন্যায় করবো না,যেমন একসময় তুমি করেছিলে।
আরিয়ান মাথা নিচু করে স্যালুট দেয়।চোখে হালকা পানি।
এদিকে আরফা আর নাহিদা রহমান মিলে ফ্যাশন ব্র্যান্ড “AAN (Arfa and Nahida)” এর কাজ শুরু করে দেয়।
আরফার ডিজাইন আর নাহিদার মার্কেটিং ট্যালেন্ট— দুটো মিলে একটা ঝড় তোলে।
বিভিন্ন বিজনেস ম্যাগাজিনে আরফার ছবি ছাপা হতে থাকে।
সাদিক একদিন বলে,, তুমি তো এখন সুপারস্টার!
আরফা হেসে বলে,নাহ, শুধু জীবনের ছাত্র। যে অনেক দেরিতে বুঝেছে, নিজেকে ভালোবাসতে হয়।
আরিয়ান ছোট একটা ডেস্কে বসে কাজ শিখছে।একসময় যার পায়ের নিচে দুনিয়া ছিল, সে এখন সময়মতো চা খাচ্ছে, প্রেজেন্টেশন লিখছে।
কিন্তু সে অভিযোগ করছে না।সে শুধু প্রতিদিন আরফার সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাইছে।
একদিন সে দরজায় দাঁড়িয়ে দেখছে,আরফা আর সাদিক একসাথে হাসছে।
তার চোখে একটুখানি জ্বলুনি,তবু সে বুঝে গেছে —
এই জীবন তার প্রাপ্য।
রাতে আরফা একটা পুরনো ডায়েরি খুলে পড়ে।
মায়ের লেখা একটা চিঠি পড়ে সে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ে:
আরফা, তুই অনেক কষ্টে বড় হবি, কিন্তু তোর সাফল্য একদিন সবাইকে চমকে দেবে। কারো ঘৃণায় ভেঙে পড়িস না, কারণ তোর মন স্বর্ণের মতো।