সবুজ_ডায়েরীর_আত্মকথা পর্ব০৫ পর্ব এবং সমাপ্তি

—অনেক সময়ই তার ডায়রীটা পড়ার সুযোগ হয়েছে। কিন্তু ইচ্ছে করেই পড়িনি। অনেক সময় গোপনে সেও আমার ডায়রীটা পড়ার বৃথা চেষ্টা চালিয়েছিল। এখনো চেষ্টা চালাচ্ছে, কিন্তু মনে হয় না আমার কারণে সফল হয়ে উঠবে। আমার মতে স্বামী-স্ত্রীর পরষ্পরের ডায়েরি পড়া উচিত নয়। এতে করে নিজেদের মাঝের দুর্বল আর গোপন কথাগুলো জানাজানি হয়ে যায়, যা পরবর্তীতে সংসারের অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
—এবার ঈদে সে কিছইু নেই নি। আমি এবার যে বোনাস পেয়েছিলাম সেখান থেকে মায়ের জন্য একটা জামা কিনেছিলাম। আর কিছু টাকা ওর জামা কেনার জন্য রেখে দেই আর বাকি টাকা ঈদের খরচের জন্য। সে সুন্দর করে তার জন্য রাখা টাকাগুলো দিয়ে আমার জন্য পাঞ্জাবি কিনে এনেছে। জিজ্ঞেস করলাম,
~এরকমটা কেন করলে? টাকাগুলো তো তোমাকে দিয়েছিলাম রাখার জন্য।
-আমি টাকাগুলো মেরে দিয়েছি। আপনার কোনো সমস্যা?
ঈদের খরচের টাকাগুলো থেকে কিছু টাকা বাঁচিয়ে তার জন্য জামা কিনতে চেয়েছিলাম, সে রাগ দেখিয়ে বললো,
-আপনার টাকা আছে আপনি কিনতে পারেন। কিন্তু তখন আমাকে পাবেননা, আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো।
—রাতের খাবার শেষে বিছানায় শুয়ে ছিলাম। সে পাশে বসে বললো,
-আপনি কি একটা বিষয় খেয়াল করেছেন।
~কি?
-আপনি দিন দিন রোমান্টিক হয়ে উঠছেন।
~কি দেখে মনে হলো তোমার?
-এইযে আজ আমাদের বিবাহের এক বছর পূর্ণ হলো। আর আপনি এক কেজি গরুর গোশত কিনে এনে আমাকে সারপ্রাইজ দিলেন। তবে আপনি আরেকটু বেশি রোমান্টিক হতে পারতেন। যদি আপনি গল্পের নায়কের মত হাঁটু গেড়ে বসে এক কেজি গোশত হাতে নিয়ে প্রপোজ করতেন।
~না, আসলে ভেবেছিলাম আজকের বিশেষ দিনে অপ্রয়োজনীয় জিনিস না কিনে কিছু ভালো-মন্দ খাওয়া যাক।
—পাশের প্রতিবেশীর ছোট মেয়েটার আজ ব্রেকআপ হয়েছে। তাই কেঁদে কেঁদে বাড়িটা মাথায় তুলছে। ফোনেই কথা বলে প্রেম হয়েছে আবার ফোনেই ব্রেকআপ হয়েছে। আমার স্ত্রী পাশের বাসা থেকে এসে রেগে গিয়ে বললো,
-আচ্ছা এখনকার ছেলেমেয়েদের ফোনে কথা বলেই কিভাবে প্রেম হয়ে যায়।
~তোমার বয়স তো তাদের কাতারেই পড়ে।
-আরে আমি তাদের মতো না। আমাকে এত সহজে কাবু করা যায় না। বিয়ের আগে আমাকে এক ছেলে ফোন করে জ্বালাতো। বলতো, আমার জন্য এইটা করবে, সেইটা করবে। মানে এরকম একটা অবস্থা, যেনো আমি বললে সে স্পীড খেয়ে আকাশের চাঁদও নিয়ে আসবে।
~যাক বাবা তুমি ঐ ছেলের খপ্পরে পরো নাই। নাহলে তো তোমাকে পেতাম না।
-বিয়ের আগে প্রেম করাটা এখন অনেকের ফ্যাশনে পরিণত হয়ে গেছে। তাদের এমন ভাবসাব, যেনো প্রেম না করলে তাদের জীবনটাই বৃথা।
~থাক, বেশি কিছু বলো না। দেয়ালেরও কান আছে। কোনো প্রেমিক-প্রেমিকা তোমার কথা শুনতে পেলে তোমার উপর আক্রমণ করে বসবে।
—আজকে আমাদের মাঝে একটা বিষয় নিয়ে ছোটোখাটো ঝগড়া হয়েছে। রাতে যখন আবার ঝগড়া মিটমাট হয়ে আমরা মিলে যাই তখন সে জিজ্ঞেস করে,
-আচ্ছা আমাদের মধ্যে যে ছোট ছোট ঝগড়া হয়, সেগুলো কি আপনি ডায়রীতে লেখেন।
~না, শুধু মাত্র ভালো সৃতিগুলো লিখি। এতে করে আমি যখন মাঝে মাঝে নিজের ডায়রীটা পড়ি তখন মনের মাঝে ভালো অনুভূতিগুলোই খুঁজে পাই।
—রান্নাঘর থেকে ওর হাসির শব্দ শুনে ছুটে গেলাম। জিজ্ঞেস করলাম,
~কি ব্যাপার, কি হয়েছে? একা একা হাসছো কেন?
-আর বলিয়েননা, যেদিন আমার বড় বোনের বিয়ে হয়েছিলো, সেদিন রাতে দুলাভাই আর বোন আমাদের বাসায়েই ছিলো। উনাদের মজা দেখানোর জন্য আমি আর ছোটভাই মিলে দুষ্ট বুদ্ধি করি। লাঠির মাথায় কাল্পনিক ভূতের আকৃতির একটা হাঁড়ি বাঁধি। তারপর মাঝরাতে ছাদে উঠে মোবাইলে কিছু ভয়ঙ্কর আওয়াজ ছেড়ে দেই। এরপর মোবাইলটাকে হাঁড়ির ভিতরে টেপ দিয়ে আটকিয়ে তাদের রুমের জানালার সামনে নাড়াতে থাকি। তারা ভয়ে আম্মাগো আম্মাগো করতে করতে দরজা খুলে দিল এক দৌড়।
হঠাৎ কথাগুলো মনে পড়েছে, তাই একটু হেসে উঠলাম।
~তোমার মাথায় যে এরকম আজিব আজিব বুদ্ধি কোথা থেকে আসে কে জানে।
—আজকে তার প্রেগনেন্সির সাত মাস হতে চললো। কথা বলতে বলতে তার পেটে হাত দিয়ে বললাম,
~ইনশাআল্লাহ, আমাদের মেয়ে বাবু হবে।
-ইনশাআল্লাহ, আমাদের ছেলে বাবু হবে।
~মেয়ে বাবু হলে কি সমস্যা?
-ছেলে বাবু হলে কি সমস্যা?
~আমরা শুধু শুধু ঝগড়া করছি। আসলে তো ছেলে হোক মেয়ে হোক, দুটোই আল্লাহর দান।
-নাহ, আল্লাহ্ আমাদের ছেলে বাবুই দিবে।
~ ….
-চুপ কেন, কিছু বলেন।
~কিছু বললেও তুমি বলবে ছেলে বাবু চাই, না বললেও বলবে ছেলে বাবু চাই।
সে খিল-খিল করে হেসে বলল,
-আরে আমি তো আপনার সাথে মজায় না করছিলাম। আল্লাহ্ আমাকে ছেলে বা মেয়ে যেটাই দেক তাতেই আমি খুশি।
—বাসে করে শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছিলাম। মাদ্রাসায় পড়ে এরকম ছোট একটা ছেলে মাদ্রাসার জন্য টাকা তুলছিলো। ছেলেটাকে বিশ টাকা দিলাম। ছেলেটা রশিদ বই থেকে একটা রশিদের কাগজ ছিঁড়ে আমাকে দিলো। স্ত্রী পাশে থেকে বললো,
-আরও বিশ টাকা দিয়ে আরেকটা রশিদের কাগজ নেন।
~কিন্তু একবার তো দিয়েছি।
-যা বলছি তাই করেন।
আমি আরোও বিশ টাকা দিয়ে আরেকটা রশিদের কাগজ নিলাম। ছেলেটা চলে যাওয়ার পর সে আমার থেকে কাগজ দুটো চাইলো। আমি কাগজ দেয়ার পর বললো,
-এই নিন, এটা আপনার জান্নাতের টিকেট আর এটা আমার জান্নাতের টিকেট।
~জান্নাতের টিকেট!
-হুম, বলা তো যায় না আল্লাহ্ কোন কাজের উসিলায় আমাদের জান্নাত দিয়ে দেন। তাই ছেলেটার থেকে দুটো টিকেট নিয়েছি। একটা আপনার জন্য, আরেকটা আমার জন্য।
ডায়রীটা পড়ে শেষ করার দুই ঘণ্টা পরেই ভদ্রলোক ফোন দিলেন। বললেন,
-আমার স্ত্রী অনুমতি দিয়েছে। তবে আমার কিছু কথা আছে।
-জ্বি, বলুন।
-যদি বই আকারে ছাপা হয় তখন তো ঠিকই আমাদের হতে সেই বই চলে আসবে। তাই আমি চাচ্ছিলাম আমাদের দুজনের ডায়রীর যেসকল কথা একান্ত ব্যাক্তিগত, আর যেসকল কথা আমাদের পরষ্পরের জানা উচিত না, সেগুলো বাদ দিয়ে দিলে ভালো হবে।
-হ্যাঁ অবশ্যই, আমিও সেটা ভেবেছি। আর আপনি বলায় আমি বিষয়টার দিকে আরো বেশি নজর রাখবো। বইটা যদি ছাপা হয় তাহলে প্রথম কপি অবশ্যই আপনাদের পাঠাবো।
-ঠিকাছে, জাযাকাল্লাহু খাইরান।
====ছয় বছর পর।
বারান্দায় বসে সামনের বিল্ডিংয়ের ছাদের রেলিংয়ে বসা কবুতর দুটিকে দেখছিলাম। দু কাপ চা হাতে আমার পাশে এসে বসলো আমার বউ। বউয়ের চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসছিলাম। চায়ের কাপ হাতে দিতে দিতে সে জিজ্ঞেস করলো,
~কি ব্যাপার হাসছেন কেন?
-সবুজ ডায়েরীর মানুষ দুটোর কথা খুব মনে পড়ছে।
~ওহ! কি খবর তাদের? আর কি কোন খোঁজ পেয়েছিলেন তাদের?
-কই আর পেলাম তাদের। শেষ কবে কথা হয়েছে ভুলেই গেছি। বইয়ের প্রথম কপিটা হাতে পাওয়ার পর তাদেরকে দেয়ার জন্য অনেকবার কল করেছিলাম। ডায়েরীর মত লোকটার মোবাইলটাও হারিয়ে গিয়েছিল নাকি কে জানে। আমিও কত বোকার মত কাজ করেছি। তাদের দুজনের ডায়েরী দিয়ে গল্প লিখলাম অথচ ঠিকানাটা রাখলাম না।
~যখন বইটা পড়ি তখন আপুটার সাথে দেখা করার অনেক ইচ্ছে হয়। আচ্ছা, গল্পের শেষে আপনি নিজে থেকে বানিয়ে কোনো বিশেষ ঘটনা যোগ করে দিতেন, গল্পটা আরেকটু সুন্দর হতো।
-চাইলে অবশ্য পারতাম। কিন্তু জীবনের অসাধারণ ঘটনাগুলোর শেষে নিজের বানানো সাধারণ ঘটনা যোগ করে গল্পটা অন্যরকম বানাতে ভালো লাগছিলো না।
~আপনার এই সাহিত্যিক উত্তর গুলো বইয়েই লিখিয়েন। আমাকে বলার সময় সাধারণ ভাবে বলিয়েন।
কবুতর দুটোর দিকে তাকিয়ে বললাম,
-তবে আমার মাথায় অন্য একটা ভাবনা এসেছে। ভাবছি বিয়ের পর থেকে আমাদের মাঝের প্রেমের কথাগুলো দিয়ে একটা বই লিখে ফেলি। যদিও আমাদের প্রেমের গল্পটা উনাদের গল্প থেকে একটু আলাদা।
~আপনি কি লেখালেখির জন্য আর কোনো বিষয় খুঁজে পাননা। খালি প্রেমের গল্পই লিখে বেড়ান। এখন কি ঘরের কথা মানুষকে জানিয়ে বেড়াবেন নাকি।
-অশ্লীল প্রেম আর যৌনতার গল্প, ঘটনা যেভাবে সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে তাতে না হোয় আমার হালাল প্রেমের ঘটনাটা একটু ছড়িয়ে পড়ুক,
দোষ কি তাতে!
ভাবছি নাম কি রাখবো আমাদের গল্পের???

Be the first to write a review

Leave a Reply

We’re sorry you’ve had a bad experience. Before you post your review, feel free to contact us, so we can help resolve your issue.

Post Review

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক গল্প